রাত্রি মানেই রহস্যময়তা। রাত যতই গভীর হয়, রহস্যের গভীরতাও তত বাড়তে থাকে। রহস্যের আকার ও প্রকার ভিন্ন। ব্রম্মাণ্ডের সব জটিলতাও জড় হতে থাকে আঁধারের ডানায় ভর করে এসে। এই মাঝরাতেই হাজার ঘটনার সূত্রপাত হয়, আবার মাঝরাতেই অনেক ঘটনার নিমীলন ঘটে। শিহাবের অন্তর্ধানের প্রভাব সাথীকে কোন মনস্তাত্ত্বিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তার মধ্যরাত্রির আচরণই একটি বাস্তবঘেঁষা প্রমাণ। এই আচরণের ব্যাপ্তি ও কালকে এ গল্পে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

মধ্যযামের উপাখ্যান
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯৮

জামাল উদ্দিন আহমদ

comment ৮  favorite ০  import_contacts ২২৭
সাথী বসে বসে দোল খাচ্ছে দোলচেয়ারে। একা। ছাদে। পাশে একটা পানির বোতল। মেডিটেশনের একটা মিউজিক স্মার্টফোনে বাজিয়ে চোখ বন্ধ করে ইয়ারফোনে শুনছে। ছ’তলার উপরের ছাদ শুনশান। অভিজাত এলাকা বলে এ সময়ে আশেপাশে কোন শব্দ নেই বললেই চলে। হঠাৎ দুয়েকটা নিশাচর পাখি ফুড়ুৎ করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ঠিকই, তবে তা চমকে দেয়ার মত কিছু নয়। নিচের দু’চারটা পোষা গাছে পাখিরা আবাস গড়তে পারেনা বলে কোনো কূজনেরও বালাই নেই। হেমন্তের হাওয়ার দমক সমুদ্রের ঢেউয়ের মত বিরতি নিয়ে ছাদের উপরে ভেঙ্গে পড়ছে।

ছাদে ফুলের টব রাখা, কাপড় শুকানো, ইত্যাদি গেরস্থালি কাজের বাড়তি সুবিধাটা টপফ্লোরের বাসিন্দা হিসেবে সাথীরা আদায় করে নিয়েছে। তাই বাড়তি একটা চাবি তাদের কাছে থাকেই। তবে গভীর রাতে নির্জন ছাদে উঠে বসার অভ্যাসটা সাথীর নতুন। মা-বাবা টের পেলে কখখনো তাকে অমন দুঃসাহসী কাজ করতে দিতেন না। তাছাড়া সাথীও সেরকম সাহসী মেয়ে নয় যে সন্ধ্যার পর ছাদে উঠবে। ইউনিভার্সিটিতে যাওয়া আসা কিংবা জরুরি কোনো কাজ ছাড়া সে দিনের বেলাতেও একা একা ঘুরে বেড়াতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। শিহাবের সাথে রিক্সায় ওঠা কিংবা মাঝে মাঝে ঘুরে বেড়ানোর ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন । কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিবর্তনটা সাথীর মধ্যে ঘটেছে তার কোনো ব্যাখ্যা তার নিজের কাছেও নেই। রাত বারোটা পেরিয়ে গেলে সে কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। আস্তে করে সামনের দরজাটা খুলে খালি পায়ে চুপি চুপি সিঁড়ি ভেঙ্গে সে ছাদে পৌঁছে যায়। ছাদের স্টীলের দরজাটা হাল্কা আওয়াজ করলেও তা ঘরের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছায় না। আজও সে একই ভাবে এসে দোলচেয়ারে বসেছে।

শিহাব একদিন বলেছিল,স্বর্গের অনুভূতিটা কেমন বড় জানতে ইচ্ছে করে। সাথী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হা করে শিহাবের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারেনি। একটু ধন্দে পড়ে গিয়েছিল সে; শিহাব কি জাগতিক স্বর্গের ইঙ্গিত করল!করলেও করতে পারে, অমনটা অনেকেই করে। তবে সাথী তা গায়ে মাখেনি। কিন্তু না, শিহাবকে তেমন মনে হয়নি। আলো-আঁধারি রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসেও স্বচ্ছ কাছের জানালার ওপারে বহু দূরের ধুসর আকাশের দিকে তাকিয়ে সে কথাটা বলেছে। সাথী এই অস্বস্থিকর হেয়ালিকে মুছে দিতে গিয়ে তড়াক করে বলেছিল, কফির কথা বলি?

শুধু অই দিনই নয়। আরও বেশ ক’বার শিহাবের দুর্বোধ্য আচরণ লক্ষ করেছে সাথী। মাঝে মাঝেই কেমন আনমনা হয়ে যায়। কখনও বলে, আচ্ছা সাথী, মানুষ যদি তারার মত দূর আকাশে মিটমিট করে জ্বলতে পারত! কিংবা, সমুদ্রের স্ফটিক জলের নিচে প্রবাল-বাগানে চুপ করে ফুটে থাকত! সাথী তখন মেকি বিরক্তি নিয়ে বলত, আচ্ছা তুমি আবার কবি হলে কখন থেকে? শিহাব উত্তরে শুধু মৃদু হাসত।

রোজকার মত সাথীর ছড়ানো চুল থেকে থেকে উড়ছে, কখনও ডানে, কখনও বায়ে। দুয়েক গোছা আলগোছে ছুঁয়ে যাচ্ছে পেলব মুখমণ্ডল। সাথী চোখ বন্ধ করে অতলান্তিক সুরের সাগরে ডুবে আছে। ক্রমশ সে গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। সেই গভীরতায় তার দু’চোখ উন্মীলিত। মুগ্ধতা আর প্রশান্তিতে সে দেখতে পাচ্ছে তার ডানে নীল, বাঁয়ে নীল, সামনে নীল, পেছনে নীল, উপরে নীল, নিচে নীল। তার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে অসংখ্য অজানা প্রজাতির বিচিত্র রঙের প্রাণী। সবগুলো প্রাণীই যেন তার সুহৃদ, কেউ শত্রু নয়। প্রতিটি প্রাণীর সাথে সেও এঁকেবেঁকে চলছে এক অপার্থিব সুর ও ছন্দের মূর্ছনায়। আবার মনে হয়, এ তো কোন প্রাণের সমাবেশ নয়। এ যেন শুধুই মায়াবী রূপ আর পরাজাগতিক পরশ। সে জানে আজও তেমনটি ঘটবে, আজও কেউ একজন আসবে। আজও আলতো করে কেয়ারী কেশে আঙুল বুলিয়ে দেবে কাফী রাগের প্রসন্নতায়।

কোনো হুল্লোড় নেই, হুলুস্থুল নেই, এক সহজিয়া মেদুরতায় কেউ একজন প্রতিদিন এসে হাত রাখে সাথীর অবিন্যস্ত কুন্তলকাননে। আঙুলের মৃদু সঞ্চালনে সাথীর একটু শিহরণ জাগলেও সে আন্দোলিত হয় না, কিংবা আন্দোলিত হওয়ার তাড়াও অনুভব করে না। যার অদেখা সম্মোহনী শক্তির টানে সে প্রতিরাতে ঘরছাড়া হয় সেই রহস্যময় সত্ত্বাকে দেখার প্রবল কৌতুহলও তার কখনও হয় না। কিংবা এমনও হতে পারে, এরকম আধোপার্থিব অবস্থানে তার কিছুই করার নিয়ম নেই শুধু সুর-ছন্দ-স্পর্শের প্রকাশ-অক্ষম এক মোহ-মোক্ষমতাকে স্বর্গীয় নিরবতায় ধারণ করা ছাড়া। কিন্তু একটা আশ্চর্য ব্যাপার হল, কিছু বলতে না পারলেও যে কথা বা প্রশ্ন সাথীর মনের পর্দায় ভেসে উঠে তা সেই অন্য কেউ – যে তার চুলে বিলি কাটে – ঠিকই শুনতে পায়। সাথী তাকে দেখতে না পেলেও তাকে অনুভব করে, তার শব্দহীন কথা শোনে। যেমন সাথীর মনের পর্দায় একটি প্রশ্ন ভেসে উঠল, ‘আজ কেমন আছ?’ অবশ্য প্রশ্নটি হতেও পারত,’তোমাকে আমি দেখতে পাই না কেন?’ কিন্তু তা আধো-জাগতিক মোহ-মোক্ষমতার কারণে হয় না। অদৃশ্য মনোহর সঙ্গীটি ঠিকই জবাব দিয়ে দেয়, ‘খুব ভাল, তোমার কুন্তল আন্দোলিত করতে পেরে আমার খুব আনন্দ লাগছে।

এই আধো-জাগতিক মোহগ্রস্থতার জন্যই হয়তোবা সে প্রতিদিন মধ্যরাত্রির ছাদকে বেছে নিয়েছে। দিনের বেলা সে বহুবার এ নিয়ে ভেবেছে। এমনটিও আশংকাও করেছে যে এটা কি তবে কোনো মানসিক রোগের লক্ষণ? নাকি কোনো অশরীরী আত্মার প্রভাব? কয়েকবার শক্ত পণও করেছে, আর নয়। কিন্তু কাজ হয়নি। রাত থিতু হতে থাকলেই তার শরীর-মন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই গিয়ে হাজির হয়েছে ছাদের নিস্তব্ধতায়।

মধ্যযামের ঐন্দ্রজালিকতায় বেশ ভালই কেটে যাচ্ছিল নিভৃত প্রহর। কিন্তু সেদিনকার কথোপকথনের পর থেকে সাথীর বজ্রকঠিন তন্ময়তার পাক যেন ঢিলে হতে শুরু করেছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও অনেকগুলো প্রশ্ন চোখের সামনে দোল খেতে আরম্ভ করেছে সেই স্বর্গীয় স্নিগ্ধতার মাঝেও।

ক’দিন আগে এমনই এক আধো-জাগতি শুন্যতার জগতে ভাসতে ভাসতে সাথী বলল অর্থাৎ মনের পর্দায় ফুটিয়ে তুলল, আমি যে হাজার রঙের ফুলঝুরি দেখতে পাচ্ছি – আমাকে ঘিরে আছে সবদিক থেকে, তুমি কি তা দেখতে পাও?
মনোহর শব্দহীন বলল, হ্যাঁ, কেন পাব না, কী নয়নাভিরাম!
রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ তোমার ইন্দ্রিয়তে কি ধরা পড়ে?
হ্যাঁ, আলবৎ পড়ে।
আচ্ছা, রাতের ঘন নীল আকাশে যে তারার মেলা দেখা যায় ওখানে কি তুমি যেতে পার? সাথীর প্রশ্ন।

অনস্তিত্ব মনোহর একটু হাসল হয়ত, কী যে বল, আমিতো ওখানেই থাকি।
তাই? সাথী একটু চমকাল। আচ্ছা, পাতালের খবরও কি তুমি বলতে পার?
অবশ্যই পারি। সেও তারার মত এক রহস্যময় জগত। পাতালের সব খবর মানুষ জানে না। তবে হ্যাঁ নাগালের মধ্যে অগুনতি প্রবালের পাহাড় আছে; কেমন ফুলের মত ফুটে রয়েছে সব।
সাথীর সুরতন্ময়তা কি তখন সপ্তক স্পর্শ করল? কারণ মনোহরের কথা শুনে তার অনুভূতির সেতার দ্রুতলয়ে মন্দ্রিত হচ্ছিল। তবে কি......? তবে কি’র সাথে এক ঝাঁক প্রশ্ন ভেসে উঠল তার মনের পর্দায়। কিন্তু সে চাইছিল না এতগুলো প্রশ্নের ঘোরপ্যাঁচে পড়ে যাক মনোহর।

সাথী না চাইলে কী হবে, চুলেবিলিকাটা মুগ্ধ মনোহর সবই পড়ে ফেলেছিল এক লহমায়। তাই পড়েছেও ঘোরপ্যাঁচে। এবার কী বলবে সে? কী বলবে শিহাবের কথা? তার ঠিকানা আকাশ নাকি পাতাল? সাথীর তবে কি’র মধ্যে তার নিজের সত্ত্বা নিয়েও একটি প্রশ্ন আছে – সে নিজেই কি শিহাব ? তারার রাজ্য থেকে নেমে এসেছে অনস্তিত্ব সত্ত্বা হয়ে? নাকি সমুদ্রের তলদেশের কোন প্রবাল সে? আরও অনেক তালগোল পাকানো প্রশ্ন – যেমন, সাথী নিজেই কি চলে এসেছে অসীম তারার জগতে কিংবা ঘন প্রবালসারির উপত্যকায়? না, মনোহর এই জটিল প্রশ্নমালার জটাজাল ছিন্ন করতে পারবে না।

শিহাবের রহস্যময় অন্তর্ধানের অনেকদিন হয়ে গেল। সেদিন বর্ষামুখর শ্রাবণ সন্ধ্যায় বেশ ক’বার ফোন করেও ব্যর্থ হল সাথী। শিহাবের ফোন বন্ধ। অনিদ্রায় কেটে গেল সারা রাত। দিনের বেলা ইউনিভার্সিটিতে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল শিহাবকে। ভালভাবে কথাও বলেনি সাথীর সাথে। অনেক চেষ্টা করেও তার বিমর্ষতার কথা জানতে পারেনি সাথী। সচ্ছল পরিবারের পড়ুয়া স্মার্ট ছেলে সে, কী এমন মগ্নচৈতন্যের স্বর্গ-মর্ত্যের ভাবনা নিয়ে পড়ল সে যে সাথী তার কুলকিনারা করতে পারছিল না। সন্ধ্যায় তাই আবার খোঁজ নিতে চেয়েছিল।

পরের ঘটনাগুলো ধারাক্রম অনুযায়ীই ঘটে গেছে। বন্ধু-সহপাঠী সবাই উদ্বিগ্ন। ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের কানে খবরটা পৌঁছালে তারাও যথেষ্ট সহমর্মিতা দেখিয়েছে। শিহাবের বাবা-মাকে জিডিই করার পরামর্শ দিয়েছে সবাই। ঘনিষ্ট বন্ধুরা সাথীর চোখের জল মুছে দিয়েছে অনেকবার। এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যেই প্রথম সবাই জানতে পারল সাথী ও শিহাবের মধ্যে একটা ভালবাসার সম্পর্ক ছিল। তাদের দুই পরিবার বিষয়টা জেনে যাবার পর কষ্টের আরেকটা মাত্রা যোগ হল। ছেলের শোকের আতিশয্য থাকা সত্ত্বেও শিহাবের মা-বাবা সাথীর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে চোখের জল আড়াল করেছেন। এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন তাদের করণীয় সবকিছুইতো করেছে, সাথে আরেকটা ঘা-ও জুড়ে দিয়েছে। শিহাবের সম্ভাব্য জঙ্গীসংশ্লিষ্টতা খুঁজতে গিয়ে যখনতখন ঘনিষ্টজনদের ডেকে নিয়ে যাচ্ছে ডিবি অফিসে। শিহাবের পরিবারতো বলতে গেলে সারাক্ষণই পুলিশি তলবীর মধ্যে আছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী শিহাবকে শেষবারের মত দেখা গিয়েছিল মহাখালী রেলগেটের কাছে। তার সহপাঠী বাদল ঘটনার দিন সন্ধ্যাবেলা শিহাবকে মহাখালীর ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সিগ্রেট টানতে দেখেছিল। অথচ শিহাব ধূমপায়ী না। বাদল সন্ধিগ্ন মনে জিজ্ঞেস করাতে সে বলেছিল মনটা ভাল না তাই মিছেমিছি ধুঁয়া গিলছে। আর কোন গুরুত্ত্বপূর্ণ কথা তাদের মধ্যে হয়নি। শিহাবকে সেখানে রেখেই বাদল আব্দুল্লাহপুরগামী বাসে উঠে গেছে।

সাথী যখন মিহি সুরের মায়াজালে মন্দ্রিত, স্বভাবসিদ্ধ শুন্যযানে আরোহণ করে কাঙ্ক্ষিত আগন্তুক এসে নামে সাথীর নিঃসীম নিরব জলসাঘরে। সাথী বুঝতে পারে তার কেশরাশি এলিয়ে পড়ছে ঝর্ণার মত। এই মুগ্ধতার মাহেন্দ্রক্ষণে শুধু স্বর্গীয় নিরবতাই ধারণ করা ছাড়া আর কিছু করার নিয়ম নেই। তবুও এতদিনে সাথীর বজ্রকঠিন তন্ময়তা আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠেছে অনেকটা। অনিচ্ছায়ও প্রশ্নের মিছিল ভীড় করেছে তার মনের পর্দায়। সেদিন যদিও চায়নি মনোহর ঘোরপ্যাঁচে পড়ে যাক, কিন্তু আজ মনে হল সে জিজ্ঞেস করেই ফেলে, তুমি আসলে কে? তুমি কি শিহাব? তুমি কি স্বর্গের দেখা পেয়েছ? স্বর্গ থেকে নেমে আস প্রতিদিন?
আনমনা মনোহর সাথীর একশ্বাসে করা প্রশ্নগুলো পড়ে চুপ করে রইল। সে জানে সাথী সেদিন চায়নি মনোহর একরাশ জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বিব্রত হোক। কিন্তু তারতো সবই জানা হয়ে গেছে। সাথীর তবে কি’র প্রশ্নগুলোর জটে সে এখনও গিঁটবদ্ধ। সে বুঝতে পারছে না তার কী করা উচিৎ। বিশেষ করে সাথীর অই প্রশ্নটাই তাকে জটিল ধাঁধাঁর মুখোমুখি করে দিয়েছে – তার পরিচয় কী? সেতো নিজেই জানেনা সে কে। সে বুঝতে পারেনা কেমন করে প্রতিরাতে তার অস্তিত্বহীন সত্ত্বা সাথীর অনিন্দ্যসুন্দর শুন্যতায় অবতরণ করে, কুন্তলসুরভিতে বুঁদ হয়, কথা বলে সাথীর সাথে।
এবার সাথীর মনের পর্দায় স্পষ্ট হয়ে ভাসে, শিহাব আমার চুলের গন্ধ প্রাণভরে শুঁকত।
মনোহর এবারও কোনো মন্তব্য করে না।
সে সুন্দর করে স্বপ্নের রংতুলি দিয়ে আগামি দিনের ছবি আঁকত আর আমি মুগ্ধতায় চোখ বুজে তা উপভোগ করতাম।
সাথীর কথা শুনে মনোহর আরও জড়সড় হয়ে যায়।
একটু থামার পর সেতারের মূর্চ্ছনায় সাথীর মানসপটে আঁকাবাঁকা ক্লিষ্ট স্বরলিপি ভেসে ওঠে, কেন সে শেষবেলায় স্বর্গের ছবি আঁকা আরম্ভ করল, কেন সে সাত রঙ ছেনে শতসহস্র শেড তৈরি করে প্রজাপতির ডানায় ভর করে ঘুরে বেড়াতে চাইল...
মনোহর জুতসই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে অস্থির হয়ে পড়লে তার অঙুলি সঞ্চালনও দ্রুত হয়ে পড়ল।
সাথীর বর্ণিল উদ্যানের আলোর স্ফুরণগুলোও তখন দ্রুতলয়ে রঙের বিভা ছড়াতে লাগল। তার মনে হল আলোর ছটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠছে।

হঠাৎ খট করে একটা শব্দ হওয়াতে সাথী কেঁপে উঠে চোখ খুলতেই দেখে মুখের সামনে উজ্জ্বল আলোর এক ফ্লাশলাইট। সে কিছু বলার আগেই তার বাবা পানির বোতলটা পায়ের কাছ থেকে উঠাতে উঠাতে বললেন, মা, বাসায় চল। এই গভীর রাতে এখানে কী করছিস? মায়ের বিস্ফোরিত চোখ ভয়ে পাথর হয়ে আছে। তিনি বললেন, কী সাংঘাতিক! কী করছিলি?
সাথী শান্ত কণ্ঠে বলল,স্বর্গে গিয়েছিলাম।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement