পড়াশুনা করতে হয় তাই করতাম, জীবনের কোনো লক্ষ্য ছিলো না। আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর নিত্য গোপাল আস স্যারের জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যদি চাকরি করি তবে শিক্ষকতাই করবো। ওনার মতো জনপ্রিয় না হতে পারলেও শিক্ষক হয়েছি, তাই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯
গল্প/কবিতা: ৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশিক্ষক (অক্টোবর ২০১৯)

যাঁর জনপ্রিয়তা...
শিক্ষক

সংখ্যা

hosne ara parvin

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৯
যাঁর জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে সেই যে সবেমাত্র স্কুল শেষ করে কলেজ জীবনে পা রাখা আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ‘যদি চাকরি করি তবে শিক্ষকতাই করবো’, আজ তাঁর কথা লিখতে যেয়ে কতকিছু মনে পড়ে যাচ্ছে! অনেকবার ভেবেছি ওনার সাথে দেখা করি। কিন্তু সময় সুযোগ করে উঠতে পারিনি। শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করার একটা উপলক্ষ্য পেয়ে আমার প্রিয় স্যারের সাথে দেখা করার জন্য ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল বের হই। শুনেছিলাম উনি পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় অবসর গ্রহণ করেছেন। থাকেন রাজশাহীতে। লক্ষীপুর মোড়ে এক বিলাসবহুল কনফেকশনারিতে ওনার নাম বলে বাসার অবস্থান জানতে চাইলাম। আশা করিনি ওরা বলতে পারবে। একটা ছেলে এসে রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে অনেকটা যেতে হবে বলল। হেঁটেই চলেছি, খানিকপর পাশের এক দর্জির দোকানে জিজ্ঞাসা করলাম, একটা বাচ্চা মেয়ে বেড়িয়ে এসে বলল চলুন আমি নিয়ে যাচ্ছি। হাঁটছি আর ভাবছি- সত্যিই স্যার আপনি শুধু আমার প্রিয় নন! ইট-পাথরের এই পাষাণ মহানগরে যেখানে পাশের ফ্ল্যাটের একজন আরেকজনকে চেনে না সেখানে আপনার পরিচিতি ক্লাসরুম ছাড়িয়ে দোকান, রাস্তার মোড়সহ সব যায়গায় পৌঁছে গেছে! মেয়েটি বাড়ি দেখিয়ে দিয়ে চলে গেলো।
নিচতলায় খোঁজ নিয়ে জানলাম স্যার চারতলায় থাকেন। কলিংবেল চাপতেই সেই পরিচিত গমগমে কণ্ঠস্বর। ভেতর থেকে উনি বললেন, ‘দরজা খোলা আছে, আসুন’। ভেতরে গেলাম। বড় একটা রুম, অনেকগুলো বেঞ্চ, হোয়াইট বোর্ড, শোকেসে সাজিয়ে রাখা নানা স্বীকৃতির বিস্তর স্মৃতিচিহ্ন। বাঁধাই করা পেপার কাটিং দেয়ালে ঝুলানো। খোলা ছাদে টবে লাগানো নানা ধরণের গাছ। বুঝতে পারলাম উনি বাথরুমে, একা বসে বসে ভাবছি-আমার মত লক্ষ্যহীন একজনের মনে ওনার জনপ্রিয়তা শিক্ষক হওয়ার বীজ বপন করেছে সেই জনপ্রিয়তা ওনাকে অবসর নিতে দেয়নি! অনেকক্ষণ পর তিনি এলেন। আমার মনোছবিতে অঙ্কিত সেই যে কোর্ট-টাই পরা টগবগে প্রাণচ্ছোল মানুষটাকে মিলাতে পারলাম না। মোটা লেন্সের চশমা পরিহিত, বয়োভারাক্রান্ত স্যার আস্তে আস্তে এসে বললেন, ‘কি সমস্যা? ছেলে না মেয়ে? বুঝতে পারলাম উনি আমাকে প্রাইভেট শিক্ষার্থীদের অভিভাবক মনে করেছেন। বললাম, ‘স্যার ১৯৮৬ সালে আমি নিউ গভঃ ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছি’। চিনতে পারলেন না।
ভেবে দেখলাম ওনার তো আমাকে চেনার কথা নয়। কারণ গালস্‌ স্কুল থেকে পাস করা আমি, কোএডুকেশনে সংকুচিত পদচারণা। শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে আমাকে আলাদা করে চোখে পড়ার মতো কোনো কিছুই ছিলো না। অন্যক্লাস না করলেও স্যারের পদার্থ বিজ্ঞান ক্লাসের জন্য সবাই অপেক্ষা করতাম। রাজনীতি করা, ক্লাস পালানো, আর্টস কমার্সের ছেলেরা পর্যন্ত এসে হাজির হতো। বেঞ্চে জায়গা হতো না। একদিন অনেক ছেলে দাঁড়িয়ে আছে দেখে স্যার গণনা করে বললেন, ‘ বিজ্ঞানে মোট ভর্তি হয়েছে এতজন (সংখ্যা মনে নেই) তোমরা তো সকলে বিজ্ঞানের নও! বাবারা যারা বিজ্ঞানের নও তারা বন্ধুদের ক্লাস নষ্ট করো না প্লিজ ওদের বসতে দিয়ে তোমরা চলে গেলে আমি খুশি হবো। ওনার কথার যাদুতে পিনপতন নিরবতা নেমে এলো এবং বেশকিছু ছেলে বেড়িয়ে চলে গেলো। উনি কি যেনো একটা হাসির কথা বলে আমাদের খুব হাসালেন তারপর বললেন, তোমাদের ক্লাস তোমরা পাহারা দিবে যাকে তাকে ঢুকতে দিলে ওরা তোমাদের ইমেজ নষ্ট করবে...’। উনি নিজেও যেমন হাসতেন তেমন মজার মজার কথা বলে ক্লাস মাতিয়ে রাখতেন। পদার্থের কাঠখোট্টা বিষয়গুলো আর কঠিন মনেই হতো না। নানা অম্ল-মধুর স্মৃতি মনে এসে ভিড় জমালো!

আপনার নাম যেনো কি বললেন? স্যারের কথায় ১৯৮৫-৮৬ সাল থেকে ২০১৫ তে ফিরে এলাম। নাম বলে বললাম, ‘স্যার আমাকে আপনি করে বলছেন! পড়াশুনা করতে হয় তাই করতাম, জীবনের কোনো লক্ষ্য ছিলো না। আপনার জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যদি চাকরি করি তবে শিক্ষকতাই করবো। অনার্সে পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়েছিলাম, কিছু সঙ্গত কারণে বিষয় পরিবর্তন করতে হয়েছিল। কিন্তু কাকতালীয় ব্যাপার দেখুন আমার নিয়োগ বোর্ডে আপনি ডিজির প্রতিনিধি ছিলেন, তখন আপনি রাজশাহী সরকারি সিটি কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন। শিক্ষক হয়েছি, যদিও আপনার মতো জনপ্রিয় হতে পারিনি আর আপনাকে কথাগুলো কখনই জানাতে পারিনি। গতকাল আমার লেখা একটা বই বাজারে এসেছে। সর্বপ্রথম বইটা আপনাকে দিতে এসেছি’। উনি এতটাই আবেগাপ্লুত হলেন যে বইটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কিছু একটা লিখে দাও। জীবনে প্রচুর পেয়েছি, এটা আমার এক অন্য রকম পাওয়া। তোমার বই আমি পড়বো, সময় নিয়ে পড়বো।’
বলছিলাম আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর নিত্য গোপাল আস স্যারের কথা। প্রায় মাসখানিক পর স্যার আমাকে ফোন দিয়ে বললেন, ‘এইমাত্র আমি তোমার লেখা বইটা শেষ করলাম। তুমি সাইন্সে পড়াশুনা করে সাইন্সের শিক্ষক হয়েছো!... আমার একটা অনুরোধ- তুমি লেখালেখিটা ছেড়ে দিয়ো না...’। এমন অনেক উৎসাহ ব্যাঞ্জক কথা। ওনার আশির্বাদ নিয়ে কথা রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement