ভ্যালেন্টাইন হলো এমন একজন যে কোন না কোন ভাবে ব্যক্তির সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে আবদ্ধ। উক্ত গল্পে একজন ব্যক্তির ভালোবাসার মানুষটির প্রতি আহাজারি, টান, একনিষ্ঠ আবেগ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে...
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

২.১৫

বিচারক স্কোরঃ ০.৩৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকবিতা - ভ্যালেন্টাইন (ফেব্রুয়ারী ২০১৯)

তুমি এবং একটি গল্প
ভ্যালেন্টাইন

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.১৫

মুর্তজা সাদ

comment ৫  favorite ০  import_contacts ১৭৩
সকাল ছ’টা বেজে ত্রিশ মিনিট। প্রচন্ড শব্দে বেজে চলেছে ঘড়িটা। কাঁথার ভেতর থেকে হাতটা বের করে সাইড টেবিল হাতড়াই আমি। না, পাই না। অগত্যা উঠেই বসতে হয়। ঘুমটাও তাই ভেঙ্গে গেলো সময়মত।
অ্যালার্মটা বন্ধ করে দেয়ালে টাঙ্গানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকাই। তারিখটা জানাই রয়েছে। তবু নিশ্চিত হই। তারপর চশমা চোখে ঘর থেকে বেরোই। চার তলার এই মেসের তিন তলার বাঁ দিকটায় আমার বাস। আর তিন তলার যে ঘরটায় আমি থাকি, তার দরজাটা খুলে দিলেই সুন্দর এক দখিণা বাতাস আমায় স্বাগত জানায়। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটলো না। ঠান্ডা বাতাসে আমার গা জুড়ে গেলো। কিছুটা সময় বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর ঘরে ঢুকে দরজাটা আঁটকে দিলাম।
বিশেষ একটা দিন আজ। বছরের এ দিনটায় আমি অফিসে যাই না। অগ্রীম ছুটির দরখাস্ত করি এবং ছুটি সহজেই মঞ্জুর হয়ে যায়। গত দশ বছর ধরেই এমনটা হয়ে আসছে। এ নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন তোলে নি। তাই তেমন কাউকে বলা হয়েও ওঠে নি।
এই বিশেষ দিনে নিয়ম করে কিছু কাজ করি আমি। আজও তার পরিবর্তন হবে না। তাই খুব দ্রুত গোসল সেরে তৈরি হয়ে নিলাম। ঝন্টুদের হোটেল থেকে খাওয়া শেষে পার্কের দিকে হাঁটা দিলাম। পৌঁছোতে মিনিট পাঁচেক লাগলো।
জায়গাটা আমার বেশ পছন্দের। মিলির আরো বেশি পছন্দের। চারপাশে সবুজ গাছ, নাম না জানা পাখি আর রঙ্গিন ফুলের সমারোহ- মিলির মতে যেন এক টুকরো স্বর্গ। অবশ্য কিছু মানুষও আছে; যাদের কারো উদ্দেশ্য আছে, কেউ কেউ উদ্দেশ্যহীন।
অথচ পার্কে এসে দেখা গেলো, জায়গাটা আজ নীরব নেই। মানুষের উপচে পড়া ভীড়, হর্নের তীক্ষ্ণ শব্দ আর হকারের চিৎকার। গাছে মলিন পাতা আর কাকের একঘেয়ে ডাক। রঙ্গিন ফুলগুলোও মরে গিয়েছে। এসব দেখতে দেখতেই বসে পড়লাম। মিলি সঙ্গে নেই বলে বড় বাঁচাই বেঁচে গিয়েছি। নয়তো নাকে কাপড় দিয়ে ভ্রু জোড়া কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠতো, “এখানে কি মানুষ আসে?”
আমি মিনমিনিয়ে জবাব দিতাম, “তুমিই তো আগে আসতে চাইতে। তোমার স্বর্গ আজ নরকের সাধ মেটাচ্ছে। দেখে নাও।”
ওর কুঁচকানো ভ্রুটা সোজা হয়ে যেত। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতো, “মানুষ পারেও বটে। নিজ ইচ্ছায় স্বর্গে যেতেও পারে। আমার নরক ডেকেও আনে।”
আমি ওর দার্শনিক কথাবার্তা ধরতে পারতাম না। কেবল মাথা নেড়ে সায় দিতাম। ও বকে যেত, সকাল শেষে দুপুর আসতো।
অবশ্য অন্যটাও ঘটতে পারতো। ওর আগমনে প্রকৃতি সুন্দরের পোশাক পরতো। গাছে সবুজ আসতো, রঙ্গিন ফুলগুলো আবার ফুটতো। দূর থেকে ভেসে আসতো পাখির সুমধুর গান। ওর মুখে হাসি ফুটতো।
এসব ভাবতে ভাবতে সত্যি দুপুর গড়ালো। আমি উঠে দাঁড়ালাম। মনির মামার দোকানের পথ ধরলাম।
লোকটা বয়সে আমার থেকে কমপক্ষে পাঁচ বছরের ছোট হলেও মামা বলেই ডাকি। আমায় দেখেই লোকটা হেসে ওঠেন। পান খেয়ে লাল করে ফেলা বত্রিশটা দাঁত খুলে বসেন প্রদর্শনীতে।
“কি ব্যাপার, হাসেন কেন?” জিজ্ঞেস করি আমি।
“এম্বেই, মন চাইলো।” হাসি হাসি মুখে বলে ওঠেন তিনি। “খাইসেন?”
আমি মাথা নাড়ি, খাই নি।
লোকটা সরে দাঁড়ান। “আসেন। খায়ে লন।”
আমি মুচকি হেসে বসে পড়ি। মনির মামার সাগরেদ খাবার দিয়ে যায়। কয়েক রকমের ভর্তা আর গরম গরম ভাত। সাথে বিনে পয়সার ডাল। ভর্তার পাত থেকে চিংড়ির ভর্তাটা টেনে নিই। মিলির সব থেকে পছন্দের খাবার। খুব ঘন ঘন আসা পড়তো এখানে, দুজনে মিলে। বসতাম আর গোগ্রাসে গিলতাম। মরিচ ভর্তা চেখে দেখার সময় মিলির চোখে পানি এসে পড়তো। তখন ঢকঢক করে পানি গিলতো সে। একটু পানি, এক লোকমা ভাত। এভাবেই চলতো তার খাওয়া। চোখের পানি এই দৃশ্যে যেত পূর্ণতা আনতো। আমার দেখা সুন্দরতম দৃশ্য, যা মিলি কখনো জানে নি। জানতে পারবে না।
আজকাল মনির মামার দোকানে খুব কম আসা হয়। বছরে দুই কি একবার। তাও একাকি। মিলি আসে না। যখনই এদিকে আসা হয়, আকাশে মেঘ করে। ঝুম করে বৃষ্টি নামে। সেই বৃষ্টি একনাগাড়ে চলতে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা।
আজও বৃষ্টি নেমেছে। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালে বৃষ্টি পড়ছে। সেই আওয়াজে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। আমি বাইরে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি দেখতে লাগলাম। মামার সাগরেদ আমাকে সিগারেট দিলো। সঙ্গে লাইটার। আমি সিগারেটটা জ্বেলে লম্বা টান দিলাম। মনে হলো, প্রকৃতিতে কোন অজানা বিষাদ নেমেছে। সেই বিষাদের কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ছে। কেবল আমার বিষাদেরই রূপান্তর নেই। ও ধ্রুবক, অপরিবর্তনযোগ্য।
বৃষ্টি থামতে থামতে বিকাল হয়ে গেলো। আমি হেঁটে প্রাইমারি স্কুলের ধারের খেলার মাঠের কাছে এসে পড়ি। বিকালে এ মাঠে খেলা হয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলে। তার মাঝে একজনের সাথে আমার খাতির ভালো। ছোটন, ক্লাস থ্রিতে পড়ে। বয়স সাত কি আট। খেলার ফাঁকে মাঝেমধ্যে পাশে বসে। দু একটা কথা বলে। তারপর আবার চলে যায়।
আজো এলো। পাশে বসে রইলো কিছুটা সময়। তারপর ইতস্ততভাবে বললো, “আংকেল?”
আমি তার দিকে ফিরে তাকাই। “কিছু বলবে?”
“আজ আপনার বিশেষ একটা দিন, তাই না?”
আমি মাথা উপর নিচ করি। হ্যাঁ, আজ একটা বিশেষ দিন।
ছোটন আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। কিছুটা সময় বসে থাকে। তারপর উঠে চলে যায়। মাঝেমধ্যে ওকে দেখে বড্ড বেশি আফসোস হয়, ফাঁকা লাগে। আজ হয়তো আমারও এমন একটা ছেলে থাকতে পারতো, খেলবার সাথী থাকতে পারতো, একাকিত্বের ওষুধ হতো কেউ একজন।
ভাবতে ভাবতেই টুপ করে এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়লো আকাশ থেকে। আমি উঠে দাঁড়াই। আবার মেঘ করেছে। হাঁটতে শুরু করলাম। সন্ধ্যা হতে আর অল্প দেরি। তার সাথে আজ দেখা হবে, অনেকদিন পর।
সন্ধ্যা হতেই জায়গাটায় পৌঁছে যাই। খুব সাবধানে বেড়াটা পার হই। তারপর সাবধানে পা ফেলি, এদিক ওদিক খুঁজি। এমন সময় খুব শক্ত করে কেউ আমার চোখজোড়া চেপে ধরে। আমি মুচকি হাসি। এই স্পর্শ কাঙ্ক্ষিত। এই স্পর্শের অপেক্ষায় বছর কেটে যায়। আমি মুচকি হেসে উঠি, “মিলি।”
মিলি আমার চোখজোড়া ছেড়ে দেয়। আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। অন্ধকারে পকেট হাতড়াই। বৃষ্টির তোপটা বেড়েছে। অনেক কষ্টে মোমবাতি আর দেয়াশলাইয়ের বাক্সটা খুঁজে পাই। কাগজ খুলে কেকটা সাজাই। তার উপর জ্বেলে দিই মোমবাতিটা।
“ফুঁ দাও।”
“দিব না।” মিলি অভিমানী কন্ঠে বলে।
অবাক হই। “কেন?”
মিলি কিছু বলে না, অন্যদিকে ফিরে তাকায় সে।
আমি মুচকি হাসি। পকেট থেকে ছোট প্যাকেটটা বের করি। হাসিতে মেয়েটা ফেটে পড়ে, খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে ঢলে পড়ে।
“ভাইজান ঐখানে কি করেন?” দূর থেকে কে যেন ডেকে ওঠে। আমি সেদিকে তাকাই
একবার, উত্তর করি না। মুখটা আবার মিলির দিকে ফেরাই।
“তুমি কি জানো তোমাকে সবাই পাগল ভাবে?” মিলি বলে ওঠে।
“জানি।” হেসে জবাব দিই।
“তবু কেন এই কবরস্থানে বারবার আসো?”
আমি মেয়েটির চোখে চোখ রাখি। “তোমাকে যে দেখতে ইচ্ছা করে।”
হেসে উঠে সে। “আমাকে একটা কথা দাও।”
আমি তার দিকে তাকাই। “বলো।”
“আর এখানে আসবে না।”
আমি কিছুটা সময় ভাবি। “আচ্ছা।”
“কথা দিলে তো?”
“হুম।”
“এখন যাও।”
আমি উঠে দাঁড়াই। কালো আকাশে অনেক মেঘ। প্রচন্ড শব্দে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। অন্ধকারটা জমে গিয়েছে ভালোমত। দশটি বছর আগে, এমন এক রাতে, মিলির সাথে আমার বিয়ে হয়। সে রাতও ছিল অন্ধকার, আকাশে ছিল ঝুম বৃষ্টি। মোমবাতিটা নিভে গিয়েছিল বাতাসের তোপে। এমন একটা সময়ে, মেঘের তীব্র গর্জনে সে আমায় জড়িয়ে ধরেছিল পরম নির্ভরতায়। পরম বিশ্বাসে আমার হাতে হাত রেখেছিল। না, আমি তাকে আগলে রাখতে পারি নি। ছ’টি মাস পরে সে চলে যায় না ফেরার এক দেশে। সেই থেকে প্রতি বছরের এ দিনটায় এখানে আসা হয়। তাকে কল্পনায় ভেবে কথা হয়। সে কথা লোকে বুঝতে পারে না, তার প্রতি ভালোবাসাটুকু কেউ জানতে পারে না, লোকে কেবল পাগল ভাবে।
হাঁটতে হাঁটতেই পিছন ফিরে তাকাই আমি। বৃষ্টি বেড়েছে। ঝাপসা হয়ে এসেছে দূরের পথটুকু। ওই সরু পথটা ধরেই মিলির কবর, তার স্মৃতি। সেখানেই তাকে খুঁজি, তাকে ভালোবাসি।

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement