ইউরোপের সুন্দর শহর এই অস্ট্রিয়া । আমার মেয়ের কারনে আজকে দেড় বছর এখানে আছি । অনেক ভালো লাগছে আমার শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এখানকার । মার্চ থেকে অগাস্ট পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোর জন্য ওয়েদার খুব ভালো । এদের কাজের পরিবেশও চমৎকার ,তাড়াহুড়ো করে এরা কাজ করতে পছন্দ করে না কেউ , সকালে দেখি সবাই বেশ ধীরে সুস্হে কাজে যাচ্ছে । নাফিসা সকালে বাচ্চাটাকে রেখে যায় , বিকেলের কিছু পরেই অফিস থেকে চলে আসে বাসায় । বিকেলে বা সন্ধ্যায় সবাই পার্কে বা লেকের ধারে ঘুরতে যায় । আমার মেয়ে একাউন্টেন্ট একটা ব্যাংকের । বাংলাদেশ থেকে স্কলারশীপ নিয়ে পড়তে এসেছিল , এখানেই পরিচয় জুনায়েদের সাথে । ওর বাবা -মা ভিয়েনায় সেটেল্ড করেছেন । এখানকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জেনেছেন জুনায়দের কাছ থেকে যে আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান , তাই ২৬
মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ওরা দাওয়াত করেছে অন্যান্য দেশের রাষ্টদূতদের , জাতি সংঘের বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের সেই সঙ্গে আমাদেরকেও । নাফিসা জুনায়দকে বলেছে যে আমার মা-বাবা ১৯৭১ সালে মারা যান , তাঁরা দুজনই মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন । আমার একটা বড় ভাই আছে ,আর একটা ছোট বোন । ভাইকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইন্ডিয়ায় পাঠিয়ে দেন বাবা । আমরা তিন ভাই বোন , বড় ভাই সোহেল , আমি সুলতানা আর ছোট বোন সিতারা ।বড় ভাই আব্বা আর মামনি মারা যাওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন । আমাদের তখন কি অবস্থা। কোথায় থাকবো জানি না । বড় ভাইয়া চাচার বাসায় থাকতে থাকে আমরা দুই বোন থাকতাম খালার বাসায় । আমার বিয়ে দেন মামারাই এক স্কুল শিক্ষকের সাথে আর সিতারার বিয়ে হয় গ্রামের এক জোতদারের ছেলের সাথে ।মাত্র ১৫ বছর বয়সে , ও আর পড়াশুনা করতে চায় নি । মামনির মৃত্যু দৃশ্য ও ভুলতে পারে নি ।
আজকে সকালের খবরের কাগজটা পড়ার পর মনটাই খারাপ হয়ে গেল , বসে বসে ভাবছি , দেশের জন্য কি করেছি আমরা ? ইউরোপের খবরের কাগজে বাংলাদেশের যে খবর পাই তা সুখকর নয় মোটেই ,সন্মানজনক তো নয়ই ।বাংলাদেশের মানুষের টাকার লোভ কেন দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে এত বেশি আল্লাহ জানে । নদী ,খাল ,পুকুর দখল করে বাড়িঘর , মার্কেট বানান হচ্ছে ।এরা ভাবে না যে পানি না থাকলে মানুষের বাঁচার উপায় কি ? এত বড় মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং বানিয়ে লাভ কি যদি সেখানে পানি গ্যাস না থাকে ? পানির উৎস দিন দিন কমে যাচ্ছে, গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে ,বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে আর বিল্ডিং উঠছে । বড় বড় স্হাপনা গড়ে উঠছে কিন্তু পানির সমস্যার কি হবে ? নদীগুলো তো দখল দুষণে মরা খালের মত হয়ে যাচ্ছে । এদের একমাত্র চিন্তা টাকা পয়সা বানিয়ে মালয়শিয়া , কানাডা বা দুবাই চলে যাওয়া ,দেশের যা হয় হোক তাতে তাদের মাথা ব্যথা নেই । টাকা বানানই আসল , দেশের ক্ষতি করে হলেও । যারা আপন জনদের হারায় নি মুক্তিযুদ্ধে তারা উপলব্ধি করতে পারবে না এটা কতটা বেদনাদায়ক প্রিয়জন হারানোর কষ্ট । বিশেষ করে নিজের বাবা মায়ের হত্যাকান্ডের সাক্ষী হয়ে বেঁচে থাকা ।
বিকেলের সোনালি আলোয় আকাশটা ঝলমল করছে। সুন্দর কারুকার্যময় ভবন গুলোর উপর সেই রোদ পড়ে আরও চমৎকার দেখাচ্ছে বাড়ি ঘর গুলোকে। প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্যের নির্দশন রয়েছে শহর জুড়ে ।এখানে আছে দি ভিয়েনা জু পৃথিবীর প্রাচীন চিড়িয়াখানা, আছে ন্যাচরাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। প্রাগৈতিহাসিক যুগের ভাস্কর্য, রেনেসাঁ যুগের শিল্প কর্ম , ডাইনসরের কংকাল আরও নানান ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র রয়েছে এই যাদুঘরে।
নাফিসার আব্বা মারা গেছেন আজকে ৫ বছর হতে চলল ।সে বেঁচে থাকলে এইভাবে বেড়ানোর কথা কি ভাবতে পারতাম?
এখন বলা যায় আমি অনেক স্বাধীন জীবন কাটাই । দুঃখ এটাই নাফিসার আব্বা মেয়ের এই জীবন দেখে যেতে পারলেন না।
সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে । নাতাশাকে তিনি দুধ আর বিস্কুট খেতে দিলেন আর নিজে খেলেন এক কাপ কড়া কফি। এখনে এসে কফির অভ্যাস করে ফেলেছি, হেসে ফেলেন নিজের মনে। কে না জানে প্রতি নিয়ত পাল্টে যাওয়া্র নামই জীবন । আজকের আমি আর ১০ বছর আগের আমি একি ব্যক্তি নই আর ।
দরজার বেল বাজার আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম আমি । এই রে ওরা হয়ত এসে পড়েছে ।
'আম্মা ,তুমি কি রেডি হয়েছ ? দেরি হয়ে যাবে কিন্তু ।'
'হ্যাঁ মা ,এই তো ।চল । নাতাশাকে রেডি করেছ?'
'কখন! দেখ কি সুন্দর লাগছে মামনিকে ।'
'একদম পরীর মত লাগছে । কি সুন্দর হয়েছে দেখতে নাতাশা!' বাচ্চাদের চেহারা সবসময়ই সুন্দর লাগে যদি একটু গর্জিয়াস জামা কাপড় পরানো হয় । বাচ্চাদের খারাপ লাগে মুখ গোমড়া করে থাকলে আর বেশি অহংকারী ভাব ধরলে । স্বাভাবিকভাবে থাকলে সব বাচ্চাদেরই ভাল লাগে আর অতিরিক্ত সাজানো বাচ্চাদের এত বিরক্ত লাগে বলার না । জুনায়েদ তাড়া দিল সবাইকে গাড়িতে উঠতে।
মার্চ মাসে বেশ ভালোই ঠাণ্ডা ভিয়েনায় , বরফও পড়ে, বৃষ্টিও আসে কখনও কখনও।
নাফিসা বলল ,' আম্মা কোট পরো, ঠাণ্ডা যেন না লাগে তোমার।'
'হ্যাঁ ,ঠিক আছে ,আমি টুপি মোজা সব কিছু পরেছি।'
রাস্তায় গাড়ী তেমন নেই , ওরা বেশ তাড়াতাড়িই রাষ্ট্রদূতের বাসায় পৌঁছে গেল । রাষ্ট্রদূত হাসনাত শরিফ ও তাঁর স্ত্রী রেবেকা শরীফ সবাইকে বাড়ীর ভিতরে নিয়ে গেলেন ।
রাষ্ট্রদূত সাহেবের স্ত্রী অনেক রকম খাবার সাজিয়েছেন দেখলাম । বিদেশি খাবারের সাথে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারও পরিবেশন করে অতিথিদের আপ্যায়ন করেন তিনি । খাওয়া দাওয়ার পর সবাই মিলে নানা অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন ।রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী রেবেকা ম্যাডাম আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন , 'আপনি যদি আপনার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আমাদের সঙ্গে শেয়ার করতেন খুশি হতাম, অনেক কিছু জানতে পারতাম আপনার কাছ থেকে ।'
আমি বললাম, 'নিশ্চয়ই ,কেন নয় । আমার মামনি একজন প্রগতিশীল পরিবারের মেয়ে ছিলেন ।আমার আব্বাও খুবই দক্ষ সাংগঠনিক ছিলেন। মামনি কারমাইকেল কলেজে পড়ার সময় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন । ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্রদের সাথে নারী ও ছাত্রীদেরও সাহসী ভূমিকা ছিল।
মামনিকে নিয়ে একটা ঘটনা আছে যেটা আপনাদের বলার লোভ সামলাতে পারছি না ।'
রাষ্ট্রদূত হালিম শরীফ বললেন ,' আমরা অবশ্যই শুনতে চাই, আপনি বলেন।'
'১৯৫১ সালের একদিনের ঘটনা ,সেদিন ছাত্র ছাত্রীদের বিশাল মিছিল বাংলা ভাষার দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে পৌঁছায় রংপুর জজ কোর্টে, তারপর তারা স্লোগান দিতে দিতে ঢুকে পড়ে আদালতের ভিতরে ।এমন সময় হঠাৎ করেই মিছিলের মধ্যে থেকে একটা মেয়ে সোজা এজলাসে গিয়ে জজ সাহেবের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলে উঠে,' কেন আপনি ইংরেজিতে লিখছেন ?' এ কথা বলেই সেই দুঃসাহসী মেয়েটি জজ সাহেবের হাত থেকে কলমটি ছিনিয়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলে ।সবাই তখন কিংকর্তব্য বিমূঢ় । এর মধ্যেই মেয়েটি এজলাস ত্যাগ করে মিছিলে ফিরে যায় এবং মিছিলটি আবারও শহরের দিকে ফিরে যেতে থাকে ।'
সবাই নির্বাক হয়ে শুনছিলেন তার কথা ।'ফেব্রুয়ারির এই আন্দোলনের পথ বেয়েই অর্জিত হয় মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি। এরই
ধারাবাহিকতায় আসে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ।যার নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ।'আমি বললাম।
' পৃথিবীর ইতিহাসে বাঙ্গালীরাই একমাত্র জাতি যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে।' হালিম শরীফ বললেন ।
'আমার মামনি আর আব্বা দুজনেই আওয়ামী লীগের পক্ষে ছিলেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রস্তুতিতে সাহায্য করতেন । অতিরিক্ত পরিশ্রমে মামনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন ,তখন স্ট্রেচারে করে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয় রংপুর থেকে ।কিছুটা সুস্থ হলেন ঢাকায় আসার পর। তারপর ২৫ মার্চ কালো রাত , তারা খবর পেলেন বঙ্গবন্ধুকে আটক করা হয়েছে ।তারা স্থির করেন যে ভারতে গিয়ে দেশের জন্য কাজ করবেন ।আমার বড় ভাইকে আগেই পাঠিয়ে দেয়া হয় ভারতে , সে তখন কলেজে পড়ত । আব্বা আমাদের দুই বোন ,মামনি, আব্বার একজন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুকে নিয়ে রওনা হলেন সীমান্তের দিকে। আমরা প্রথমে যাই আব্বার বন্ধু ইসমাইল চাচার গ্রামের বাড়িতে । আমরা খেয়ে রওনা দিব , এমন সময় গ্রামের লোকেরা আব্বাকে বলে পাকসেনারা পুরো গ্রাম ঘিরে ফেলেছে । আমার মনে আছে মামনি আমাকে আর সিতারাকে নিয়ে একটা ডোবায় লুকিয়ে পড়েন। তারা প্রথমেই আব্বাকে গুলি করে । আব্বা তখন শুধু আমাদের নাম নিয়ে চিৎকার করছিলেন। তারপর মামনিকে গুলি করে ।মামনি ্মারা যাওয়ার সময় বলছিল ,'তোরা বেঁচে থাকিস, বাংলাদেশকে স্বাধীন দেখতে চেয়েছিলাম,পারলাম না ।আমি না দেখলেও তোরা দেখিস ।তোরাই আমার কর্ম।সিতারা বলেছিল তখন ,' মামনির গায়ে তো মাত্র একটা গুলি লাগল , তবুও মামনি কেন মরে গেল ?' মামনি খুবই
দুর্বল ছিলেন বলে গুলি খেয়ে মারা যাবার পরও তার শরীর থেকে বেশি রক্তপাত হয়নি ।পাকসেনারা ইসমাইল চাচাকেও গুলি করে মেরে ফেলে । সেদিন গ্রামের ১২৮ মানুষকে তারা মেরেছিল। ইসমাইল চাচার টাঙ্গাইলের মির্জাপুর গ্রামের বাড়ীতে মামনি ও আব্বাকে, ইসমাইল চাচাকে এবং আরো ৪জনকে তারা হত্যা করেছিল। আমরা সেদিন বিকেল পর্যন্ত এভাবেই বসে ছিলাম । তারপর দেখি একটা বাচ্চা ছেলে সাইকেলে করে সেখান দিয়ে যাচ্ছে , আমি তাকে ডেকে আমার অবস্থা বললাম । কিভাবে পারলাম জানি না হয়তো ছোট বোনটাকে বাঁচানোর চিন্তায় কাজটা করার সাহস পেয়েছিলাম। '
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,' সেই শফিক ছেলেটা আমাদের নিয়ে রাখে মির্জাপুরের একটা স্কুলে । পরে খালামনি আমাদের বলেন গ্রামের লোকেরা রাতের বেলায় তাও আতঙ্কের মধ্যে মামনি আর আব্বার মৃতদেহগুলো সৎকার করেন , কারন পাকসেনারা হয়ত আবার ফিরে আসতে পারে এই ভীতি ছিল তাদের মনে । মামনিরা মারা যান ৩ এপ্রিল আর খালামনিরা সেই খবর পান ১৭ এপ্রিল । তারপর আমাদের এক মামা সেই স্কুল থেকে আমাদের খালামনির বাসায় নিয়ে আসেন ।আমার মামনি ও অন্যান্য শহীদের স্মরণে নির্মান হয় নি কোন স্মৃতি ফলক। গণকবর ও বধ্যভূমিগুলোও সংরক্ষন করা হয় নাই। তাদের অবদানকে চির স্মরনীয় রাখার জন্য স্মৃতি ফলক নির্মান করে চিহ্নিত করতে হবে বধ্যভূমি গুলো আর শহীদদের গণকবরগুলো ।