হিমেল শেখ একজন খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ৷ সে ঠেলাগাড়ি করে তরিতরকারি বিক্রি করে ৷ মেয়ের বায়না মিটাতে সে তরমুজ কিনে নিয়ে যায় তার বাড়িতে ৷ কিন্তু সে জানতো না তরমুজে বিপজ্জনক লাল রং আর মিষ্টি স্যাকারিন মিশিয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে পুশ করে আধা কাঁচা তরমুজকে পাকা ও লাল বানান হয় ৷ এটা সে জানত না যে তরমুজের মধ্যেও ভেজাল দিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা ৷ সেই ক্যামিকেল মেশান তরমুজ খেয়ে হিমেল শেখের মেয়েটা মারা যায় ৷ হিমেল মনে কষ্ট নিয়ে জানতে চায় , ভেজাল পন্য বিক্রি করে লাভবান হওয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের কোন সন্তান যদি মারা যায় ভেজাল খাদ্যের বিষক্রিয়ায় তখন পরিবারকে কি জবাব দেবে সে এই কথাটা কি ভেবেছেন তারা ? বেশি লাভের আশায় তারা প্রতিনিয়ত খাদ্যপন্যে ভেজাল দিচ্ছেন ৷ যারা খাদ্যে বিষ মিশিয়ে অন্যকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দিচ্ছে আসলে তারা খাঁটি মানুষ নয় ৷ তাদের মনের মধ্যে ভেজাল আছে , তাদের মধ্যে দেশপ্রেমও নাই, আছে শুধু টাকার লোভ ৷
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ মে ১৯৬৬
গল্প/কবিতা: ২১টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

খাদ্যে বিষ মনেও বিষ
শিশু

সংখ্যা

এলিজা রহমান

comment ৩  favorite ০  import_contacts ৪২
হিমেল শেখ থাকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে , তিন ছেলেমেয়ে , আর বৌ নিয়ে তার সংসার ৷ তাজা শাকসবজি তরিতরকারি সে ঠেলায় করে নিয়ে বিক্রি করে ঢাকার মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে ৷ কয়েকদিন ধরে রৌদ্রের প্রচণ্ড তাপ ৷ সকাল থেকেই রোদের তেজ খুব আজকে , হিমেল শেখ আকাশের দিকে তাকিয়ে জলন্ত সূর্যকে মনে মনে বলল , 'টাকাপয়সা বেশি হইয়া গেছে মনে লয় আপনার এ জন্য তেজ দেহাইতাছেন আমাগো লাহান গরীব মাইনষেরে!! ' বৃষ্টিহীন দিন , আকাশে মেঘও নেই একটুকু ৷ রৌদ্রের তেজে চোখ দুটো ঝলসে যায় হিমেল শেখের ৷ তার ছোট মেয়েটা কয়েকদিন ধরে তরমুজ খেতে চাচ্ছে , দাম কিছুটা কম হওয়ার কারনে গরমে ছোট বড় সবাই তরমুজ খায় ৷ এতে পানির অভাবও মেটে , আর খেতেও সুস্বাদু ! বাংলাদেশের চরাঞ্চলে এবং উপকূলের বিভিন্ন জেলায় তরমুজের চাষ হচ্ছে , ফলনও ভালো হয়েছে ৷এবার তাপদাহের কারনে বেশি লাভ করতে পাইকাররা পাকা তরমুজ তো এনেছেই আধা পাকা তরমুজও তুলে এনেছে দেখল হিমেল শেখ ৷ এক সাথে একই জায়গায় ডাব বিক্রি করে আফজাল ব্যাপারী ৷ দুজনে মিলে সুখ দুঃখের কথা বলে , গল্প করে চা খায় ৷ হিমেল শেখ আফজাল ব্যাপারীকে বলল , ' ভাই আমার মেয়ের জন্য ভালো দেখে একটা তরমুজ কিনে নিয়ে যেতে হবে ৷"
' কেন ? বাড়িতে যাচ্ছ বুঝি ?" আফজাল ব্যাপারী বলে ৷
" হ ," কালকে তো শুক্রবার , ছেলেমেয়েদের স্কুল বন্ধ ৷ সন্ধ্যায় যাব , রবিবার সকালে চলে আসবো ৷ "
" আমি তো শুক্রবার চিড়িয়াখানার সামনে থাকি , অনেক মানুষ আসে , বেশ ভালই লাভ হয় ৷"
' ঠিকই কইছ দোস্ত , ছুটির দিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সময় কাটানো উচিত ৷ এই জীবন আর কয় ঘন্টা , এই তো আজ আছি কাল নাই ৷"

হিমেল শেখের বড় মেয়ে সুমাইয়া আক্তার পড়ে ক্লাস ফাইভে , ছেলেটা সিক্সে , মেয়েটা যেমন
পড়াশুনায় ভালো , ঘরের কাজে ওর মাকে, সব্জী ক্ষেতের ফসল তোলার সময় তাকে অনেক সাহায্য করে ; ছেলেটা তা না , ওর উৎসাহ ক্রিকেট খেলায় ৷ যখনই সময় পায় , খেলতে চলে যায় পাড়ার ক্লাবে , টাকার অভাবে সে ছেলেটার জন্য ভাল ব্যাট কিনে দিতে পারে না , ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ৷ ছোট মেয়েটা থ্রীতে এই মেয়েটাকে ডাক্তার বানাতে চায় সে জমিজমা বিক্রি করে হলেও , এটা তার মনের গোপন ইচ্ছা ৷ এই মেয়েটা কিছু আবদার করলে সে ফেলতে পারে না ৷

সে ২০০ টাকা দিয়ে একটা তরমুজ কিনল , বৌয়ের জন্য কিনল একটা শাড়ি আর সবুজ রঙের চুড়ি , বড় মেয়েটার জন্য একটা ফ্রক আর ছেলেটার জন্য একটা কমদামি ব্যাট ৷

বাড়িতে ফিরে সবার সাথে রাতে খাওয়া দাওয়া করল হিমেল শেখ , শাড়িটা দেখে বৌ খুশি হলেও মুখে বলল , ' আমার জন্য আবার শাড়ি কিনলা খামাখা পয়সা খরচ ৷'
বৌ এর খুশি খুশি মুখটা দেখে হিমেল শেখের মনে ভারি আনন্দ হলো ৷ আয় রোজগার তো সবাই করে , সুখ কয়জনে পায় ,সুখী হতে তো বেশি পয়সা লাগে না !!

অনেক রাত হয়ে গিয়েছে ৷ ছেলেমেয়েদের ঘুমিয়ে পড়তে বলে হিমেল , আর তার বৌ শাহিনা বলে , তরমুজটা সকালে কেটে দিবো নে ৷"
সকালে নাস্তা রেডি করে সবাইকে খেতে দেয় শাহিনা ৷ ছোট মেয়েটা বলে উঠে , " আম্মু তরমুজডা কখন কাটবা ?'
শাহিনা ওই তরমুজটা কাটতে বসে ৷ সে তার স্বামীকে উদ্দেশ্য করে বলে ,"তরমুজটা লাল দেখতে কিন্তু কেমন যেন শক্ত লাগে , কেমন একটা গন্ধ লাগতেছে য্যান ৷'
হিমেল শেখ বলে ,' কি কও তার ঠিক নাই , দাও সবাইরে ভাগ কইরা দাও তরমুজটা ৷ '
সবাই খায় ৷ছোট মেয়ের বায়না মিটাতে পেরে সে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানায় ৷ মনে মনে বলে , ' আল্লাহ্ যদি সামর্থ্য দেন তাহলে এই মেয়েটাকে ডাক্তার বানাতে চাই আমি ৷ মেয়েটা তার চোখের মনি ৷

নিজের আব্বা আম্মা মারা গেছেন শিশুকালে , তাই নিজের ছেলেমেয়েকে বাবার স্নেহ ভালবাসার কোন কমতি থাকুক এটা সে চায় না ৷

দুপুরবেলা খাবার আয়োজন দেখে হিমেল শেখ খুশি হয় ৷ সত্যি তার বৌএর রান্নার কোন তুলনা নেই ৷ চ্যাপা শুটকি রানছে , পাট শাক ভাজি , আলু ভাজি , মুরগির ঝাল তরকারি , গিলা কলিজার লটপটিও করছে দেহা যায় ৷ বাড়ির খাবারের স্বাদ অন্য কোথাও পাওয়া যায় না ৷ গোসল করে এসে সে ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেতে বসে ৷ সে খাবারটা তৃপ্তি নিয়ে খেতে থাকে ৷ প্রতিদিনই বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হয়ে যায় ৷ দুপুরের খাবার রাতে খায় তাও ঠান্ডা হয়ে যাওয়া ভাত-তরকারি , এত খিদে লাগে সে সময় যে গরম করে খাওয়ার ইচ্ছা করে না তার ৷ ছেলেমেয়ে মানুষ করার জন্যই তো এই কষ্ট করছে সে ৷
বৌকে বলে , ' তোমার এই চ্যাপা শুটকি দিয়েই এক থাল ভাত খাইয়া ফালান যায় , এত্ত মজা হইছে কি কইতাম ৷'
বৌ হেসে বলে , "খাও ভালা কইরা , বাচ্চারা মুরগির সালুন দিয়াই খাইবোনে ৷'

বিকেলবেলা ৷ হিমেল শেখের ছোট মেয়েটার হঠাৎ করেই তীব্র পেট ও মাথাব্যথা শুরু হয় ৷ তাকে স্যালাইন খাওয়ান হয় ৷ এরপর বড় মেয়েটার ও ছেলেটাও পেট ব্যথার কথা বলতে থাকে আর বমি করা শুরু করে রাতের দিকে হিমেল শেখ আর তার স্ত্রী শাহিনা বেগমও বমি করা শুরু করে ৷ সকালে এলাকার কিছু লোকজন তাদের এই অবস্থা দেখে পাড়ার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ছাত্রকে ডেকে আনে হিমেল শেখের বাড়িতে , সেই ছাত্রই নিজে এ্যাম্বুলেন্সে করে তাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে আসার ব্যবস্হা করেন৷
হিমেল শেখের ছোট মেয়েটাকে জরুরী বিভাগে নেয়া হলেও বাঁচাতে পারলেন না ডাক্তারেরা ৷ তারা বলেন ,খাদ্যে বিষক্রিয়ায় শিশুটি মারা গেছে ৷ ডাক্তাররা মনে করছেন তরমুজটার মধ্যে হয়ত কোন ক্ষতিকর ক্যামিকেল মেশান ছিল ৷ মেয়েটাকে জরুরী বিভাগে আনতে দেরি হয়ে গেছে মা-বাবার সেজন্য তাকে বাঁচাতে পারেননি ডাক্তাররা ৷ হাসপাতালে পরিবারের বাকি দুই ভাই-বোন ও তাদের আব্বা -আম্মার চিকিৎসা চলছে , তারা এখন আশঙ্কামুক্ত ৷
শাহিনা বেগম তার স্বামীকে কানতে কানতে বলে , " যারা তরমুজে বিষ দেছে তাদের কিছু কইরতি পারবা না তুমি ? আমার মেয়েটা মরে গেল , এই বিষ মেশায় যারা তাদের নিজেদের কি ছেলেমেয়ে নাই ? তাদের সন্তান যদি এইভাবে বিষ মেশানো তরমুজ খেয়ে মারা যায় তখন পরিবারের কাছে কি জবাব দেবে ?"
সন্তানহারা মায়ের আহাজারিতে হাসপাতালের বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠে ৷৷
হসপিটালের বেডে শুয়ে হিমেল শেখের মনে বড় কষ্ট , তার দুচোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে ৷ চোখের সামনে তার মেয়েটার হাসিমাখা মুখটা ভাসছে , সে বাড়িতে এলে মেয়েটা ছুটে আসত 'আব্বু ' এসেছে আব্বু ' এসেছে বলতে বলতে ৷ খাবারে ভেজাল দিয়ে মানুষকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা ৷ খাবারে ভেজাল কেন দেয় তারা ? শুধুমাত্র লোভ আর লাভের আশায় ? যারা ভেজাল কারবারি করে বড়লোক হচ্ছে তাদের দেশপ্রেম নেই , দেশের মানুষকেও তারা ভালবাসে না , তাদের মনে শুধু লোভ আর লাভের হিসাব ৷ দেশের প্রতি , দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসা দেশকে উন্নত করে ৷ শুধু মুখে দেশকে ভালবাসি বললে হয় না কাজে সেটা প্রমাণ করা দরকার ৷ জীবনধারনের জন্য খাদ্য প্রয়োজন , এই খাদ্যে যারা বিষ মিশিয়ে অন্যকে মৃত্যু মুখে ঠেলে দিচ্ছে তারা কেন কঠিন শাস্তির হাত থেকে রেহাই পেয়ে যান ?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • কাজী প্রিয়াংকা সিলমী
    কাজী প্রিয়াংকা সিলমী বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। গল্পের শিরোনামটাতে খাবারের বিষের কথা না বলা থাকলো মনে হয় ক্লাইম্যাক্সটা আরো আকর্ষণীয় হত। কাহিনী বিন্যাস ভাল লেগেছে।
    প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ সেপ্টেম্বর
  • এলিজা রহমান
    এলিজা রহমান অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ৷ আসলে মনে বিষ বলতে যারা ভেজাল কারবারি তাদেরকে বুঝাতে চেয়েছি ৷ গল্পটি পড়ে মন্তব্য করেছেন তাই অশেষ কৃতজ্ঞতা ৷ শুভ কামনা ৷
    প্রত্যুত্তর . ২ সেপ্টেম্বর
    • কাজী প্রিয়াংকা সিলমী আসলে বলতে চেয়েছি যে শিরোনামে 'খাদ্যে বিষ' কথাটা না থাকলে শুরুতেই অনুমান পারতাম না যে শখের তরমুজ খাবার ফলে একটা দুর্ঘটনা হবে। এটা বুঝে না গেলে পাঠকের দৃষ্টিতে গল্পটা আরো চমকপ্রদ হত মনে হয়। শুধু 'বিষ' হতে পারে শিরোনামটি। ভবিষ্যতে বই আকারে যদি গল্পটি ছাপান, তখনকার জন্য চিন্তার খোরাক যোগাতে এ মন্তব্য। শুভেচ্ছা।
      প্রত্যুত্তর . thumb_up . ২ সেপ্টেম্বর
  • এলিজা রহমান
    এলিজা রহমান অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ আপনাকে এত চমৎকার পরামর্শের জন্য৷ শুভেচ্ছা অফুরান ৷
    প্রত্যুত্তর . ৪ সেপ্টেম্বর

advertisement