এই গল্পটির সময়কাল সত্তর দশকের প্রথম দিকের। পুরুলিয়া শহর থেকে গাড়িতে মিনিট দশেক যাবার পর প্রধান রাস্তা থেকে ডানদিকে চলে গিয়েছে একটি মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে পায়ে হেঁটে প্রায় আধঘণ্টা যাবার পর জঙ্গলের সীমানা। এখানে একটা পুরোনো ফাঁকা বাড়ি। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, বাড়িটি পরিত্যক্ত। আজ রাতের মিটিংটা এই বাড়িতে হচ্ছে। জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে মিটিং যখন শেষ হলো তখন রাত প্রায় গভীর।
রণজয় স্কুল, কলেজের অত্যন্ত এক মেধাবী ছাত্র। আজ যে দলের মিটিংটা হলো রণজয় সেই দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে পরিচিত। বাড়িতে ঠিক মত সময় দিতে পারেনা। প্রায় দিন গভীর রাত করে বাড়িতে ফেরে। বাড়ি থেকে তাকে অনেকবার বোঝানো হয়েছে এই কার্যকলাপ থেকে সরে আসবার জন্যে। কিন্তু কোন ফল হয়নি। বরং অনেকবার তার খোঁজে বাড়িতে পুলিশ এসে তাকে না পেয়ে বাড়ির লোকেদের নানা ধরনের প্রশ্ন করে গেছে।
একদিন গভীর রাতে গোপন মিটিং শেষ হবার পর মহাদেবদা রণজয়কে বললেন, আমরা খবর পেয়েছি তোমাকে ধরবার জন্যে পুলিশের দল হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এইসময় তোমার এখানে থাকাটা একেবারেই নিরাপদ নয়। তোমাকে বেশ কয়েকদিনের জন্য এই জায়গা ছেড়ে আমাদের এক নিরাপদ আস্তানায় গিয়ে থাকতে হবে। কাল ভোররাতে আমাদের বিশ্বস্ত লোক গোপনে তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেবে আর সময়মত তুমি পরবর্তী প্রয়োজনীয় সব নির্দেশ পেয়ে যাবে।
জায়গাটা পুরুলিয়া শহর থেকে অনেকটাই দূরে। জঙ্গল আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর একটি সুন্দর জায়গা। প্রধান রাস্তা ছেড়ে চুন সুরকির রাস্তাটা ধরে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সামান্য এগোলে নিরিবিলি পরিবেশের মধ্যে একটি "টুরিস্ট বাংলোবাড়ি"। বাড়িটির কাছেই জঙ্গল ঘেঁষে বয়ে চলেছে একটি নদী। বাড়িটি দেখলে বোঝা যায় অনেকদিন কোন মেরামতির কাজ হয়নি। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় এটা কোন "ভূতের বাড়ি"। দোতলা বাড়িটায় চতুর্দিকের দেওয়ালে বট গাছের শিকড়। ভাঙ্গা দরজা, জানালাগুলি কোন রকমে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
বছর তিনেক আগেও এখানে প্রচুর লোকজন বেড়াতে এসে এই বাংলো বাড়িতে থাকতেন। নিস্তব্ধ জায়গাটায় শুধু পশুপাখির ডাক আর নদীর জলের আওয়াজ। বর্তমানে কোনো লোকজন আর এখানে বেড়াতে আসেন না। প্রচলিত রয়েছে, এই বাংলো বাড়িতে নাকি ভূতের উপদ্রব। রাত হলেই গা একেবারে ছমছম করে। মেয়েদের ছায়ামূর্তি অহরহ এই বাড়িতে দেখা যায়। এই বাংলো বাড়ির কেয়ারটেকার হলেন, সনাতন হাজরা। তিনি এই বাড়িতে আসার কয়েকদিন পর থেকেই এই ভূতের ব্যপারটা উপলব্ধি করেন। ক্রমে ভয়ের ঘটনাটা লোকজনদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকে লোকজন এখানে আর আসেন না।
রণজয় এই পরিত্যক্ত বাড়িটির দোতলায় একটি ঘরে রয়েছে। ছোটবেলা থেকেই রণজয়ের ভয় ডরটা কম। কেয়ারটেকার- সনাতন হাজরা একতলায় একটা ঘরে একাই থাকেন। একবারে গোবেচারা, নিরীহ প্রকৃতির নিপাট ভদ্রলোক। কথা বলার সময় মাথাটা হেলিয়ে দুহাত জোড় করে খুব মৃদু স্বরে কথা বলেন। মনে হয় মুখ থেকে যেন মধু গড়িয়ে পরছে।
রণজয়ের দুরাত ঠিকঠাক কেটে গেল। এই জঙ্গলের ভেতরে পুলিশের ভয়টা কম। তৃতীয় দিনের রাত। রণজয় সবে খাওয়া দাওয়া করে শুয়েছে। ঘুম আসছিল না, জেগেই ছিল। রাত একটু বাড়লে হঠাৎ করেই জঙ্গলের নদীর দিক থেকে মেয়েদের ভয়ার্ত চাপা কান্নার আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিলো। জনপ্রানিহীন জায়গাটায় এই রকম আর্তনাদ শুনে বেশ ভয় লাগছিল। ভাবলো, সকাল হলে কেয়ারটেকারকে এই ব্যপারে জিজ্ঞাসা করবে।
কেয়ারটেকার সনাতন হাজরা রণজয়ের থেকে সব শুনে ভয়ে ভয়ে বললেন, আপনি ঠিকই শুনেছেন। আপনাকে আমি বলিনি কারন আপনি ভয় পাবেন। শোনা যায়, প্রাচীনকালে নদীর ধারে এক কালীমন্দির ছিল। সেখানে ঘোর অমাবস্যার রাতে কুমারী মেয়েদের ধরে নিয়ে এসে নরবলি দেওয়া হতো। রাত হলেই তাদের বিদেহী আত্মাদের কান্নার আর্তনাদ শোনা যায়। পূর্বে এখানে বেড়াতে আসা লোকজন গভীর রাতে মেয়েদের কান্নার আর্তনাদ শুনতে পান। প্রচন্ড ভয়ে সেই রাতটা কোনো রকমে কাটিয়ে ভোরবেলা এখান থেকে তারা পালিয়ে যান। ক্রমে ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়তে, বেড়াতে আসার লোকজন আর এই বাড়িতে আসেন না। তারপর থেকে এতবড় বাড়িটি লোকজনহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। আমিও ভেবেছিলাম এখান থেকে চলে যাব। কর্তপক্ষ প্রায় জোর করেই আমাকে এখানে রেখে দিয়েছেন বাড়িটি পাহারা দেবার জন্যে। এতদিন বিদেহী আত্মাদের যে কান্নার আর্তনাদ বাইরে থেকে শোনা যেত, ইদানিং সেটা মাঝে মাঝেই বাড়ির ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে। আমি ঠিক করেছি, আর আমি এখানে থাকবনা।
সনাতন হাজরা ভয়ে ভয়ে বললেন, এই ভূতুড়ে বাড়িতে আপনি আছেন বলে তবু একটু ভরসা পাচ্ছি। আপনি এখান থেকে চলে যাবার পর আমি আবার একা হয়ে যাব। দিনের বেলায় বিশেষ দরকার ছাড়া আমি ঘরের বাহিরে যাইনা। রাত হলে বাহিরে যাওয়াতো দূরের কথা, ভয়ে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে রাখি। এবার আপনি যখন নিজের কানেই শুনেছেন বিদেহী আত্মাদের আর্তনাদের আওয়াজ, তাই আপনাকে সাবধান করে দিই সন্ধ্যে হলেই ঘরের সমস্ত দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরে থাকবেন।
রাতের অন্ধকারে বারান্দায় একটা চেয়ারে বসে রণজয় ভাবছিল কবে এই লোকজন বিহীন গোপন আস্তানা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। হটাৎ শুনতে পেল সেই চাপা কান্নার আর্তনাদ। বিজ্ঞানের মেধাবী ছাত্র রণজয় মনের ভিতর সাহস সঞ্চয় করে অতি সাবধানে টর্চটা নিয়ে বাংলো থেকে বেরোলো ভুতুড়ে আর্তনাদের রহস্যটা জানবার জন্য।
রণজয় কান্নার আওয়াজকে লক্ষ্য করে এই নির্জন রাতে আস্থেআস্থে খুব সন্তর্পনে এগোতে লাগল। মনে হচ্ছে ভূতুড়ে আর্তনাদের আওয়াজটা নদীর ধার থেকে আসছে। কাছাকাছি আসতেই গাছের আড়াল থেকে রণজয় যে দৃশ্য দেখতে পেল তাতে সে নিজেই চমকে উঠলো। আর্তনাদের রহস্যের জট খুলতে এসে এ আরেক নতুন রহস্যের সন্ধান পাওয়া গেল। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
গত দুদিন ধরে যে অমায়িক, ভদ্র, সজ্জন সনাতন হাজরাকে দেখে এসেছে, এই কি সেই লোক !!! এযেন অন্য আরেক "সনাতন হাজরা"। কঠিন, অশ্রাব্য মুখের কর্কশ ভাষা, চালচলন বর্বারাচিত। নদীর পাশে বড় গাছটার আড়াল থেকে রণজয় দেখতে পেল, নদীর পাড়ে সনাতন ছাড়াও আর কয়েকজন গুন্ডা প্রকৃতির লোকজন। একটা নৌকা এসে ভিড়েছে। নৌকার মধ্যে বিভিন্ন বয়সের দশ-বারটি মেয়ের হাত-পা, মুখ বাঁধা রয়েছে। তারই মধ্যে মেয়েগুলি বাঁচার জন্য আর্তনাদ করে কাঁদবার চেষ্টা করছে।
সনাতন হাজরা আর অন্য লোকগুলি অশ্রাব্য ভাষায় তাদের চুপ করতে বলছে। শাসানি দিয়ে বলছে যদি চুপ না করে তবে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে দেওয়া হবে। হাত,পা মুখ বাঁধা অবস্থায় তাদের জোড় করে রিক্সা ভ্যানে তুলছে অন্যত্র পাচারের উদ্দেশ্যে।
সনাতন নীচু স্বরে কর্কশ গলায় অন্য লোকগুলিকে বলছে-- নদীর ওপাড়ে মেয়েদের কি আকাল পরেছে ? আমি কোন কথা শুনতে চাই না। আমার আরো অল্প বয়সী মেয়ে চাই। বাজারে এখন খুব চাহিদা রয়েছে। টাকাটাও ভাল পাওয়া যাচ্ছে। মনে আছে, আগে কি হত ? মেয়ে জোগাড় করে রাখবার জায়গা ছিল না। আগে থেকেই পাচার করবার ব্যবস্থা করে রাখতে হতো। কত বুদ্ধি খাটিয়ে পাচার হবার আগে মেয়েগুলিকে যদি প্রয়োজন হয় কিছুদিনের জন্য নিরাপদ জায়গায় রাখবার, সে ব্যবস্থাও করে ফেলেছি জঙ্গলের ভেতরে এই " টুরিস্ট বাংলোতে "। ক্রমাগত এই বাংলো সম্পর্কে মিথ্যে ভূতের গল্পের কথা নানা ভাবে প্রচার করে আমার উদ্দেশ্য সফল করতে পেরেছি। এখন কোন লোকজন ভূতের ভয়ে এখানে আর বেড়াতে আসে না। সুতরাং যদি প্রয়োজন হয়, তবে মেয়েগুলিকে এই বাংলো বাড়িতে নিশ্চিন্তে কয়েকদিনের জন্য রেখে দিতে পারি। বর্তমানে অবশ্য একটি ছেলে কয়েকদিনের জন্য এখানে রয়েছ। শুনেছি, সে নাকি একজন জঙ্গি। এমন ভূতের ভয় তাকে পাইয়ে দিয়েছি, সে বেচারা ভয়ে ঘরের দরজা, জানালা বন্ধ করে দিন কাটাচ্ছে।
এর কিছুদিন পর উপর তলার নির্দেশে রণজয়কে অন্য আরেক জায়গায় চলে যেতে হয়। গাড়ি এসে গেছে তাকে নিয়ে যাবার জন্য। ফিরে যাবার সময় কেয়ারটেকার - সনাতন হাজরা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে রণজয়কে বললো-- সাবধানে থাকবেন।
রণজয় মৃদু হেসে বললো, আপনাদের এই জায়গাটি একটা রহস্যের মায়াজালে ঘেরা। বেশি রাতে নদীর পাড়ে মেয়েদের কান্নার কিংবা আর্তনাদের রহস্যটা আসলে যে ভূতের ব্যপার নয় সেটা আমি নিজে লুকিয়ে থেকে রাতে নদীর পাড়ে উপস্থিত হয়ে সবকিছু জেনে গেছি। আর কেন লোকজন বেড়াতে এসে এই বাংলোতে ওঠেন না, তার প্রকৃত কারনটাও আমি রাতে নদীর ঘাটে গিয়ে সব জানতে পেরেছি। আসলে আমরা যে ধর্মে দীক্ষিত হয়ে দেশের কাজ করছি, সেখানে এইসব কুকাজকে সমর্থন করা হয় না। তাই বলছি, আমার মত আপনিও সাবধানে থাকবেন। রণজয় দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, আমাদের দুজনকেই পুলিশের ভয়ে সাবধানে থাকতে হয়। পার্থক্য শুধু একটাই, আমাদের দুজনের চিন্তা ধারার পথটা সম্পূর্ণ ভাবে বিপরীত।
লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা
ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য
কিছু মানুষের অসৎ উদ্দেশ্যে এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভয়ের গল্প ছড়িয়ে রহস্যে পরিবৃত করে রাখা জায়গাটিকে। অবশেষে রহস্যের উন্মোচন...,
১২ আগষ্ট - ২০১৭
গল্প/কবিতা:
৫৩ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
বিজ্ঞপ্তি
“ ” সংখ্যার জন্য গল্প/কবিতা প্রদানের সময় শেষ। আপনাদের পাঠানো গল্প/কবিতা গুলো রিভিউ হচ্ছে। ১ , থেকে গল্প/কবিতা গুলো ভোটের জন্য উন্মুক্ত করা হবে এবং আগামি সংখ্যার বিষয় জানিয়ে দেয়া হবে।
প্রতিযোগিতার নিয়মাবলী