১ -----

দুর্গাপুর এক্সপ্রেস হাইওয়ে ধরে ছুটে চলছে আমাদের গাড়ি । গাড়িতে আমরা চারজন ছোটবেলার বন্ধু , সবাই কলেজে পড়ি । বর্ধমান পার হয়ে বাম দিকের রাস্তাটা চলে গেছে বোলপুর , শান্তিনিকেতনে । তখন সবে সন্ধে নেমেছে । বর্ধমান থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার । আমরা মোটামুটি হিসেব করে দেখলাম আর ঘণ্টা খানেকের মধ্যে আমাদের বোলপুর , শান্তিনিকেতনে পৌঁছে যাবার কথা । আসলে হটাৎ করে ঠিক করে হুট করে বেড়িয়ে পরা । উদ্দেশ্য , শহরের কোলাহল ছেড়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত জায়গায় নিরিবিলিতে কয়েকদিনের জন্য সময় কাটানো । এপ্রিল মাসের শেষের দিক । বেশ কয়েকদিন ধরে ঝড়বৃষ্টির চিহ্নমাত্র দেখা নেই । চারিদিকে একটা গুমোট আবহাওয়া । আজ অবশ্য সন্ধের আকাশে অল্প অল্প কাল মেঘের সঞ্চার হচ্ছে । মনে পড়লো আজকের সকালের খবরে বলা হয়েছে বঙ্গোপসাগরে এক গভীর নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে আর আজ সন্ধ্যায় এটি উপকূলবর্তী এলাকায় আছড়ে পরে প্রবল থেকে প্রবলতর ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা সঙ্গে রয়েছে সাবধানতার বিশেষ সতর্কবার্তা । খবরটা হালকা ভাবে নিয়ে আমরা ভাবলাম একটু ঝড়বৃষ্টি হলে এই গরমে লালমাটির দেশে কিছুটা আরাম করে কাটাতে পারবো ।

বর্ধমান পেরিয়ে বাদিকের রাস্তায় একটুখানি যাবার পরেই আকাশে ঘন কালো মেঘ এসে জড়ো হতে হতে নিমেষের মধ্যে সারা আকাশটা ঘন কালো মেঘে ঢাকা পরে গেল । শুরু হলো দমকা হাওয়া সঙ্গে বৃষ্টি । প্রথমে এই প্রচন্ড গরমে বৃষ্টি আর হওয়া বেশ ভাল লাগছিল । কিন্তু ক্রমেই ঝড়বৃষ্টির দাপট বাড়তেই থাকল । বিদ্যুতের ঝলকানির সঙ্গে ঘন ঘন বাজ পরার বিকট শব্দ । একটা সময় এই ঝড় এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করে সবকিছু একেবারে লন্ডভন্ড করবার খেলায় এক রুদ্রমূর্তিতে রূপান্তরিত হল । এই রকম অবস্থায় গাড়ী চালানোই দুস্কর হয়ে উঠল । ঝড়ের গতিবেগ এতটাই তীব্র আকার ধারণ করলো যেন প্রকান্ড এক দৈত্যের রূপ নিয়ে রাস্তার পাশের গাছগুলি উপরে ফেলে দিচ্ছে , মাঠের মধ্যে ছোট ছোট কুঁড়েঘর গুলিকে কাগজের মত উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে । ড্রাইভার জানান দিল এই অবস্থায় কোন ভাবেই গাড়ী চালানো সম্ভব নয় । আমরা প্রচন্ড ভয়ে গাড়ীর মধ্যে জড়সর হয়ে ঠাকুর-দেবতার নাম জপ করে যাচ্ছি । একটা সময়ে মনে হচ্ছিল এই তীব্র ঝড়ের দাপটে আমাদের সমেত পুরো গাড়ীটাই উল্টে যাবে । এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের কথা বলা সব বন্ধ হয়ে ভীষন ভয়ে থরথর করে কাঁপছি । ঘূর্ণিঝড় যে এতটাই তীব্র তান্ডবের রূপ ধারন করতে পারে সেটা আজ নিজের চোখে দেখলাম । এই ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হটাৎ করেই মনে পড়ে গেল আমার বাবার মুখ থেকে শোনা এক ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের কথা । সময়টা ১৯৯১ সালের ২৯শে এপ্রিল । বাবা সেইসময় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম শহরে ছিলেন কাজের সূত্রে । বিধ্বংসী সেই ঘূর্ণিঝড় এক ধংস খেলায় মেতে উঠে জনজীবনকে একেবারে তছনছ করে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি করেছিল ।

একটা সময় ঝড়ের প্রকোপ কিছুটা কমলেও বৃষ্টি অঝোরে হয়ে যাচ্ছে । অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ড্রাইভার ছেলেটি বললো -- আর বোধহয় এগোনো যাবে না । রাস্তাতেই সারা রাত কাটাতে হবে । রাস্তায় বড় বড় গাছ আর বাতি স্তম্ভ পরে গিয়ে যানবাহন চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে । কাকতালীয় ভাবে আমাদের গাড়িটি রাস্তার পাশে যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার অদূরেই দেখা যাচ্ছে এক গ্রাম্য শ্মশান । আধপোড়া কাঠ , ভাঙ্গা মাটির কলসী , মৃতদেহের বিছানাপত্র সব ছড়িয়েছিটিয়ে পরে রয়েছে । একেবারে গা ছমছম করা জায়গাটা ।সারারাত এই অন্ধকার জনমানবহীন হাইওয়ের রাস্তায় শ্মশানের পাশে আমাদের কাটাতে হবে জেনে প্রচন্ড ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অগত্যা আমরা ড্রাইভার ছেলেটিকে বললাম -- একটু এগিয়ে যাবার চেষ্টা কর যদি কোন গ্রামের সন্ধান পাওয়া যায় । আমাদের বিপদের কথা বলে শুধু আজ রাতের জন্য যদি কোন গ্রামবাসীর বাড়ীতে আশ্রয় পাওয়া যায় । ঝড়ের তোরটা তখন সামান্য কমেছে । কোনক্রমে মিনিট পাঁচেক যাবার পর দেখতে পেলাম বাদিকে একটা চুন-সুরকির রাস্তা দুদিকের ফাঁকা মাঠ , ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ভিতরের দিকে চলে গেছে । এক অজানা ভয়কে সঙ্গী করে রাস্তাটা ধরে কিছুটা এগোতে দূরে আবছা আলোয় দেখা গেল একটা দোতলা বাড়ী । বাড়ীটাকে দেখতে পেয়ে আমাদের ভয় কিছুটা মন থেকে দূর হল এই ভেবে যদি এই বাড়ীতে আজ রাতের জন্য কোনরকম ভাবে আশ্রয় পাওয়া যায় ।

------- ২ -------

বাড়ীটার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ভয় ভয় লাগল । বাড়ীটা বহু বছরের পুরনো আর দীর্ঘদিন কোন মেরামতির কাজ হয় নি । দেয়ালগুলো গাছের শিকড়ে অধিকাংশ জায়গায় আঁকড়ে ধরেছে । বাড়ীটার বাহিরের দিকে দেয়াল বরাবর এক বহু পুরোনো আমলের ঘোরানো লোহার সিঁড়ি ছাদ অবধি চলে গেছে । নোংরা , অপরিষ্কার । দেখলেই বোঝা যায় দীর্ঘদিন এটি ব্যবহার হয় না । চারিদিকে নানা ধরনের ডালপালা সমেত বড় বড় গাছ । অন্ধকার আচ্ছন্ন বাড়ীটির বাহিরে থেকে দেখে মনে হচ্ছে ভিতরে বোধহয় কোন লোকজন নেই । অনেক ডাকাডাকির পর একজন বয়স্ক মহিলা দরজা খুললেন । চুলগুলো সব ধবধবে সাদা । ঘাড় অবধি ছড়ানো । সারা গায়ে একটা সাদা থান জড়ানো । এক বিকট চাহুনি দিয়ে একটু অদ্ভুত ভাবে বললেন -- আমার এই বাড়ীতে সাধারণত আমার কোন আত্মীয়স্বজন আসে না মানে আমার কোন খোঁজখবর নেয় না তাই ভাবলাম এই দুর্যোগপূর্ণ রাতে হটাৎ করে কারা এলো ? দেখেতো মনে হচ্ছে তোমরা এই এলাকার লোকজন নয় ! মানে ... , আচ্ছা এবার তোমাদের আগমনের উদ্দেশ্যটা বলো । আমতা আমতা করে আমাদের সমস্ত ঘটনা তাঁকে জানালাম আর সবিনয়ে অনুরোধ করলাম যদি অন্তত আজকের রাতটা আপনার বাড়ীতে আশ্রয় দেন তবে আমাদের খুব উপকার হয় । উনি একবার ভাল করে আমাদের পরখ করে ফোকলা দাঁতে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন -- তারমানে তোমরা সবাই বিপদে পরেছ ...., ঠিক আছে , তাই হবে । সবাই তোমরা ভিতরে এস । প্রথম থেকেই ওনার ব্যবহারে আমাদের একটু অন্যরকম আর ভয় ভয় লাগছিলো । চলতে চলতে বললেন -- শুনলাম রাস্তায় গাছ পরে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেছে । এই ঝড়ে আমার বাড়ীর বিজলী চলে গেছে । তবে একটা কথা -- ..... এই বাড়ীতে আমি একাই থাকি । অনেক দিন পর কিছু লোককে কাছে পেয়ে ভাল লাগছে । একতলায় আমার চারটে ঘর রয়েছে । ঘরগুলো অনেকদিন পরিস্কার করা হয় নি , মানে প্রয়োজন হয়নি বলে । তোমাদের হয়তো একটু অসুবিধা হবে । তোমরা একটু অপেক্ষা কর আমি তোমাদের জন্য কেরোসিন কুপির জোগাড় করি । আর হ্যাঁ , তোমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা ....আমরা তাঁকে বাধা দিয়ে বললাম -- আপনি চিন্তা করবেন না , আমাদের সঙ্গে অনেক শুকনো খাবার রয়েছে । অন্ধকার ঘরটায় একটা টিমটিমে কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে মহিলাটি বললেন -- তোমরা বিশ্রাম কর আমি দোতলায় যাচ্ছি কিছু কাজের প্রয়োজনে । যাবার আগে আমাদের আর একবার ভাল করে দেখে নিয়ে বললেন -- তোমরা সব শহরের লোক অন্ধকার ঝরজলের রাতে এই অজপাড়াগাঁয়ে আমার এই অন্ধকার বাড়ীতে অহেতুক কোন ভয় পেও না , প্রয়োজন হলে আমাকে ডাক দিও ।

শুনশান পরিবেশ । চারিদিকে অন্ধকারে বৃস্টির একটা মেঠো মেঠো গন্ধ । বৃষ্টি থেমেছে কিন্তু মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক আর সঙ্গে বজ্রের হুংকার । চারিদিকে ব্যাঙের ডাক । বোঝা যাচ্ছিল অধিকাংশ সময় ঘরগুলি বন্ধ থাকার ফলে ভিতরে একটা স্যাঁতসেঁতে ভাব । ভাঙ্গাচোরা পুরোনো দেয়ালের কোটরে চামচিকেদের বাস । টিমটিমে কেরোসিনের আলোয় ঘরটার মধ্যে এক অদ্ভুত ভয়ের পরিবেশ । আমাদের পাশের ঘরগুলো সব ছিটকিনি দেয়া রয়েছে , তালা লাগানো নেই । আমরা ভয় কাটাবার জন্য সবাই মিলে গল্প শুরু করেছি । একটা রাত গল্প করেই কাটিয়ে দেব । এখন রাত গভীর হয়েছে । .......হটাৎ ড্রাইভার ছেলেটির বিকট একটা আর্তনাদ আর দৌড়ে আমাদের সামনে এসে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে । ইশারায় পাশের একটা ঘর দেখাচ্ছে । একটু ইতস্তত করে আমরা সবাই মিলে জোরালো টর্চ হাতে নিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে টেবিলের উপর রাখা ছবিটা ভাল করে দেখে ছিটকে ঘর থেকে প্রচন্ড ভয় পেয়ে বেরিয়ে এলাম । এতক্ষণ যে মহিলা আমাদের অভ্যর্থনা করে তাঁর এই নির্জন বাড়ীতে আশ্রয় দিলেন , তাঁরই একটা বাঁধানো বিশাল ছবি টেবিলের উপর রাখা রয়েছে । ছবিটায় রজনীগন্ধার মালা আর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে সাজানো রয়েছে । ছবির সামনে টিমটিমে এক কেরোসিনের কুপি জ্বলছে । বোঝাই যাচ্ছে ছবির মহিলাটি মৃত ।

মূহুর্তের মধ্যে আমাদের মনে হল আমরা হয়তো কোন ভূতের বাড়ীতে এসে আশ্রয় নিয়েছি । মৃত মহিলার আত্মা এই পোড়ো বাড়ীতে অশরীরি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে । ছোটবেলায় বাবা , কাকাদের মুখ থেকে শুনেছি ভূতেরা ইচ্ছে করলে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে । এর পরের অবস্থা চিন্তা করে আমাদের সবার সারা শরীর একেবারে হিম হয়ে গেল । এক মূহুর্ত এ বাড়ীতে আর নয় । এক্ষুনি সবাই এই বাড়ী থেকে ছুট লাগবো । তারপরে কপালে যা লেখা আছে তাই হবে । এক ঝড়ের ভয়কে ছেড়ে এসে এযেন আরেক ভূতের বাড়ীর ভয়েতে এসে পরলাম ।

আমরা ব্যাগ-পত্তর নিয়ে বাড়ী থেকে সবে দৌড় লাগবো , ঠিক সেই সময় দেখতে পেলাম সেই বয়স্ক মহিলা দোতলার আধ-অন্ধকার সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে । আমাদের সবাইকে একসঙ্গে দেখে এক সন্দেওজনক দৃষ্টি নিয়ে আস্থে আস্থে দোতলার সিড়ি দিয়ে নেমে এলেন । আমাদের অবস্থা তখন অত্যন্ত শোচনীয় । ভয়ে আমাদের সারা শরীর অবস হয়ে গেছে । চলবার ক্ষমতাটুকু হারিয়ে ফেলেছি । আমাদেরকে এই অবস্থায় দেখে তিঁনি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন -- ঝরজলের এই গভীর রাতে তোমরা সবাই হটাৎ করে কোথায় যাচ্ছ ? ওনাকে সামনে দেখে আমাদের কথা বলার সব শক্তি হারিয়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে শুধু মুখ থেকে গো.. গো আওয়াজ বেরোতে লাগলো । উনি একটু চিন্তা করে মনে হয় ব্যপারটা বুঝলেন । তারপর হাসতে হাসতে বললেন -- এসো আমার সঙ্গে । তোমাদের মত যারাই আমাদের দুজনকে এক সঙ্গে দেখে প্রায় প্রত্যেকেই এই ভুলটা করে ভয় পায় । তোমরা ভয় পেও না । ছবিটা দেখিয়ে বললেন -- এ আমার বোন । আমরা অবিকল একই রকম দেখতে । এ বাড়ীতে আমরা দু বোন থাকতাম । দুবছর হোল ও মারা গেছে । আজ ওর মৃত্যু বার্ষিকী । মহিলার থেকে সব শুনে আমরা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম ।

সকাল হোল । শুনলাম সারারাত ধরে জরুরী ভিত্তিতে রাস্তাঘাট কোনরকমে গাড়ী চলাচলের জন্য পরিষ্কার করা হয়েছে । মহিলাটিকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম আর অন্তরের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নিলাম । গত রাতের ভয় আর আতঙ্কের মুহুর্তগুলো চিরতরে তোলা রইল আমাদের স্মৃতির ঝাঁপিতে ।