শীতের মিষ্টি রোদে দাওয়ায় বসে মতিলাল এক মনে হিজিবিজি কি যেন মাটিতে আঁকছিল। চায়ের কাপে সেই কখন চুমুক দিয়েছে সেদিকে কোন খেয়াল নেই।
দাদা আমলের গজারী কাঠের একটি পিঁড়ির একদিকের খুড়া ভাঙা, ওটির উপর কসরত করে বসে এক ঘণ্টা যাবৎ আঁকাআঁকি। বাম হাটুর লুঙিটা একটু বেমানান; বেমানান বলেই ঐখান দিয়ে দাউদপরা হাটুতে মাছি ভনভন করে বাদ্যযন্ত্রে ঠাট দিচ্ছে। ঠাট যুৎসই না হওয়াতে মতিলাল ‘হেইত’ বলে বাহাতটা ঘুরান দেয়। হাতের আঙুলের নীচে যেটা পড়ে সেটার চোদ্দ পুরুষের খবর করে। হাতে তো ডলা দেয় দেয়ই, শেষে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলের নীচে ফেলে বলে- ‘বুঝো ঠ্যালা’।
এদিকে চায়ের কাপে কয়েক গাছি মুড়ি সাঁতার কাটছিল এখন আর সেগুলোর দেখা নেই; হয়তো রাগে অভিমানে ফুলে ফেঁপে অবশেষে তলানিতে ডুব মেরেছে। আইজু যখন ডাক দিল ‘মতি’; মতি আলগোছে মাথাটা তুলে একটা হাসি মারে, অবশ্য হাসিটা আইজুর অনেক দিনের পরিচিত। মতিলাল চায়ের কাপটা দেখে ঠান্ডা হয়ে গেছে; তারপর সবটা এক নিশ্বাসে গটগট করে গিলে ফেলে, তলানীটুকু চুকচুক করে চিবোয়। আইজুর দিকে দেখে বলে- ‘রেন্ডিয়া যামুগা’। কথাটা যে ওর নিজের না পরবর্তী দীর্ঘ শ্বাসই তা জানান দেয়। আইজু বলে- ‘ব্যাপার কি রে মতি ?’ ততক্ষণে মতির বউ পুরবী এক সানকি পান্তা এনে সামনে দেয়। সানকির কান্দায় এ জোড়া কাঁচা মরিচ কিছু লবণ। পেঁয়াজের কথা বলতেই বউ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। একটা পেঁয়াজের পরত খুলে খুলে দশদিন খেয়েছে, আজই শেষ। দশদিন আগে ওটা পাঁচ টাকা দিয়ে কিনেছে যদিও ওটার দাম দশ টাকা ছিল। দোকানদার তাঁকে পাঁচ টাকা সন্মান করেছে। মতিলাল আইজুর দিকে চেয়ে অনুযোগের সুরে বলে-‘পেজ ছাড়া পান্তা খাওন যায় কও দেহি ?’তারপর সরকারের চোদ্দ পুরুষ খলাইতে থাকে। পানতার পানিতে কি একটা কুটো পড়েছিল সেটা ফেলে লবণ দিয়ে মলতে থাকে, পানিগুলো বানের ঘোলা জলের মত হলে একটা লম্বা চুমুক দেয়। আইজুর দিকে চেয়ে বলে- ‘কি কামে ?’
মতিলালের বাবা দেশ স্বাধীনের আগে আইজুদের ‘বছরমারী’ কৃষাণ ছিল। কৃষাণ বলাটা ভুল হবে, ‘গৃহ কর্তার প্রতিনিধি’ বলাই সমীচীন কেননা বাজার করা থেকে শুরু করে সংসারের খুঁটিনাটি সব কিছু মতিলালের বাবাকেই সামলাতে হত। আর মতিলালের মা ছিল সংসারের গৃহকর্ত্রী,আইজুকে গাও-গোসল দেয়া থেকে শুরু করে সংসারের নানা ঝুট-ঝামেলা তাকেই বইতে হত। রাতে মতিলালের সঙ্গে পড়ত আইজু। মতিলালের বাবাই আইজুর প্রথম গৃহ শিক্ষক। কোন কোন দিন পড়তে পড়তে মতিলালের সঙ্গে গলাগলি ধরে ঘুমিয়ে পড়তো আইজু।
আর্থিক স্বচ্ছলতার কারণে আইজুর বাবা শরাফ শেখ তখন অনেকটা দেওয়ানী গোছের হয়ে উঠেছিল,প্রায়ই দেন দরবার নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন।স্বাধীনতার আগে আগে তাঁর ব্যস্তা আরও বেড়ে যায়। তিনি কি যেন রক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাড়িতে লোকজনের বেশ আনাগোনা। প্রায় প্রতি রাতেই বাড়িতে যেন কি সব মিটিংফিটিং চলতো। অতোসতো তারা বঝতো না। তারা বলতে মতিলাল আর আইজু।
রাতে যখন মিটিং বসতো আইজু আর মতিলালের মা পাক-ঘরের বেড়ার সাথে কান পেতে সেসব শুনার চেষ্টা করতো। দেশ বিদেশের নানা কথা । আইয়ুব খানের কথা, ইয়াহিয়ার কথা। কথায় কথায় হাসাহাসি হতো বিস্তর। তারা তখন ঐ সময় জ¦ালাতন করে মারতো ভাত খাওয়া জন্য। মা তখন ধমক দিতেন কথা শুনতে ডিস্টার্ব হওয়ার জন্য। কোনদিন তড়িঘড়ি করে ভাত বেড়ে দিয়ে আবার আলোচনা শুনতে মনোযোগী হতেন।
দিন তো ভালই যাচ্ছিল।
একদিন হঠাৎ গ্রামে নতুন হট্টোগোল শুরু হলো। আইজুদের বাড়ির সম্মুখ রাস্তা দিয়ে একদল নতুন মানুষকে যেতে দেখা গেল, সুন্দর পা তুলে পা মিলিয়ে যাচ্ছে তারা। গায়ে ফিটফাট পোষাক ; দেখতে ভালই লাগল আইজুর।কাঁধে নাকি ওটা বন্দুক পরে বাবার কাছে জেনেছিল আইজু। মাঝে মাঝে ওদের গাড়ীতে গরু ছাগল দেখে অবাক হয়েছিল,তারও উঠতে মন চাইতো।
দিন যত গড়াতে থাকল এই নতুন মানুষদের দেখে গ্রামের মানুষের মধ্যে ছুটোছুটিও বাড়া শুরু হল। তখনও কিছুই বুঝতো না আইজু আর মতিলাল্। পাখির ছানা আর ডাঁসা পেয়ারা খুঁজতেই তাদের দিন চলে যেত।
একদিন অলস বিকেলে আইজুর মা আইজুর বাবাকে ডেকে বলে- ‘আমার তো ব্যাপার স্যাপার ভালা ঠেকছে না।’
আইজুর বাবা বলে- ‘ কি কও বউ !’
ঃ‘হ, পুব পাড়ার কালা মানিক খালি পাক-ঘরের দিকে ফুচকি পারে। আপনেরা যহন মিটিংয়ে বসেন অয় ছাল-ছুৎনা নিয়া পাকের ঘরে আসে; পানি খাইতে, কোন দিন পান চায়। একদিন আইয়া মতির মাকে বলে- বউ দিদি খাওন দেও খিদা লাগছে।’ আইজুর মা বলে।
ঃ কি কও বউ ওর চোখ তুল্ল্যা ফলামু না।
ঃ অতো চেতনের কাম নাই, দেশের অবস্থা ভালা না। দেহা যাক কোন হানের পানি কোন হানে যায়।
সেদিন থেকে মিটিংয়ের সময় আইজুর বাবা একটা চোখ পাক-ঘরের দিকে রাখে।
সেদিন রাতে রক্ষা কমিটির কী একটা জরুরী মিটিং চলছিল, মিটিংয়ের এক পর্যায়ে মধু শেখ বলে- ‘মালাউন গো দ্যাশ থাইকা খেদাইতে অইব, শালারা বড় বাইরা গেছে।’ শইষ্ষ্যার মদ্যে বুৎ থাইকলে কি আর বুৎ খেদান যায়?’ রক্ষা কমিটি বয়স্ক গোছের সদস্য মজুদ উল্লাহ বলে। সে আঙুল নাড়িয়ে আইজুর বাবাকে শাসনের সুরে বলে- ‘শেখের পো এ্যার পর আমরা কিন্তুক আর সহ্য করব না ।’
আজকের মিটিংয়ে আইজুর বাবার যেন ঘুম ভাঙল।
মতিলালের মা কান পেতে সবই শুনতে পেল। আজ আইজুদের বাসায় শীতের পিঠাপুলি তৈরীর জন্য চালের গুড়া করার ধুম ছিল, সেই সুবাধে মতিলালের মা তখন পর্যন্ত আইজুদের পাক-ঘরের কোণে ঢেঁকিতে চাল গুড়া করছিল। কথা শুনে এত শীতেও তার কান গরম হয়ে উঠল কিন্তু আইজুদের প্রতি কোন রোষের ভাব দেখালো না।
রক্ষা কমিটির মিটিং শেষ হতে, মতিলালের মায়ের হাতের ভাঁপা পিঠা খেতে রাত ১টা বেজে যায়।
রাত ২টায় বসল দ্বিতীয় মিটিং নব্য রক্ষা কমিটির। সদস্য চার জন। আইজুর বাবা ও মা, মতিলালের বাবা ও মা। আইজু ও মতিলালের চোখ ঘুমে লাল হয়ে আছে তবুও বাবার কোল ঘেষে বসে আছে।
শরাফ সাহেবই প্রথম কথা পাড়ল- ‘দেশে তো অনেক গন্ডগোল তুমি রেন্ডিয়া যাওগা ; সবাই তো যাইতাছে। তা ছাড়া আইজকার মিটিংয়ের খবর তো নিজ কানেই শুনলা। মতিলালের বাবা বলে- ‘নিজের দ্যাশ থুইয়া কই যামু কও।’ আমি যামুনা।
মতিলালের মা এক কথার মধ্যে আরেক কথা পাড়ল- ‘আমরা না হয় রেন্ডিয়া গিয়া বাঁইচলাম ঠাকুর পো কিন্তু তোমরা কেমন কইর‌্যা থাইকব্যা।’ তিনি কালা মানিকের কথা তুলে ‘ও আমার দিকে কু-নজর দেয়, বউ দিদিও দিকেও কু-নজর দেয়।’ শরাফ সাহেবও কালা মানিকের হাবভাব অনেকটা আঁচ করতে পেরেছে কিন্তু দল ও ভদ্রতার খাতিরে মুখ ফোটে এখনও কিছু বলে নাই। বিষয়টি নিয়ে দুই দম্পতির মধ্যে বিস্তর আলোচনা পর্যালোচনা হয়। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয় উভয়ে ওপাড়ে শরনার্থী ক্যাম্পে চলে যাবে।
বলা বাহুল্য অবিশ্বাস্য হলেও মতিলালরা আইজুদের বাড়ির বাউন্ডারীর ভিতরেই থাকতো; তবে ওরা থাকতো ওদের মত করে । সাংসারিক কাজকর্মে কোন প্রভেদ না থাকলেও দুই পরিবার নিজ নিজ ধর্মীয় নিয়ম মেনে চলতো।
দেশ ইতোমধ্যে অস্থির; গুলাগুলি, অগ্নি সংযোগ, মারামারী, লুটপাট, ধর্ষণ। দেশ যেন মগের মুল্লুক হয়ে গেছে।
ইতোমধ্যে আইজুদের বাড়িতে ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। ঘটনার দিন শরাফ সাহেব ও মতিলালের বাবা কি সব হিসেব নিকেষে ব্যস্ত; আইজু ও মতিলালের মা পাক-ঘরে খুটুর-মুটুর রান্নার কাজে ব্যস্ত। শরাফ সাহেব মাথা ঝাকিয়ে হা-হু ফিসফিস শব্দে কি সব শলা-পরামর্শ করছে ; আইজু আর মতি পড়ার ঘরে পড়ছিল। হটাৎ করে বাড়িতে হুরহুর করে দু-তিন জন লোক ঢুকল। শরাফ সাহেব ভারী গলায় বলল- ‘কে?’
কালা মানিকও চড়া গলায় উত্তর দিল- ‘কালা মানিক।’
উত্তরের ধরণ শুনে শরাফ সাহেব ভরকে যায়; কি এক অজানা আশংকায় বুকটা কেঁপে ওঠে। মতিলালের বাবা অজয় বুকে থুথু ছিটায়। কালমানিকের এক সঙ্গি তাদের কাছে এসে বলে- ‘কাহা, হুনলাম তোমরা রেন্ডিয়া চইল্ল্যা যাইবাগা, তা তো আউন দেউন যায় না’,বলে অজয়কে ধাক্কা মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। শরাফ সাহেব ওদের কান্ড দেখে অবাক; এমন কান্ডের জন্য প্রস্তুত ছিলনা। ওরা শরাফ সাহেবকেও বেঁধে ফেলে। ও দিকে কালামানিক পাক-ঘরের দিকে গিয়ে মতিলালের মাকে দেখে বলে- ‘ এই যে বউ দিদি খুব শীত লাগছে,শরীলডা একটু গরম কইরা দেও। কত্তদিন থাইকা চাই তোমগরে দিয়া শরীলডা একটু গরম করামু। দ্যাশ থাইক্যা যহন চইল্ল্যাই যাইবা একটু গরম কইরা দিয়া যাও।’
আইজুর মা বটি উচিয়ে আসে-‘তর একদিন কি আমার একদিন।’ এক পর্যায়ে বটির কোপে জখম হয় কালামানিক।
লুটপাট শেষে বেড়িয়ে যাচ্ছে কালামানিকের দল। শরাফ সাহেব অনেক কসরত করে হাতের বাঁধন খুলে বন্দুক নিয়ে বেরোয়, গতকালই উচু মহল থেকে বন্দুকটি তিনি পেয়েছেন আর ঐ বন্দুকের শিকার দলের সতীর্থ।
পরদিন সকালে শরাফ সাহেব,অজয় ও তাদের স্ত্রীদেও লাশ গ্রাম বাসীরা সৎকার্য করে। দৈবক্রমে বেঁচে যায় মতিলাল ও আইজু।
-দুই-
পদ্মা-যমুনার পানি অনেক গড়িয়েছে, সূর্য্য ছড়িয়েছে অনে আলো; আইজু ও মতিলালের জীবন থেকেও খসে পড়েছে বহু বছর।
আইজু,মতিলালের বয়স এখন ষাটের কোঠায়। আইজুদের পুরনো বাড়ির ভীতে গড়ে ওঠেছে প্রতিষ্ঠান, জমিজমা যাদের দখলে তাদের কেউকে চাচা, কেউকে মামা বলে ডাকতো আইজু; তাদের কেউ আর বেঁচে নেই। চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় ছোট বেলার স্মৃতি। যাঁর হাত ধরে বেড়ে উঠেছিল তিনিও আর নেই। গাঁয়ের শেষ মাথায় ক’ঘর হিন্দু,ওখানেই থাকে মতিলাল। মতিলালকে মনে প্রানে চেনে আইজু। তাই দিনে একবার হলেও দেখা করতে আসে মতিলালের সাথে।
সম্প্রতি প্রতিবেশি দেশে নাগরিকত্বের নতুন আইন চালু হওয়াতে খুশি হয় মতিলাল। সেখানে যেতে পারলে নাগরিকত্ব,টাকা পয়সা আরও অনেক সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, হয়তো সুদিন ফিওের আসবে।
বউ পুরবীর পরামর্শে মতিলাল অবশেষে ও পাড়ে চলে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেয়।
"কথাটার বাতাস কানে আসে আইজুর। তাই সে আজ ভরা শীতের সকালে লাঠিতে ভর করে মতিলালের সাথে দেখা করতে এসেছে। শীত কি মানে হৃদয়ের টান ? মতিলাল যখন জিজ্ঞেস করেছিল 'কি কামে ?' তখন উত্তরে আইজু বলে-
- হুনলাম রেন্ডিয়া যাবি গা ?
- হ।
- ক্যা যাবি ? এহন তো আমরা স্বাধীন; স্বাধীনের সময় তো আমার বাপ-মাকেও হ্যারা মারছে।
বলে মতিলালের দিকে করুন চোখে চেয়ে থাকে আইজু।
- না রে, এই হানে আমার কোন অসুবিদে নাই, তয় বউ কইলো রেন্ডিয়া সরকার আমগর জন্নে নাগরিকইত্ব আইন শোদন করছে, দেহি যদি কোন সুবিদে পাওন যায়।
- তাইলে আমিও যামু তর লগে।
- তর তো ঐ হানে সুবিদে অইবে না আইজু।
বলেই মতিলাল আইজুর গলা জড়িয়ে ধরে,আইজুও মতিলালের গলা জড়িয়ে ধরে। শুরু হয় কান্নার মহাপ্লাবন। অঝরে কাঁদতে থাকে দু'জন। পাশে মতিলালের বউও কাঁদে।

কান্না কতক্ষণ চলেছিল এই মুহুর্তে বলা যাচ্ছেনা, এখন সব শুনশান, তবে মতিলালের বউ এক সময় চোখ মুছে বলে- 'ঘরে চলো ঠাকুর পো',কিন্তু কোন উত্তর হলোনা। আইজু ও মতিলাল নড়ছে না দেখে হাত টেনে ' ঘরে চলেন' আবার বলতে গেলে তিনি দেখেন দু'জনের শরীর ভীষণ রকম শক্ত। মৃত্যুর আশংকায় আর্তচিৎকার দিয়ে উঠে পুরবী। ততক্ষণে আইজু ও মতিলালের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে যায়। গলাগলি ধরা তখনও অটুট থাকে। মৃত্যুর কঠিন শীতও তাদের দূরে ঠেলতে পারেনি; কাছে টেনেছে পরম আদরে।

* এমন কান্না ও গলাগলির দৃশ্য বাংলাদেশ ব্যতিত পৃথিবীর আর কোন দেশে আছে কিনা লেখকের জানা নেই।