সুপ্রিয় পাঠক বাবারা সন্তানদের জন্য অনেক কষ্টে নির্ভয় আবাস গড়ে তুলেন, নিঃস্বার্থ ভালবাসা দেন। না বুঝে সন্তানেরা দুরে গেলেও বাবারা ক্ষমা করে দিয়ে কাছে টানেন। মুলতঃ বাবাদের ভালবাসা বাবা হলেই বোঝা যায়। বাবার মন শুধু বাবারাই বুঝেন। এভাবেই সামঞ্জস্য করা হয়েছে। ধন্যবাদ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ এপ্রিল ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ৩৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৯৭

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাবারা এমনই হয় (জুন ২০১৯)

কিছু কথা কিছু ব্যথা
বাবারা এমনই হয়

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৯৭

মোঃ মোখলেছুর রহমান

comment ১০  favorite ১  import_contacts ৪০২
আমাদের পাড়ার শেফু, দুই দশক ধরে দেখা নাই। পেটের টানে রিক্সা চালাতে শহরে এসেছিল; তখন থেকেই শহরের একটি বস্তিতে থাকে।

আমিও অফিসের একটি বিশেষ কাজে শহরে এসেছিলাম। রিক্সার জন্য অপেক্ষা করছি; শেফু কোত্থেকে দৌড়ে এসে আচমকা আমাকে ঝাপ্টে ধরে; বড়লোক ঘেষা ভোতা অনুভূতিতে চিনতে বেশ সময় লাগে। ততক্ষণে আমাকে প্রায় টেনে হিঁচড়েই তার রিক্সায় তোলে, তারপর সোজা বস্তির প্রাসাদে।

ওর বৌ দেখে তো অবাক; শুধু ওর বাচ্চা দুটো মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তবুও বুঝা যায় ওরা বেজার নয় হয়তো আমার বাহারী পোষাকের জৌলুসই তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। একটি বাচ্চা শেফুর লম্বিত হাত ধরে ঝুলে পড়ে; আর শেফু আল গোছে বুকে তুলে নেয়, ধুলো মুখে চুমো বসিয়ে দেয়।

কথার ফাঁকে ফাঁকে ওর বৌ কখন যেন এক গাদা ইফতারি সামনে এনে হাজির;এতটাই বাবুয়ানা খাবার যে, দেখে থ মেরে গেলাম। শেফুর বাচ্চা দুটো বাবার সাথে একই পেলেটে খেতে বসে। বুকের কোথায় যেন একটু চিন করে উঠল;অতীতে ফিরে বাবার কথা মনে পড়ে গেল, ছোট বেলায় ওরকমই আমরা বাবার সাথে খেতাম। বাবা কতকটা লোকমা আমাদের মুখে তুলে দিতেন।

অনেক রাত পর্যন্ত শেফুর সাথে স্মৃতি রোমন্থন চলল। একটা পর্যায় এসে আমি বললাম দেখেছিস শেফু এক সময় ছোট লোকদের বাঁচার খাদ্য ছিল রুটি, আর তখন বড়লোকদের খাদ্য ছিল ভাত; আর এখন বড়লোকদের বাঁচার খাবার হল রুটি ছোট লোকদের ভাত;ঠিক যেন বিপরীত। সবি আল্লাহর ইচ্ছে শেফু বলে।

শেফু মিষ্টি করে একগাল হাসি দিল। এ হাসির একটা ভূমিকা আছে, ভূমিকাটি শেফুও জানে আমিও জানি।
ভূমিকাটি নিম্ন রূপ-
স্যাক আলু নামক খাদ্য বস্তুটি বিংশ শতাব্দীর অতীব পরিচিত একটি খাদ্যের নাম । বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন নামে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নিম্নমান মানুষের আরও নানা খাদ্য শষ্য ছিল. যেমন চিনা. কাউন, খেরাচি.....।

যা হোক আমরা স্যাক আলুর নাম দিয়েছিলাম ব্যাটারী,রুটির নাম দিয়েছিলাম চশমা। এখানে উল্লেখ্য শেফুর সাথে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত এক সাথে পড়েছি। সর্ব প্রকার বন্ধুত্ব তার সাথে অটুট ছিল। স্কুলে যাওয়ার পথে কে কি খেয়ে এসেছি তার একটা এক্সামিন চলতো। কেউ বলতাম ব্যাটারী, কেউ বলতাম চশমা।

আমাদের চশমা বলার মাহাত্মটা তখনকার দিনের অনেকেই জানেন। ছোট বেলায় যখন চিতই পিঠা খেতাম, পিঠার একদিকে কামড়িয়ে খেয়ে চাঁদ তারা বানাতাম; কখনও বা রুটি খেতে খেতে রুটির মধ্যে দুটো ফুটো করে খেয়ে চশমা বানিয়ে খেলতাম।

মূল ঘটনাটি ঘটে একদিন সকালে.রুটিতে চশমা বানিয়ে বাবাকে দেখছিলাম। বাবা ঐ চশমার ফুটোর ভিতর দিয়ে আমার চোখ দুটোতে কি যেন একটা দেখে ফেলেন সহসা নিজের চোখ মুছে কোলে তোলে নিলেন। সন্ধ্যা থেকেই শুরু হল বাবার জ্বর,

জ্বরের মধ্যে প্রলাপ বকে বকে বাবা আমাকে কাছে ডেকে বাদশা বাবর আর হুমায়ুনের রোগ মুক্তির গল্প বলতে শুরু করেন। তখন ততটা না বুঝলেও এখন বুঝি বাবার অসুস্থ্যতার কারন। হুমায়ুনের রোগ মুক্তির অনুগল্পের মদ্য দিয়ে আমার চশমা দিয়ে নিজের দারিদ্রতার কষ্টকে অনুভব করেছেন তিনি।

সেবার ঈদে অনেক হৈ হুললোর করেছিলাম নতুন জামা জুতো পেয়ে; আমার অনেক দিনের আবদার। মায়ের বিভিন্ন তিক্ত প্ররোচনায় বাবা অবশেষে নতুন জামা জুতো এনে দেন।


ঈদের দিন সকালে আনন্দটি পন্ড হয়ে যায়। বাবার হাত ধরে মাঠে নামাজ পড়তে যাচ্ছিলাম হঠাৎ বাবার জামার দিকে খেয়াল যায়, দেখি জামায় বেশ কটি ফুটো; তার মানে বাবা তার পুরনো জামাটি গায়ে দিয়ে এসেছেন। পায়ের জুতোর দিকে তাকালাম, জুতোর ফিতের নাকটি গুনা ( লোহার চিকন তার ) দিয়ে বাঁধা। সহসা বুকটা হু হু করে উঠল। আমার আর যাওয়া হয়নি, বাবা কি করেছিলেন এখন তেমন আর মনে নেই।

কদিন আগে ফেইস বুকে একটি পোস্ট নজরে আসে; কে পোস্টটি দিয়েছে খেয়াল করিনি। পোস্টটি এ রকম- ‘আমরা মা, বোন, ভাইয়ের পুরনো কাপর পরতে পারি কিন্তু ......’ এর পর একটি রিক্সা চালকের পিছন দিকের ছবি দেয়া আছে। ‘......ইনাদের কাপর ব্যাবহার করতে পারা যায়না।’ বিষয়টা আমার বুঝতে ৩/৪ মিনিট সময় লেগে যায়। ছবিতে ভাল করে লক্ষ্য করলাম- রিক্সা চালক লোকটির সার্টটি পিছন দিকে সম্পুর্ণ ফেঁড়ে গিয়েছে, সেটি গায়ে দিয়েই তিনি রিক্সা চালাচ্ছেন; যেটি দ্বিতীয়বার ব্যাবহার করার কোন সম্ভাবনাই নেই। মনটা আর একবার হু হু করে উঠল। অতীতের সেই স্মৃতিটি আবার জাগরুক হল; অস্পস্ট স্বরে মুখ থেকে বেরুলো ‘বাবারা বুঝি এমনি হয়।’
আজকে অফিসে যাওয়া গায়ে যে পোষাকি জৌলুস এর পুরো অবদানে আমার বাবা।

প্রত্যহ সকালে বাবা আমাকে পড়াতেন। অ-আ, ক-খ, হাতে খড়ি তেনার মাধ্যমেই । ক্লাস টেন পর্যন্ত আমাকে পড়িয়েছিলেন,অথচ বাবা লেখা পড়া করেছিলেন ৬ষ্ঠ শ্রেনি পর্যন্ত।

পরীক্ষা দিয়ে বাড়িতে আসলে তিনি প্রশ্ন পত্র হাতে নিয়ে আমাকে নানা ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন কেমন পরীক্ষা দিয়েছি। যেগুলো ফটাফট উত্তর দিতে পারতাম সেগুলোর নম্বর হিসাব করতেন আর যেগুলোর উত্তর দিতে কোচর-মোচর করতাম তখন তিনি বলতেন ওগুলোতে গোললা খেয়েছি। পুর্বেই বলেছি তিনি ৬ষ্ঠ শ্রেনি পর্যন্ত পড়েছেন। উত্তরে আমার গোললা খাওয়া আন্দাজ আজ ভাবায়,কাঁদায়; বরাবর ক্লাসে প্রথম থাকতাম তাইতো।

দুঃখজনক ঘটনাটি ঘটে ইন্টারে,তখন আঞ্চলিক ভাষায় আমার নতুন‘ফইরা’ গজিয়েছে। কী একটা ছোট কথায় বাবার সাথে কথা কাটাকাটি হয় , পালালাম বাড়ি থেকে । কদিন ছিলাম আজ আর মনে নেই তবে আমার পড়ার যতেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল।

বাসায় ফিরে এলে বাবা তেমন কিছু বলেনি, পরে মায়ের কাছে শুনেছি বাবা চুপি চুপি অনেক কেঁদেছিল এবং আমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য যাবতীয় কবিরাজী তদবীরও করেছিল।

সর্বশেষ সেই চিরকুটটি হাতে পেলাম,যেটি মায়ের গহনার বাক্সে বাবা সযত্নে রাখতে বলেছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর চিরকুটটি আমাকে দিতে বলেছিলেন । মা-ও তেনার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। বাবাকে সমাহিত করে ফিরে এলে সেই চিরকুটটি মা আমার হাতে দেন। সযত্নে খুলি। তাতে সম্রাট সাজাহানের একটি উক্তি উদ্বৃত ছিল। ” সন্তানেরা যদি জানতো প্রতিটি আঘাতের অর্ধেক বাবার গায়ে লাগে,তাহলে কোন সন্তানকে শাসন করতে হতনা না।”

চিরকুটটি বুকে জড়িয়ে নির্বাক দাড়িয়ে রইলাম।

ভোরের দিকে শেফু ডাক ছাড়ে ফজরের সময় হয়ে গেছে , তাড়াতাড়ি ওঠ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement