কনকনে শীতের রাত।রাহাত,কবীর আর আমি আবির। এই রাতে নৌকায় করে মালামাল পৌছে দিতে হবে দীঘারচরে।রাহাত আর কবীর আমার ছোটবেলার বন্ধু।একসাথে কতো খেলাধুলা করেছি।এখন আমি চাকুরীসুত্রে অনেকদুরে। তবুও রাহাতের কথায় ছুটির কয়েকটা দিন থাকার জন্য চলে এসেছি রাহাতদের বাড়ি।আমি এসেছি জেনে কবীরও আমাদের সংগী হয়েছে।এ যেন প্রাণের টান।রাহাতের বাবা ও ছিল নৌকার মাঝি।তার বাবা রহমত উদ্দিন মারা যাবার পর সেও নৌকার মাঝিতে পরিণত হয়েছে।
এতো শীতেও আমরা যথাসময়ে গন্তব্য পৌঁছালাম। আসার সময় রাহাত কবীরের কাছে আক্ষেপ করে বলছে,"আর মনে হয় নৌকা বাইতে পারবোনা।"
কবীর বললো,'কেন? কি হয়েছে?'
'জানিস তো পন্নুর সাথে সেদিন ঝগড়া হয়েছে। সে হুমকিও দিয়েছে।আর লোকটাও ভাল নয়।'বলে থামলো রাহাত।'
হঠাৎ আমরা সবাই নীরব।বাইরে শুনশান বাতাস বইছে।হাল্কা ঠাণ্ডাও লাগছে।
কি যেন এক খেয়ালে রাহাত আমাকে বললো,
'আবির, কেন জানি তোকে খুব মনে পড়ছিল।তাই কয়েকদিন ধরে তোকে অনবরত কল করে আমার জন্য জ্বালাতন করেছি।তুই রাগ করিসনি তো-?'
আমি বললাম,'এভাবে বলবিনা কখনো।জানিসতো ভাই,পরের চাকরগিরির নাম চাকরি।যেখানে নিজের ইচ্ছেমত কিছুই করার সময় নেই।তাই ছুটি পেয়েই তোর কাছে ছুটে এসেছি।তোদের কাছে পেয়ে আমার ও খুব ভাল লাগছে।'
এরপর হারানো দিনের স্মৃতিচারণে আমরা ফিরে গেলাম।
এদিকে আমার ছুটির দিন ও প্রায় শেষ।
সেদিন রাহাতের কি হয়েছে জানিনা।দুপুরেই পূর্বেই বাড়ি চলে আসলো। রাহাতের শরীরটা ভাল নেই।শরীরে অল্প অল্প জ্বর বইছে।সে কবীরকে বললো,'যা,আবিরকে নিয়ে স্বপ্নছায়ায় ঘুরে আয়। আমি এমন অবস্হায় যেতে পারবোনা।'
আমি বললাম,'তোকে এভাবে রেখে আমার যেতে ইচ্ছে করছেনা।সামনের বার বেড়াতে আসলে যাবো।'
রাহাত বললো,'না। তোকে স্বপ্নছায়ায় নিয়ে যাবো বলেই এখানে এনেছি,এখন আমার কারণে যাবিনা তা হতে পারেনা।'
আমি আর কবির রাহাতের মাথায় জ্বল ঢেলে খাইয়ে শুইয়ে দিলাম।
অগত্যা বিকালের দিকে স্বপ্নছায়ায় উদ্দেশ্য রওনা দিলাম।স্বপ্নছায়াতো নয় যেন অসীম গণ্তব্য!
গভীর রাত! হঠাৎ খবর পেলাম রাহাত খুন হয়েছে।কে বা কারা রাহাতকে খুন করে রেখে গেছে।
এ খবর শুনে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।যেন পায়ের তলা থেকে আমার মাটি সরে গেছে।
আমরা আবার রাহাতদের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলাম। রাহাত কতো সুন্দর করে স্বপ্নছায়ার বর্ণনা দিতো।আমার কাছে তার মুখের সেই বর্ণনা শুনতেই বেশী ভাল লাগতো।
রাতারাতি পৌঁছালাম। মনে মনে নিজেদের প্রতি ভৎসনা করতে লাগলাম।আমরা পাশে থাকলে হয়তো এমন হতোনা।কবির অঝোরে কাঁদছে।আমার কণ্ঠ যেন রোধ হয়ে গেছে। হঠাৎ করে পাগলের মতো হয়ে গেছি।কি করবো বুঝতেও পারছিনা।রাহাতের বুকে খুব সম্ভবত ছুরি বা গাঁইতি জাতীয় কিছু মারা হয়েছে।রক্তে বিছানা ভিজে গেছে।তাঁর গেংগানোর শব্দে তার প্রতিবেশী কলিমচাচা এসে দেখেন এই অবস্হা! তিনি আশে-পাশের সবাইকে ডেকে তোলেন।
খুব সকালবেলা পুলিশ আসলো সরেজমিনে তদন্ত করতে। রাহাতের ঘরে পাওয়া গেছে আমার কাপড়ে রক্তের দাগ।যেটা আমি বিকালে তার আলমারিতে রেখে দিয়েছিলাম।
ঘরে কোন অস্র পাওয়া যায়নি।
পাড়ার কেউ বিশ্বাস করলোনা রাহাতকে আমি হত্যা করতে পারি।তাছাড়া সবাই জানে আমি, রাহাত,কবীরের বন্ধুত্ব সম্পর্কে।
এদিকে গ্রামে রটে গেছে আমি আর কবীর তাকে হত্যা করে গা-ঢাকা দেবার জন্য পালিয়ে যাচ্ছিলাম।
বাড়িতে ছমছম পরিবেশ।এমন সময় পুলিশের ইন্সপেক্টর সাহেব বললেন,'আবির সাহেব,চিন্তিত হবার কোন কারণ নেই।
রাহাত আমাদের কাছে দুপুরে একটা হয়রানী মামলা করেছিল।মামলাটা করা হয়েছে পন্নুর বিরুদ্ধে।আমরা শীঘ্রই তাঁকে খুঁজে বের করছি।
এরপর রাহাতের লাশটা ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে গেল।
এদিকে রাজ্যর বিষন্নতা ভর করেছে আমার মনে।
যার জন্য এতো দুরে আসা, সেই যখন আর নেই -ভাবতেই নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়।আমি রাহাতের কাছে না আসলেই মনে হয় ভাল হতো।তাহলে এমন পরিস্হিতির সম্মুখীন হতে হতোনা।নিজের চোখে রাহাতের মৃত লাশ দেখতে হবে কখনো ভাবতে পারিনি।
আল্লাহর কাছে মিনতি, তুমি রাহাতের স্বপ্নছায়ায় আমাদেরও একটু ঠাই দিও।