আজ পহেলা ফাল্গুন।রমনায়,রবীন্দ্রসরোবরে সকাল থেকেই শুরু হয়েছে বসন্ত বরণের মহা উৎসব।
সকলে এসেছে তাদের প্রিয়জনের সাথে।অনেক ফাগুন ই জীবনে গেল আসল কিন্তু ফাগুনের মাহাত্ম্য আর ভালবাসার যে নিবিড় এক সম্পর্ক সেটা তুমি আমার জীবনে না আসলে বুঝতাম না।তুমি আমার জীবনে আসার পর প্রতিটা ঝতু আমার জন্য ছিল বসন্ত।প্রতিটি ঋতুতেই যেন কোকিল এসে দুরের কোন এক গাছে বসে গান গাইত।মনে আছে তোমার,এমনই এক ফাগুণী পূর্ণিমা রাতে তোমাকে জানিয়েছিলাম ভালবাসি তোমাকে।লজ্জা পেয়ে চলে গিয়েছিলে।তার কিছু দিন পর বেনামী একটা চিঠি পেয়েছিলাম আর সেখানে তোমার উত্তর ছিল এই বসন্তের মত আরো সহস্র বসন্ত কাটাতে চাই তোমার সাথে আর খামে ছিল একটা হলুদ গোলাপের পাপড়ি তাতে আমার নাম লেখা।
প্রতিদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে যখন বলতাম স্বপ্ন এ এসো কিন্তু। তুমি আদরজড়ানো কন্ঠে বলতে হ্যা,পেত্নী হয়ে তোমার রক্ত খাব।
আর তোমার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমাব।তোমাকে ঐ দিন থেকে পেত্নী বলে ডাকতাম।পেত্নী বললেই তুমিও আমাকে বলতে, "কি,আমি পেত্নি!আমি পেত্নী হলে তুমি কি?তুমি তো দানব যে বড় শরীর তোমার তুমি তো আমাকে জড়িয়ে ধরলে আমি মরেই যাব।দানব একটা কি খাও এত্ত বড় শরীর বানিয়েছ?"
আমি হাসতাম আর বলতাম, "তোমার রান্না করা কম লবণের মাংস খেয়ে এমন হয়েছি।"তুমি অনেক রাগ হতে আর তোমার রাগান্বিত মুখটা দেখতেও খুব সুন্দর লাগত মনে হত যেন সূর্যএর সব লাল তোমার মুখে এসে পড়েছে।
সেই ফাল্গুন, সেই ভালবাসায় সিক্ত দিনগুলো আমি যে একা,বাবা-মা হীন এক অনাথ,অত্যাচারিত ছেলে, সেই সব দুক্ষ-কষ্টকে তোমার ভালবাসা দিয়ে ভুলিয়ে দিয়েছিলে আমাকে।যখনি বাবা-মার কথা বলে কান্না করতাম তখনি বলতে, "আমি তো কেউ না তোমার,তাই না? আর আমার সাথে কথা বলনা।"তোমার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তুমি আমাকে দেখলেই বুঝতে পারতে কি ভাবছি,কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত কিনা?
একদিন মনে আছে তোমাকে বলেছিলাম সাদা হরিণ।তুমি শুনে অবাক হয়ে বললে, "তুমি আমার নামের অর্থ জানলে কিভাবে?"আমি বললাম,"বা রে আমাকে দানব উপাধি দিয়েছ, আমার কি এতটুকু ক্ষমতা নেই?" তুমি শুনেই হেসে বলতে,"এত কথা শিখেছ কোথা থেকে?"আমি বলতাম,"কেন স্বপ্নে আমাকে আমার পেত্নীটার কাছ থেকে।"
তোমার একটা সাদা সালোয়ার কামিজ ছিল,যেটা আমার খুব পছন্দ ছিল।পরের ফাল্গুনে তোমাকে বলেছিলাম ঐ সাদা ড্রেসটা পরতে তুমি শুনেই বললে,"কি গাধা গাধা কথা এগুলো?ফাল্গুনে কি কেউ সাদা পরে?তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে।"আমিও খুব হেসেছিলাম আর যখনি বলতে "গাধা গাধা কথা" তখনি অনেক আদুরে শোনাত কথাটা।
কিছুদিন পরেই ধরা পড়ল আমার লিভার সিরোসিস, শেষ পর্যায়।তুমি খুব কান্না করেছিলে,তখনও ছিল বসন্ত আর একটা কথা বলেছিলাম যেটা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কান্না করেছিলে।বলেছিলাম,"কাটাবে সহস্র বসন্ত আমার সাথে?"তুমি কপালে একটা চুমু খেয়ে বলেছিলে, "হ্যা থাকতে তো আমাকে হবেই।"
বসন্ত প্রতিবারের মত এবারও এল।কিন্তু প্রকৃতির কি পরিহাস দেখ,তুমি আমার থেকে আজ কত দূরে।কখনো ভাবিনি এভাবে আমাদের বিচ্ছেদ ঘটবে।তুমি আমাকে দিব্যি দিয়ে বলেছিলা, "কখনো যদি আমার কিছু হয়,নিজের ক্ষতি করবে না।কথা দাও আমাকে?"তখন যেন কেমন কাদো কাদো হয়ে বলতে বুঝতে পারতাম না। আমিও বলতাম কথা দিলাম।

কেন আমাকে সেই দিন বলনি প্রাণঘাতী ক্যান্সার বাসা বেধেছে তোমার শরীরে।এবারের বসন্তে আমার চারপাশ টা যেন মরুভূমির থেকেও বেশি নিস্তব্ধ।শুণ্যতা আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।কোথায় গেলে আমায় ছেড়ে? রাতের আকাশে লক্ষ লক্ষ তারার মাঝে যে শুধু তোমাকেই খুজি।

বসন্ত আসবে যাবে,
প্রকৃতিও পাল্টাবে তার রূপ,
শুধু শুণ্যতা আর তোমার স্মৃতি রয়ে যাবে।শিরায় শিরায় আমার মাঝে মিশে আছ তুমি।

একবার ফিরে এসো,আমার পেত্নি।আবারো আমরা বাসন্তী মেলায় হাটব দুজন দুজনের হাত ধরে।
কাধে মাথা রেখে বেঞ্চে বসে গল্প করব।তোমার চুলগুলো এলমেলো করে দিয়ে বকুনি খাব তোমার।

ফিরে এসো একবার এই বসন্তবেলায়।।