অনেকদিন পর ব্ল্যাক কফির মগ হাতে নিয়ে আবির আজ ব্যালকনীতে বসেছে। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির হালকা আবেশ আবিরের মুখে এসে লাগছে। বৃষ্টির এই ছোঁয়া আাবিরের খুব পছন্দ। রুমের ভেতর শাওনের ’যদি মন কাঁদে, চলে এসো, চলে এসো এক বরষায়’ গানটি বাজছে। আবিরের খুব পছন্দের একটি গান।
কফির মগে চুমুক দিতে দিতে আবির চলে গেল বিশ বছর আগের স্মৃতিতে। ১৯৯৭ সাল। সবে মাত্র এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়েছে। ঠিক তখনই একটি মেয়ের প্রেমে পড়ে গেল। দু’জন দু’জনাকে প্রচন্ড ভালোবাসত। মেয়েটির বাসা আর আবিরদের বাসা কাছাকাছি হওয়াতে প্রায় সময়ই দু’জনার দেখা হত। কিন্তু কেউ কাউকে মুখ ফুটে ভালোবাসার কথাটি বলতে পারেনি। একটু চোখাচোখি, একটু দুষ্টমি, একটু হাসি, একটু শাসন সবই চলত আকারে-ইঙ্গিতে। এভাবেই চলতে লাগল ওদের ভালোবাসার স্বপ্ন-সারথি।
আবিরের রেজাল্ট বের হলো। ভালো ছাত্র হিসাবে কাঙ্খিত রেজাল্ট হলো আবিরের। মেয়েটিকে দীপ্তি বলে ডাকত আবির। দীপ্তির বাবা সরকারী চাকরীজীবী ছিলেন। হঠাৎ করে দীপ্তির বাবার বদলী হয়ে গেল। দীপ্তি চলে যাবার সময় ওর ছবি, একটি চিঠি আর একটি ডায়েরী আবিরকে উপহার দিল। এরপর ওদের মধ্যে আর কোন যোগাযোগ হয়নি।
পাঁচ বছর পর আবিরের ইউনিভার্সিটিতে দীপ্তির সাথে ওর দেখা হল। দীপ্তি প্রথম বর্ষে আর আবির তখন তৃতীয় বর্ষে। এরপর আবার ওদের সম্পর্ক নতুন করে শুরু হল। ইউনিভার্সিটিতে ওদের প্রতিদিন দেখা হত। আহসান মঞ্জিল, বলধা গার্ডেন, রমনা পার্ক, লালবাগ কেল্লা সব জায়গায় ছিল ওদের দু’জনের ভালোবাসার পদচিহ্ন। আবির দীপ্তিকে নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকত। দীপ্তি এমনিতেই ছিল খুব সুন্দরী তাছাড়া মা-বাবার বড় সন্তান। ভালো পাত্র পেলে যেকোন সময় মা-বাবা ওকে বিয়ে দিয়ে দিবে। এই আশঙ্কার কথা প্রায়ই দীপ্তিকে জানাত আবির। প্রত্যুত্তরে আবিরকে অভয় দিত দীপ্তি।
ওরা প্রায়ই ঢাকা শহরে রিকশায় করে ঘুরত। ঘন্টা চুক্তি করে রিকশায় ঘুরতে পছন্দ করত ওরা। একদিন রিকশায় করে ঘুরবার সময় হঠাৎ করে বৃষ্টি এল। আবির রিকশা হতে নেমে যেতে চাইলে দীপ্তি ওর হাত দুটো শক্ত করে ধরে রাখল। বলল,’আজ দু’জনে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ঢাকা শহর ঘুরব।’
আবির বলল,’পাগল হলে নাকি?’
’হ্যাঁ, আমি পাগল হয়ে গিয়েছি। তোমার ভালোবাসায় আমি পাগল।’
এই পাগলিটাকে আর সামলানো যায়নি। বৃষ্টিতে ভিজে জ¦র বাঁধিয়ে ফেলেছিল। এভাবেই আবির আর দীপ্তির ভালোবাসার রঙ্গিন প্রজাপতি উড়ে চলেছিল।


সুখের দিনগুলি যেন তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যায়। হঠাৎ করে দীপ্তির কোন খোঁজ-খবর নাই। হলে গিয়ে জানল জরুরীভিত্তিতে ও গ্রামের বাড়িতে গিয়েছে। বাড়ি যাবার আগে সবসময় আবিরকে জানিয়ে যায়। তবে এবার কেন জানাল না। নানা চিন্তা আবিরের মাথায় ঘুরপাক খায়।
পনের দিন পর দীপ্তি ক্যাম্পাসে এল। দীপ্তির আসার খবর পেয়ে আবির ওর কাছে ছুটে গেল। দীপ্তির চেহারা কেমন যেন মলিন মনে হল। চোখের নিচে কালি পড়েছে। আবির ওর হাত ধরতে গিয়ে দেখল হাত দুটো মেহেদী রাঙ্গানো। চকিত নিজের মধ্যে একটা ভয় এসে গেল। আবির কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই দীপ্তি বলল-
’ আমাকে ক্ষমা করে দিও আবির। মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আমি কিছুই করতে পারিনি। সত্যি বলছি, আমি অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। আমার ডাক্তার বর লন্ডন থাকে। আমাকেও খুব তাড়াতাড়ি নিয়ে যাবে। প্লিজ, আমাকে ভুল বুঝ না। পারলে ক্ষমা করে দিও।’
দীপ্তির কথা শুনে আবির হতবাক হয়ে গেল। ও যেন বলার মতো কোন ভাষা খুঁজে পেল না। শুধু বলল,’ ভালো থেকো’
এরপর কেটে গেছে আরো অনেক বছর। আবির একটি কোম্পানীতে উচ্চপদে কর্মরত। এখনও বিয়ে করা হয়নি ওর। আজ এতদিন পর ফেসবুকের কল্যাণে আবার দীপ্তিকে খুঁজে পেয়েছে। ব্যালকনীতে বসে আবির ভাবছে ও কি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবে নাকি আগের মতোই নিরবে দীপ্তিকে ভালোবেসে যাবে।