একদিন বৃষ্টিতে

বৃষ্টি ও বিরহ সংখ্যা

শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান
  • 0
  • 0
  • ১৩১
আষাঢ় মাস।আষাঢ়ের প্রকৃতি হলো কখনো মেঘ,কখনো বৃষ্টি আবার কখনো রোদের খেলা।বৃষ্টিতে প্রাণে প্রশান্তি আনে তবুও চলাচলে কিছুটা ভোগান্তি সহ‌্য করতে হয়।তারপরেও বৃষ্টি মনে প্রাণে এক শান্তির রেশ রেখে যায়।বৃষ্টি খুবই প্রাণবন্ত আর শান্তিদায়ক মানুষের জীবন জুড়ে।
রেনু বৃষ্টি উপভোগ করে ঠিকই কিন্তু আজকের বৃষ্টিতে সে বেশ কষ্ট পেয়েছে।ছাতা না নিয়েই সে বাসা থেকে বের হয়েছিল জরুরি কাজে।বের না হয়ে তার উপায় ছিলো না কারণ তার মেয়ের জীবনের বিষয় এর সাথে জড়িয়ে রয়েছে।মেয়ের জীবনের জন‌্য তাকে সব ধরণের কষ্ট মেনে নিতে হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে সে তার মেয়ের দেয়া ঠিকানা অনুযায়ি বাসার সামনে এসে হাজির হলো।বাসার গেট লাগানো আর বেশ বৃষ্টি হচ্ছে সে ভাবতে লাগল কিভাবে ভিতরে প্রবেশ করা যায়।গেটের আশেপাশে সে কাউকেই দেখতে পাচ্ছে না।এদিকে রিক্সা থেকে নামার পর থেকেই সে হালকা বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে।কি করবে ভেবে পাচ্ছে না সে।
গেটের বামপাশে বেশ বড় একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল সে। অপেক্ষা করতে লাগল যদি কেউ নিজেদের প্রয়োজনে গেট খুলে দেয়।গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিতে ভিজেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে তাকে কেননা সে তার মেয়েকে নিয়ে বেশ বিপদেই পরেছে আর সে কারণে ই এই বৃষ্টিতেও বুকেতে বিরহ নিয়ে তাকে এই বিপদের একটা সমাধানের চেষ্টা করতে হচ্ছে।মানুষ বিপদগ্রস্ত হলে তাকে যেকোনো ধরণের পরিস্থিতিতেই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়।ঝড় বৃষ্টি তাতে হয়তো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।আজ রেনু র ক্ষেত্রেও তেমনটা হয়েছে কেননা তার কাছে তার মেয়ের জীবন রক্ষা করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
আর এ কারণেই সে কিছু না ভেবেই এই বৃষ্টিতেও ছুটে এসেছে তার মেয়ের জীবনে সৃষ্টি হওয়া সমস‌্যার সমাধান করার জন‌্য।বেশিক্ষণ আর তাকে অপেক্ষা করতে হলো না।সহসা বাড়ির গেট খুলে গেল।গেটের দাঁড়োয়ান তাকে বলল,আপা আপনি বোধহয় এ বাড়ির ভিতরে যাবার জন‌্য অপেক্ষা করছেন।
জ্বি ভাই ঠিকই বলেছেন।আমি জায়েদ সাহেবের সাথে দেখা করার জন‌্য এসেছি।সে বলল।
ঠিক আছে আপা আপনি ভিতরে যান আপনাকে স‌্যারই উপর থেকে দেখে আমাকে গেট খুলতে পাঠিয়েছেন।আপনি ভিতরে যান দরজা খোলাই রয়েছে।দাঁড়োয়ান রেনুকে ভিতরে যাওয়ার জন‌্য বলল।
সংকোচ নিয়ে ও সে ভিতরে চলে গেল।আসলে আজ তার স্বামী বেঁচে থাকলে এসব ব‌্যাপারে হয়ত তার স্বামী ই দেখতে পারতো।কিন্তু লোকটা তাকে ফাঁকি দিয়ে আগেই চলে গেল।রেনু বেশ অসহায় হয়ে গেছে তার স্বামীকে হারিয়ে।আর সবচেয়ে বেশি ঝামেলায় পরে গেছে তার সুন্দরী মেয়ে জেরিন কে নিয়ে। সে মেয়েকে যতই লুকিয়ে রাখতে চায় ততই বেশি ঝামেলা এসে তাকে জড়িয়ে ধরে।কিছুতেই মেয়েকে নিয়ে সে শান্তিতে থাকতে পারছে না।এই মেয়েকে একটা ভালো ছেলের হাতে দিতে পারলেই তার চিন্তা একটু মুক্ত হয়।সারাটিক্ষণ মেয়ের চিন্তায় সে স্থির থাকতে পারে না।রাতে তার ঠিকমতো ঘুম ও হয় না মেয়ের চিন্তায়।
এইভাবে কষ্ট নিয়ে তার দিনগুলো কেটে যাচ্ছে।স্বামী মরে যাবার পরই তার জীবনে এই নিদারুণ কষ্ট নেমে আসে।তবুও সে আর দ্বিতীয়বার বিবাহ করতে রাজি হয়নি।যদিও তাকে সবাই বিবাহ করার জন‌্য চাপ দিয়েছিল। কিন্তু মেয়ের কথা ভেবে সে আর ঐ পথে পা বাড়ায়নি।
জায়েদ সাহেবকে দেখে রেনু চমকিত হয়ে উঠলো।সে কি লোকটাকে চেনে,মনে হয় লোকটা বহু দিনের চেনা।সে তার ঘোমটা একটু বেশি টেনে আর এক দিকে মুখটা হালকা একটু ঘুরিয়ে সোফার ওপরে বসে পরলো।তার কাছে লোকটাকে এতো চেনা মনে হলো কেন।সে কি আগে তাকে দেখেছে।ভাবতে লাগল রেনু।তবে কি এ সেই জায়েদ যাকে সে আপন করে চেয়েছিল আরো পচিশ বছর আগে।না তা হতে যাবে কেন,এটা হয়তো তার মনের একটা ভাবনা যেহেতু নামে মিল রয়েছে তাই হয়তো এমন ভাবনা এসেছে তার মনে।আর সে সহসা এতো পুরানো কথা কেন মনে করলো তা নিজেই বুঝতে পারছে না। তবে কি তার চোখের দেখা ভুল নয় এ কি তার পিছনে ফেলে আসা সেই জায়েদ।আর ভাবতে পারলো না সে।
সহসা জায়েদ সাহেব বলল,আচ্ছা বলুন তো আপনি কেন এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করার জন‌্য,আপনার সঙ্গে আমার কি কোনো ব‌্যবসায়িক যোগাযোগ রয়েছে নাকি অন‌্য কোনো বিষয়ে কথা বলতে চাচ্ছেন।আমি একটু ব‌্যস্ত রয়েছি বৃষ্টি থামলেই বের হতে হবে।যা বলার একটু তাড়াতাড়ি বলবেন প্লিজ।
এবার জায়েদ সাহেবের কথা শুনে আবার চমকে উঠলো রেনু।এ যে তার ফেলে আসা সেই জায়েদের ই কন্ঠ।নিজেকে সে আর সামলাতে পারলো না একটু তাকিয়ে দেখল সে লোকটাকে চেনে কিনা তা দেখার জন‌্য।বহু বছর আগের দেখা এতো সহজেই কি চিনতে পারবে তাকে।
তবু সে চেনার চেষ্টা করলো।অনেকটাই তার সেই জায়েদ ই মনে হচ্ছে।সবকিছু আগের মতোই মনে হয় শুধু চুলগুলো পাকা। জায়েদকে দেখে তার পুরানো কথাগুলো মনে পরে যেতে লাগল।না সে আর ভাবতে পারলো না। এবার জায়েদকে লক্ষ‌্য করে সে বলল,জ্বি আমি আপনার বেশি সময় নেব না আমি শুধু জরুরি একটা কথা বলে চলে যাব।
জ্বি বলুন তবে।জায়েদ বলল।
এবার রেনু বলল,আমার মেয়ের নাম জেরিন।ও অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ে।ও যে কলেজে পড়ে আপনার ছেলেও সেখানে পড়ে।তাতে কোনো সমস‌্যা না এক কলেজে পড়তেই পারে।কিন্তু সমস‌্যা হলো আপনার ছেলের কারণে আমার মেয়ে কলেজে যেতে পারছে না।
রেনুর কথা শুনে জায়েদ বলল,আপনি কিছু মনে না করলে আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই আমার মনে হচ্ছে আপনাকে আমি আগেও কোথায় যেন দেখেছি।আপনার কন্ঠ আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।আসলে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না বা ঠিকভাবে মনে করতে পারছি না আপনাকে আমি কোথায় দেখেছি বা কিভাবে আপনি আমার পরিচিত।আপনি কি আমাকে চেনেন?
না না আমি আপনাকে কিভাবে চিনব।আমি আমার মেয়ের জীবনের নিরাপত্তার জন‌্য আপনার কাছে এসেছি।সে বিষয়ে আপনি কিছু করুন।আর আমরা পরিচিত কিনা সে বিষয় বাদ দিন।রেনু বলে উঠল।
সে বিষয় আমি শুনবো আর এর সমাধানও করবো।কিন্তু আপনার কন্ঠ আমার যে খুব পরিচিত লাগছে।বলুনতো আপনি কে?আপনার নাম কি?আমার খুবই পরিচিত একজন আপনজনের সঙ্গে আপনার কথা বলার ভঙ্গি মিলে যাচ্ছে।প্লিজ আপনার পরিচয়টা দিন।এবার জায়েদ সাহেব রেনুকে বিপাকে ফেলে দিল এ কথা বলে।
রেনুর আর বুঝতে বাকি রইল না এ সেই জায়েদ যে তাকে বিয়ে করতে চেয়েও তার বাবার কারণে পারেনি।এক সময় তাদের ভালোবাসা ছিল কিন্তু জায়েদের বাবা গরীব ঘরের মেয়েকে তার ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিতে চায়নি তাই বাবার কথা মেনে নিয়ে সেও তখন রেনুকে ভুলে গিয়ে আর কাউকে বিয়ে করেছিল।তখন রেনুর ঘৃণা আর রাগ হয়েছিল জগতের সকল ধনী লোকদের প্রতি।কিন্তু তার তো কিছু করার ছিলো না তাই সবকিছু তাকে মেনে নিতে হয়েছিল সময়ের প্রয়োজনে।এই সময়ের প্রয়োজনে মানুষকে কতো কিছু মেনে নিতে হয় তার কোনো হিসেব নিকেষ হয়তো কারো কাছে নেই।
সময়ের স্রোতে ভেসে আজ বহু বছর পর নিজের অজান্তেই রেনুর সাথে দেখা হয়ে গেল জায়েদের।যা তাদের দুজনের কারোর কাম‌্য ছিল না।সময় ভেসে ভেসে কতদূরে চলে গেছে তবুও তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো একে অপরের কাছে এখনো ঠিক সজীব সবুজভাবে তাদের বুকেতে আটকে রয়েছে।যা কখনো ভুলে যাবার নয়।
পুরোপুরি বিপাকে পরে গেল রেনু।এখন সে কিভাবে তার পরিচয় তুলে ধরবে জায়েদের কাছে সেটাই ভাবতে লাগল।সহসা সে বলে উঠল,আমি জেরিনের মা।এটাই আমার পরিচয়।আপনার ছেলে আমার মেয়েকে কলেজে বসে বেশ বিরক্ত করে সেটা আপনি যেন নিষেধ করেন সেই অনুরোধ নিয়ে আমি আপনার কাছে এসেছি আর আমি আশা করি আপনি আমার অনুরোধটুকু রাখবেন।
আমি আপনার মেয়ের কোনো সমস‌্যা হতে দেব না।আপনি চিন্তা করবেন না।আমার ছেলেকে যা করা লাগে আমি তাই করবো কিন্তু তার আগে আমি আপনাকে সঠিকভাবে চিনতে চাই।আমি আপনার পরিচয় জানতে চাচ্ছি।জায়েদ খান বলল।
জায়েদ সাহেবের কথার জবাবে রেনু বলল,দেখুন আমার পরিচয়ের দরকার নাই।আপনি আমাকে নিশ্চিত করুন যে আপনার ছেলে আর আমার মেয়েকে বিরক্ত করবে না আর আমার মেয়ের স্বাভাবিক জীবন যাপনে সে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না তাহলেই আমি উঠে পরবো।দয়া করে আপনি আমাকে এই কথাটুকু দিয়ে চিন্তা মুক্ত করুন।
রেনুর কথা শুনে এবার নিশ্চুপ রইলো জায়েদ সাহেব।সে হয়তো আপনমনে কিছু ভাবতে লাগল।তার পুরানো স্মৃতি থেকে হয়তো সে কিছু খুঁজতে লাগল।তার সামনে বসা নারীকে তার কাছে খুব পরিচিত মনে হচ্ছে তার এক সময়ের খুব আপনজন যাকে সে খুব ভালোবাসতো তার সাথে সবকিছু মিলে যায়।না আর ভাবতে চাইলো না সে তার মন বলছে তার সামনে বসা নারী সে যাকে ভেবেছে সে ই হবে।
রেনুই তার সামনে বসে আছে এমন ধারণা করেই এবার জায়েদ সাহেব বলল,যেহেতু আপনি আমার কাছে নিজের পরিচয় লুকাতে চাচ্ছেন তাই আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার ফেলে আসা আমার খুব কাছের জন আমার রেনুই হবেন।তাই নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাচ্ছেন। আসলে কি হবে তোমাকে লুকিয়ে রেখে বলো, দোষ তো আমারই ছিল,তোমার তো সংকোচ করার কিছু নেই।আমি তখন যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম তাহলে হয়তো আজীবন মনে মনে এতো কষ্ট পেয়ে যেতে হতো না।এতোটুকু বলে সে চুপ করলো।
জায়েদের কথা শুনে চোখে জল এসে গেল রেনুর।সে কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে রইল।সে নিজেকে লুকাতে পারবে না এটা সেও বুঝেছিল কিন্তু তবুও সে চাইছিল যে বিষয়ে সে কথা বলতে এসেছে সে বিষয়ে কথা বলেই সে চলে যাবে।কিন্তু তা আর হলো কই,প্রথমে জায়েদকে দেখে সে ভেবেছিল ঘোমটা টেনে বসলে হয়তো তাকে আর চিনতে পারবে না কিন্তু সেটা আর হলো না।তার কন্ঠ শুনেই তাকে চিনে ফেলল জায়েদ।পুরানো দিনে সে আর ফিরে যেতে চায়নি কিন্তু সেটাই ঘটে গেল।
চোখ মুছে এবার রেনু বলল,আমি যা বলতে এসেছি সেই কথায় মনোযোগ দিন আর কোনো কথা আমি শুনতে চাই না।অহেতুক কোনো কথা আমি বলতে বা শুনতে চাই না।
এবার দুজনেই নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল।এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে তা কোনোদিন ভাবেনি রেনু।তার ভাবনায় কখনো আসেনি যে এইভাবে অনাকাক্ষিতভাবে জায়েদের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যাবে।ভালোবাসা হারানোর কষ্ট সে সহ‌্য করে নিয়েছে বহু বছর আগে কিন্তু সেই পুরানো কষ্ট যে আবার নতুনরুপে দমকা হাওয়ার মতো এসে তাকে ছুঁয়ে যাবে তা সে কখনো ভাবেনি।
এইভাবে সহসা পুরানো স্মৃতি এসে তাকে সহসা দোলা দেবে তা কি সে ভেবেছিল,ভাবেনি কখনো।মনটা তার বেজায় খারাপ হয়ে গেল।এতো কষ্ট করে বৃষ্টিতে ভিজে সে এখানে এসেছিল তার মেয়ের কষ্ট লাঘব করা যায় কিনা তার জন‌্য কিন্তু এখন কি হয়ে গেল সে নিজেই বুঝতে পারছে না। তার নিজের বিরহ এসে নতুন রুপে তাকে আবার ভেঙ্গেচূড়ে দিলো।সে যেন আর কিছু বলতে পারছে না।যেন নতুন করে আবার অগোছালো হয়ে গেছে তার জীবন।অজান্তেই নির্বাক হয়ে গেছে সে।এই সময়ে এসে এখন নিজের মেয়ের কথা ভাবাই তার প্রধান কাজ নিজের সুখ দুঃখের কথা ভাবার সময় এবং ইচ্ছা কোনটাই নাই তার।তবু জমে থাকা দুঃখ এতো বছর পরে এই বৃষ্টিমাখা দিনে তার কাছে এসে তাকে আলিঙ্গন করেছে।যা তার পক্ষে সহ‌্য করা খুবই কষ্টদায়ক।তবু নিজেকে আটকে রেখে সে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো কঠিনভাবে।নিজেকে শাষণ করে নিলো রেনু আর পুরানো কথা যেন না মনে করে সে তার জন‌্য।
এদিকে জায়েদও নিশ্চুপ রইল।এমন অবস্থা সৃষ্টি হবে তার জন‌্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিলো না।তার সঙ্গে দেখা করতে আসা নারী যে তার হারিয়ে ফেলা প্রেমিকা হবে তাতো তার জানা ছিল না।কিন্তু অনাকাক্ষিত ভাবে সেটাই হয়ে গেল।তার চোখের সামনে পুরানো দিনগুলো সব ছায়াছবির মতো ভেসে উঠতে লাগল।রেনুকে সে জীবন দিয়ে ভালোবাসতো,কিন্তু তার বাবার কঠোরতার কারনে তখন সে নিজের উপরে আস্থা রেখে সঠিক ভাবে রেনুকে পাওয়ার জন‌্য ভূমিকা রাখতে পারেনি।সে কষ্ট বুকে রেখেই তাকে জীবনের প্রতিটিক্ষণ কাটাতে হয়েছে।আজ আবার এতো বছর পর তার সাথে যে এভাবে দেখা যাবে তা সে কখনো কোনোদিনও ভাবেনি।তার আবেগ আর অপরাধবোধ তাকে সহসা জড়িয়ে ধরলো।বুকের ভিতর হু হু করে উঠলো , কিন্তু এতো দুঃখবোধ আর কষ্ট এতোদিন পরে তাকে ছুঁয়ে গেলেও তাতে কোনো লাভ নেই।এখন রেনু যা চায় সেটা দিতে পারলেই তার মনে কিছুটা শান্তি হয়তো আসতে পারে।আর ভাবনার গভীরে যেতে চাইল না তার মন।সহসা নিরবতা ভেঙ্গে জায়েদ এবার বলল,
অহেতুক আর কোনো কথা বলব না রেনু।আমি এত বছর পরে যে তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ পেয়েছি তাতেই আমি খুশি। আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও।আমি আসলে তোমাকে ঠকিয়েছিলাম তোমার কোনো দোষ ছিল না।আমিই পারিনি তোমাকে আপন করে নিতে।আমার তখন সাহস ছিলো না যে বাবার বিরুদ্ধে কিছু বলব।আর সে কারনেই আমি বাবার কথা মেনে নিয়ে তোমাকে ভুলে আবিরের মাকে তখন বিয়ে করেছিলাম। আমাকে ক্ষমা করে দিও।আমি পচিশ বছর আগে ঘটে যাওয়া সবকিছুর জন‌্য তোমার কাছে ক্ষমা চাই।
জায়েদের কথার জবাবে রেনু বলল,পুরানো ওসব কথা আর তুলে অহেতুক মন খারাপ করার দরকার নাই।আর যা ঘটে গেছে তা হারিয়ে গেছে এর জন্য ক্ষমা চাওয়ার কোনো দরকার নাই আমি সবকিছু ভুলে গেছি।যা ভাগ্যিস তাই হয়েছে সুতরাং আর পিছন ফিরে আমি তাকাতে চাই না।আমাকে আপনি নানান কথা বলে বিচলিত করবেন না প্লিজ।আমি যে কারনে এসেছি তার একটা সমাধান আমি চাই।আপনার মতো আপনার ছেলেও যেন কোনো মেয়ের জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি না খেলে।দয়া করে সে ব‌্যবস্থাটুকু করবেন।এতটুকু বলে রেনু এবার চুপ করলো।
রেনুর কথায় পুরোপুরি কষ্টের ঝাপ ফুটে উঠেছে তা জায়েদ বুঝতে পারলো।কষ্ট পাওয়া মোটেও অমুলক নয়।যা করেছে সে রেনুর সাথে তাতে কষ্ট পাওয়ার কথাই।কারণ রেনুকে সে বিয়ে করার কথা বলেও সে কথা সে রাখেনি।এমনটা করলে যেকোনো মানুষই কষ্ট পেতে পারে।সুতরাং রেনু তাকে দু চার কঠিন কথা শুনাতেই পারে।এটা জায়েদ সহজেই মেনে নেবে।কেননা ভালোবাসা হারানোর কষ্ট তার বুকেও জমে রয়েছে।সুতরাং সে উপলব্ধি করতে পারছে রেনুর কষ্টগুলো।পুরানো কষ্টের কথা মনে করিয়ে দিয়ে সে আর রেনুকে কষ্ট দিতে চাইল না।
এবার জায়েদ তাকে বলল,আচ্ছা ঠিক আছে তুমি যে কারনে এসেছ তার একটা সমাধান আমি করে দেব তবে এখন আমি এর কোনো সমাধান করে দিতে পারছি না কারন আবির তার মাকে নিয়ে ওর নানা বাড়ি গেছে গতকাল।আজ বিকেলে ওদের আসার কথা। ওরা আসলেই আমি কথা বলে সবকিছু জেনে তোমাকে জানিয়ে দেব।
কোনো সবকিছু জানার দরকার নাই।আমি যা বলেছি তাতে বোঝেননি।আপনার ছেলে আবির আমার মেয়ে জেরিন কে বিরক্ত করে আমি চাই আর সে আমার মেয়েকে কোনো ধরনের ঝামেলায় যেন না ফেলে।আর এটা আপনি করবেন আপনার ছেলে কে আপনি ফিরিয়ে নেবেন।আমি কিন্তু এটা আর সহ‌্য করবো না।আর এটা আপনি করবেন এই কথা আমাকে দিন তাহলে আমি চলে যাব।রাগান্বিত হয়ে এবার রেনু কথাগুলো বলে উঠল।
জায়েদ দেখল রেনু রেগে যাচ্ছে তাই সে এবার আরো নরম হয়ে বলল,ঠিক আছে ঠিক আছে।আমি কথা দিচ্ছি তুমি যা বলছ সেটাই হবে।তোমার মেয়েকে আবির আর বিরক্ত করবে না সে ব‌্যবস্থা আমি করবো।তুমি চিন্তা মুক্ত থাকতে পারো।
জায়েদের কথা শুনে রেনু উঠে পরলো।সে যে কাজে এসেছিল তার একটা সমাধান হয়েছে সুতরাং এখানে তার আর থাকার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই।উঠতে উঠতে রেনু বলল,দেখুন জায়েদ সাহেব আপনার মেহেরবানির জন‌্য আপনার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ থাকব।চললাম তাহলে।
জায়েদ নিশ্চুপ রইল।রেনুকে থামাবার অধিকার এখন তো তার আর নেই।তাই আর কোনো কথা সে বলল না।সে শুধু রেনুর চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল।রেনুও আর পিছন ফিরে তাকাল না।সে বাইরে বের হয়ে এলো।এদিকে বাধা হয়ে দাঁড়াল বৃষ্টি।বৃষ্টি ঝরছে মুষলধারে পথ চলার মতো অবস্থা নেই।রেনু আবার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে রইল।সহসা আবার বাড়ির গেট খুলে গেল।
জায়েদ সাহেবের গাড়ি নিয়ে তার ড্রাইভার বের হলো।রেনুর দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার বলল,আপা গাড়িতে উঠে আসেন আপনাকে স‌্যার বাসায় দিয়ে আসতে বলেছেন।এই বৃষ্টিতে রিক্সা পাবেন না।
রেনু কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে রইল।সে ভাবতে লাগল এভাবে সে জায়েদের গাড়িতে উঠবে কিনা।আসলে সে এখন এমন অবস্থায় পরেছে যে কতোক্ষণে রিক্সা পাবে তার তো কোনো ঠিক নেই আবার গাড়িতে ও তার উঠতে ইচ্ছা করছে না।এভাবে জায়েদের সাহায‌্য সে নিতে চাচ্ছে না কারণ জায়েদের দেয়া কষ্ট সে কিছুতেই ভুলে যেতে পারেনি।এখনো জায়েদের দেয়া কষ্ট তাকে মাঝে মাঝে কাঁদিয়ে থাকে।সুতরাং তার দেয়া কোনো সাহায‌্য তার আর কোনোদিন নেয়ার ইচ্ছে ছিলো না।কি করবে সে ভেবে পাচ্ছে না।সে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল।
এভাবে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এবার ড্রাইভার আবার বলল,আপা অত কি ভাবছেন তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পরেন আর আমাকে বলেন কোনদিকে যাব আপনার বাসা কোন দিকে।
নিজের অজান্তেই যেন পা চলল রেনুর।
সে গাড়িতে উঠে পরলো।কেননা তাকে তো বাড়িতে ফিরতে হবে।আর কখন যে বৃষ্টি থামে তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।সুতরাং অসহায়ের মতো তাকে তাই মেনে নিতে হলো যা সে করতে চাইছিল না।
রেনু গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভার জায়েদকে মোবাইলে কল করে বলল,স‌্যার ম‌্যাডাম গাড়িতে উঠেছেন আমি তাকে তার বাসায় নিয়ে যাচ্ছি।
ওপাশ থেকে জায়েদ কি বলল রেনু তা আর শুনতে পেল না।সে ড্রাইভারকে গাড়ি আস্তে চালানোর জন‌্য বলে দিল।
জ্বি আচ্ছা বলে ড্রাইভার গাড়ি চালাতে লাগল আর রেনুর কাছ থেকে জেনে নিলো তার বাসা কোনদিকে তার ঠিকানা।
ড্রাইভারকে পথের নির্দেশনা দিয়ে এবার নিশ্চুপ বসে রেনু মনে মনে তার জীবনে ঘটে যাওয়া পিছনের ঘটনাগুলো স্মৃতিচারণ করতে লাগল।বিশেষ করে শেষের দিকে ঘটে যাওয়া জায়েদের সঙ্গে তার দুঃখের দিনগুলো বেশি করে তার মনে পরতে লাগল। সে কখনো ভাবেনি যে জায়েদকে তাকে ছাড়তে হবে।সবসময় সে ভাবতো তার বিয়ে জায়েদের সঙ্গেই হবে।কিন্তু তা হলো না,জায়েদের ভুলের কারণে তাকে আর তার পাওয়া হয়নি।কিন্তু তার দুভার্গ‌্য যে আবার এতো বছর পরে সেই জায়েদের ছেলের কারণে আবার তার সঙ্গে তার দেখা হয়ে গেল।কোনোদিন এমনটা আসা করেনি সে।কারণ যা হারিয়ে গেছে তাকে সে আর কোনোদিন নিজের সীমানার কাছে দেখতেও চায়নি।কিন্তু মানুষ যা না চায় তাই যেন ঘটে তার জীবনে বারবার।আর অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে রেনুর জীবনেও এমনটা ঘটল। সে কোনোদিন ভাবেনি তার মেয়ের পিছনে জায়েদের ছেলে এভাবে উঠে পরে লেগে যাবে।যাহোক এর একটা সমাধান তো সে করে এসেছে সুতরাং সে আর এটা নিয়ে ভাবতে চাচ্ছে না।
প্রায় চল্লিশ মিনিট কেটে গেল।ড্রাইভার রেনুর বাসায় এসে পৌঁছে গেল।রেনু তাকে চা খাওয়ার জন‌্য বলল কিন্তু বৃষ্টির কারণে সে আর গাড়ি থেকে নামল না।পরে কোনো এক সময় খাওয়া যাবে বলে সে গাড়ি ঘুরিয়ে নিজের পথে ফিরে চলল।
রেনু বাসায় ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল।তারপরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু মেয়ের কাছে খুলে বলল।কিন্তু লুকিয়ে রাখল তার আর জায়েদের আগে থেকেই চেনা জানার কথাটি।
জেরিন শুধু তার মার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিলো যে আবির তাকে আর বিরক্ত করবে না।এটাই জেরিনের চাওয়া ছিলো আর সেটাই হয়েছে জেনে সে মনে মনে খুশি হলো।
পরদিন সে শান্তি মতো কলেজ থেকে ফিরে এসে তার মাকে বলল,মা তোমার কথায় কাজ হয়েছে আবির আজকে আমাকে কোনো কথাই বলেনি।অনেক ধন‌্যবাদ তোমাকে মা।
ঠিক আছে এবার মন দিয়ে লেখাপড়া কর।আশা করি আর কোনো ঝামেলা হবে না।রেনু তার মেয়েকে নিশ্চিন্ত করে বলল।

এক সপ্তাহ কেটে গেল।
রেনু আর তার মেয়ে জেরিন আনন্দের সঙ্গে জীবনযাপন শুরু করছিল আর আবিরের বিষয়টা সম্পূর্ণ ভুলে গেছিল।কলেজে আবিরের সঙ্গে জেরিনের দেখা হয় ঠিকই কিন্তু তাদের মাঝে কোনো কথা হয় না।তাই সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে এমনটাই ভেবে নিয়েছিল রেনু।
গতকাল রাত থেকে বৃষ্টি ঝরছিল।সকালেও তার রেষ রয়ে গেছে। থেমে থেমে বৃষ্টি পরছে আর এর মধ‌্যেই সহসা জায়েদ সাহেবের গাড়ি এসে রেনুর বাসার সামনে থামল।
গাড়ির শব্দ শুনে জেরিন তার মাকে বলল, মা কে যেন এসেছে দেখ আমাদের বাসার সামনে একটা গাড়ি থেমেছে।
রেনু বলল,তাইতো দেখছি।দরজা খুলে দেখ কে এসেছে।
জেরিন দরজা খুলে দিল।
গাড়ি থেকে আবির আর তার বাবা মা নেমে এলো।তারা একটু বৃষ্টিতে ভিজে জেরিনের বাসার ভিতরে প্রবেশ করলো।তাদেরকে জেরিন সালাম দিয়ে সামনের রুমে বসতে বলে ভিতরে চলে গেল।
রেনু যা স্বপ্নেও ভাবেনি তাই হলো।তার মেয়ে জেরিনকে আবিরের মা তার ছেলের জন‌্য বউ হিসেবে পেতে চায় তার প্রস্তাব নিয়ে এলো।রেনু কি করবে এখন।সে ভাবতে পারছে না।তার মন চায় না বলে দিতে কারণ জায়েদের সঙ্গে সে আর কোনো সম্পর্ক সৃষ্টি করতে চায় না।কিন্তু মেয়ের কথা ভাবলে সে আবার রাজি হতে চায় কারণ এটা তার মেয়ের জন‌্য খুব ভালো প্রস্তাব।
কি করবে সে ভাবতে লাগল।
তাকে আর বেশি ভাবতে দিল না আবিরের মা।সে বলল,বসে ভাববেন বেয়াইন রান্না বসাবেন না।আমরা কিন্তু দুপুরে খেয়ে যাব।আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না।
কি যে বলেন।আপনারা বসুন আমি নাস্তা দিচ্ছি আগে।রেনু এতটুকু বলে ভিতরে চলে গেল।
বাহিরে বৃষ্টি হচ্ছে আর মনের মাঝে বরিষণ বইছে রেনুর।সে মেয়ের কথা ভেবে আর না করতে পারল না।খুশিমনে পিছনের সবকিছু ভুলে গিয়ে জায়েদের পরিবারের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টিতে মত দিয়ে দিল।
রিমঝিম বৃষ্টিতে বুকে বিরহ নিয়ে নতুন করে আবার বিরহ ভুলে যাওয়ার প্রত‌্যয়ে রেনুর মন নেচে উঠল।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
Md.Maidul Sarker হ্যাপি এন্ডিং এর জন্য গল্পটা ভালো লাগলো।
ফয়সল সৈয়দ সুন্দর উপস্থাপনা। রেণু আর জায়েদের মধ্যে প্রেমের টানাপোড়েন, এবং গল্পের শেষে ইতিবাচক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে ইতি টানা হয়েছে; সন্তোষজনক। কিছু অসর্তকমুলক ভুল ছিল; দারোয়ান শব্দটি ভুল। বাক্যের শেষে দাড়ি(।) এবং আরেক বাক্যে শুরুর করার আগে স্পেস ব্যবহার করা হয়নি। শুভ কামনা রইল। ভালো থাকবেন।
শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান অনেক অনেক ধন্যবাদ সুন্দর মন্তব্যের জন্য। শুভ কামনা রইল।
ফয়জুল মহী সুন্দর লেখা এবং শব্দ বুনন চমৎকার লাগলো
শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান অশেষ ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। শুভেচ্ছা রইল।

২২ জানুয়ারী - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "উষ্ণতা”
কবিতার বিষয় "উষ্ণতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ডিসেম্বর,২০২১