বীরাঙ্গনা রুপালী

স্বাধীনতা সংখ্যা

শরীফ মুহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান
  • ২২০
একাত্তর সাল।বাঙালি জাতি নিজেদের স্বাধীনতা অর্জনের তরে মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত।পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের সহকারি রাজাকার বাহিনী দেশের গ্রামে গ্রামে প্রবেশ করে নিরীহ বাঙালিদেরকে নির্বিচারে খুন করে যাচ্ছিল।আর রাজাকার বাহিনী তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছিল মানুষের ঘর বাড়ি আগুন দিয়ে পোড়াতে ,নারীদেরকে নির্যাতন করার কাজে।তেমনি চারিদিকে নদী দিয়ে ঘেরা সোনাপুর গ্রামেও পাকবাহিনী প্রবেশ করলো আর রাজাকার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে চারিদিকে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিল।
সোনাপুর গ্রামে পাকবাহিনী প্রবেশ করে রাজাকার বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে তারা ঘাটি স্থাপন করে নিল।প্রতিটি কাজে তারা রাজাকার নেতা সুলতান খলিফার সহযোগিতা নিতে লাগল।
পাক বাহিনী সুলতান খলিফার বুদ্ধি মতো একেক দিন গ্রামের একেক এলাকায় আগুন জ্বালিয়ে দিতে লাগল আর মুক্তিসেনাদের খুঁজতে লাগল।তারা গ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে দশ বারো জন যুবতী মেয়েকে ধরে এনে আটকে রাখল।প্রতি রাতে তারা পাকবাহিনী সেনাদের দ্বারা নির্যাতিত হতে লাগল।তাদের মাঝে একজন রুপালী।তারা চেহারা ছবি সবার চেয়ে ভালো ছিল।তাই প্রতি রাতে তাকে সবার চেয়ে বেশি নির্যাতন সহ‌্য করতে হতো।সে মনে মনে আল্লাহ্ কে ডাকতো আর এই পিশাচদের কাছ থেকে মুক্তির জন‌্য দরখাস্ত করতো।
কিভাবে এই হানাদার বাহিনীকে শেষ করে দেয়া যায় তাই ভাবতে লাগল রুপালী।প্রতিদিন রাতেই মেয়েদের সংখ‌্যা বাড়তে লাগল পাকিস্তানি ক‌্যাম্পে।সে আর এই নিদারুণ কষ্ট দেখতে পারছে না। সে পথ খুঁজতে লাগল কিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর দেয়া যায় এই পাক ঘাটির।মুক্তিযোদ্ধারা এই গ্রামে হয়তো প্রবেশ করেছে কিন্তু তারা এই ঘাটিতে আক্রমনের সুযোগ পাচ্ছে না।তাদেরকে সঠিক আক্রমনের সময় জানিয়ে দিতে পারলেই এই গ্রামের মানুষগুলো হয়তো রক্ষা পেত এই জানোয়ারদের হাত থেকে।
ভাবনা অনুযায়ি কাজ শুরু করে দিল রুপালী।সে গোপনে পাক এক সেনার একটা ছুরি নিয়ে নিল।মনে মনে একটা প্লান করে নিল সে।রাজাকার নেতা সুলতান খলিফাকে টার্গেট করলো সে।সুলতান খলিফার আসার পথ চেয়ে রইল রুপালী।
প্রতিদিন রাতেই আসে পাষন্ড খুনিটা আর পাকিস্তানি বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে বাঙালিদের খুনের নীল নকশা সাজায় হারামিটা।তার অপেক্ষাই আজ রইল রুপালী।সে পথ চেয়ে রইল সুলতান খলিফার।
রাত দশটার পরে এলো সুলতান খলিফা।তাকে দেখে মনে মনে খুশি হলো রুপালী।সে সুলতান খলিফার কাছাকাছি থাকতে লাগল।সুলতান খলিফা বুঝতে পারল রুপালী তাকে কিছু বলতে চাচ্ছে।সে সরাসরি রুপালীকে বলল,এই ছেমরি তুই কিছু কইতে চাস।
জবাবে রুপালি বলল, একটু আড়ালে গেলে একখান কথা কইতাম।
যা ঐ পাশে গিয়া খাড়া আমি আইতাছি।সুলতান খলিফা রুপালীকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াতে বলল।
সবার চোখের আড়ালে ক‌্যাম্পের এক কোনায় একটু অন্ধকারে গিয়ে রুপালী দাঁড়িয়ে রইল সুলতান খলিফার আসার অপেক্ষায়।একটু অপেক্ষা করতেই সুলতান খলিফা এসে তাকে বলল,এই ছেমরি কি কবি তাড়াতাড়ি ক,হাতে সময় নাই।বাড়ি যাইতে হইবে।ঐ দিকে নাকি মুক্তিবাহিনী আইসা গেছে,ওরা আবার আমার বাড়িতে যদি আক্রমন কইরা বসে।
রুপালী মনে মনে বলল, খুব ভালো হয় তোর বাড়ি আক্রমন করলে।তুই তো ধ্বংস হইবিই শুয়োরের বাচ্চা।
রুপালীকে চুপ থাকতে দেখে একটু রেগে গেল সুলতান খলিফা। সে এবার রাগতস্বরে বলল,ঐ ছেমরি মশকরা করো কি কবি ক আমার সময় নাই।
এবার রুপালী বলল,না কইছিলাম কি মর্দান কি পাকিস্তানিদের ই আছে সুলতান খলিফাদের কি কিছু নাই।নাকি তারা হিজড়া।
রুপালীর কথা শুনে খেপে গেল সুলতান খলিফা। সে বলল, তুই কি কইলি ছেমরি।তুই আমার পুরুষত্ব দেখতে চাস।
সুযোগ পাইলে দেখতাম আর কি।এই সাত মাস তো পাকিস্তানিদেরকে আনন্দ দিলাম আজ রাতে সুযোগ দিলে সুতলান খলিফা সাহেবকে একটু ফূর্তি দিয়ে খুশি করতে চাই আর কি।কি কন রাজাকার সাব।রুপালী খোঁচা দিয়ে বলল সুলতান খলিফাকে।
এবার রুপালীর কথা শুনে একটু মুচকি হাসি দিল সুলতান খলিফা।সে বলল, ও এই কথা আজ আমার রাতের রানী হতে চাস তুই।
রুপালী বলল,ঠিক কইছেন জনাব।
কিন্তু তোকে তো অনুমতি ছাড়া নেয়া যাবে না।আচ্ছা তুই এইখানেই খাড়া।আমি কমান্ডারের কাছে অনুমতি নিয়া আসি।সুলতান খলিফা অনুমতি নেবার জন‌্য ভিতরে চলে গেল।
রুপালী অপেক্ষা করতে লাগল আর আল্লাহ্ আল্লাহ্ করতে লাগল যেন তাকে নিয়ে যাবার অনুমতি পায় সুলতান খলিফা।আর তার মনের ইচ্ছা পূরণে আল্লাহ্ তাকে যেন সাহায‌্য করে।তার এ জীবন তো শেষ হয়ে গেল রাজাকার আর পাক বাহিনীর কারণে।এবার সে এই বাহিনীদেরকে শেষ করে দিয়ে দেশের জন‌্য কিছু করে দিয়ে যেতে পারে যেন এটাই তার মনের শেষ ইচ্ছা।
এদিকে সুলতান খলিফার কথা শুনে রেগে গেল ক‌্যাম্প কমান্ডার।সে বলল,সেটা হতে পারে না সুলতান।তুমি আমার রাতের আরাম কেড়ে নিতে চাও।এর বদলে আর কোনো সুন্দরীকে না দিলে তুমি ওকে আজ রাতে নিতে পারবে না।
সুলতান খলিফা কুট বুদ্ধির অধিকারি।সে বলল,কিন্তু কমান্ডার সাহেব ওর একজন খুবই সুন্দরী বান্ধবি আছে তাকে তো আপনার জন‌্য নিয়ে আসতে হবে আর ওকে সাথে নিয়ে না গেলে আমরা তো ঐ সুন্দরীকে পাব না।আর আপনিও একজন সুন্দরীর রুপ উপভোগ করা থেকে বঞ্চিত হবেন।তাই রুপালীকে আমার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
ও এই কথা।খুব ভালো খুব ভালো।তা ঐ নতুন সুন্দরীকে আমি কালকে রাতে পাচ্ছি তো।কমান্ডার এবার খুশি হয়ে বলে উঠল।
সুলতান খলিফা বলল,জ্বি হুজুর।আমি তো সে কারণেই রুপালীকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি।আপনি অনুমতি দিলে কাল রাতে আরেক নতুন রানীকে নিয়ে আপনি রাত কাটাতে পারবেন।
যাও সুলতান তাহলে দেরি করছো কেন।কমান্ডার এবার রুপালীকে ক‌্যাম্প থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল।
খুশি মনে সুলতান খলিফা এবার বাইরে বেড়িয়ে এল।আগত খুশির চিন্তায় সে বেদিশা হয়ে গেল।দ্রুত বাইরে এসে সে রুপালীর হাত ধরে বলল,চল ছেমরি তোরে নিয়া যাওয়ার অনুমতি পাইছি।তয় কাইল রাইতে তোর মতো আর কোনো একজন সুন্দরীকে কমান্ডারের জন‌্য নিয়ে আসতে হবে।সে যাই হোক,সেটা কাল ভাইবা দেখমু কারে ধইরা আনা যায়।আজ রাইতে তো তোরে পাইছি এবার চল আমার বাগান বাড়িতে যাই তুই আজ সারা রাত আমারে আনন্দ দিবি।
চলেন তাইলে দেরি করছেন কেন।রুপালী তাগাদা দিয়ে সুলতান খলিফাকে বলল।
ক‌্যাম্প থেকে বের হয়ে দুজনে হাঁটতে লাগল।সুলতান খলিফা অনাগত সুখের আশায় মনে মনে খুশি হয়ে পথ চলতে লাগল।সে সামনে সামনে হাঁটছে আর তার পিছু পিছু পথ চলছে রুপালী।মনে মনে সুলতান খলিফা বলল, আহরে কতদিন মন চাইছিল রুপালীর মতো কোনো সুন্দরীকে নিয়ে জীবন কাটাই কিন্তু তাতো আর হয়নি।এবার এক রাতের জন‌্য হলেও রুপালীর মতো এমন নারীকে তো কাছে পাচ্ছি ভাবতেই আমার ভালো লাগছে।কেন যে এতোদিন আমার মাথায় এ বুদ্ধিটা এলো না।তাইলে তো ওরে আরো আগেই কাছে পেতাম।মেয়েটা আমার মনের কথা নিজেই বলল যা আমি পাক বাহিনীর ভয়ে বলতে পারি নি।যাক আজ রাতে তো আমি ওকে নিয়ে সুখে কাটাবো।
হাঁটতে হাঁটতে এবার সুলতান খলিফা রুপালীকে তাগাদা দিয়ে বলল,ঐ ছেমরি তাড়াতাড়ি পা ফেল।আমাদের দেরী হইয়া যাইতেছে।রাত তো অর্ধেক হইয়া গেল।
জবাবে রুপালী বলল,হুম তাড়াতাড়ি ই তো হাঁটছি।
একটু থেমে এবার রুপালী মনে মনে বলল,আরে কুত্তার বাচ্চা তুই তো জানস না সঙ্গে কারে নিয়া যাইতেছস।তোর মউত তো সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে।তাড়া দিস না তাইলে তোর সময়ই কইমা যাইব।
আধা ঘন্টা হাঁটার পর সুলতান খলিফার বাগান বাড়িতে এসে পৌঁছল তারা।দ্রুত সুলতান খলিফা রুপালীকে নিয়ে বিছানায় যেতে চাইল।রুপালী তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,সারা রাইত ই তো থাকমু অত উতলা হইছেন কেন।
সুলতান খলিফা বলল,আমার আর সহ‌্য হচ্ছে না।
একটু সবুর করেন।আমারে রেডি হইতে দেন।রুপালী বলল।
বেশি দেরি করতে ভালো লাগছে না রুপালী,তুই এমন করছিস কেন ক তো।সুলতান খলিফা তাগাদা দিয়ে বলল।
রুপালী নিশ্চুপ রইল।নানান তালবাহানা করে সে রাত পার করে দিতে লাগল।শেষে সুলতান খলিফা জোড়াজুড়ি শুরু করে দিল তার সঙ্গে আর সুযোগ পেয়ে গেল রুপালী।
তখন ভোর রাত হয়ে গেছে।সহসা সুলতান খলিফার বাগান বাড়ি থেকে মানুষের একটা আওয়াজ শোনা গেল।ইচ্ছে মতো ছুরি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে অবশেষে নিশ্চুপ হলো রুপালী।একবার ই সুলতান খলিফা চিৎকার করতে পারছিল।আর তারপরে সব শেষ।কোনো সুযোগ ই দেয়নি রুপালী হারামীটাকে।মনের সব কষ্ট ঢেলে দিয়ে ইচ্ছেমতো কুপিয়ে মেরে ফেলল সে রাজাকারটাকে।
ভোরের হালকা আলোতে রক্তমাখা রুপালী বাগানের ভিতর থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলো।তখনো ঠিক ভাবে আলো ফোটেনি।সে আস্তে আস্তে হেঁটে নদীর পাড়ে চলে এলো।নদীর পানিতে সে ছুরিটা ধুঁয়ে নিল আর ধুঁয়ে নিল নিজের রক্ত মাখা জামাটা।তার ভালো লাগছিল, মনের ভিতরে সে প্রশান্তি অনুভব করতে লাগল।চারিদিকে তাকিয়ে সে দেখল কোথাও কেউ নেই।
কোথাও কাউকে না দেখে সে এবার নদীর পাড়েই শরীরটা এলিয়ে দিল।নিজের অজান্তেই সে ঘুমিয়ে পরলো।
ঘুম ভেঙ্গে রুপালী নিজেকে আবিষ্কার করলো বনের ভিতরে।সে চোখ খুলে দেখল চারিদিকে বাগান।সারি সারি গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে।তার চারপাশে অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন।রুপালী কোমরে হাত দিয়ে দেখল তার ছুরিটা জায়গা মতোই আছে।সে এবার ছুরিটা হাতে নিয়ে উঠে বসে বলল,তোমরা কারা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছ কেন।
রুপালীর কথা শুনে তাদের মাঝে একজন বলল,তুমি শান্ত হও।আমরা তোমার কোনো ক্ষতি করবো না।আমরা মুক্তিযোদ্ধা।এবার বলো তুমি কে? নদীর পাড়ে ঐভাবে ঘুমিয়ে ছিলে কেন?তোমার কি কোনো ভয় নেই।দেশে যুদ্ধ চলছে তুমি জানো না।আর এই ছুরি পেলে কোথায়?
মুচকি হাসি দিয়ে এবার রুপালী বলল,আমি রুপালী আমার কোনো ভয় নেই।আর এই ছুরিটা পাক বাহিনীর কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।আর এই ছুরি দিয়েই আমি কুলাঙ্গার সুলতান খলিফাকে খুন করেছি।আর তারপরে আমি নদীর পাড় গিয়ে একটু ধোঁয়ামোছা করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
রুপালীর কথা শুনে সবাই চমকে উঠল।তারা জেনে গিয়েছিল কারা যেন রাজাকার সুলতান খলিফাকে খুন করেছে।কিন্তু সেই খুনি যে তাদের সম্মুখে এখন রয়েছে আর তাকেই তারা একদিন আগে এখানে নদীর পাড় থেকে নিয়ে এসেছে তা তারা বুঝতে পারেনি।
এবার সবাই মিলে রুপালীকে স‌্যালুট করল।
মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা এবার রুপালীকে বলল,বোন আপনি এই গ্রামের সবচেয়ে বড় রাজাকার কে হত‌্যা করেছেন।আপনিও আমাদের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা।আমরা ওই রাজাকার কে খুন করার জন‌্য খুঁজতে ছিলাম,কালকে গ্রামে প্রবেশ করেই আমরা শুনি ওকে কে যেন মেরে ফেলেছে।আপনি পুরো একদিন ঘুমিয়ে ছিলেন।তাই আপনি আমাদের উপস্থিতি টের পান নি।যাই হোক আমাদের এবারের টার্গেট হচ্ছে ওদের ক‌্যাম্প উড়িয়ে দেয়া।আপনি সম্ভবতঃ এ গ্রামের মেয়ে এ ব‌্যাপারে আমাদের একটু সাহায‌্য করতে পারবেন নিশ্চয়।
মুক্তিযোদ্ধাদের নেতার কথা শুনে একটু মুচকি হাসল রুপালী।
তার হাসি দেখে সে রুপালীর কাছে জানতে চাইল,আপনি হাসলেন যে বোন।
এবার রুপালী বলল,আপনি জানেন না আমার এবারের টার্গেট ছিল আপনাদের খুঁজে বের করা।কারণ আমিও চাই ওদের ধ্বংস।কিন্তু না খুঁজতেই আমি আপনাদের দেখা পেয়ে গেলাম।আল্লাহ্ আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন।
তাহলে ওদের ক‌্যাম্পটা আপনি চেনেন মনে হচ্ছে।আপনি কিভাবে ঐ দুর্ধর্ষ রাজাকারটাকে মেরে ফেললেন বোন একটু বলবেন।মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা এবার রুপালীর কাছে জানতে চাইল।
জবাবে রুপালী বলল,সে অনেক কথা আমি সবকিছু খুলে বলছি আপনারা শুনুন।এতটুকু বলে রুপালী তার যুদ্ধের শুরু থেকে পাকবাহিনীর ক‌্যাম্পে এই সাত মাস ধরে বন্ধি থেকে নির্যাতিত হওয়ার এবং কিভাবে রাজাকার সুলতান খলিফাকে প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে এসে খুন করেছে সবকিছু খুলে বলল।
রুপালীর সব কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা দাঁড়িয়ে তার পুরো দলকে বলল, দল এই বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধাকে সবাই আবার স‌্যালুট করুন।এ ই হলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা যে আমাদের মতো জীবনের তোয়াক্কা না করে দেশের কারণে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন।
সবাই আবার দাঁড়িয়ে রুপালীকে স‌্যালুট করলো।
রুপালী এবার নিজের চোখ মুছল।সে নিশ্চুপ আর সব মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে লাগল।
মুক্তিযোদ্ধাদের একজন বলে উঠল,তাহলে আজ বিকেলেই আমরা ঐ ক‌্যাম্পটাকে উড়িয়ে দিচ্ছি না কেন।
আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা বলল,আমারও মনে হয় দ্রুতই ওদের শেষ করে দেই আমরা।আমার মনে হয় আর দেরি করে লাভ হবে না।ওদেরকে শেষ করে দিতে পারলেই আমি একটু শান্তি পাব।
মুক্তিযোদ্ধাদের কথা শুনে এবার রুপালী বলল,না আমরা বিকেলে ওদেরকে আক্রমন করবো না।
রুপালীর কথা শুনে চমকে উঠল সবাই।তারা সবাই তাদের নেতার দিকে তাকাল।তাদের নেতা তাদেরকে বলল,এ বিষয়ে রুপালী আপার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।এবারের মিশনে সে ই আমাদের নেতা।আমরা তার কথাই মাথা পেতে মেনে নেব।সুতারং সবাই নেতার হুকুম মেনে চলুন।আচ্ছা আপা আপনি আমাদেরকে বলুন আমরা কখন এবারের মিশনে যাব।
এবার রুপালী বলল,আমরা যেকোনো দিন ভোরবেলা ওদেরকে আক্রমন করতে পারি।কেননা প্রতিদিন মাঝ রাত পর্যন্ত ওরা বেশিরভাগ দিন ই আনন্দ ফূর্তি করে কাটায়।আর ভোরবেলা ঘুমিয়ে থাকে।সুতরাং যদি ভোরবেলা আমরা ওদেরকে আক্রমন করি তাহলে ওরা ঘুচিয়ে উঠতে পারবে না।আর আমরা এই যুদ্ধে বিজয়ী হবো।অতএব ভোরবেলা আক্রমন করা আমাদের জন‌্য সুবিধাজনক হবে।সকাল ছয়টা সাতটার মাঝে যেকোনো সময় আমরা ওদের ওপরে ঝাপিয়ে পরতে পারি।
ঠিক আছে তাহলে কালকেই আমরা মিশনে যাচ্ছি।তোমরা সবাই তৈরি থেক।আপা আমাদেরকে যেভাবে নিয়ে যাবে আমরা সেভাবেই এগিয়ে যাব।মুক্তিযোদ্ধাদের নেতা সবাইকে লক্ষ‌্য করে বলল।
পরদিন সকাল ছয়টায় পনের জনের মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল রুপালীর নেতৃত্বে পাকবাহিনীর ওপরে ঝাপিয়ে পরলো।সহসা আক্রমনের কারণে পাকবাহিনী আর ঘুচিয়ে উঠতে পারলো না।তারা অসহায়ের মতো যুদ্ধে পরাজিত হলো।
এক এক জন করে সবগুলোকে মেরে ফেলল মুক্তিযোদ্ধারা।যে কয়জন রাজাকার সেখানে ছিল তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমন থেকে রেহাই পেল না।তারাও সদলবলে নিহত হলো।মুক্তিযোদ্ধাদের একজন নিহত হলো।আর রুপালীসহ দুইজন গুলিবিদ্ধ হলো।
যুদ্ধ শেষে তারা গুলিবিদ্ধ দুইজনের চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করতে লাগল।কিন্তু রুপালীর অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে লাগল।সে আর তেমনভাবে ফিরে আসলো না।অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারলো সে নিজেও।তাই সবাইকে লক্ষ‌্য করে সে বলল,প্রতিটি যুদ্ধে কিছু না কিছু হারাতে হয় ই।সুতরাং আপনারা কেউই ঘাবড়ে যাবেন না।আমি বোধহয় আর আপনাদের মাঝে থাকতে পারছি না,যাবার আগে সবাইকে একটা অনুরোধ করে যাচ্ছি সবাই আমাকে কথা দিন যুদ্ধ শেষে আপনারা যদি কেউ বেঁচে থাকেন তবে আপনারা কেউ এই অসহায় বোনটার কথা কাউকে কখনো গল্পছলেও বলবেন না।কারণ এই নোংরা জীবনের কথা আমি কাউকে জানতে দিতে চাই না।আমাকে আপনারা কথা দিন।
রুপালীর কথা শুনে চোখ মুছল সবাই।
তাদের নেতা এবার রুপালীর কথার জবাবে বলল,এ কি কথা বলছেন আপনি বোন।আপনার জীবন নোংরা হতে যাবে কেন।আপনি তো বীরাঙ্গনা,একজন শ্রেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা।আপনার আসন চিরকাল সন্মানের স্তরে থেকে যাবে।যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে অনেক কিছুই হতে পারে তাতে আপনার কোনো দোষ নেই।আপনি এবং আপনার জীবন নোংরা নয়।আপনি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান।
নেতার কথা শুনে রুপালী বলল,আমি এতকিছু বুঝি না।আপনারা আমাকে কথা দিন আমার কথা রাখবেন।
এবার সবাই একযোগে বলে উঠল,আমরা আপনাকে কথা দিলাম আপনার কথা আমরা রাখব।
সকলের সম্মতিসূচক কথা শুনে একটু মুচকি হাসল বীরাঙ্গনা রুপালী।তারপরে চোখ বুঝল সে।তাকে আর শত ডেকেও মুক্তিযোদ্ধারা খুঁজে পেল না।একজন বীরাঙ্গনা নারী তার বীরত্বের ছোঁয়া রেখে দেশের তরে জীবন দান করে চলে গেল নীরবেই।
মুক্তিযোদ্ধারা্ এবার বীরাঙ্গনা রুপালীর নিথর দেহটাকেই স‌্যালুট দিল।



আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
মাইনুল ইসলাম আলিফ খুব ভালো লাগল।ভোট রইল। আমার পাতায় আমন্ত্রণ।
ফয়জুল মহী সাবলীল সুন্দর উপস্থাপন । ,বেশ ভালো লাগলো ।

লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

একজন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার কাহিনী বিবৃত হয়েছে এই গল্পে।

২২ জানুয়ারী - ২০১৭ গল্প/কবিতা: ২ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "উষ্ণতা”
কবিতার বিষয় "উষ্ণতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ডিসেম্বর,২০২১