১)
কি সুন্দর! আহা কি চমৎকার!! আমি একদম অতৃপ্ত ছিলাম না, তৃপ্ত শব্দটাকে কেন্দ্র করে নিডেল সানগ্লাস চোখে দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম।
বোধ হয় না আমি হেসেছিলাম কি না। মনে হয় দু'ঠোটকে ফাঁক করে হাসিটা একদম গুম হয়ে গিয়েছিল! কিঞ্চিত জানা ছিল না যে, পাথরের বুক ছিড়ে ফুটে উঠা ফুলও একদিন পাথর হয়ে যাবে। সেই শ্রাবণ, সেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি কেমন করে যেন একটা মনকে শার্সিত জানালার গ্রিল বেয়ে রেটিনার অতল গহ্বরে সৃষ্টি হওয়া সমুদ্রকে আজন্ম সমুদ্র বানিয়ে দিবে। বিশ্বাস করুন অনুদিতা, আমি তখন সমুদ্রে সাঁতার কাটছি। আমার স্মৃতি তখন এক একটা অন্ধকার কারাগারে রেখে বিষধর সাঁপের মতো আমাকে আঘাত করেছে। আর আমি নিশ্চুপ ফুলদানির ভিতর থেকে ঝুঁটিবাঁধা কাঁশফুলটা হাতে নিয়ে যেন বার্নিং আইচের উপর দাঁড়িয়ে আছি। আপনার অনুকূল, আপনার প্রতীক্ষার ঘোর যেন এতোটাই ভূমিকম্প ছিল আমার কাছে। অতঃপর আপনার শেষ মেসেজের অপেক্ষায় আমার এ রাত্রি, এ দিন.... সব একাকার করে দিয়েছি!

(২) কয়েকটা দিন পেরিয়ে যায়। ক্রমে বাড়িয়ে উঠে আপনার উপেক্ষা, আর আমার অপেক্ষা। হয় তো ঘুমিয়ে গেছে আপনার মনের ভিতর জাগিয়ে তোলা সে স্বপ্নগুলো কিংবা আপনিও। আপনার উপহাসকে উপসর্গ ভেবে নিজেকে সংগোপন করেছিলাম। ইতস্তত আপনার কাছে সব একেবারে অচেনা, অজানা। কিন্তু আমার এ হৃদয়ের স্পন্দন প্রতিনিয়ত ব্যারোমিটারের মতো উঠানামা করেছিল। আমি একদম ভুলতে পারি না, ভুলে যাওয়া শব্দটা যেন কোটি পর্দা বেধ করে আমার হাতে গীটার বাজিয়ে তুলে। বিশ্বাস করুন অনুদিতা, এই দু'চোখ যেন তখন এক আলোকবিন্দু ক্যামেরার ভিতর ফটোগ্রাফিক করে নতুন ফিতায় যুক্ত করে। এই দীঘল পথ আর আমার কাছের প্রিয়জন চাঁদও যেন বিন্দু বিন্দু করে আপনাকে আমার কাছে সাজিয়ে তুলে। আপনার কাছে আমার কিঞ্চিত পরিমাণ অভিযোগ কিংবা অনুযোগ নেই, তবে আপনার এতো সুন্দর পরিস্থিতির কাছে আমি যে নির্ভুল একটা উপহাসের পাত্র ছিলাম তাতে মোটেও সন্দেহ নেই। আপনি যতটাই ভেবেছিলেন না কেন, এই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতম অপেক্ষায় ছিল আমার দীর্ঘশ্বাস। আপনি চালকলা ভেবে নিজেকে সংগোপন করতে চেয়েছেন, কিন্তু আপনার চালকলাকে আমি কখনো চাকলাও ভেবে দেখিনি। আমি এ ও বলতে পারি- আমার এক একটা বিষণ্নতার শহর ছিল, আপনার এক একটা কাল্পনিক স্পর্শতা.....
আচ্ছা অনুদিতা, তবুও কি আপনাকে ভুলে থাকতে পেরেছি?

৩)
এর ভিতরেও পেরিয়ে যায় আপনার অনেকটা দিন। খোঁজ, খবর কিছু নেই। আপনি মনে হয় ভুলে গিয়েছেন ক্যালেন্ডারে আঁকা দিনগুলির কথা। আচ্ছা স্বপ্নের মাঝেও লাল কালি দিয়ে গোলাকার কিছু তারিখ দাগানো থাকে, হয় তো তাও আজ আপনার কাছে অজানা। জানিনা স্মৃতিস্তম্ভ করা সেইদিনগুলি কিভাবে ভুলে থাকা যায়। পরিবর্তন হয় পথের। পরিবর্তন নেই শুধু হৃদয়ের। তবুও আশার ভিতরে একটা প্রদীপ ছিল। আপনি আসবেন কিংবা ভুলগুলো শুধরানোর জন্য আপোষ হবেন।

একদিন রক্তিম সূর্যটা পশমি মেঘের দ্বীপপুঞ্জ এলিয়ে ঝিকঝিক করে উঠতে শুরু করেছিল। অফিসের উদ্দেশ্যে বের হতেই চোখে কালো সানগ্লাস, হাতে ব্যাগ আর পড়নে কালো একটা প্যান্ট ও স্যুট....ছিল। পড়ার উদ্দেশ্য ছিল এই কালো সানগ্লাস ফাঁক করে যাতে দু'চোখ আপনাকে চিনতে না পারে। অবয়ব স্মৃতির ঘরে জমানো দুঃখগুলো যেন বাড়িয়ে না দেয়। আচ্ছা অনুদিতা, তবুও কি প্রিয় মানুষটাকে অচেনা রাখা যায়? সেদিন মা চা দিতে গিয়ে খুব রেগে গিয়েছিলেন ঠিকমত খানা না খাওয়ার কারণে, পরিমিত ঘুম না যাওয়ার কারণে, আনমনা ভাব নিয়ে যেদিক সেদিক দৌঁড়ানোর কারণে! চেয়েছিলাম সবসময় ব্যস্ততা থেকে আপনার কিছু স্মৃতি দু'চোখ থেকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু বিশ্বাস করুন, যতবার সরিয়ে দিতে চেয়েছি ততবারি হ্যামলকের বিষ পেয়েছি..... যতবার আপনাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করেছি ততবারি নীলাচলের সুউচ্চ পাহাড় থেকে নীচে গড়িয়ে পড়ার ব্যথা অনুভব করছি।

অতঃপর রিকশা থেকে নেমেই কিছুটা পথ আগাতেই পথিমধ্যে আপনার সাথে দেখা। সানগ্লাসের ফাঁক করে এতোগুলো দিনের পর আপনাকে চিনতে পারবো ভাবতেও পারিনি! আপনি নির্মল দু'চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। পরক্ষণে দু'চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল ভিজিয়ে দিচ্ছে আপনার মুখ। আমার মুখে তখন কোন প্রশ্নেই আসেনি। হঠাৎ কথা না বলার বিশাল একটা অভিমান বুকের ভিতর ফেনার মতো করে ফুফিয়ে উঠেছিল। আপনাকে বুঝতে দিইনি। আপনি আমাকে কিছু প্রশ্ন করেছিলেন; এই অভিমান, বলে না যাওয়ার অভিযোগ আমার ভিতরে কোন উত্তর বের করার সাহস দেয়নি। আমার রাগ পরমুহূর্তেই আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে! যদিও কারো জলেভেজা চোখের সামনে কেউ কারো অভিমান ভাসাতে নাই, তবুও কি করবো বলুন.... আপনার আঘাত আমাকে আপনার কাছে অনুতপ্ত হতে দেয়নি!
-)আচ্ছা অনুদিতা, তবুও কি আপনার স্মৃতির শহর মুছে ফেলতে পেরেছি?

(৪)
এক পড়ন্ত বিকেলবেলা নিজেই সমুদ্রে হারিয়ে গেছি। গিয়েছি মুক্তোর জন্য, অবশেষে মুঠোমুঠো ঝিনুকজল ছাড়া আর কিছুই পাইনি। ভেবেছিলাম এই শহরের হয় তো আমিই ছিলাম এক বাঁশিওয়ালা! যে আপনার সুর তুলতে তুলতে কখন যে দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা আসে আর রাত পেরিয়ে ভোর হয় তা বুঝে উঠতে পারে না। এতোটাই আপনি ছিলেন আমার বিষাদিনী! যাকে রাজরানী বলে হৃদয়ের ঘরে মন্ত্র পড়ে কাক আটকিয়ে দিতাম। অথচ সেও যে সেই কাক ভেংগে এসিডের নোনাজল উপহার দিয়ে যাবে জানা ছিল না।

এমনিতেই কয়েকদিন পেরিয়ে গেল! হতাশার কাছে প্রতিদিন নিজেই গোসল করে উঠতাম৷ দুঃখের বিষয় হলো সেই গোসলে আপনি নামের নারীটির নাম মুছতে পারতাম না। অনেক কাছের মানুষ, বন্ধু-বান্দবী কতো স্বজনের নাম ভুলে গেছি... তবুও আপনার নাম রয়ে গেছে, যেন আপনি নিজেই রক্তের সাথে মিশে আছেন।
অতঃপর একদিন আপনি নিজেই চলে এসেছেন। যেখানে বসে বসে আপনি আমাকে গল্প শোনাতেন, মিষ্টি গানে আমার গীটারে সুর তুলতেন। যেখানে বসে বসে কখনো ভুলে যাবেন না বলে এক মহাজাগতিক সূত্র পড়াতেন। যে সূত্রে বাঁধা ছিল আপনার আর আমার প্রেম। ইট পাথর খসে পড়বে, তবুও হৃদয় ভাঙবে না। আমি সেদিন নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছি৷ তবুও আমার মোটেও অনুযোগ কাটেনি। আপনার প্রতি যে আমার বিদ্বেষ তা সরে যায়নি। সেদিনও আপনি আমার জন্য একটা ডায়রী নিয়ে এসেছেন, সাথে নিয়ে এসেছেন বক্স ভরা উপহার। কিন্তু মন ভরা অভিমানের সামনে বক্স ভরা উপহার পৃথিবীর রাজ্যে উপহাস ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। উপহারকে উপহাস মনে করে সেদিনও আপনার কাছ থেকে অভিমানের বুকভরা ব্যাকরণ নিয়ে ফিরে এসেছিলাম।

(৫)
এক প্রিয়জনের মৌখিক চিরকুটের মাঝে শুনেছি আপনি অনেকটা অসুস্থ। আপনার প্রতিটা সময় এক একটা গুল্মের কাটামায় রক্তক্ষরণের ন্যায়। আরো শুনেছি আপনি আর আগের মতো নেই। অনেকখানি পরিবর্তন হয়ে গেছেন। দিনদিন শরীরটা অনেক শুকিয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন ডাক্তার আসে, বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা হয় ব্যাপার হলো আপনার রোগ কেউ নির্ণয় করতে পারিনি। কারো প্রেসক্রিপশনে আপনার রোগ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবসময় এলোচুলে বেলকনিতে বসে দূর দিগন্ত পথের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে হয় এই ডায়রি যেন কতো যুগযুগ ধরে আপনার আপন হয়ে আছে। প্রতিনিয়ত কি যেন ভেবেই চলেন আপনি, কিন্তু আপনার মনের কথাগুলো এখন আর আগের মতো ডায়রি করেন না!
-) কথাগুলো শুনে অনেকটা বিস্মিত হলাম! মনের অজান্তেই বেরিয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা নোনাজল! বিশ্বাস করুন, তখন আমি যে স্থানে দাঁড়িয়ে আপনার চিরকুট শুনেছিলাম, মনে হচ্ছে এখন আর আমি সেই স্থানে নেই! আপনার প্রতি আমার যে রাগ এবং অভিমান ছিল তা পরমুহূর্তে সব ভেংগে জলের সাথে নিঃশেষ হয়ে গেছে। যেন সবটুকু পার্থিব ঝড় আমাকে ঘিরে ফেলেছে। মনে হয় আমি নব্বই ডিগ্রী কোণ করে কোথাও পড়ে আছি! তবুও আপনাকে দেখার জন্য বুকের ভিতর বিশাল একটা ঝড় তুলছে।

অপেক্ষা আর হয়নি, জলেভেজা দুচোখ নিয়ে একটা দৌড় দিলাম। পড়ন্ত বিকেল, চমৎকার রূপে সাজিয়ে আছে পৃথিবী। তবুও আমার কাছে এটি ছিল এক বৃষ্টিস্নাত শহর! ক্রমেই যেন এই পথ অনেক দূর ! তবুও সব যান ঝাঁপটা পেরিয়ে আপনার আঙিনায় উপস্থিত হলাম! আপনি বেলকনিতে বসে খুব তাকিয়ে আছেন! যেন কতটি বছর আপনার অচেনা, অজানা! আমার দুচোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জল দেখে আপনি কিছু বলেননি! এমন করে তাকিয়ে আর কখনো আপনাকে থাকতে দেখিনি! ইচ্ছে করেছিল- শুধু একবার জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন? কই আর সুযোগ দিলেন? দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম শুধু, ভিতরে যাওয়ার যাওয়ার জন্য আজ আর আপনি একদম বলেননি---!
কিছুক্ষণ পর দেখ আপনার কাজের মেয়েটি আমাকে ডেকে একটি চিঠি দিয়ে গেল আর বলল আপনি যদি কখনো আসেন, তাহলে খামে আটকানো এই চিঠিটি আপনাকে দিতে বলেছিল! খুব আনন্দ নিয়ে চিঠিটি হাতে নিলাম! কিন্তু সেখানে লেখা ছিল-
রাহুল তুমি অনেকদিনের জন্য কোথায় যেন গিয়েছিল, আমাকে বলোনি! আমি ভেবেছিলাম, আমার সাথে খুব রাগ হয়ে বুঝি! কিন্তু জানো, সমাজ আমাকে খুব হেয় করে ফেলেছিল! অনেক ইচ্ছে এবং স্বপ্ন নিয়ে জেগে উঠা এই প্রীতির মাঝে সমাজ আমাকে উপহার দিয়েছে হীনতা এবং ঘৃণিত কিছু শব্দ! পারিপার্শ্বিক আপনজন, খুব কাছের মানুষ প্রতিদিন আমাকে আঘাত দিয়েছিল! কোনভাবে ধৈর্য ধরার তৃপ্ততা দেয়নি! তুমি যখন ফিরে এসেছিলে তখন আমি বারবার তোমার কাছে অনুতপ্ত হতে গিয়েছি, কিন্তু দুঃখের বিষয় তুমি আমাকে অনুতপ্ত হওয়ার সুযোগ দাওনি! দাওনি তোমার অভিমান ভাঙাতে! যতই তুমি দূরে চলে যাও, সমাজ ততই আমাকে আরও বেশি অবহেলা করতে শুরু করে! তোমার কাছে গেলে তুমি আরও বেশি অবহেলা করতে। সরিয়ে দিতে আমাকে কাছ থেকে
একসময় তোমার জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমি অন্যরকম হয়ে যেতে শুরু করছি। ধীরেধীরে হারিয় ফেলি সবকিছুর তৃপ্ততা। কিছুই আমার কাছে ভালো লাগেনি। আর এই সময় তোমার কথা মনে করে তোমার কাছে চিঠিটি লিখলাম! এরপরেও অনেকবার তোমার বাড়িতে গেছি, কত কান্নাকাটি করেছি... কিন্তু অনুমতি ছিল না ফের ঘরে উঠার! আমি আর লিখতে পারছিনা এখন। তুমি ভালো থেকে রাহুল। দোয়া রইল তোমার জন্য! (অনুদিতা)

এইটুকু পড়ে হতবম্ভ হয়ে গেলাম। কি বলবো কিঞ্চিৎ ভাষা জানা ছিল না অনুদিতা! যদি তুমি সুস্থ হয়ে যাও তাহলে ফিরে এসো। আর এর জন্য যদি মৃত্যুবরণ করো তাহলে আমি দায়ী এবং ততোক্ষণ পর্যন্ত দোয়া করবো, যতক্ষণ পর্যন্ত মহান সৃষ্টিকর্তা তোমাকে জান্নাত না দেয় এবং আমাকে এ ভুলের জন্য ক্ষমা না করে...!!