শৈশব কিংবা শিশুকাল যেটাই বলি না কেন, এর মতো এতো সুখ, এতো আনন্দ আর নেই। জীবনে আর হয় না। এই যে হা-ডু-ডু, কানামাছি, মাঠেঘাটে ঘুড়ি উড়া সহ আরো কত কি। আরো কতো মহা উৎসব, মহা আনন্দ। আর এই আনন্দের পিছনে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন, তারা হলেন মা-বাবা। কষ্টকে কষ্ট বলেননি, সবসময় সন্তানের সুখের জন্য বেহুশ ছিলেন। কখনো ৪০-৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা সহ্য করেছেন, কখনো সহ্য করেছেন হিমাংকের নীচের আদ্রতাও। অথচ আমরা একসময় মানুষের মতো মানুষ হই, উচ্চ শিক্ষা অর্জন করি। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আরো কতো কি! কিন্তু ভুলে যাই গর্ভধারিণী মা'কে, কঠিন পরিশ্রমকারী বাবাকে। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে আমরা স্ত্রীকে নিয়ে সুখে জীবন যাপন করি, অথচ মা বাবাকে পাঠিয়ে দিই কিংবা মা বাবার সুযোগ্য স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রম। অন্যদিকে নিরক্ষর কিংবা একজন দিনমজুর ছেলের বাবা মা থাকে তাদের সাথে, খায় তাদের সাথে। এ গল্পের মাঝে লেখক এ দিকটি ফুটে তুলার চেষ্টা করেছেন এবং বলেছেন- উচ্চ শিক্ষিত হয়েও যখন কিছু করতে পারিনি তখন শিশুকালই ভালো ছিল। নিরক্ষর কিংবা দিনমজুরই ভালো ছিল। কিছু না পারতাম, সারাদিন পরিশ্রম করে মা বাবার সাথে বসে একমুঠো ভাত খেতর পারতাম। মা বাবার খুঁজ নিতে পারতাম। মা বাবাকে গেঁয়ো বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখতে পারতাম।। সুতরাং এ দিকটা বিবেচনা করলে গল্পের "শিশু" বিষয়ের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যতা পাবে বলে আমার বিশ্বাস।।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মার্চ ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ৪৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.২২

বিচারক স্কোরঃ ৩.২৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শিশু (সেপ্টেম্বর ২০১৯)

বিলাপ
শিশু

সংখ্যা

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.২২

মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৩৩৫
চোখের সামনেই যেন দেখেছি আকাশ, দেখেছি চাঁদ; পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত করে রেখেছে সব। যেন কোটি নক্ষত্র চাঁদের জমিনে রেখেছে হাত, জোছনার মতো করে বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে সব। ক্রমেক্রমে শুনেছি মায়ের ডাক মা, বাবার ডাক বাবা। ভাষাটা শিখেছি বেশ মজবুত।
অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি, মাটিতে রাখতো না যেন ঘুণে খাবে, পাটিতে রাখতো না যেন ব্যথা পাবে!
হাটতে হাটতে একদিন হাটা শিখেছি। শিখেছি মায়ের পরিধি ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের পরিধির চারপাশ। অতঃপর সবার চোখের ভালোবাসার উজ্জ্বল নক্ষত্র।
ধীরেধীরে বাড়ির পথ ছেড়ে বাজার, স্কুলের গন্ডি। এটা খাবো না ঐটা খাবো, চানাচুর খাবো না চিপস খাবো, বিস্কুট খাবো না লজেন্স খাবো। এভাবে দিন থেকে দিনান্ত, দিক থেকে দিগন্ত। সুখ কামিয়েছি কেবল, কখনো জিজ্ঞেস করিনি আব্বু, আম্মু তোমরা খেয়েছো কি? না বুঝার অক্ষমতায় ধারণ করিনি জ্বালাময় এক রৌদ্রতেজে মাঠে বাবা নিজেকে কর্মের সাথে বিলিয়ে দেওয়া! স্কুলে শিক্ষকের ধমক; বেতন, পরীক্ষার ফি পরিশোধ না করলে স্কুল থেকে বের করে দিবো! মা'কে বলতেই বাবা শোনে মানুষের কর্মে চলে যেতো। ৪০-৪৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় সারাটা দিন পরিশ্রম করে আমাদের পরীক্ষার ফি'টা যোগাড় করাই ছিল যার একমাত্র চিন্তা! মা প্রতিদিন সকালে উঠে নাস্তা রেডি করে খাইয়ে দিয়ে আবার টিফিন বক্স ভরে ব্যাগ নিজের হাতে করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। উপেক্ষার পারদ উঠানামা করে, তবুও মায়ের সন্তানের অপেক্ষার বাঁধ ভাঙতো না!
জীবনের এই কঠিন সংগ্রামের ভিতরে মা স্বপ্ন দেখতেন একদিন সন্তান অনেক বড় হবে। বাবা স্বপ্ন দেখতেন ছেলে একদিন অন্ধকারকে আলোকিত করবে, এই মুখে সেদিন গর্বের হাসি ফুটবে। এই গর্বের হাসি সেদিন মুছে দিবে সব কষ্ট, স্মৃতির ঘরে জমানো সমুদ্র জল। এভাবেই চলতে লাগলো শৈশব।

দুই.
অতঃপর অনেকখানি বড় হইছি। হাড়ি পাতিল আর থালাবাসন নিয়ে খেলতে শিখেছি। এখানে সেখানে, সময়ে অসময়ে। দিন নেই রাত নেই মা'কে জ্বালাতন করতে শিখেছি। বাবার কাঁদে উঠে লাঙল যোয়াল খেলতে শিখেছি। শিখেছি বাবার হাত ধরে অনেকদূরে পাড়ি দিতে। একসময় সারাটা শহর ঘুমিয়ে যেতো, ঘুমাতো না আমার জননী। ঘুমাতেন না আমার গর্ভধারিণী মা। জ্বরের মাত্রায় কাঁপা কণ্ঠস্বর! কখনো মাথায় পানি, কখনো সারা শরীরে তেল মালিশ, কখনো নিজেই দু'চোখের জলে সমুদ্র হয়ে যেতেন। বাবা এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি। ডাক্তার নেই, থাকলেও পকেট শূন্যতা। তবুও অগ্রিম পরিশ্রমের কাছে নিজে বিকিয়ে যেতেন, কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। অতঃপর সৃষ্টিকর্তা বাঁচিয়ে রাখেন, মায়ের মুখে হাসি ফুটে।
একদিন মাকে না বলে দৌড়াদৌড়ি করতে শিখে যাই, মাঠেঘাটে ঘুরাঘুরি করতে শিখে যাই, শিখে যাই পুকুর ঘাটে বসে বসে পানির সাথে মজা করতে। পানির ভিতরেই দেখি যেন আহা ঝিকমিক কতো সুন্দর সুন্দর ফুল, কতকিছু! ধরতেই গেলে যেন আরেকটু দূরে...
পরক্ষণে মা খুঁজতে গিয়ে দেখেন আদুরে মাণিক!
চিৎকার দিয়ে পানির কাছে চলে গিয়ে আমাকে বাঁচান। দু'টো চুমটি খেয়ে, দোলনার মতো করে হাতে দুলিয়ে ফের ঘরে নিয়ে যান। এভাবেই চলতে শুরু করেছি আরো একধাপ!

৩.
অতঃপর ঘুড়ি হাতে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে ফিরে এসেছি প্রাইমারির শেষ প্রান্তে। সেখান থেকে একসময় মাধ্যমিকে। দিন বাড়ে, ক্লাস বাড়ে সাথে বাড়তে শুরু করে পড়ালেখার খরচও। কখনো কোচিং এর ফি, কখনো স্কুলের বেতন আর কখনো পরীক্ষার ফি। খেয়ে না খেয়ে, বাজারের টাকা থেকে অল্প অল্প করে বাঁচিয়ে বাবা মা কোচিং, স্কুলের বেতন আর পরীক্ষা ফি জমাতেন। তবুও কষ্টের কথা বোঝতে দিতেন না। বোঝতে দিতেন না এক একটি দীর্ঘশ্বাসও। মাঝেমাঝে কতো কষ্ট দিতাম, স্কুলে ক্লাস হয় না বিদায় তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেছে, ইংরেজীর স্যার আজকে আসেননি, আজকে আঁধাবেলার পরে ছুটি হয়ে গেছে এভাবে আরো কতো মিথ্যে কথা, মিথ্যে ফন্দী। কখনো পেটে ব্যথার নামে ক্লাস ফাঁকি, কখনো শরীর ভালো লাগে না মিথ্যা কথা বলে স্কুল যেতাম না! মা এমনে বলতেন না ওমনে বলতেন। এমনে আদর করতেন না ওমনে আদর করতেন। আহা! কতো রকমে বোঝাতেন! তবুও বুঝতে চাইতাম না, শুনতে চাইতাম না ভালো মন্দ কিছু। তবুও মা বাবা কখনো মারতে চাইনি। কতো ধৈর্য আর কতো ভালোবাসা দিয়ে সুদূরে সাজিয়ে রাখতেন।


চার.
একদিন আমরা স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে এসেছি। পেরিয়ে এসেছি মা বাবাকে একটা উজ্জ্বল ফলাফল উপহার দিতে। বাবা দিনমজুর; দিন এনে দিনের খাবারটা যোগাড় করতেন, কখনো সম্ভব করাটাও ছিল দুঃসাধ্য। তবুও স্বপ্নটা দিনমজুরের মতো ছিল না। দুঃসাহসী এক স্বপ্ন জাগিয়ে পাঠিয়ে দিলেন গ্রাম ছেড়ে শহরে। আমরা একদিন মানুষ হবো। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে আমরাই তাদের কষ্ট মুছবো। তাদের স্বস্থির ভিতরের আকুতিটাকে একদিন রাঙিয়ে দিবো, নীল রঙটাকে মুছে একদিন সেখানে যোগ করবো হলুদ, কমলার মতো উজ্জ্বল রঙ!
অথচ শহুরে বাতাস পেয়ে আমরা অনেকখানি পরিবর্তন হয়ে যায়। পরিবর্তন হয়ে যায় আমাদের প্রতিদিনের রুটিন। মিশে যায় অনেক ধূমপান আর মদ্যপানকারীদের সাথে। তবুও মা বাবার দুঃখের কথা মনে করে আমরা আমাদের পড়ালেখায় মন বসাই। এদিকে কলেজের বেতন যদি হয় পাঁচশত, আমরা বলি আটশত। কোচিংয়ের বেতন যদি হয় একহাজার, আমরা বলি তেরশত কিংবা পনরশত। কারণ আজকে তো আমরা ধূমপান কিংবা মদ্যপান করতেও শিখে গেছি। অতঃপর মা দিশেহারা হয়ে যেতেন। কানের জিনিস আর নাকের নোলকই তখন ছিল মায়ের একমাত্র সম্পদ। মা নিজের চিন্তা না করে নাক আর কান থেকে তাও খোলে দেন বিক্রয়ের জন্য। তবুও আমাদের পড়ালেখা বন্ধ করতে চাইনি, চাইনি আমাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে। এভাবে মিথ্যের অজুহাতে আমরা উচ্চ শিক্ষার জন্য মা বাবার সব সম্বল নষ্ট করে দিই। নষ্ট করে দিই, জমিজমা আরো কত কিছু। একসময় চমৎকার এক ফলাফল করে পেরিয়ে আসি কলেজ এবং ভার্সিটির গন্ডি।

৫.
সুতরাং আমরা আজ অনেক বড় হইছি। উচ্চ শিক্ষা অর্জন করেছি। হইছি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক আরো কত কি! একসময় মা বাবার অজান্তেই সেড়ে ফেলি বিয়ের উৎসব। ভুলে যাই সে গ্রামে সন্তানের চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়ে থাকা বাবাকে। ভুলে যাই মা বাবার কতো আদর, কতো স্নেহ, মায়া। একটুও মনে পড়ে না আমাদের পিছনে ক্ষয়ে যাওয়া তাদের বাস্তুভিটা, ক্ষয়ে যাওয়া সোনালী দিন, সোনালী জীবন। আমরা আজ নিজেরাই একজন। নিজেরাই আজ নিজের শহুরে সংসারের চিন্তা থাকি। অথচ যারা খেয়ে না খেয়ে সন্তানের মুখে মুঠোমুঠো হাসি ফুটিয়েছেন আজ একটু খবরও নিই না তাঁদের। মাঝেমাঝে স্ত্রী আমাদের মা বাবাকে আমাদের কানে গেঁয়ো বলে উপহাস করে। কখনো ভুলেও না বলতে বারণ করি না। করতে চাই না কোন শাসন। ভুলে যাই রাসূলের বাণী (যদি তুমি তোমার মায়ের কষ্ট বুঝতে চাও, তবে তুমি তোমার গর্ভধারিণী স্ত্রীর কষ্ট অনুভব করো)।

একসময় আব্বা আম্মা আমাদেরকে নিয়ে দেখা উজ্জ্বল স্বপ্ন হারিয়ে বৃদ্ধ হয়ে যান। আমাদের জন্য কাঁদতে কাঁদতে চোখের নীচে কালো দাঁগ পড়ে যায়। চোখে দেখেন না, হাটতে পারেন না। হাটতে গেলে মুছড়ে পড়েন। তবুও তাঁরা আমাদের জন্য একমুঠো অভিশাপ জমান না। তবুও আমরা তাদেরকে একটু মনে করি না। তাঁদের কথা ভেবে নীরবতায় নিজেকে একটুও লুকাই না। গেঁয়ো মা বাবাকে শহরে আনলে আমাদের সম্মান নষ্ট হবে বলে আমরা অনেকে নিয়ে আসি না। আমরা অনেকে উচ্চ শিক্ষিতরা তাঁদের পরিচয়ও কাউকে দিই না। অথচ যারা আমাদের জন্য নিজের সম্মান ক্ষয় করে কখনো মাঠে কাজ করেছেন। আবার কখনো রিকশা চালিয়েছেন।

অতঃপর বৃদ্ধ বয়সে এসে কিছু করতে না পেরে বেঁচে নেন বৃদ্ধাশ্রম। আর জায়নামাজের কোলে নিজেদেরকে ভাসান দু'চোখের জলে। আল্লাহ তাঁদেরকে সুখে রেখো, তাঁরা যেন আমাদের মতো এতো কষ্ট সহ্য না করে।

বি.দ্র : আমরা উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে মা বাবার জন্য বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া আর কিছু করতে পারিনা। অথচ আমাদের পাশ্ববর্তী একজন দিনমজুর কিংবা নিরক্ষর ব্যক্তির মা বাবা সন্তানের সাথে কতই না সুখে থাকেন, কতই না আনন্দ দিন পার করেন। বৃদ্ধাশ্রম কি জিনিস তারা কখনো চিনেন না, অনেকে জানেনও না। যদি উচ্চ শিক্ষিত হয়ে আমাদের এটাই কাম্য হয়, তবে শৈশব কিংবা শিশুই তো ছিল ভালো, তবে নিরক্ষর কিংবা দিনমজুরই তো ছিল ভালো। কিছু করতে না পারতাম, একমুঠো হলেও মা বাবার সাথে বসে খেতে পারতাম। কিছু না করতে পারতাম, এক জগ ওযুর পানি হলেও তো দিতে পারতাম।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement