লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৪ এপ্রিল ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftস্বাধীনতা (মার্চ ২০১১)

স্বপথে ভয়ঙ্কর হিংস্রতা
স্বাধীনতা

সংখ্যা

মাহাফুজ হক

comment ৯  favorite ২  import_contacts ৯২৮
রবি এই পোঁটলাডা লইয়া কালা মিয়ার পিছে পিছে যা। নয়া বাড়িতে গিয়া চুপচাপ মিজান মাষ্টারের হাতে এইডা দিয়াই আইয়া পড়বি। এক মুহূর্তও দেরি করবি না। বুঝছস। যা, অহন তাড়াতাড়ি যা।
খালুজানের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে রবি হাতে একটা গামছা নিয়ে তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলো।
পিছ বাড়িতে কালা মিয়া দাড়িয়ে আছে। বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া যাবে না। যেতে হবে পিছ বাড়ি দিয়েই। সামনে দিয়ে গেলে সমস্যা আছে।
কিন্তু ওই দিকে আবার পায়খানা। তার উপর বটগাছ। পিছ বাড়ির রাস্তাটা আবার পায়খানা আর বটগাছের পাঁশ ঘেঁষে গেছে।
দিনের বেলাতেই রবি ওদিক দিয়ে চলাফেরা করে না। আর রাতের বেলার কথা চিন্তা করতেই ভয়ে ওর গলা শুঁকিয়ে গেলো। তবুও সাথে কালা মিয়া আছে। এই ভরসাতেই রবি পোটলাটা গামছায় পেঁচিয়ে শক্ত করে কোমরে বেঁধে হাটা শুরু করলো।
কালা মিয়ার মাথায় ভাত আর তরকারির গামলা। সে আগে আগে হাটছিলো। বিশাল দেহি শক্ত সমর্থ কালা মিয়াকে অন্ধকারে দৈত্যর মতো লাগছিলো। তার পিছু পিছু তাল রেখে হাটতে গিয়ে রবি অন্ধকারে বেশ কয়েকবার হোঁচট খেলো।
খালুজানের বিশাল বাড়ি। পিছ বাড়ির পিছনের জঙ্গল পার হতেই বিশ মিনিট লাগে। আগাছা আর বড় বড় বাঁশ ঝাড় বোঝাই। আরো আছে নানা গাছ গাছালী। পুরনো আমলের বাড়ি বলেই কিনা কে জানে, বাড়ির ভিতরে কোন পায়খানা নেই। খালুজানের বাপজান পায়খানা তৈরি করেছিলেন বাড়ির সীমানার একেবারে শেষ মাথায়। বসত বাড়ির ভিতর বা আশেপাশে পায়খানা থাকলে নাকি বাড়ি নাপাক থাকে। শয়তানে নজর রাখে। তাই এ বাবস্থা।
পায়খানা পার হওয়ার আগেই রবি কালা মিয়াকে হারিয়ে ফেললো।
কালা মিয়া দেখতে এমনিতেই কুচকুচে কালো। তার উপর লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুত হাঁটছিলো বলে রবি আর তাল রাখতে পারেনি।
অন্য সময় হলে হাঁক দিতো কিংবা ওর জন্য দাড়াতে বলতো। কিন্তু এই সময় কথা বলা বারণ। এখন কথা বললে বিপদ আছে। বাতাসেরও কান আছে। এটা রবি জানে। তাই ও অন্ধকারেই চেষ্টা করলো দ্রুত হাটতে। কে জানে এখনো দ্রুত হাঁটলে হয়তো কালা মিয়াকে ধরে ফেলতে পারবে।
পায়খানাটা পার হওয়ার সময় আচমকা একটা ফিসফিস আওয়াজ রবির কানে ভেসে এলো। দ্বিতীয় বার হতেই রবি বুঝতে পারলো ওটা আওয়াজ নয় শব্দ। কে যেনো ফিসফিস করে বলছে ‘দাঁড়ান’।
রবি এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালো। অন্ধকারে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। মনে হয় যা শুনেছে ভুল শুনেছে। সে দোয়া দুরুদ পরে আবার হাটতে শুরু করলো।
এবার আর ফিসফিস করে নয় খানিকটা জোরালো ভাবেই কানে এলো কথাটা। ‘দাঁড়ান না। আমারে দেখতাছেন না’।
স্পষ্ট মেয়েলি গলা। রবি খুব ঘাবড়ে গেলো। গলাটা যেনো খুব পরিচিত।
রবি এবার দাড়াতেই হারিকেন হাতে একটা ছায়া দেখতে পেলো। পায়খানার পাঁশে দাড়িয়ে আছে।
না, ওটা শুধু ছায়া না। হারিকেনের টিমটিমে আলোতেও স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে ওটা আসলে রক্ত মাংসের একটা মেয়ের শরীর। আছিয়া। আছিয়া দাড়িয়ে আছে ওখানে।
আছিয়া কাছে এগিয়ে এলো। ‘শুধু তোমরাই যুদ্ধ করবা। আমরা কিছু না’। আছিয়া ক্ষোভের সাথে জিজ্ঞেস করলো।
‘কই আমি যুদ্ধ করতাছি। আমিতো বরং বাড়ি ছাইড়া তগো এইখানে আইসা লুকাইছি। আমার মা আমারে যুদ্ধে যাইতে দিবো না। আমি তার একমাত্র পোলা বইল্লা নিজে আইসা আমারে তার বইনের বাসায় দিয়া গেছে। এইখানে নাকি আমি নিরাপদ। তা তুই এতো রাইতে এইখানে কি করতাছস? খালাম্মা, খালুজান দেহে নাই’?
‘নাহ। আম্মায় ঘুমাইতাছে। তোমরা নয়া বাড়িতে যাইতাছো টের পাইয়া আমি চুপ কইরা পিছনের দরজা খুইল্লা আইয়া পরছি।। আম্মায় টের পাইলে ভাববো পায়খানায় গেছি। অহন আর কতা বাড়াইয়া লাভ নাই। পা চালাও। আমি তোমার লগে যামু’।
‘তোর কি মাথা খারাপ হইছে আছিয়া? খালুজান জানলে আমারে দুই টুকরা কইরা ফালাইব। আমি যুদ্ধে যাইতাছি না। এই পোঁটলাডা দিয়া আইতে যাইতাছি’।
‘এইডা ও কি যুদ্ধে যাওয়ারতে কম’। আছিয়ার গলায় এবার ঝাঁজ। ‘তুমি টাকার পোঁটলা, বন্দুকের গুলি, চিঠিপত্র কতো কিছুই তো দিয়া আসো প্রায়ই কালা মিয়ার সাথে গিয়া। এইডা কি যুদ্ধ করা না? আমি তোমার লগে আইজ যামুই যামু। আর কথা বাড়াইয়া লাভ নাই’।
রবি জানে আছিয়া একবার জিদ করলে তারে সামলানো বড়ই কঠিন। কি করবে কিছু ভেবে না পেয়ে ও যা আছে কপালে এই চিন্তা করে হাটা শুরু করলো।
আছিয়া হারিকেনের আলো একেবারে ঢিম করে দিয়েছিলো। ওঁরা পাশাপাশি হাঁটছিলো। সামনেই বটগাছ। আছিয়া জানে রবি একটু ভীতু স্বভাবের। সারাজীবন শহরতলিতে ছিলো বলেই কিনা কে জানে ওর একটু ভুতের ভয় বেশি। কিন্তু আছিয়া খাঁটি গ্রামের মেয়ে। তাই মেয়ে হয়েও এসবে ওর কোন ভয়ডর নেই।
‘চলো ডান দিক দিয়া ঘুইরা যাই। এ দিক দিয়া বটগাছ পড়বো না’। আছিয়া রবির কথা ভেবেই বললো।
‘ক্যান, ওই দিক দিয়া কেন’? রবি সাথে সাথে বলে উঠলো।
‘ডান দিক দিয়া কোন জঙ্গল নাই। ওই দিক দিয়া ধানক্ষেত। নয়া বাড়ি ওই দিক দিয়াও যাওয়া যায়। তোমারে ভূতে ধরবো না’।
রবি খোঁচাটা হজম করে বললো, ‘দরকার নাই আছিয়া। খালুজান কইছে এই দিক দিয়াই যাইতে। কালা মিয়াও এই দিক দিয়া গেছে। জঙ্গল বইলা কেউ কিছু টের পাইব না। তাই এ দিক দিয়া নিরাপদ’। ভয় পেলেও রবি অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে চাচ্ছিলো না।
‘তোমার কচু! কিছু হইব না। চলো। ও দিকটায় কোন বাড়ি ঘর নাই। শুধু খেত খামার।। তাই আরো নিরিবিলি’।

ক্ষেতে পাকা ধান। ধান গাছগুলো হাল্কা বাতাসে দুলছে। আকাশে নৌকার মতো চাঁদ। এদিকে জঙ্গল নেই বলে ওই নৌকার মতো এক চিলতে চাঁদের আলোতেও চারপাশ হাল্কা দেখা যাচ্ছে। মন ভালো করে দেওয়ার মতো সেই পরিবেশে দুই জন আঠারো উনিশ বছরের কিশোর কিশোরী মনের আনন্দে দেশের কাজে শরিক হওয়ার জন্য নয়া বাড়ির দিকে যাচ্ছে।
ওখানে মুক্তিযোদ্ধারা এসে আশ্রয় নিয়েছে। নতুন সূর্যের আলো দেখানোর আশায়। অনেক দূর থেকে এসেছে ওঁরা। নয়া বাড়িতে কিছু দিন থেকে নিজেদের শক্তি বাড়িয়ে আবার দূরে কোথাও চলে যাবে। অপারেশনে। দেশের অপারেশনে। আবার নতুন কোন। দেশের অর্ধেক শরীর ক্যান্সারে আক্রান্ত। সেই অর্ধেক কেটে বাদ দেওয়ার অপারেশনে। পশ্চিম পাকিস্তানীদের অন্যায় শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করার অপারেশনে।
এসব ভাবতে ভাবতে হেটে যেতে আছিয়ার খুব ভালো লাগছিলো। ও যে রবির সাথে ওখানে যাচ্ছে এটাও কিছু একটা করা। হঠাৎ ধান ক্ষেতের ভিতর থেকে তিন চারটি ছেলে এসে ওদের ঘিরে ধরলো। মুখে গামছা বাঁধা। ওঁরা ক্ষেতের ভিতর আইলে বসে নেশা করছিলো। আবাছা আলোতে ও বোঝা যাচ্ছিলো ওদের শরীর বেশ গাঁট্টাগোট্টা। একজন এসে প্রথমেই আছিয়ার আঁচল ধরে টান দিলো। আরেকজন রবিকে জিজ্ঞেস করলো, ‘কিরে এতো রাইতে কই যাস। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিবি নাকি শালা। নাকি ফুর্তি করতে বাড়ি ছাড়ছস। লগে আবার মাইয়া’। রবি রাগের মাথায় হঠাৎ প্রথম ছেলেটার মুখে একটা গুসি মারতে গেলো। কিন্তু ঠিক মতো লাগলো না। আর সেই মুহূর্তেই পিছন থেকে আরেকটা ছেলে তার হাতের খালি মদের বোতল দিয়ে রবির মাথায় সজোরে আঘাত করলো।
রবি অজ্ঞান হওয়ার আগে দেখলো আছিয়াকে ওঁরা টেনে নিয়ে যাচ্ছে ধান ক্ষেতের ভিতরে।
কতক্ষণ গিয়েছে কে জানে মনে হয় ত্রিশ চল্লিশ মিনিট। জ্ঞান ফিরতেই রবি ধড়ফড় করে উঠে বসলো। মাথাটা খুব ভারি হয়ে আছে। পিছনটা হাল্কা ভিজা। বেশ ফুলে আছে। রবির সেদিকে খেয়াল নেই। আছিয়া! আছিয়া কই? দৌড়ে গিয়ে ও ধান ক্ষেতের ভিতর ঢুকলো।
বেশিক্ষণ খুঁজতে হলো না। আছিয়া বসে আছে ক্ষেতের ভিতর এক জায়গায়। ওই জায়গাটার ধানগুলো লম্বা লম্বা গাছসহ অনেকটা জায়গা জুড়ে মাটির সাথে লেপটে আছে। জায়গাটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে কি নির্যাতন হয়েছে আছিয়ার উপর। কিন্তু শক্ত সমর্থ গ্রাম্য শরীর বলেই হয়তোও উঠে বসেছে।
আছিয়ার শাড়িটা একপাশে পরে আছে। রবি তাড়াতাড়ি সেটা তুলে আছিয়ার শরীরে পেঁচিয়ে ধরলো।
আছিয়া এবার ফিরে তাকালো। রবির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার কোমরের পোঁটলাডা আছে’?
রবির এতক্ষণে খেয়াল হলো সেটা। কোমরে হাত দিয়ে দেখলো পোঁটলাটা জায়গা মতোই আছে। আছিয়াকে বলতেই ও রবিকে বললো, ‘তুমি রাস্তার উপরে গিয়া দাড়াও। আমি আইতাছি। সবকটা কুত্তার বাচ্চারেই আমি চিনি। মুখে গামছা থাকলে কি অইবো। আমি জানি ওইগুলা কারা। আমি একটারেও ছারমু না। একটারেও না। শেষের কথাগুলো আছিয়া মনে হয় নিজে নিজেই বললো।
কিছুক্ষণ পর রবি অবাক হয়ে দেখলো আছিয়া ঠিকঠাক শাড়ি পরে ধানক্ষেত থেকে বের হয়ে আসছে। ওর হাটতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু রাস্তার উপরে উঠতে আছিয়া তবুও রবির সাহায্য নিলো না।
চল, যা হওয়ার হবে। তরে আগে বাড়ি দিয়া আসি। তারপর ওই হারামির বাচ্চাগো ব্যবস্থা করমু আমি। ওঁরা কবরে গেলেও আমি ওগো কবর থেইক্কা বার কইরা ছারমু। রবি বললো দৃঢ় কণ্ঠে।
আছিয়া শান্ত স্বরে বললো, ‘কারো কিছু করতে অইবো না। আগে নয়া বাড়ি চলো’।
নয়া বাড়ি গিয়ে দেখে বড় বাংলো ঘরের ভিতর মিজান মাষ্টার ও আরো অনেক লোক। সবাই তৈরি হয়ে বসে আছে। গায়ে সবার চাদর জড়ানো।
রবিকে দেখেই মিজান মাষ্টার দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলো।
‘কি ব্যাপার। তোমার এতো দেরি হলো? কালা মিয়া সেই কখন চলে এসেছে। পথ হারিয়ে ফেলেছিলে নাকি? আমরা এক্ষণই রওনা হবো। সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। টাকাটা কোথায়’?
রবি কোমর থেকে গামছাটা খুলে মিজান মাষ্টারের হাতে দিলো।
গামছাটা খুলে টাকাটা দেখার পরেই যেনো মিজান মাষ্টার এতক্ষণে রবির পিছনে আছিয়াকে দেখতে পেলো।
মিজান মাষ্টারের চোখে প্রশ্ন। রবির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, ‘তোমার সাথে উনি কে’?
‘আমি কেউ না’! আছিয়া নিজেই উত্তর দিলো। কিছু না। কিন্তু কিছু হইতে চাই। মুক্তিযোদ্ধা হইতে চাই। প্রতিশোধ নিতে চাই। প্রতিশোধ।
আছিয়ার গলায় মনে হয় এমন কিছু ছিলো যা শুনে মিজান মাষ্টার আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কিছুক্ষণ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, ‘ওই চোখে আমি আগুন দেখতে পাচ্ছি! তুমি পারবে। আমার আর কিছু জানার দরকার নেই। চলো আমাদের সাথে। আমরা আজ রাতেই এক অপারেশনে যাচ্ছি’।
আছিয়া এবার রবির দিকে ফিরে বললো, ‘তুমি বাসায় ফিরা গিয়া আমার কথা কিছু বলার দরকার নাই’। তারপর একটু থেমে আবার বলল, ‘ এবার তাইলে তুই যাও’।
রবি এবার আস্তে কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললো, ‘কই যামু? আমিতো একলা ফিরা যামু বইল্লা তোমারে সাথে নিয়া আসি নাই। এক সাথে যহন আইছি। যেইখানে যামু একসাথেই যামু। যা করমু একসাথেই করমু। একসাথে’।
দুর্বল চিত্তের কিশোর রবির কণ্ঠেও এখন এক সাহসী যুবকের প্রত্যয়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement