তনিমা নামের মানুষটি প্রতিদিন বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। কিছু অাকড়ে ধরে বাঁচতে চাই। কিন্তু তার স্বপ্নগুলো মাঝরাতের অন্ধকারে তলিয়ে যায় প্রতিদিন। সুন্দর এ পৃথিবীতে নারী অথবা পুরুষ ছাড়া অারও একটি অস্বীকৃত লিঙ্গ রয়েছে, যেটা তৃৃতীয় লিঙ্গ নামে পরিচিত। এ সমাজ তাদেরক‌ে মানুষ বলে স্বীকৃতি অাজও না দিলেও প্রতিদিন তারা স্বপ্ন দেখে। যা একই ভাবে প্রতিদিন মাঝ রাতের অাঁধারে তলিয়ে যায়।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৮ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ৩০টি

সমন্বিত স্কোর

২.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ১.২৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

তৃতীয় লিঙ্গ
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৭৮

রওনক নূর

comment ১৬  favorite ১  import_contacts ১৯২

মধ্য রাত, ঘুমহীন চোখ, মুগ্ধ হয়ে জানালা দিয়ে চেয়ে আছে তনিমা। বাহিরে ঝুম বৃষ্টি, মনে হচ্ছে ধোয়া উড়ছে। মাঝে মাঝে বিজলি আলো বৃষ্টির রুপকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হালকা মিষ্টি বাতাস শিহোরিত করছে তনিমাকে। মনে হচ্ছে কোন এক আকাঙ্খিত অজানা স্পর্শ ছুয়ে দিচ্ছে তাকে। পাশের বিল্ডিং এর ছাদে কিছু একটা উড়ছে মড়মড় শব্দ করে, মনে হয় পলিথিন জাতীয় কিছু। বৃষ্টির ঝিরিঝিরি গান শুনানি মুগ্ধতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এমন সময়ে এক কাপ চা আর রবীন্দ্রসংগিত বেশ যায়। তনিমা পানি গরম করে তার মধ্যে একটি টি ব্যাগ দিয়ে আবার বসলো জানালার গ্রীলে মাথা ঠেকিয়ে।

মোবাইলে গান চালিয়ে দিলো তনিমা, " আমার হিয়া র মাঝে লুকিয়ে ছিলে"। এটা ওর প্রিয় গান। হিয়ার মাঝে লুকিয়া থাকা কাউকে খুজছে তনিমার মন। তার একাকিত্ব জীবনে বৃষ্টিভেজা দিনে বৃষ্টি বিলাশ করতে সত্যিই পাশে কাউকে প্রয়োজন ছিলো। প্রিয় মানুষের সাথে বৃষ্টি দেখতে, বৃষ্টিতে ভিজতে কেমন লাগে তনিমা জানেনা। এটাড় হয়ত এক স্বর্গীয় উপলব্ধি হবে। কারো হাত ধরে বাকিটা জীবন পার করার বড্ড স্বাদ হয় তনিমার। কিন্তু এসব স্বপ্ন দেখাও তার অন্যায়।

তনিমার জন্ম এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। যদিও এতে তার পরিচয়ে কোন রকম গর্বিত হওয়ার কিছুই নেই। কারন বাবা মায়ের একটি মাত্র সন্তান হলেও তার পরিচয় দেওয়া পরিবারের কাছে লজ্জার। ছোটবেলা থেকেই তনিমা সবার কাছে অবহেলা পেয়েছে। রাস্তায় বের হলে সবাই এমন ভাবে তাকায় যে মনে হয় সে মানুষ না, অন্য গ্রহ থেকে এসেছে। যদিও প্রথম প্রথম তনিমা বুঝতো না কেন সে সবার থেকে আলাদা কিন্তু একটু বড় হতে না হতেই সমাজ তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে তার অবস্থানটাে এ সমাজে কোথায়।

তনিমা, নামটা মেয়েদের হলেও সে একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তবে জন্মটা তার মানুষ নামে হলেও এ সমাজ তাকে মানুষের পরিচয়ের থেকে তার লিঙ্গের পরিচয় বেশি শিখিয়েছে। ছোট বেলাই যখন বাবা মায়ের কাছে ছিলো তখন স্কুলে পড়াশুনা করতো তনিমা। তবে একটু বড় হবার পর তার নিজের অবস্থানে চলে আসতে হয়েছে। মল্লিকা মাসি, তার মত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ, তনিমাকে সন্তানের মত বড় করেছে। এখন আর তনিমার নাম শুধু তনিমা নয়, তনিমা সুন্দরী। নিজের জীবনটাকে খুব তুচ্ছ আর উদ্দেশ্যহীন মনে হয় তনিমার।

তনিমা তার মত অন্যদের থেকে বেশ ভিন্ন। চুপচাপ থাকতে ভালোবাসে, হাসে খুব কম। তার আকাশটাতে মনে হয় সবসময় মেঘ জমে আছে। সবাই যখন বাইরে আদায়ে বের হয় ও লজ্জায় চুপসে যায়। ভিক্ষা করতে একদম পছন্দনা তনিমার। কিন্তু তাছাড়া কোন উপায়ও নেই ওদের। কাজ দেওয়াতো দুরের কথা, ওদের দেখলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেই। তনিমার খুব ইচ্ছা করে বাড়ীতে ফিরে যেয়ে বাবা মায়ের সাথে থাকতে। কিন্তু সে ক্ষমতাও তার নেই। বাবা মা তাদের সন্তানকে সমাজের ভয়ে কাছে রাখতে পারেনা। প্রথম প্রথম দেখা করতে আসতো তনিমার সাথে, কিন্তু এখন আর আসেনা।


তনিমা স্কুলে পড়া বন্ধুদের খুব মিস করে। বাড়ী থেকে চলে আসার পর আর কারো সাথে দেখা হয়নি। তবে সবসময় বন্ধু খুজে তার ক্লান্ত দুটি চোখ। তার লিঙ্গের মানুষ মৌসুমি অবশ্য তাকে ফেসবুক খুলে দিছে। এই ফেসবুকে নাকি অনেক বন্ধু খুজে পাওয়া যায়।

তনিমার স্কুলের বন্ধু আদনানকে খুজে পেয়েছে এই ফেসবুকে। তনিমা খুব খুশি। কিছুদিন চ্যাট হবার পর তনিমার আদনানের প্রতি দুর্বলতা সৃষ্টি হয়। খুব আবেগে তনিমা ভুলে যায় যে তার ভালোবাসার কোন অধিকার নেই। এক বৃষ্টিভেজা দিনে তারা দুজন দেখা করে একে অন্যের সাথে। কিন্তু আদনান তনিমাকে দেখে অবাক হয়, সে এতদিন বুঝতে পারেনি তনিমা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। নিজেকে সামলে নেই আদনান, তনিমাকে তার এই অবাক হওয়াটাও বুঝতে দেইনা। যদিও তনিমা সেটা বুঝে ফেলেছিলো। সারাদিন দুজন একসাথে সময় কাটাই। হাত ধরাধরি করে একসাথে বৃষ্টিতে ভিজে তারা। দিনটি তনিমা অবশ্য সারা জীবন মনে রাখবে কারন তার জীবনে হয়ত এমন দিন আর কখনও আসবেনা।

সন্ধ্যার পর বাসায় পৌছে তনিমা ফোন অফ করে দেই। কারন আদনান তার সম্পর্কে প্রশ্ন করলে কোন উত্তর দিতে পারবেনা সে। তিনদিন ফোন ফেসবুক সব বন্ধ রাখে সে। তিনদিন পর ফোন খুলে আদনানের অনেক গুলো মেসেজ পায় তনিমা, " আমি তোমার বন্ধু হয়েছি, সারা জীবনের বন্ধু। যদি তুমি নিজেকে আলাদা ভেবে আমার কাছ থেকে আলাদা রাখতে চাও তবে মনে রেখো, তোমার আমার একটাই জাত, আমরা মানুষ।" আদনানের মেসেজ দেখে তনিমার চোখ আনন্দ অশ্রুতে টলমল হয়ে গেলো। কারন তনিমার মত তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা তার মানুষ পরিচয়টাকে খুব বেশি মিস করে। তারা সবার কাছে মানুষ হওয়ার সম্মানটুকু পেতে চায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement