গল্পটি পড়লে বিষয়ের সাথে পরিপূর্ণ রুপে সামাঞ্জস্যতা খুজে পাওয়া যাবে।ধন্যবাদ।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ অক্টোবর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৩৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ভাঙ্গা মন (নভেম্বর ২০১৯)

ভাঙ্গা মন
ভাঙ্গা মন

সংখ্যা

নাজমুল হুসাইন

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪১

কাচা বাঁশের চটায় মোড়ানো কবরখানি দেখে কেমন যেন খামচে ওঠে হৃদ মাঝারে।মুহুর্তেই থমকে দাঁড়ায় আলতা রাঙাআ দুটি পা।চিরপরিচিত এক নিঃশ্বাস বায়ু ধেই ধেই করতে করতে,দূকর্ণে বাড়ড়ড়ি খেয়ে,মৃতদের ঘ্রাণ শুকিয়ে উড়ে যায়,দূর দিগন্ত সীমারেখা পেরিয়ে।মাতৃগায়ে ফেরার আনন্দ মুহুর্ত হঠাৎ কেমন জানি ফিকে লাল হয়ে ওঠে গোরস্থান হতে ভেষে আসা খুশবু ঘ্রাণে।খেজুর পাতার ছাউনি জুটেছে কেবল কবরটিরর সারা অংগ জুড়ে।পাতা গুলো এখনো অব্দি কিঞ্চিৎ কাঁচা,যদিও শুকোতে আরম্ভ করেছে সদ্য তোলা কাঁদামাটির কণাগুলো।খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে হয়তবা কারো সমাধী ঘটেছে এই এখানে,এইতো কদিন পূর্বেও যেখানে না ছিল কারো সমাধী,না কেউ জানত এখানেই তাকে থেকে যেতে হবে চিরকালের ত্বরে।গ্রামের বাহিরে যাবার প্রাক্কালে এই গোরস্থানটি পশ্চাতে রেখেই হেঁটে যেতে হয়েছিল।যতদূর মনে পড়ে,নতুন কোন কবর চোখে পড়েনি সেদিন।না পড়বারই কথা,কারন না কেউ মারা গিয়েছিল ঐ দিন বা তার পূর্বক্ষণে,না কারো কবর খোঁড়া হয়েছিল মৃত্যুর সংবাদ শুনিয়ে।মোদ্দা কথা হল,যেহেতু গত এক বছরের মধ্যে,এ গায়ের কেউ ইহলোক ত্যাগ করেন নি,ফলে বলাই বাহুল্য মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে কেবল তার প্রস্থান পর্বের সমাপ্তি লগ্নে,যার কবর জুটেছে বড় রাস্তার পাশে ছোট্ট এই গোরস্থানটিতে।চর্তুপাশ্বে কেমন যেন শুনশান নিরবতা!বাতাসের গতিবেগে হেয়ালীপনার ছন্দ পতন,গাছের পাতারা যেন আনন্দে দুলে ওঠে না এখন আর,পাখির কূজন ধ্বনি স্তব্ধ হয়ে গেছে কোন এক প্রলয়ংকর ঝড়ের নিঃষ্ঠুরতায়।প্রকৃতির এমন বিরুপ আচরণ দাগ কেটে যায় চোখে মুখে কলিজায়।গত কয়েক দিনে পরিবারের অনেক আত্নীয়ের সাথেই যোগাযোগ হয়েছে,কথা হয়েছে তার,মুঠোফোনে খোশ গল্প হয়েছে ঢের।গায়ের মধ্যে মৃত্যুর মত এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল,অথচ কেউ কিচ্ছুটি বলল না এ ব্যপারে?যে গায়ের অতি তুচ্ছ ঘটনার খবর মুহুর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে দূর গায়ের আত্নীয় নিবাসে,সেখানে কিনা মৃত্যু সংবাদ!জীবন লীলা সাঙ্গ করে কেউ একজন হারিয়ে গেল চিরদিনের তরে অথচ সে খবরটি কারো মুখ থেকে উচ্চারিত হল না একটি বারের জন্য?কিচ্ছুটি জানানো হল না তাকে?আত্নীয় জনের এমন অদ্ভুত বৈপরীত্যে কেবল আশ্চর্যনিতই হল না আয়াত,দুঃখও পেল ঢের।পিতৃনিবাস ছেড়ে পতি ঘরে গেলে বুঝি,পর হয়ে যায় কণ্যারা?মনে মনে বড্ড অভিমান হল তার,বিশেষ করে সুনিতার প্রতি।কেউ কিচ্ছুটি না বলুক,ও আমায় বলতে পারলো না বুঝি,বিয়ে হয়ে গেছে বলে কি এ গায়ের সুখ-দুখের ভাগিদার হতে পারব না আমি?

পাক কাঁদা মাড়িয়ে,রাগে ক্ষোভে দুগাল ফুলিয়ে,নতুন বেনারসীর পাড়ে অভিমানের দাগ জড়িয়ে,প্রাণ পতিকে পশ্চাতে রেখেই বাড়ির পানে হেঁটে চলল আয়াত।বাক্স পেটরা নিয়ে নিতান্ত বাধ্য পুরুষের ন্যায় পথ অনুসরন করে চলল প্রাণপতি।মাত্র এ কদিনের সংসারে স্ত্রীর অভিমান পর্বের স্বাদ আস্বাদন করে যদিও বড্ড বিচলিত হয়ে আছেন তিনি,তবুও স্ত্রীকে যে ইতমধ্যেই ভালোবেসে ফেলেছেন,নিতান্ত বাধ্য্য আর অনুগত থাকাটাই হল এ মুহুর্তে তার উত্তম নমুনা।মেঠো রাস্তা পেরিয়ে গায়ে প্রবেশ করতেই,পথের দু ধারের বাড়ি গুলো হতে ছুড়ি ছুকরি আর ঝি বউয়েরা উঁকিঝুকি দিয়ে দেখতে লাগলো নব দম্পত্তিকে।ভাব সাব খানা এমন যেন,কোন এক অজানা অচেনা ভীন গায়ের আগুন্তক দেখতে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে তারা।অথচ চোখাচোখি হলেই কেমন যেন আড়ালে সরে যাবার ভান ধরতে লাগলো ঝি বউয়েরা,একে অন্যের কানে কি সব ফাসুর-ফুসুর করতে করতে আঁচলে মুখ লুকিয়ে মিটিমিটি হেসে উঠলো যেন।পরিচিত জনের সাথে কথা কইতে চাইলে গুমড়ো মুখোর ন্যায় বিনা বাক্যে এড়িয়ে গেল প্রত্যেকেই,কেন জানি টু শব্দটি পর্যন্ত করলো না কেউ।পিতৃদ্বারে প্রবেশের পূর্বে শেষ ঘর অব্দি চলল প্রতিবেশিদের রহস্যময়ী সে আচরণ।এমন সব কান্ড কারখানা দেখে,মন মস্তিষ্ক উভয়ই বিগড়ে গেল আয়াতের।স্ত্রীর এমন মানসীক বিপর্যয় আর ছেলে মানষীর জীর্ণদশা দেখে স্বামীও চরম লজ্জিত হল বটে।

পিতৃগৃহে প্রবেশের সংগে সংগে অভিমানের অশ্রু গড়িয়ে পড়লো দুচোখের নালী বেয়ে।সে কান্না চলতে লাগলো মনের কালিমা আর যাতনার স্বাদ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাওয়ার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত।অথচ ও বাড়ির কেউ শোক সন্তপ্ত কণ্যার আর্তনাদে বাঁধা হয়ে দাঁড়ালো না একটি বারের জন্যেও।এমনকি সবাই যেন চাইছিল মেয়েটা একটু কাঁদুক,কেঁদে কেঁদে হালকা হয়ে উঠুক ওর হৃদয়ের পাহাড় সম কষ্টের ভারি পাথর খানি।একদা নিজের ঘরে গিয়ে ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে ঘুমের দেশে চলে গেল মেয়েটি।স্বামীর ব্যপারে বিন্দুমাত্র তদারকী করবার খায়েশ যেমন ছিলনা তার,তেমনি স্বামীও কিছু সময়ের জন্য তাকে একলা ছেড়ে দিল,কেবল হাফ ছেড়ে বেঁচে উঠার তাগিদে।ফলে আপাতত বাড়ির অন্যদের সাথে বৈঠক খানার আড্ডাতেই শামিল হতে হল তাকে।অপর দিকে কেবল দীর্ঘ নিদ্রা হতে,জেগে উঠার পর আয়াতের মনে হল,মা আর কাকিমা তার শিয়রে বসে আছে।অদূরে দরজার কাছে খাবার প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে সুনিতা।ওকে দেখারর সাথে সাথে কেমন যেন খেঁকিয়্যে উঠলো মেয়েটি-দূর হ আমার সামনে থেকে দূর হ,যত দিন এ বাড়িতে আছি,আমার সামনে আসবি না তুই।মায়ের ইশারা পেয়ে খাবার থালা হাতে নিশ্চুপে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সুনিতা।চটপটে আর মিষ্টি মুখের মেয়েটির হঠাৎ এমন চুপসে যাওয়া আর নিরানন্দ ভাব যেন আরো বেশি বিষিয়ে তুলতে লাগলো ওকে।কাকিমা,ও কাকিমা কি হয়েছে গো?এমন কেন করছো তোমরা?ও…ওই যে সুনিতা,কেমন যেন পালটে গেছে গো!কেন গো?কেন?কাকিমাকে জড়িয়ে ধরে ফের ফুপিয়ে উঠলো আয়াত।
দ্যাখো দিকিনি পাগলি মেয়ের কান্ড!কিচ্ছুটি হয়নিরে কিচ্ছুটি হয়নি।এই যে দ্যাখ আমরা সবাই তো আছি,তোর পাশেই তো আছি,আমরা তোকে কত্ত ভালোবাসি!হঠাৎ করে তোর কাছে কেন যে এমন মনে হল তা কে জানেরে মা।ছাই পাশ যা ভাবছিস তা ঠিক নয়রে,ঠিক নয়।বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর ঘরে গেলে প্রথম প্রথম সবারই অমন একটু আধটু অভিমান হয় বৈকি।দুদিন গেলেই দেখবি সব কিছু ঠিক হয়ে গেছেরে পাগলি।তখন আর আমাদের কথা মনেই থাকবে না তোর।
কি ঠিক হয়ে যাবে কাকি মা?শুষ্ক ঠন ঠনে মুখে আয়াত এমন এক প্রশ্ন করে বসলো যে,কিছুটা থতোমতো খেয়ে উঠতে হল এ বাড়্রির ছোট গিন্নিকে।
ওমা!এত সময় ধরে মনটা তবে কোথায় বেধে রেখেছিলি রে হতভাগিনী?
এমন সময় পানের বাটা হাতে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এক বৃদ্ধা প্রবেশ করলো ঘরে।এক খিলি ছেচা পান মুখে পুরে দিয়ে বলে উঠলো কি আবার ঠিক হবে গো নাতী?নতুন বর,সংগে ঘর,বুঝলে গো সতীন?
সদ্য মুখে পোরা পান পাতার স্বাদে রাঙানো গালের ফোঁকলা দাঁতে খিলখিলি্যে হেসে দিলেন তিনি।
দাদীজান হলেন এ বাড়ির একমাত্র ব্যক্তি যিনি কথা ও কর্মে মানুষের মনের কালো মেঘ দূর করে দিতে পারেন মুহুর্তেই।তিনি যেমন রসিকতায় পটু তেমনি আর্কষনীয়াও বটে।ফলে দাদীজানের ব্যক্তিত্ব আর রসিকতা পূর্ণ কৌতুক সত্যিই যেন মেয়েটির ভাগ্যাকাশের মেঘ সরিয়্যে দিতে সক্ষম হল,আর তাই ফেটে যাওয়া শুষ্ক ঠোটে হাসি ফোটালো আয়াত,সেই সাথে অন্যরা।দাদীজানকে জড়িয়ে ধরে বিছানার ওপাশে নিঃশ্চুপে বসে থাকা মায়ের পানে চেয়ে আহলাদে গদগদ হয়ে বলে উঠলো বড্ড খিদে পেয়েছে,খেতে দাও দিকিনি।মেয়ের এমন দারাজ কন্ঠ শুনে মায়ের সজল চোখ জোড়া হতে জল গড়িয়ে পড়লো।এই প্রথমবার মেয়ের পানে চেয়ে সেও হেসে উঠলো।এতক্ষন দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে ছিল সুনিতা,ছুটে এসে বলে উঠলো-জো হুকুম জাহাপনা,জো হুকুম,খাবার রেডি।
একটু আগেও যার প্রতি প্রচন্ড রাগ আর অভিমান ছিল,এ মুহুর্তে তার এমন হৃষ্ট পুষ্ট আচরণে সব যেন উবে গেল।যাকে মন মরা আর গুমড়ো মুখো বলে মনে হচ্ছিল বাড়িতে ঢুকেই,সেই সুনিতাকেই যেন সব চেয়ে হাসি খুশি আর প্রাণবন্ত দেখতে পাচ্ছে সে।সত্যিই যেন ঠিক হয়ে গেল সব কিছু,আয়াতের মনে যেমন রইলো না আপনজনের প্রতি অভিমান,তেমনি হাসি খুশিতে ভরে উঠলো সারাটা ঘরময়।সুনিতা হাসছে দেখে যেন বড্ড শান্তি লাগলো আয়াতের মনে।হাসি তামাসার এ পর্যায়ে এসে,এই প্রথমবার স্বামীর কথা মনে পড়লো তার।
হাই!হাই! কি লজ্জারর কথা,এ বাড়ির মেয়ে জামাইর কি খবর গো?তার কি এখনো অব্দি কোন প্রকার তদারকি হয়েছে?মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো সে।
খান বাড়ির জামাই বলে কথা,সেকি আর যেন তেন আপ্যায়ন হবে গো নাতীন?তা বাপু এত দিনে বুঝি মনে পড়লো সখার কথা?মায়ের মুখে বুলি ফুটবার পূর্বেই,দাদীজান চটজলদী আর এক চামচ ঘি ঢেলে দিলেন লজ্জা রাঙা আগুনে।জ্বলে উঠার পরিবর্তে সে আগুন এবার চুপসে গেল।দাদীজানের কথায় চরম ভাবে লজ্জিত হল আয়াত।মেয়ের সাথে মাও লজ্জা পেল যেন।আর তাই আঁচলে মুখ ঢাকার ভান করে,বেঋয়ে গেল ঘরর থেকে।
কি যে বলেন না আম্মাজান!খাবার নালা মুখে পুরে দিতে দিতে বলে উঠলো কাকিমা।মিটি মিটি হাসতে হাসতে কোন এক বিশেষ কাজের ছুতোয় সুনিতাও বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
ওরে ছেমড়ি দাঁড়া দিকিনি,আমিও একটু তাড়ায় পড়েছি বটে।রসিকতা করতে করতেই দাদীজান বেরিয়ে গেল সুনিতার পিছু পিছু।ঘরে রইলো কেবল কাকি মা।ভাতের নালা মুখে পুরতেই হঠাৎ কিছু একটা মনে পড়লো আয়াতের।ফলে মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে মনের জিজ্ঞাসা চরিতার্থ করবার জন্য প্রশ্ন করে উঠলো,আচ্ছা কাকিমা ওই যে বড় রাস্তার ধারে,আসবার কালে একটা নতুন কবর দেখলাম গোরস্থানে,কে মরেছে গো গায়ে?
মরেছে?ক…ক…কই?ও হ্যা মরেছে শুনেছি,কিন্তু কে মরেছে সেটাতো জানিনে রে মা।
ভাতের নালা মুখে তুলে দেবার সময় কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠলো কাকিমার হাত,ফলে যা বোঝার বুঝে নিল আয়াত।কিছু একটা ঘটেছে নিশ্চয়,কিছু একটা লুকোবার চেষ্টা চলছে হয়তবা,কিন্তু কেন এমনটি করছে সবাই?নতুন কবরের কথা জিজ্ঞেস করতেই কাকিমার মুখটা অমন চুপসে গেল কেন?কে এমন মরল যে,আমার নিকট লুকোতে চাইছে তাকে?ও বাড়িতে যাবার পর বাবার সাথে কথা হয়নি একটি বারও।ইচ্ছে করেই কথা বলেন নি তিনি,বাড়িতে প্রবেশের পরও দেখা গেলনা তাকে,যদিও বাড়ির সকলের সাথেই দেখা হয়েছে ইতমধ্যে।
দূর কি সব ভুলভাল ভাবছি!বাবার কিছু হলে তো সবার আগে আমাকেই জানানো হত।
এমন সময় দেউড়ি ঘরর থেকে কারো কন্ঠ ভেষে এলো যেন,সে কন্ঠ চিনতে নিশ্চয় ভুল হলনা আয়াতের।তবে কে মরেছে গায়ে?
সবার অলখ্যে যে ধোঁয়াসা ভেসে উঠলো তার মন্নের চোখে,সেটি যেন কোন এক রহস্য ঘেরা পথের বাঁকে,উড়ে যেতে চাইলো শরতের মেঘের মত,অথচ বৃষ্টি এসে মুহুর্তেই তা নামিয়ে দিল ধরণীতে।
ভাতের নালা আর চিবোতে পারলো না আয়াত,কাকিমা ও কেমন যেন খাওয়াবার আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।ফলে উচ্ছিষ্ট অংশ সমেত,থালা হাতে কি এক ভাবনায় পতিত হয়ে,বিষন্ন চিত্তে বেরিয়ে গেল সে।
ধীর পায়ে বিছানা ছেড়ে,দক্ষিনের বন্ধ জানালা খুলে দিয়ে,দুহাতে লোহার গ্রীল চেপে ধরে,স্থীর দাড়ড়িয়ে রইলো আয়াত।

বিকেলের লাল সূর্য পেছনের ডোবায় তলিয়ে গেলে,সন্ধ্যে নেমে এলো।হাসনা হেনার তাজা সৌরভ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো সারাটা ঘরময়।যদিও থোকা থোকা ফুলের ডালি সাজিয়ে ফুল গাছটি জানালার পাশেই বেড়ে উঠেছে,তবুও বন্ধ জানালার বাধ পেরিয়ে,সৌরভ ছড়াতে পারেনি এতটা সময়।এখন ঢের প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছে বৃক্ষটি।হাসনা হেনার ঘ্রাণ নাকে আসতেই,কোন এক কল্প লোকের স্মৃতির তালে তালে নেচে উঠলো মন ফড়িং,দুচোখের স্বলজ্জ চাহনি বুঝতে বাকি রইলো না আর,মনে পড়ে গেল সুরেলা সুরে বাঁশি বাজানো পূর্নিমার প্রেম কুমারকে।আরো অনেক কিছুই মনে পড়ে গেল,অনেক কিছুই মনে আসতে চাইলো,কিন্তু কেন জানি ইচ্ছে করেই থমকে দাঁড়ালো সামনে এসে।অগ্রসর হল না আর,কেন যেন এগিয়ে এলো না দরজা ডিঙিয়ে।ফলে কিছুই দেখা গেল না আর,কিছুই দেখা যায় না দুচোখের দৃষ্টি সীমায়।যেন ইটের আস্তরনের পর্দা ভেদ করে,আরো গাঢ হয়ে নেমে এলো অন্ধকার!হঠাৎ এ অমাবশ্যা তিমির যেন বড্ড বেশি ভালো লাগতে শুরু করলো,ফলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে,মুহুর্তের মধ্যেই নিজেকে অদৃশ্যের মাঝে ছুড়ে দিল আয়াত।প্রগাঢ় প্রেম আর মমতায় সে নিশি যেন,বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরলো তাকে।এমন সময় একটি বিলেপী সুর ভেষে এলো হাসনা হেনার সুগন্ধি নিশিতে মাখামাখি কররে।অদূরে পড়শী ঘরের এক নারী কন্ঠিনী যেন!কিন্তু কে?ঠিক ঠাওর করতে পারলো না আয়াত।এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে,হঠাৎ সে কন্ঠিনীর ক্রন্দন ধ্বনি,সমস্ত পরিবেশকে থমথমে করে দিল মুহুর্তেই।কিয়ৎক্ষন স্থীর কর্ণপাতে,যে নারীর প্রতিচ্ছবি সে আবিষ্কার করলো,তা যেন মনের মধ্যে দুপ করে জ্বলে উঠে,ফের নিভে গেল অতল জলরাশির বুদবুদ উঠার ন্যায়।রাশি রাশি কালো ধোঁয়ার গন্ধ যেন,গা বেয়ে ঠিকরে পড়তে লাগলো,অগ্নিদগ্ধ বেনারশির আর্তনাদে।কিংকর্তব্য বিমূঢ় রেখায় দাঁড়িয়ে,ক্রন্দন রত অতিপরিচিত সে কন্ঠিনীর সুরে সুর মিলিয়ে,বিড়বিড়্ শব্দে উচ্চারিত হল আম্মার!

বছর পাঁচেক পূর্বের কথা,সেদিন তুলসী ডাঙার মেঠো পথ বেয়ে,সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়বার কিছু পূর্বে,স্কুল পড়ুয়া দুজন তরুন-তরুনী ফিরছিল বাড়ির পানে।স্কুলে আসা যাওয়ার জন্য কেবল ওই একটি মাত্র রাস্তা থাকার ফলে,এ গায়ের তাবৎ শিক্ষার্থীর পায়ে,রাস্তাটির ধুলো বালি জড়ায় সকাল বিকেল দুবেলা।হয়তবা কোন এক অজানা কারনে,সেদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গিয়েছিল উভয়ের।আগেই স্কুল শেষে বাড়ি ফিরেছে আয়াতের বান্ধবিরা।অন্য দিকে সিগারেট খোর অসাধু বন্ধুদের সঙ্গ প্রিয়তা,ফিরতে দেয়নি আম্মারকে।ফলে তাকেও বাড়ির পথ ধরতে হয়েছে একাকী এবং প্রায় অবর বেলাতে।
স্কুলটি ছিল পাশের গায়ে,দূরত্বও ছিল ঢের বেশি,মাইল তিনেক তো হবেই।আর এই সম্পূর্ণ পথটিই পাড়ি দিতে হয়,বিরাট এক মেঠো পথের বুক চিরে।যে বাইসাইকেলটি ছিল আম্মারের,তাতে চেপেই সে স্কুলে যেত প্রতিদিন,কিন্তু কেন জানি,সেদিন আর সংগে করে সাইকেলটি নেয়া হয়নি তার।আপর দিকে আয়াতের ও একটি সাইকেল ছিল।নষ্ট হবার দরুন আপাতত মেকার ঘরেই পড়ে আছে ওটি,ফলে হেঁটেই বাড়ির পানে রওনা দিতে হল তাকে।
অত্যন্ত চটপটে আর ডান পিঠে স্বভাবের ছেলে আম্মার।ইতরামী আর বাদরামীতে যেমন ওস্তাদ,তেমনি খেলাধূলা, অথবা কাজকর্ম কিংবা পড়ালেখাতেও কম যায় না সে।বেশ কিছু ভালো গুন থাকা সত্বেও,গায়ের বাজে ছেলেদের সাথে সখ্যতা থাকার দরুন,বলা চলে এ গায়ের সকল মেয়েরাই তাকে প্রচন্ড ভয় এবং ঘৃণা দুটোই করে।আয়াতের কাছেও আম্মার ছেলেটি অত্যন্ত বাজে আর অসভ্য হিসেবেই পরিচিত।যদিও অসভ্যতার তেমন কোন নজীর আজ অব্দি চোখে পড়েনি তার।কিন্তু আকষ্মিক ভাবে হলেও,সে শঙ্কা আজ বড্ড বেগবান হয়ে উঠলো যেন,কারন সেই অসভ্য ছেলেটিই কিনা এই অবর বেলাতে পিছু নিয়েছে তার!
দ্রুত পায়ে হেঁটে চলল আয়াত,আম্মার ঠিক তার পিছু পিছু।এক সময় লোকালয় ছেড়ে ফাঁকা মাঠের দিকে এগিয়ে এলো ওরা,এমন সময় পায়ের জোর যেন দ্বিগুন বেড়ে গেল আয়াতের।কিছু দূর চলবার পর,হঠাৎ আম্মারের মনে হল,সম্মুখের মেয়েটি এ মুহুর্তে প্রচন্ড রকমের ভয় পাচ্ছে তাকে।কেন জানি কিছু একটা ভান করে তৎক্ষনাৎ বসে পড়লো সে।বসেই রইলো শক্ত হয়ে,যতক্ষন না চোখের আড়াল হয়ে গেল মেয়েটি।এর পর ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে চলল আম্মার।বসে থাকার দরুন,খানিকটা দেরি হওয়ার ফাঁকে সন্ধ্যে নেমে এলো সূর্য ডুবিয়ে দিয়ে।হাঁটতে হাঁটতে মধ্য মাঠে এসে পৌছুলো আম্মার।এত ক্ষনে হয়তবা বাড়ি পৌছে যাবার কথা মেয়েটির,মনে মনে ভাবতে লাগলো সে।হঠাৎ দূরে কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়ালো,কিঞ্চিৎ চমকে উঠলো যেন।সাদা রঙের কিছু একটা পড়ে আছে ধুলো বালির মধ্যে।দৌড়ে নিকটে পৌছুতেই,বিষ্ময়ে হতবাগ হয়ে পড়লো আম্মার।
আরে এতো দেখছি সেই মেয়েটা!পা থেকে গলগল করে রক্ত ঝরছে যে!
পথ চলবার সময় অসতর্কতা বশত ধুলোর আড়ালে মিশে থাকা এক গুচ্ছ খেঁজুর কাটার আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে ওর ডান পায়ের পাতা।এমতা অবস্থায় বেশ কিছু দূর পথ চলেছে ও,বলা চলে অনেকটা হেঁচড়ে হেঁচড়ে।রক্তের ফোট ও দেখা যাচ্ছে হেচড়ে যাওয়া অংশে।কাছে এগিয়ে যেতেই, না না শব্দ করে মেয়েটি চিৎকার জুড়ে দিল।যদিও তীব্র যন্ত্রনায় প্রচন্ড রকমের কোকাতে লাগলো সে।থমকে দাঁড়ালো আম্মার।বোঝাবার চেষ্টা করেও বিন্দু মাত্র লাভ হল না যেন।অথচ গন্তব্য যে এখনো মেইল দেড়েক দূরে!তার উপর সন্ধ্যে নেমে এলো চারিপাশ অন্ধকার করে দিয়ে।প্রচন্ড রাগ আর ক্ষোভ মাথার মধ্যে চাড়া দিয়ে উঠলেও,নিকট প্রতিবেশিনীকে এমন বেহাল দশাতে ফেলে রেখে,চলে যেতে সাই দিল না মন।অথচ গো ধরে বসেই রইলো মেয়েটি,না শুনলো কোন কথা,না ভিড়তে দিল কাছে।এদিকে তজা রক্তে ভিজে যেতে লাগলো রাস্তার ধুলো।এ ভাবে চলতে থাকলে নির্ঘাত রক্ত শুন্য হয়ে মারা পড়বে মেয়েটি।কাল সকালের আগে এ রাস্তা দিয়ে আর কোন মানুষ যে যাতায়াত করবে না,তা একপ্রকার নিশ্চিত আম্মার।অথচ মেয়েটি যে দমবার পাত্র নয়!

বেশ কিছু সময় ধরে ধস্তাধস্তি চলল উভয়ের মাঝে।অবশেষে নিতান্ত বাধ্য হয়ে,এক চাপেটাঘাতে মেয়েটিকে ধরাশায়ী করে ফেলল আম্মার।একে একে দাঁত দিয়ে টেনে তুলল পায়ে ফুটে থাকা খেজুর কাটাগুলো।অতপর নিজের গায়ের জামাটি খুলে,পরম যত্নে ক্ষত স্থানটি বেঁধে দিল মেয়েটির।এসব কিছু করা সম্ভব হল কেবল,মেয়েটি সঙ্গাশূন্য হয়ে পড়বার দরুন।সন্ধ্যে যেন গভীর হয়ে,আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল রাতের অন্ধকারে।এমতাবস্থায় কোন প্রকার উপায়ন্তর না দেখে,মেয়েটিকে কাঁধে চেপেই গায়ে ফিরতে হল তাকে।
সঙ্গা ফিরে পাবার পর,আয়াত নিজেকে আবিষ্কার করলো তার বিছানায়,অর্থাৎ এখন যে ঘরে সে অবস্থান করছে।আক্রান্ত পাটি মোড়ানো রয়েছে,একটি ছেড়া,সাদা টি শার্ট দিয়ে।যে ছেলেকে নিয়ে এত কথা হয় স্কুলে,যাকে দেখলে এ গায়ের তাবৎ মেয়েরা থাকে দূরে দূরে,কেবল সুনিতা ছাড়া।ও নাকি কিচ্ছুটি ভয় কিংবা পরোয়া করে না ওকে।সবার চোখে ঘৃণিত সেই জঘন্য ছেলেটিই কিনা,সুজোগ পেয়ে ক্ষতি করার বিপরীতে,উলটো বিপদ থেকে উদ্ধার করলো তাকে!
সেদিনের পর থেকে একটু একটু করে কাছে আসতে থাকে দুজন।এ গায়ের লোকেদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো উভয়ের নাম।হঠাৎ সেদিন পাশের বাড়ির এক দূর সম্পর্কের আত্নীয়া,সামান্য কলহের ব্যপার নিয়ে,বাবা মায়ের সাথে প্রচুর ঠাট্টা বিদ্রুপ করলো তাকে নিয়ে।পিতার কাছে চরম অপমানীত হতে হল বাড়ির বাইরে যাওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ হল সেদিনের পর,পাত্র দেখা আরম্ভ হল তার জন্য।নিতান্ত বাধ্য মেয়ের মত সমস্ত কিছু ভুলে,বিয়ের প্রস্তুতিতে নিজেকে মানিয়ে নিল আয়াত।ফলে হুট করেই সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেল আম্মারের সাথে।

মাত্র কয়েকদিন পূর্বে,গভীর রাতে জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো আম্মার।ইতপূর্বে যে আসত না তা কিন্তু নয়,দুজনের মাঝে নিভৃতে্র এই সাক্ষাত পর্বটি চলছে প্রায় বছর পাঁচেক।আয়াতের সাথেই শুয়ে ছিল সুনিতা,অবশ্য ঘুমিয়ে পড়লে আর জগতের খবর থাকে না ওর কাছে।যাইহোক বরাবরের মত যে আচরণ সে রাতে আশা করেছিল আম্মার,আকষ্মিক ভাবে ঠিক তার উলটো ব্যবহার পেতে হল তাকে।ইচ্ছে করেই এমনটি করলো আয়াত।কিছু একটা আঁচ করতে পেরে,সে রাতে কেবল একটি বাক্য শুনবার জন্য বড্ড পিড়াপিড়ি করতে লাগলো আম্মার।নিতান্ত ভিক্ষুকের মত বারবার অনুরোধ করে গেল,শুধু একবার বলো ভালোবাসো আমায়,শুধু একবার বলো।চলে যাব আমি,আর কখনো আসব না তোমার সম্মুখে,দিব্বি করে বলছি জ্বালাবো না আর কখনো,ভুলে যেতে বলছো যখন,সত্যি ভুলে যাব,সব কিছু ভুলে যাব।শুধু একবার বলো……
অথচ কেন যেন,নরম হওয়ার বিপরীতে আরো বেশি শক্ত আর কঠিন হয়ে গেল আয়াত।প্রচন্ড রেগে গিয়ে সাফ সাফ জানিয়ে দিল,আমি তোমাকে ভালো বাসি না,ভালো তোমাকে কোন দিন বাসিনি,যা করেছি কেবল অভিনয় করেছি,আর ভালো কখনো বাসতে পারব না।বাবা মা পাত্র দেখেছেন মার জন্য,পাত্রকে আমার ও ভালো লেগেছে বটে,ফলে সাত পাঁচ ভাববার সময় নেই আমার।তুমি এখন আসতে পারো।

সে রাতের অতি তেতো কথা গুলো মনে পড়তেই কিছুটা হোঁচট খেল আয়াত।এত বড় প্রতারনা সে কারো সাথে করতে পারে,এমন কি করতে পেরেছে,এটা ভাবতেই ঘৃণা জন্ম নিল নিজের প্রতি।লুকিয়ে রাখা কলঙ্ক ছাপিয়ে,ভাবনারা আর পথ চলতে সক্ষম হল না।ফলে এখানেই যেন বিশ্রাম নেবার জন্য থেকে যেতে হল কিছু সময়ের জন্য।অতপর দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিয়ে,আবার অতিতের পানে পথ চলতে শুরু করলো আয়াতের অন্তরাত্নার ম্যাপ ধরে ধরে।ভাবনাদের বলয় ভেদ করে,কোন এক চির চেনা মুখ সামনে এসে দাঁড়ালো।সে মুখে না আছে হাসি,না আছে বাক্য কিংবা দূরন্তপনা।কিছু একটা বলতে চাইলো যেন,কিন্তু বিবাহের পিড়িতে বসে থাকা নব বধুর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল না কোন ক্রমেই।অবহেলার চরম বিপর্যয়ে পতিত হয়ে,ভাঙা মন নিয়ে অন্ধকার মেঘের মত আকাশের নীল ডিঙিয়ে সহসা দূরে চলে গেল মুখখানি।

বিদ্যুৎ চলে যাবার ফলে,গুমোট অন্ধকার ঠেকাবার জন্য সন্ধ্যে বাতী হাতে আগমন ঘটলো সুনিতার।হঠাৎ আলো হাতে বোনের আগমনে সচকিত হয়ে উঠলো আয়াত।এখনো হাসির রেখা ফুটে রয়েছে সুনিতার চোখে মুখে।পাশের টেবিলের উপর সন্ধ্যে বাতী রেখে বেরিয়ে যাবার জন্য উদ্যত হল সে,এমন সময় পশ্চাৎ থেকে হাত চেপে ধরলো আয়াত।
বোন আমার জানিস?কি যেন হয়েছে আমার,মনের মাঝে কে যেন এসে বার বার আর্তনাদ করে উঠছে ক্ষণে ক্ষনে,কেন যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি আমি!আচ্ছা সুনিতা বলতে পারিস,কি হয়েছে আমার?আমি উন্মাদ হয়ে যাচ্ছি নে তো?
বড় বোনের মুখে হঠাৎ এমন অস্বাভাবিক কথা শুনে,কিঞ্চিৎ চমকে উঠে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে,ফের বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল সুনিতা।মুহুর্তেই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে উঠলো ওর মুখ খানা।
এই তো হাসি খুশি ছিলি তুই,কি এমন বললাম যে,হঠাৎ মুখ খানা অমন পেঁচার মত কালো হয়ে গেল?আরো শক্ত করে হাত চেপে ধরে বলল আয়াত।বোন আমার বল না কি হয়েছে?কেন এমন হচ্ছে আমার?আমি যে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারছি নে।
বোনের এমন করুন আকুতি শুনে,নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না সুনিতা।ধীরে ধীরে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো হাত দুখানি ছাড়িয়ে নিয়ে।সজল দুটি চোখ জলে ভরে উঠলো যেন।ফের বড় বোনের হাত ধরে বলে উঠলো-ও কথা জানতে চাসনে বুবু,জানতে চাস নে,সইতে পারবি না।তার চেয়ে ঢের নায়র শেষে শ্বশুর বাড়ি ফিরে যা।ভালো থাকবি তুই,সুখে থাকবি।
-কিন্তু আমায় যে জানতেই হবে সেই অজানা কথা?নইলে যে শান্তি পাব না কোন মতে?
-খামখা জীদ করিসনে বুবু,কিচ্ছুটি বলতেপারব না আমি।কিঞ্চিত রেগে গিয়ে,জানালা থেকে সরে,পালঙ্কের পাশে দাঁড়ালো সুনিতা,ধপাস করে বসে পড়লো বিছানায়।
-কিন্তু তোকে যে বলতেই হবে ছোট,দোহায় লাগে তোর বল না কি হয়েছে?
-ঠিক আছে জীদ যখন ধরেছিস,তবে তোর কথায় রইলো,শোন তাহলে আসল ঘটনা-তোর বিয়ের দিন,বর যাত্রি এসে পড়েছে,লাল বেনারশী পরে এ ঘরেই বসে ছিলি তুই।একটু পরেই তোকে নিয়ে চলে যাবে নতুন বর।আমিও বসে ছিলাম তোর পাশে।হঠাৎ জানালার পাশে এসে দাঁড়ালো আম্মার ভাই।অনেক অনুনয় বিনয় করে,ইশারা দিয়ে একটু সময় চাইলো আমার কাছে।আমি দরজার ও পাশে অর্ধ খোলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে,তোকে দেখবার জন্য একটু সময় করে দিলাম।তুই ছিলি অন্য জগতে,তাই খেয়াল করিস নি ওকে।আড়াল থেকে সব কিছু নিরিক্ষন করছিলাম আমি।ও যেন এক দৃষ্টে চেয়ে ছিল তোর পানে।অথচ ভ্রুক্ষেপ পর্যন্ত করলি না তুই!খুব কষ্ট পাচ্ছিলাম আমি,কারন মনে মনে বড্ড ভালোবাসতাম ওকে।তোর সাথে ওর সম্পর্কের কথা জানতাম বলেই,নিশ্চুপ থেকেছি সব সময়,কারন আমি যে তোকেও ভালো বাসি।বহু রাত তোদের গল্প করতে দেখেছি জানালার গ্রীল ধরে।সব কিছু জানতাম অথচ বুঝতে দেইনি তোকে,এমনকি বাঁধা হয়ে দাঁড়াইনি মনের মানুষ হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে।বিয়ের দিন ফের আঘাত প্রাপ্ত হয়ে আম্মার ভাই যখন চলে যাচ্ছিল,দূর থেকে ওর হাতের মুঠিতে কিছু একটা দেখতে পেয়েছিলাম আমি।তৎক্ষনাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে,বাড়ির পেছনের বাগানে দৌড়ে গেলাম,কিন্তু হাই!আর দেখা গেল না ওকে,কোথাও দেখা গেল না।সব কিছু ফেলে ছুটে গেলাম ওর বাড়িতে।সেখানেও দেখতে পেলাম না।কুলোয় ফেলে ধান ঝাড়ছিল ওর মা,বাঁশের চটা দিয়ে মুরগীর ঘর বানাচ্ছিল ওর বাবা।আমায় দেখে কাকিমা ছুটে এসে বলল-ও মা!এ অসময়ে এ বাড়িতে কেনরে মা?শুনলাম আয়াতের আজ বিয়ে,বর যাত্রি এসে গেছে বোধহয়।তা হ্যারে মা জামাই দেখতে কেমন রে?আমার আম্মারের মত অমন লম্বা চওড়া সুপুরুষ হবে তো নিশ্চয়?
কোন প্রকার রাকঢাক না করেই সোজা প্রশ্ন করে বসলাম কাকিমা আম্মার ভাই কই?
-কেনরে মা কোন দরকার পড়েছে বুঝি?এদিকেই তো ছিল এবেলা,একটু আগেই বাপের পকেট থেকে টাকা নিয়ে কোথায় যেন গেল।জানিসরে মা,ইদানিং কি যেন হয়েছে ছেলেটার।খায় না,নায় না,রাত করে ঘরে ফেরে,কিছু বললেই কেমন যেন খেকিয়ে ওঠে।
-কাকিমা!
-ও…ও..আচ্ছা,তাড়া আছে বুঝি?তুই তাহলে যারে মা,আম্মার বাড়িতে এলে পাঠিয়ে দেব ওকে।
সে সময় কাকিমাকে কিছুই বলতে পারলাম না আমি,বলতে যেন সাহসই পেলাম না।বুকের মধ্যে যেন খুচে যেতে লাগলো,তেষ্টায় ফেটে যেতে লাগলো বুকের ছাতিটা।
-কাকিমা এক গ্লাস পানি হবে গো?
-শোন দিকিনি পাগলি মেয়ে্র কথা,এ..এ..এই এখানে বস,এক্ষুনি দিচ্ছি,ফিলটার জল এনে দিচ্ছি।আমার আম্মার কি সব পাথর দিয়ে বানিয়েছে ওটা।
-কাকিমা তাড়া আছে গো,একটু জলদি দাও?
-আচ্ছা দিচ্ছি গো মা দিচ্ছি।কাকিমা ভেতর বাড়িতে চলে গেল জল আনতে।কেন যেন তর সইছিল না আমার,প্রাণটা ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছিল এদিক-সেদিক।এক দন্ড স্থীর থাকতে পারলাম না আর।দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম ওদের বাড়ি থেকে।পিছু পিছু পানির গ্লাস হাতে বেশ কিছুদূর ছুটে এলো কাকিমা,কিন্তু আমার নাগাল পেল না।বিড়বিড় করে কি যেন বলে উঠে,গ্লাস হাতে ফের বাড়িতে ফিরে গেল সে।আমি সোজা ছুট দিলাম মাঠের পানে,হিজল তলার দিকে,যেখানে প্রায়ই বসে থাকতে দেখতাম ওকে।কিছুদূর যেতেই দেখতে পেলাম,বাড়ির পানে হেঁটে আসছে আম্মার ভাই,হাতে সেই প্রিয় বাঁশি খানা।ইতপূর্বে দেখা ছোট্ট সেই প্যাকেট খানা এখন আর নেই ওর হাতে!ছুটে গিয়ে সামনে দাঁড়ালাম,অবাক বিষ্ময়ে নিরিক্ষন করতে লাগলাম ওকে।ওর চর্তুপার্শ্বে ঘুরতে লাগলাম আমি।আচমকা হাত খানি ধরে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠলাম আম্মার ভাই!এ আপনি কি করেছেন?নিতান্ত অবজ্ঞা ভরে ও আমায় দূরে ঠেলে দিল,যদিও কোন দিন ভালোবাসার কথা বলা হয়নি,কিন্তু কেন যেন ও বুঝতে পারতো আমার মনের কথা।তাই বলে উঠলো ভালোবাসা?কেমন যেন জড়ানো প্যাচানো ভঙ্গিতে কথা বলছিল সে সময়।কথা বলতে বড্ড কষ্ট হচ্ছিল ওর।বার বার হেঁচকি উঠছিল।শত বাধা দেয়া সত্বেও,ওর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলাম আমি,একদম ওর বাড়ি অব্দি।বড় রাস্তার দিকে হই হুল্লোড় শুনে,একবার তাকিয়ে দেখলাম তুই চলে যাচ্ছিস।চোখ মুখ ফুলে গেছে তোর,বড্ড কেঁদেচিস বোধ হয়,উকিঝুকি দিয়ে কাউকে যেন খুজছিস।আমি জানি সেদিন তুই আমাকেই খুজছিলি।কিন্তু বিশ্বাস কর বুবু,তোর কাছে যাবার কোন আগ্রহই তখন ছিল না আমার।

বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়াতেই ধপাস করে পড়ে গেল আম্মার ভাই।মুখ দিয়ে ফেনার মত কিছু একটা বেরিয়ে এলো,সেই সাথে বেরিয়ে এলো তীব্র ইন্ডিনের গন্ধ!ঘর থেকে ছুটে এলো কাকিমা।হাতের কাজ ফেলে খামার থেকে দৌড়ে এলো চাচাজান।দুঃসাহসিক রাজপুত্রটি তখন একদৃষ্টে মায়ের দিকে তাকিয়ে,হঠাৎ আমার হাত শক্ত করে চেপে ধরে,হাসতে হাসতে সহজ সরল ভঙ্গিতে বলে উঠলো,আমি বিষ খেয়েছি মা,আমি বিষ খেয়েছি!গো গ্রাসে ধোক গিলতে শুরু করলো যেন,দুনিয়ার তাবৎ তৃষ্ণা এসে বাসা বাধলো ওর বুকের মাঝে।ততক্ষনে মায়ের আত্নচিৎকারে ভারী হয়ে উঠলো এ গায়ের আকাশ বাতাস।চিৎকার করতে করতে আপন বক্ষে হাত চাপড়াতে চাপড়াতে ডাক্তার খানার দিকে দৌড় দিল চাচাজান।আমি কেমন যেন সঙ্গা শুন্য হয়ে পড়েছিলাম ওর হাতের স্পর্শ পেয়ে,হঠাৎ ঘোর কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই,লক্ষ্য করি দুহাতের চাপেটাঘাতে ছেলেকে ধরাশয়ী করে ফেলেছে কাকিমা।ওর মায়াময় মুখের পানে চেয়ে দেখি,এখন আর সে হাসি নেই ওই মুখ খানিতে।জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে না ও।আমার হাত চেপে ধরা শক্ত মুঠিখানি ঢিল হয়ে মাটিতে এলিয়ে পড়েছে ততোক্ষনে…..
তখনো ছেলের মুখে ও বুকে সজোরে আঘাত করে চলেছে কাকিমা।কিন্তু হাই!ও দেহ যে কেবল নিঃষ্প্রাণ এক দেহ মাত্র!
-তবে কি গোরস্থানের নতুন কবরটি?
বড় বোনের প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারলো না সুনিতা।বাক রুদ্ধ হয়ে পড়লো যেন মেয়েটি।কেবল ফুপিয়ে কেঁদে উঠে,ঘর থেকে বেরিয়ে গেল দ্রুত পায়ে।
এখনো পড়শি ঘর থেকে কারো উন্মাদ চিৎকার আর ক্রন্দন ধ্বনি ভেষে আসতে লাগলো আয়াতের কানে।পড়শি ঘরের সে মহিলাটি যে আম্মারের পাগলী মা!পুত্র হারা মা জননী শোক সইতে না পেরে,স্মৃতি হারা হয়ে পড়েছে সেদিন হতে।
হারাবার যন্ত্রনা সইতে না পেরে যে মেয়েটির জন্য কেউ একজন প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিয়ে গেল হাসি মুখে,কেন যেন এক ফোটা জল বেরিয়ে এলো না সেই মেয়েটির নিঠুর চোখ জোড়া বেয়ে।
১০
নায়র শেষে স্বামীর ঘরে ফিরে যাবার পালা এলো অবশেষে।এ কয়েকদিনে আয়াতের মধ্যে কোন দুঃখ বোধ,কোন যন্ত্রনা বোধ পরিলক্ষিত হতে দেখা গেল না ঠিকই,কিন্তু সকলের সাথে সাক্ষাত হওয়া সত্বেও যেমন ভ্রুক্ষেপ সে করলো না কারো প্রতি,তেমনি একটি কথাও কইলো না কারো সাথে।খুব সম্ভবত তীব্র অপরাধ বোধ থেকে,স্নেহ আর ভালোবাসা নিয়ে,মেয়েটির সামনে পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়াতে সক্ষম হল না আয়াতের পিতা।কারন সে খুব ভালো করেই জেনে গেছে,তাকে আর হয়তবা কোন দিন ক্ষমা করা হবে না।
অত্যন্ত বিচক্ষন একটা মেয়ে সুনিতা,আর তাই সেই সন্ধ্যের পর হতে,তার মুখের প্রতিচ্ছবিতে লেগে থাকা কালিমা দেখতে পাওয়া গেলনা আর,বিশেষ করে আয়াতের সম্মুখে এলে।
বিদায়ের প্রাক্কালে পরিবারের লোকেরা বেশ কিছুদূর এগিয়ে দিয়ে আসলো আয়াতকে।রাস্তায় চলবার সময় পড়শি বাড়ির ঝি বউয়েরা সেই সেদিনের মত আজো উকিঝুকি দিয়ে দেখতে লাগলো ওকে।আজ আর রাগ বা অভিমান হল না তাদের প্রতি,কেবল মিটিমিটি হেসে গেল ঝি বউদের দেখে,যেমনটি প্রথম দিন হেসেছিল তারা।সে আসলে বোঝাতে চাইলো যে,আমার কোন দোষ কিংবা দায়বদ্ধতা নেই,তা ছাড়া আমিতো কাউকে জীবন দিতে বলিনি,বেশ তো সুখি হয়েছি আমি,এই যে,এইতো আমি,নায়র শেষে স্বামীর ঘরে ফিরে যাচ্ছি,হাসি মুখেই তো চলে যাচ্ছি।কিছুদূর যেতেই বাপের বাড়ির লোকেরা বাড়ির পানে ফিরে গেল বিদায় দিয়ে।অদূরে সুনিতা তখনো দাঁড়িয়ে রয়েছে।
স্বামীর হাত ধরে এ গায়ের নতুন কবর খানি পেছনে ফেলে বড় রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালো আয়াত।হঠাৎ এক বুক নিঃশ্বাস নিয়ে কোন কিছুর গন্ধ শুকলো যেন।পেছনের গোরস্থান থেকে খুশবু ঘ্রাণ ছুটে এলো সেই সেদিনের মত।কেউ হয়তবা সেখানে আতর ছিটিয়ে দিয়েছে নতুন করে।অবশ্য নতুন কবরটি এখন আর নতুনটি নেই,কিঞ্চিৎ পুরোনো হয়েছে বটে।খেজুর পাতা গুলো শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।দুচারটেঘাস জন্ম নিতে শুরু করেছে আলো মাটির বুকের উপর।সেদিনের মত আজো কানের কাছে কে যেন হাওয়ার বেগে ছুটে এসেকিছু একটা বলে গেল,আচমকা অন্য এক দমকা বাতাসে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুনিতার দিকে উড়ে গেল কন্ঠস্বরটি।তবে আজ আর সে কন্ঠস্বর চিনতে ভুল হলনা আয়াতের।এক ঝাটকায় নিজেকে স্বামীর হাত থেকে ছুটিয়ে নিয়ে,বাতাসে মুখ লাগিয়ে,খিল খিল করে হেসে উঠে বলে উঠলো আমি আসছি আম্মার,আমি আসছি।ওর তীব্র হাসি আর গগণ বিদারী চিৎকার ছড়িয়ে পড়লো এ গায়ের আকাশ-বাতাস ছাড়িয়ে দূরে,বহুদূরে।উন্মাদিনি অট্টহাস্যে,অর্ধ উলঙ্গের ন্যায় পড়িমরি করে,গোরস্থানের সেই নতুন কবরটির দিকে ছুট দিল আয়াত।তার পিছু পিছু ছুটে চলল প্রাণপ্রিয় স্বামী,যার জন্যে অতি সংগোপনে নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিল মেয়েটি।সেই সাথে ছুটে এলো অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা বোন সুনিতা।কারন মেয়েটির অন্তরাত্নার ব্যথা কেউ না দেখতে পেলেও এই দুটি মানুষ ঠিক ঠিক দেখতে পেয়েছিল যেন।অথচ মানুষকে কখনো সখনো নিশ্চুপ আর নিতান্ত অপরাগ হয়েই থাকতে হয়।
আম্মারের মা যেমন আর কখনো সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি,তেমনি আয়াত।ছেড়া ফাড়া বস্ত্র পরিহিত,উশকো খুশকো চেহারার,শেকলে বাধা স্মৃতি হারা উন্মাদিনী সেই মেয়েটির মুখে,অস্ফুট স্বরে জীবনের শেষ নিঃশ্বাস অব্দি,কেবলমাত্র একটি নাম দিবা রাত্র ধ্বনিত হয়েছিল,আম্মার,আম্মার…….

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement