লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৯ এপ্রিল ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ১২টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০৬

বিচারক স্কোরঃ ২.২৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ঘৃণা (সেপ্টেম্বর ২০১৬)

গরাদ গলা হাত
ঘৃণা

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০৬

অর্বাচীন কল্পকার

comment ২  favorite ০  import_contacts ৫১২
চোখ খুলতেই একমুঠো অন্ধকারে চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো। আমি সচরাচর চোখ খুলি না। এই বিদঘুটে অনুভুতির প্রতি অগাধ ঘৃণা থেকেই হয়তো এই মহান সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি।
কি জানি? কে ই বা জানে?
আসলে যেই জগতে জানার কোন শেষ নেই, সেখানে জানার চেষ্টা আমার কাছে বৃথা ঠেকতো। আর এত বড় একটা মিছে কথাকে অসহ্য লাগতো বলেই আসলে জানার পুড়িয়াতে আগুন জ্বালাইনি।
মানুষ সব জানতে পারে। সত্যি কথাটা বলি চুপি চুপি?
আসলেই সব জানা যায়। সব জ্ঞানেরই শেষ আছে। তবে জ্বলজ্বলে চাঁদের কলঙ্কের মতো জ্ঞানও কলঙ্কপূর্ণ হতাশায় কলুষিত। সেটা হচ্ছে মানুষ একমাত্র নিজেকে জানতে পারে না। আসলে কেউ চেষ্টাও করে না- যাকগে এসব প্রলাপ!
দু’হাত দিয়ে জোর খাটিয়ে ঠেলে অন্ধকার দূরে সরালাম। অন্ধকারটা চোখে সয়ে আসতেই চোখে পড়লো সময়গুলোকে।
একগাদা নোংরা বাজে সময় মেঝের ধুলোয় লুটিয়ে পড়ে আছে মরা ইঁদুরের মতো।
বহুকাল আগেও একটা সময় ছিল। সেই সময়টা এই সময়টার চেয়ে কিছুটা হলেও ভালো থাকার কথা।
সময়!
সময়ের কথা আসলেই চোখের সামনে ১২টা সোনালী ডায়ালের ছবি ভেসে উঠে। একে ঘিরে থাকা মরচে পড়া একটা ফ্রেম। তেল চিটচিটে আঙুলের ছোপে ঘোলা হয়ে পড়া কাচের ভিতর থেকে সেগুলো নানান ভঙ্গিমায় আমার দিকে করুণার ভ্রুক্ষেপ করে।
ঘড়িটা সযত্নে বুকের ডান পকেটে রাখা থাকে। সেই বহুকাল আগে একটা সময় ছিল না? সেই তখন থেকেই। অবশ্য সবসময় ডান পকেটে রাখা মুশকিল!
এখানকার শার্টগুলোতে কয়েকটাতে মাত্র ডানদিকে পকেট। বাকিগুলো বামদিকে সেলাই করা। আমার পকেট থেকে প্রায়ই দেখা যায় একটা দুইটা লেজ ঝুলে আছে!
দর্জি হারামিটা তাড়াহুড়োয় বুকের মাঝে বেখাপ্পা পকেটগুলো স্রেফ নামে মাত্র সেঁটে দিয়েছে।
আসলে আমার কোন কিছুই যত্নের খাতিরে পড়ে না। এই বিশাল রুমটা আমার জন্যে বরাদ্দ; সেটাও অযত্নের চাপে পিষে চিরে চ্যাপ্টা। মেঝে ভর্তি কিছু পুরনো আমলের ছবির রিল।
ভাঙা কাপ- যেটার তলানিতে এক চুমুকের মতো চা ধরবে কিনা সন্দেহ হয়।
রুমভর্তি একটা বোটকা একাকিত্ব।
রুমটার তিন পাশেই দেয়াল। আর এক পাশে সারি সারি গরাদ। যার ঠিক নিচে মাঝ বরাবর আমার দেহের আধা সাইজের মোটামুটি চওড়া মাপের একটা মাত্র দরজা।
দরজাটা অনেক কালের স্মৃতি নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে; সেই বহুকাল আগের একটা সময় থেকে।
সময় এক একাকি পথিক। যার প্রতি পদক্ষেপ তাজা থাকে অতীতের তেপান্তরে। সেটাকে আমরা মিষ্টি নামে আদর করে ডাকি স্মৃতি।
সেই স্মৃতিরা দরজার গরাদের আশে পাশে ঘনবসতিপূর্ণ কলোনীর ধুলো জমিয়ে আছে। তার থুতনিতে আবার সুদৃশ্য গোঁফের মত একটা তালা ঝুলে আছে।
দিনের বেশির ভাগ সময়ই দুটো ময়লা হাত ঝুলে থাকে গরাদের ফাঁক গলে, পরম আলস্যে।
আগে হাতগুলো এতো অলস ছিল না। প্রথম প্রথম সমস্ত জোর খাটিয়ে তালাটাকে পাশবিক টানা হেঁচড়া করে নজর দিলাম গরাদে। মাঝরাতে যখন ভূত পেত্নীরা বিশাল ঝাঁকড়া বটগাছে পা দুলিয়ে গাড় আতঙ্ক নামিয়ে আনত, ঠিক তখন আমার হাতগুলো লোহার গরাদে আঁছড়ে পড়তো।
একগুয়ে দুটো হাত ভোরের আগে আগেই নিথর হয়ে যেত। আর গরাদ বেয়ে চুয়ে পড়তো লালচে কালো অশ্রু।
কিছুকাল পরে সেটাকেও ক্ষান্ত দিলাম। তবে ঠিক তখনই হাতগুলো অলস হয়ে পড়েনি।
সেটা হয়েছিল আর অনেকটা সময় পরে।
********************
“এই ছোটন দাঁড়াও দাঁড়াও, আমি আর ছুটতে পারব না”।
“মাত্র এতটুকুতেই হাঁপিয়ে উঠলে? তুমি খুব অলস আর দুর্বল।আরো দূর যেতে হবে, থামলে হবে না”।
আমি তখন ক্লান্ত। ক্লান্তি ভর করলে আর দাঁড়াতে পারি না। সটান আকাশের দিকে তাকিয়ে শুয়ে পড়লাম মাঠে।
বাড়ির পিছনের দিকটায় এই মাঠ। বিশাল এই মাঠজুড়ে ছোট ছোট ঘাস আর মাঝে মাঝে কিছু লতাগুল্ম উঁকি দিয়ে আছে। এই মাঠে সাধারণত কোন মানুষজন আসে না। বলতে গেলে বিশাল বিরানভূমির হাহাকের মাঝে আমি আর ছোটন একচ্ছত্র আধিপত্যে ছুটে বেড়াই।
ছোটন আমার খুব ছোটবেলার বন্ধু।
নাছোড়বান্দার মতো ছোটন আমাকে আবার উঠে দাঁড়াতে বলে। আসলে ওকে কখনো বোঝানো সম্ভব নয় দু’পায়ের ক্লান্তি কিরকম মারাত্মক!
ওর কথায় কান দেবার মতো শক্তি নেই আমার। বিশ্রামের নেশায় অবসন্ন হয়ে পড়ে থাকি চোখ বুঁজে।
আর মাথার পাশে তিড়িং বিড়িং করে উড়তে থাকে ছোটন। মাঝে মাঝে ওর প্রতি আমার ঘৃণা হতো। ওর মতো এক জোড়া পাখা থাকলে আমার মনে হয় না প্রকৃতির কোন সমীকরণে গণ্ডগোল হতো!
একটা দুরন্ত ফড়িংয়ের কাছে হার মানাটা সত্যিই অপমানজনক!
****************
হালকা বাতাসের মৃদু ধাক্কায় একদলা কাগজ গড়াগড়ি দিয়ে আমার পায়ের কাছে থমকে দাঁড়ায়।
সেটাকে হালকা লাথি মেরে গরাদ গলে বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। সামান্য একটা কাগজ হলেই হতো। পৈশাচিক কারার কপাটকে ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা এই মানুষটার মাঝে হাতড়ে খুঁজে পাওয়া গেলনা এতো সময় পরেও।
দক্ষিণের দেওয়ালটার দিকে তাকিয়ে আছি অনেক্ষণ হলো। যদিও এর মাঝে তাকিয়ে থাকার মতো বিশেষত্বের কিছু নেই।
জায়গায় জায়গায় আনাড়ি চুনকামের বেঢপ ছোপ।
প্রায় খসে পড়া সিমেন্টের ছাপ। ছোট একটা বাচ্চা হাতের চিহ্ন।
প্রায় শেষ হতে হতে না হওয়া সহজ একটা অঙ্ক।
একগাদা নাম। রাসেল, হীরা, মইনুদ্দি, ইয়াজ, সাবের......
হয়তো এরকম আরো কয়েকটা নাম ছিল। হীরা নামের বানানটা আবার ভুল।
আর দেওয়াল জুড়ে ছড়িয়ে আছে কিছু শব্দ। লেপ্টানো নিবের কালি দিয়ে অদ্ভুত নকশাকাটা আঁকিবুঁকির শব্দ না। ভাঙা গোঙানির মতো আবছা ধ্বনি। দূর থেকে যেটা কেউ বুঝতে পারবে না। খুব কাছে যেয়ে দেওয়ালটায় কান পাতলেই সেটা পরিষ্কার বুঝে আসে।
কখনো কখনো সেটা শুধুই বাতাসের শোঁ শোঁ। আবার কখনো সেটা ছন্দকাটা বিলাপ; অথবা আনমনে আলাপ। কেউওবা স্বপ্ন ডেকে আনে অবসরে। কেউ আক্রোশে শাসায় কাউকে। কারো কারো জন্যে শব্দগুলো মুখ ফুঁটে বের হয় না শেষমেশ।
সেটা চোখের পাপড়ির দিঘীতে উপচে পড়া জলকেলি; এক নির্মম মুক্তিতে গড়িয়ে পড়ে।
এক হাজার আফসানার মতো এরা কখনো বদলায় না। গল্প না বদলালেও বদলে যায় গল্পকার।
দেওয়াল এর একপাশ জুড়ে চকের সাদা দাগের কাটাকুটিতে বিদঘুটে কয়েকটা তৈলচিত্র চিত্রিত হয়ে আছে।
এর মাঝে বাচ্চদের মতো করে এক টানে আঁকা সাদা ফুলটা দেখা যাচ্ছে!
************************
ঘনঘন নাক চুলকাচ্ছিলাম আমি।
কারো দিকে কেউ টানা হাবার মতো তাকিয়ে থাকতে পারে না। কেউ কিছুক্ষণ পর পর এদিক ওদিক তাকায়, কেউবা আপাদমস্তক আনমনে চোখ বুলায়।
একদল আমার মতো নাক চুলকায়। একদল খুক খুক করে কাশে। আবার যারা কিছুই করে না, তারা মন চুলকায়। মনের ফোঁড়া থেকে ফোয়ারার তালে তখন কল্পনাগুলো জেগে উঠে।
গটগট করে লিখে যাচ্ছিল সে। লেখার সময় তার চোখগুলো কোটর থেকে বেরিয়ে আসে। একটু পর পর জিহ্বাটা বের হয়ে শুকনো ঠোঁটকে ভিজিয়ে দেয় হালকা করে।
একাকী মানুষের গল্প একক অভিনয়ের মতো তালকাটা রাগিণী। গল্পে পূর্ণতা দেয় আনন্দ, বিষাদ, ভালোবাসা, ঘৃণা, ক্রোধ, ভীতি! একাকীর এগুলো থাকার কথা নয়। তাই গল্পটাও কচলানো লেবুর মতো তিতকুটে হতে থাকে। সেই ভয় থেকেই কী না জানি না, লেখক কলম থামিয়ে আমার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আমায় দেখছিলেন। একটু পরই তার ঠোঁটের কোণায় সূক্ষ্ম মুচকি হাসি ফুটে উঠে। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
তিনি নিচু হয়ে কাগজে আবার কিছু লিখলেন। তারপর কাগজটা আমার দিকে ঠেলে দিলেন।
চারকোণাকার প্রেসক্রিপশনের মাঝে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছোট্ট একটামাত্র শব্দ- ‘অরুণিমা’।
*********************
অরুণিমা? চার অক্ষরের সুন্দর একটা নাম। বেহালার চিকন সুরের মতো যেটা আমার মনের ভিতরে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল।
লেখককে তার ভিজিটটুকু মিটিয়ে দিতে আবার আয়তাকার কাগজে ডুব দিতে হলো।
সাদা পরীর মতো ও অপরূপ সুন্দরী নয়; মোটামুটি রকমের। কিন্তু আকাশের রঙধনুর সাতরঙা সাঁকোটার মতো ওকে একেক সময় একেক রকম লাগতো। বহুকাল শুকনো প্রান্তরে ছোটার পর সঞ্জীবনীর মতো চমৎকার একটা কল্পনা।
নতুবা কিশোরীর হাতের রাঙা মেহেদির মতো।
গেরস্তের দেউরীর অচেনা আলপনা কিংবা দূরের উড়ে যাওয়া ফড়িংয়ের মতো। ভেজা মাটিতে বেঁচে থাকার আনন্দে উল্লসিত পায়ের ছাপ অথবা মাঘী শীতের মাঝে এক চিলতে উষ্ণ উত্তাপ!

ছোটনের মতো ওর পাখা নেই যদিও তাও সুযোগ পেলেই সবুজের মাঝে ছুটে বেড়াতে কার্পণ্য করতো না।
ওর সাথে আমার দেখা হয় কোন এক বিকেলে। ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে খুঁজছিল কাকে যেন। পরণে সাদা শাড়ি, যার পাড়টুকু ঘন কালো রঙের। চোখগুলো মায়াবী হরিণীর মতো।
“কাউকে খুঁজছেন?” উৎসুকভাবে এগিয়ে গেলাম অরুর দিকে।
ওহ! বলতে ভুলে গেছি। অরুণিমাকে আমি অরু ডাকি।
না মানে ঠিক ডাকি না, ডাকতাম আর কি!
অরু আমার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। সন্ধানী আঁখিতে এক ঝলক স্নিগ্ধতার বিদ্যুৎ চমকে উঠলো।
হ্যাঁ, ও কাউকে খুঁজছে। কোন স্বপ্ন থেকে উঠে এসে হাজির হয়েছে সবুজের চাদরে মোড়া তেপান্তরে। কিন্তু ও কাকে খুঁজছে সেটা ও জানে না।
ছন্দকাটা ছড়ার মত হতবাক হয়ে উঠি আমি। আকাশে ভেসে বেড়ানো মিষ্টি বাতাসকে চোখের ইশারা দিতেই কাজ হয়ে গেলো।
হঠাৎ করেই ওরা আকাশে মেঘের দলকে টেনে আনলো। মেঘলা আকাশের নিচে আবছা আঁধারে রঙতুলির আঁচড়ের মতো একটানা মোহে ছিল অরুণিমা।

আকাশ থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় শুরু হয়ে গেল বৃষ্টি। ঠিক বর্ষার বৃষ্টির মতো না। সেটা অন্যরকম। এর মাঝে নেই জলের ঝমঝমানি, এই বৃষ্টিতে আকাশ ভেঙে ঝরে ফুল- লাল, সাদা, নীল।
একটা সাদা ফুল কুড়িয়ে ওর হাতে দিলাম। পরম যত্নে ও খোপায় পরে নিল সেটা।
হাত ধরে দুজন হাঁটতে থাকি তেপান্তরের মাঝে। ভোরের শুরুটায় ও হেঁটে যেত কুয়াশাভেজা ঘাস দিয়ে। আঙুলের ডগায় নরম করে শিশির লাগিয়ে ও ছবি আঁকত। ঠিক ছবি বলব না, কারণ ওর ক্যানভাস জুড়ে শুধু ফুল আর ফুল- জটিল রঙের কারুকার্জে কোন মাস্টারপিস নয় সেটা।
ছোট খুকির মতো একটানে এঁকে ফেলা সামান্য একটা সাদাফুল। এক পলকে দেখে নিতাম ফুলটাকে। তারপর বাগানের প্রতিটি ঝরাপাতার মাঝে এঁকে দিতাম সেই ফুল।
তবে সব কিছুতেই অপূর্ণতা আছে। জ্বলজ্বলে চাঁদমামার মাঝে ধূসর ছোপের মতো অরুণিমার ছিল একরাশ হতাশা।
ওর মাথাভর্তি একঝাঁক রেশমি চুল, যেটার মাঝে উঁকি দিত সাদা ফুল। ওর চোখজোড়া স্বচ্ছ পুষ্করিণীর মতো টলমলে, বড্ড ইচ্ছে হতো গণগণে সূর্যটা যখন মাথার উপরে ঠিক তখন ঝাপ দেই তার মাঝে। ওর নাক সুন্দর, সুন্দর ওর কান, যেটা বিকেলের আকাশে গান শুনতো।
ওর অভাব ছিল শুধু কথার! ঝর্ণার মতো ছলাৎ ছলাৎ করে ও কথা বলতে পারতো না। কলকলে নদীর মতো ওর গান গাওয়া হতো না। কারণ ওর একজোড়া ঠোঁট নেই।
অসমাপ্ত মোনালিসার মতো হতভাগা আর্টিস্ট ওকে সমাপ্ত করে দিল এক জোড়া দুঃস্বপ্ন দিয়ে।
তবে ওর চোখ হয়তো কথা বলতো। কি জানি? কখনো সেটা শোনার চেষ্টা করিনি। একাকী মানুষের সাথে অভিশাপ লেগে থাকলো ছায়ার মতো।
প্রচণ্ড ঘৃণা হতে থাকে অরুকে।
**************
বুক পকেটে রাখা ঘড়িটা বের করলাম। আঁধার কারাগারে এই একটা বন্ধুই আছে আমার। সবকিছু নির্জীব নীরব হলেও এই ঘড়ি থাকে সজীব।
টিক টিক করে সেটা কথা বলে আমার সাথে। আসলে বলতে গেলে মানুষের মতো অসম্পূর্ণ আর কিছু নেই। এতো বুদ্ধিমান একটা জীবের জীবন সামান্য সময়ের কাছে বন্দি! আমার কাছে মানুষ বলতে আছেন ওই এক লেখক, যে কিনা টেবিলের উপর ঘড়িটাকে রেখে শুধু গটগট করে প্রেসক্রিপশন দিত। এই মানুষটাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করতে শুরু করি। সেই ছোটনকে যেদিন থেকে চিনি সেদিন থেকেই।
সব কিছুরই অপূর্ণতা থাকে। অপূর্ণতার মাঝে প্রশান্তির পরশ হয়ে আসে সন্তুষ্টি। যেটা আমাকে লেখক দিতে চান নি। ঘৃণার আঘাতে মারাত্মক জখম হতে থাকে আমার মন। এর একটা শেষ দরকার।
*****************
রক্তে মাংসে গড়া একদম সত্যিকার মানুষগুলোর মরা লাশ মর্গে স্থান পায়। আমি যেখানটায় শুয়ে ছিলাম সেটাকে মর্গ বললেও ভুল হবে না। আমি শুয়ে আছি একটা অসমাপ্ত গল্পের বুকে। অবশ্য আমি একা ছিলাম না। আমার আশেপাশে এরকম সাড়ি সাড়ি হাজার অসমাপ্ত গল্প কবিতা মরে পড়ে আছে। উঠে বসার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। কিসের আকর্ষণে জানি না, পিঠটা একদম আঠার মতো লেগে আছে মরা গল্পটার সাথে। নীরবতার মধ্যেও হঠাৎ মৃদু শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা বুকের ডান পকেট থেকে আসছে।
টিক, টিক, টিক, টিক......
আস্তে আস্তে শব্দটা আরো জোড়ালো হতে থাকে। আরো কাছে আসতে থাকে। টিক টিক শব্দটা হঠাৎ পায়ে চলা বুটের ঠক ঠক শব্দে রূপ নেয়। ধরাম করে রুমের দরজাটা খুলে যায়।
একদল কলম ছুটে এসে আমার হাতে হাতকড়া পরাল। আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকল। হঠাৎ নিজেকে একটা বড় হলঘরে আবিষ্কার করলাম। সাড়ি সাড়ি করে অনেকগুলো বেঞ্চ পাতা। সেখানে মানুষ বসে আছে। এদের মাঝে কিছু চেনা মুখও দেখা যাচ্ছে। ঠিক মনে করতে পারছিলাম না এদের কোথায় দেখেছি।
রুমের মাঝখানটায় আমি দাঁড়িয়ে- একটা কাঠগড়ার মাঝে। আমার সামনে অনেক উচুঁতে থাকা একটি আসনে একটা কলম বসে আছে। কলমটার মাথাটা একটু মোটা। এতক্ষণে মোটামুটি বুঝে গেছি এটা একটা আদালত।
আমার বিচার হচ্ছে। কিন্তু আমি জানি না আমার অপরাধ কী? আসলে ‘কী’ না বলে ‘কোনটা’ বললে প্রশ্নটা বেশি সার্থক হয়। একগাদা অপরাধে আমি অপরাধী!
যেকোন জেলা জজ কোর্ট বাঁ হাইকোর্টের ট্রাইব্যুনালে উকিলদের যুক্তিতর্কে সরগরম হয়ে উঠে মামলা; ফরিয়াদি আসামীদের মধ্যে কথার যুদ্ধে লড়ে হার মানে একপক্ষ।
কিন্তু এই আদালতে এসব চলে না। এখানে শুধু রায় হয়।
আমি তখন ভাবছি। অস্থিরভাবে হাতড়ে যাচ্ছি গল্পের প্রতিটি পাতা। অপরাধ ঠিকই করেছি আমি, তবুও নিজেকে একবাক্যে দোষী বলাতে বড্ড অমত আমার।
*******************
ছোটনের ওই পাখাগুলোর প্রতি বড্ড ঘৃণা হতো আমার। ঘৃণা হওয়াটাই কি স্বাভাবিক না? আমার ও তো ইচ্ছে হতো ডানা মেলে তেপান্তরের শেষটা দেখে আসার। যেটা দু’পায়ে হাজার বার পাড়ি দিতে যেয়েও ব্যর্থ হতাম।
তাই কোন এক রাতে ওর পাখা দুটো টেনে ছিঁড়ে ফেলি। আমার পিঠে পাখা দুটো লাগিয়ে অপেক্ষায় থাকি- ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার।
কিন্তু সেই অপেক্ষার পাতার কবিতা কখনো ফুরোয় না; ডানাগুলো আর কখনো উড়ে নি!
এরপর অরুণিমার কথাটাই ফের নাহয় ভাবি। বাতাসের মাঝেও শোঁ শোঁ শব্দ থাকে। সেই বাতাসকে ভালোবাসলেও হয়তো ঠিক ছিল। প্রেমের ভেলাটুকু অরুর বিশালতায় উদ্দেশ্যহীন ভাসছিল কেবল।
মানব মন কোন স্থায়ী সংসার না। সেটা সরাইখানার মতো তাসের ঘর। প্রয়োজন ফুরোলেই পয়সা ফেলে দাম চুকাতে হয়। আমি অরুণিমার মনঘরে ঢোকার নিমন্ত্রণটুকুও কখনো শুনতে পাই নি। পাবার আশাও ছিল না
তাই কল্পনার শ্মশানে অরুর চিতা জ্বালিয়ে দেই। সব হারিয়ে শুণ্য গল্পে বসে থাকি একলা।
একাকী মানুষের মাঝে ঘৃণা থাকার কথা না। ঘৃণা করতে কাউকে লাগে। তার মানে কেউ যখন থাকে না, তখন ঘৃণাও থাকে না।
ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে আমি ঘৃণা করতে শুরু করি। আমি ঘৃণা করি নিজেকে।
অসমাপ্ত গল্পের মাঝে বেঁচে থাকা একাকীর প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণায় জ্বলতে থাকি।
***********************
ঘৃণার মতো অসহনীয় শাস্তি আর নেই। এর থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া হয়ে উঠি। তাই উপায় না দেখে খুন করে ফেলি নিজেকে।
বুক পকেটে ঘড়িটা নিয়ে গল্পের প্রতিটি পাতা ছিঁড়ে ফেলি। অসমাপ্ত কয়েকটা পাতার সাথে সমাপ্ত হয়ে যাই আমি।
এই আদালতের হিসেব খুব সোজা। নির্দোষীদের জন্যে আছে মৃত্যু। আর আমার মতো খুনীর জন্য- অমরত্ব।
“এই আদালত আসামীকে আত্মহত্যার অপরাধে অমরত্ব দণ্ডে দণ্ডিত করলো”
*************************
অমরত্বের নেশায় উন্মাদ মানুষ হয়তো এই শাস্তির মানে বুঝবে না। আমিও প্রথম বুঝি নি। তবে একদিন ঠিকই বুঝে ফেলি।
মৃত্যুদণ্ড কোনভাবেই শাস্তির কাতারে পরে না। মৃত্যুর অপর নাম তো মুক্তি! সমস্ত সস্তা অনুভূতি থেকে পরিত্রাণ।
আমার মতো খুনির জন্যে মুক্তির অবকাশ নাই। আমি বেঁচে থাকব চিরকাল। হাজরটা সূর্য উঠবে, ডুববে; কিন্তু আমি ডুবব না।
ওরা চায় আমি বেঁচে থাকি, আর আমার সাথে বেঁচে থাকবে ঘৃনা।
একদিন আমিও বুঝে ফেলি, ঘৃণার মতো মারাত্মক বিষটা আমাকে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিচ্ছে; শেষ করে ফেলছে।
তবুও আমি শেষ হবো না। এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী ই বা হতে পারে?
সেই থেকে আমার হাত দু’টো অলস হয়ে পড়ে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement