আট বছরের একটি বাচ্চা ছেলে মনোযোগ দিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে অংক করছিল, হঠাৎ বাবা বাচ্চা ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করল, বাবু তুমি তোমার আব্বুকে কতটুকু ভালবাস? উত্তরে সে একটু থেমে থেকে বলল ‘ভালবাসি’। বাবা আবার জিজ্ঞাসা করল কতটুকু ভালবাস? এবার ছেলেটি উত্তর দিল বাবা-মা দুজনকেই ভালবাসি। বাবা আবারও জিজ্ঞাসা করল বাবাকে কতটুকু ভালবাস, এবার ছেলেটি উত্তর দিল ১০০% ভালবাসি কিন্তু বাবা-মা দুজনকেই। আসলে বাচচাটি যে তার বাব-মা কে কতটুকু ভালবাসে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছেনা।আবার বাবা মা কাউকে ছোটও করতে পারছেনা। এটাই ভালবাসা বা শ্রদ্ধাবোধ যা অন্তরে প্রকাশ, ভাষায় বোঝানো যায়না।

একদিন আমি ও আমার ছেলেকে বিছানায় শুয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, বাবু আমি মরে গেলে কি তোমার খুব খারাপ লাগবে? সংঙ্গে সংঙ্গে সে কান্না শুরু করল, আর বলতে লাগল কেন আমি মরে যাব । তারপর অনেক চেষ্টা করে আমার ছেলের কান্না থামালাম। যে শিশু এখনও ঠিকমত বুঝতে শিখেনি কেন বাবাকে তার প্রয়োজন বা বাবার ভূমিকা কি তার জীবনে অথচ বাবা মরে যাবে শুনে কান্নাকাটি করে, এটাই বাবার প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম ভালবাসা।

অনেকদিন পর বাবাকে নিয়ে লিখতে বসেছি। আমার ছেলে যেমন বাবাকে কখনও হারাতে চায়না, ঠিক আমিও কখনো চায়নি আমার বাবা হারিয়ে যাক আমাদের মাঝ থেকে। কিন্তু নিয়তির করুন পরিহাস আমরা তাকে হারিয়ে ফেলেছি। বাবা কি? এটা আমরা তখনিই পরিপূর্ন ভাবে বুঝতে পারি, যখন আমরা নিজেরা বাবার ভূমিকায় আবত হয়।

আমাদের সন্তানরা যখন অসুস্থ থাকে, তখন সব বাবা-মায়েরাই সারা-রাত ঘুমাতে পারেনা সন্তানের চিন্তায়। সন্তানেরা যদি বলে বাবা পেটে ব্যাথা, চোখে ব্যাথা, মাথায় ব্যাথা অমনি বাবা-মায়েরা চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়ি এই ভেবে, যে আমার সন্তান কতই না কষ্ট পাচ্ছে ব্যাথায়।ঠিক এমন চিন্তিত আমাদের বাবারাও আমাদের জন্য হত। হয়ত প্রকাশটা হত ভিন্ন।বাবা হয়েছি বলেই আজ বুঝি ও ভালবাসা শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ায়।

বাবার হাত ধরে হাটি হাটি পা করে সব সন্তানেরই জীবন শুরু হয় তারপর বাবার ভাষায় কথা বলা চলা সবকিছু। একজন বাবা হয় সন্তানের আদশ। পৃথিবীর সব বাবাই সন্তানের ভাল চিন্তা করে। তাদের উপদেশ, আদেশ বা নিষেধ সবটাই সন্তানের জন্য আশিবাদ। অথচ কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়া মাত্রই অনেক সন্তানেরই বাবার উপদেশ বা আদেশ খুব একটা ভাল লাগেনা। মনে করে বাবারা সেকেলে বা ব্যাকডেটেড। সে সন্তানেরা আসলেই অভাগা যারা যৌবনে বাবা-মায়ের আদেশ মেনে চলেনা। বাবা তুমি আজ নেই আমাদের মাঝে, কিন্তু আমি ক্ষমাচাচ্ছি তবুও তোমার কাছে।

প্রত্যেকের ব্যাক্তিগত জীবনে দু-একজন খুব কাছের বন্ধু থাকে। তারা অবশ্যই খুব ভাল বন্ধু হয়, কিন্তু পিতা যদি কারও ভাল বন্ধু হয় তাহলে সে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান পুরুষ বা নারী। কারন পিতার বন্ধুত্ব একমুখী যার কোন বিনিময় হয়না। পিতা শ্রদ্ধেয়, মাননীয়, পূজনীয়,সন্মানীয় সাথে পরম বন্ধুও।


আমার জীবনে বাবা আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধুছিল। যার সাথে আমি আমার জীবনের সবকিছু শেয়ার করেছি ।আমার যা চাহিদা ছিল , আমার পিতা সেটা পূরন করেছে যা আমি পারিনি। পারিনি আমি ভাল ছাত্র হতে, ভাল রেজাল্ট করতে। বাবার মনের মত হতে না পারলেও যখন বাবার জন্য সামান্য কিছু করার সামথ অর্জন করলাম তখন বাবা আর আমাদের মাঝে নেই।

বাবা তোমার প্রতি আমার ভালবাসা, কৃতজ্ঞতা কিভাবে ব্যাত্ত করব , আমার ৮ বছরের ছেলের মত বুঝতে পারিনা। শুধু জানি আমি ভালবাসি ও বাসব। তুমি ওপার থেকে তোমার সন্তানদের জন্য দোয়া করিও। তোমার যা অপূর্নতা আমরা যেন তা পূরন করতে পারি।