তার কাছে আমি ছিলাম না বিশেষ কিছু কখনোই, ছিলো না আমাদের মধ্যে কিয়ৎপরিমান কোন অন্তরঙ্গতা । আমি তাকে অনেক বেশি চাইতাম, এর ঠিক উলটা ছিলো সে । আমি তার কাছাকাছি যত বেশি যেতে চাইতাম সে যেন ততই দূরে সরে যেত । আমি যত চাষ করি ভালোবাসা বিপরীতে সে ততই আবাদ করতো ঘৃণা। সে একটা ছেলেকে পছন্দ করতো, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো । আমি তাকে চিনতাম, তারা একসাথে অনেকদিন হেঁটেছে । সে যতই ছেলেটার নিকট ঘেঁষতে চাইতো ততই যেন তার থেকে ছেলেটা দূরে সরে যেত। তাকে যেন ছেলেটা তুচ্ছ ভাবতো, এমনটা সহ্য হত না আমার । একদিন ক্যাম্পাসের পাশের ঘন জঙ্গলটায় ছেলেটাকে ডেকে নিয়ে মেরে ফেললাম, আমার একটুও খারাপ লাগে নি । আমার মস্তিস্কের প্রতিটি নিউরণে শুধু তাকে দেখতে পেয়েছিলাম, কেউ তাকে তুচ্ছ করার মত রইলো না এই ভেবে আমার মন খুশিতে ভরে উঠলো । ছেলেটাকে কেউ খুঁজে পায় নি, অনেক আলোচিত হল বিভিন্ন মহলে, কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোন হদিস মেলে নি । ছেলেটাকে মেরে ফেলার পর বেশ কিছুদিন সে ক্যাম্পাসে আসে নি । একদিন অন্য একটি রাস্তায় তার সাথে দেখা হলো, সে আগের মত নেই যাকে আমি দেখেই সুখ পেতাম। সে আমার সাথে তেমন কথা বলে নি, পাশ কেটে চলে গেল । আমি বুঝতে পারি নি, আমার দোষ কী । পৃথিবীর কেউ জানে না ছেলেটাকে আমিই খুন করেছি, তবে সে কেন আমার সাথে এমন করে চলে গেল । আমি পেঁছন ফিরে তাকিয়ে রইলাম, সে যদি মাথা ঘুরিয়ে আমার দিকে একটু তাকিয়ে দেখে তা দেখার জন্য । তবে এই ভাবতে পারবো সে আমাকে ভালো না বাসলেও ঘৃণা করে না, আর এটুকুই হবে আমার জন্য অনেক পাওয়া । কিন্তু সে তাকায় নি এমন কী সে এক বিন্দু থমকেও দাঁড়ায় নি। এমনভাবে হেঁটে চলছিলো যেন তাকে কেউ পেঁছন থেকে তাড়া করছে । আমি আবারও বুঝতে পারলাম সে হবে না কখনো আমার । কিন্তু তাকে ছাড়া আমার হৃদয়ের আঙিনা শূন্য, এখানে আর কেউ আসবে না । হৃদয়ের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে সে মিশে আছে মৃত্তিকারূপে । জীবন্ত সূর্যের অগ্নিমন্ত্রকে নিত্তি আসর বসে তাকে নিয়ে, বাড়ছে সেখানে ক্রমাগত প্রেমের লাভা । তাকে যদি বিতাড়িত করে দেই তবে আমি কোথায় !

একদিন বিকেলে আমি বসে ছিলাম ক্যম্পাসের আদি সাক্ষীরূপে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশচুম্বী পানির টাঙ্কির উপরে । এখানে আমার অনেকটা সময় কাটে । মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় এখান থেকে নিজেকে নিজে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেই । আচ্ছা নিজেকে নিজে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে কী আত্মহত্যা হবে ? আমার একমাত্র কাছের বন্ধু আমাকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এলো । সে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো, ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । আমার মস্তিস্কে আবারও সেই খুন চেপে বসলো । আমি চোখে শুধু লাল দেখতে লাগলাম । আমি খুন করবো, আমি আবারো খুন করবো, মাথায় শুধুই খুন ঘুরছে । আমি ছেলেটার ঠিকানা খুঁজে বের করলাম । তাকে খুন করা এতো সহজ হবে না । এরা অনেক ধনী, চারপাশে সিকিউরিটি নিয়ে চলা ফেরা করে । আমি দাঁড়িয়ে আছি তাদের বাড়ির গেইটের সামনে । ছেলেটাকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছি । বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর দেখলাম ছেলেটা বাড়ির ভেতর থেকে একটা মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বেরিয়ে আসছে । তারা খুব অন্তরঙ্গ খুনসুটি করছে । ছেলেটা মেয়েটির মুখে চুমো দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দিলো । মেয়েটা চলে গেলো । আমার উৎসুকি দৃষ্টির দিকে ছেলেটার নজর পড়ে । সে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাস্তা পার হয়ে এগিয়ে আসে । আমি কোমরের পেঁছনে চুরিটার উপর হাত রাখি । সে কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, এখানে কী ? আমি বললাম, আমরা একসাথে পড়ি। ছেলেটা আমার চেহারার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বুঝতে পারলো আমি ওকে ভালোবাসি, অনেক বেশি । ছেলেটা আমার সামনে খুব হাসছে । আমার ইচ্ছে করছে চুরি দিয়ে তার গলা বরাবর কষে একটা পোঁচ দিয়ে দেই । কিন্তু এখানে করা যাবে না, আগেরটার মত হতে হবে খুন । কেউ জানবে না আমি ছাড়া । ছেলেটা হাসি বন্ধ করে আমাকে বললো, আমি বিয়ে করছি বাবা মায়ের স্বপ্ন পূরণ হবে এই জন্য, না হয় এইসব বালছালের বিয়ে কে করে ! টাকা থাকলে এসব মেয়ে কত আসে যায় আমার কাছে, যেমন একটু আগে যে মেয়েটা চলে গেলো সেও অনেক ধনী ঘরের মেয়ে । তার চাহিদা সেক্স, আমার চাহিদাও তাই । তাই আমরা প্রেম বলে কোন নাটক করি না, অফার সোজা, নাও... দাও ! আফসোস, তোমার জন্য আমি কিছু করতে পারলাম না, আমার বাবা মায়ের স্বপ্ন বলে কথা। পুউর ফেলা, কথাটা বলে ছেলেটা চলে গেলো । আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম । কোমরের পেঁছনে চুরিটা থেকে হাত নামিয়ে হাঁটতে লাগলাম ।

আমার এখন তার সাথে দেখা করা খুব দরকার । তাকে ছেলেটা সম্পর্কে জানাতে হবে, তাকে সর্বনাশ থেকে রক্ষা করতে হবে । কারণ আমি তার সত্যিকারের প্রেমিক । কিন্তু তার সাথে দেখা করবো কীভাবে ? তার বাড়ির আঙ্গিনায় গেলে সে আমার সাথে দেখা করবে না । তার বাসার বাইরে বেশ কিছুক্ষণ হয় অপেক্ষা করছি, যদি সে কোন কাজে বের হয় তাহলে তাকে বলা যাবে । সে বের হলো, কোথাও যাবে মনে হচ্ছে । তার সাথে তার বান্ধবীও আছে, মনে হচ্ছে শপিং এর জন্য বের হয়েছে । তাদেরকে সামনে রেখে কিছুক্ষণ পেঁছন পেঁছন হাঁটলাম । একটা একাকী জায়গায় তাকে খুলে বলবো সবকিছু । তেমন একটা জায়গা পেয়ে গেলাম, দ্রুত গিয়ে তাকে দাঁড় করালাম । ছেলেটার সম্পর্কে সবকিছু খুলে বললাম । সে বিশ্বাস করলো না, তার চেয়ে বড় কারণ সে আমার কোন কথা শুনতে ইচ্ছুক না, তাই সে আমি কী বলেছি সেদিকে তেমন মনোযোগও দেয় নি । আমার কাছে ছেলেটাকে ভাল লেগেছে আমি তাকেই বিয়ে করবো, এ বলে পাশ কেটে সে চলে গেল । তাকে বোঝাতে পারলাম না, তার কাছে আমি মিথ্যাবাদী হয়েই রইলাম । এখন খুন করা ছাড়া আমার হাতে আর কোন উপায় নেই, ছেলেটাকে নয়তো ওকে ।

মাথার উপর ময়লা ফেনটা অনবরত ঘুরছে । অনেকদিন পরিষ্কার করা হয় না, ছোট ছোট কিছু ময়লা গায়ে এসে পড়ছে । আমি তাকিয়ে আছি, ভাবছি কী করতে হবে । অনেক সময় আবর্জনার দিকে তাকিয়ে থেকেও জুতসই বুদ্ধি পাওয়া যায় । রাত এখন বারোটা বেজে চুয়ান্ন, মাথা ভনভন করছে ।আর ঘুম কী জিনিস তা আমি অনেক আগেই ভুলে গেছি । পৃথিবীর সকল ডাক্তারকে আমি ভুল প্রমাণ করে দিয়েছি, না ঘুমিয়েও জীবিত থাকা যায় । এই যেমন করে আমি বেঁচে আছি, হয়তো আমি আত্মাহীন ! ছেলেটাকে মাথায় ঘুরছে, আর তার রক্ত । তাকে যে করেই হোক খেতে হবে, চুরি দিয়ে হৃদপিণ্ড আলাদা করে ফেলতে হবে । সারারাত কেটে যখন রুমে সূর্যের আবছা আলো পৌঁছালো ঠিক তখন মাথায় একটা বুদ্ধি এলো । বুদ্ধিটা মন্দ নয়, বলতে গেলে রীতিমত চমৎকার- জ্বালিয়ে দিতে হবে । বুদ্ধি দিয়ে মাঝে মাঝে প্রকৃতিও সাহায্য করে, এ যেমন সূর্যের আলো থেকে বুদ্ধিটা এলো ! আমি শোয়া থেকে উঠে বেরিয়ে পড়লাম, সরঞ্জামের ব্যবস্থা করতে হবে । আজ সন্ধ্যায় কাজটা সারতে হবে । সরঞ্জাম সংগ্রহের পাশাপাশি সকল খোঁজ খবর রাখলাম, কারণ জায়গামত না পেলে কাজটা পিঁছিয়ে যাবে । যাবতীয় জিনিসপত্র পকেটে রেখে অপেক্ষা করছি শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য, শত্রুর প্রতিটি পদক্ষেপ ইতিমধ্যে আমার নখদর্পণে । প্রায় সন্ধ্যা গড়িয়ে আসছে, আমার হৃদপিণ্ডে ধড়ফড়ানি বেড়ে চলছে, তা কোথায় গিয়ে থামবে বলা যাচ্ছে না, হয়তো তার ক্রমাগত বৃদ্ধিতে আমিই মরে পড়ে থাকবো । এবারের কাজটা আগেরটা থেকে অনেক বেশি কঠিন, তবুও আমাকে শক্ত থাকতে হবে । আমি সত্য প্রেমিক, সত্য প্রেমিকদের অনেক কঠিন কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়। এইতো আসছে এদিকে, তাড়াতাড়ি কালো কাপড়টা মুখে বেঁধে নিলাম । পকেট থেকে বোতলটা হাতে নিলাম, জায়গামত আঘাত করতে হবে । আমি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছি, সমানে সমানে আসলেই আঘাত হানতে হবে । আমি কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিলাম, আমি অনুভব করছি অজস্র ভয় আমাকে গ্রাস করে চলছে । সময় ঘনিয়ে আসছে, নিঃশ্বাস বন্ধ করে বোতলের মুখটা খুলে তার মুখের উপর পুরোটা নিক্ষেপ করে দিলাম, কিছুক্ষণের জন্য আমার সাথে তার চোখাচোখি হলো । সে যন্ত্রণায় ঢলে পড়ছে মাটিতে, আমি দ্রুত পায়ে পালিয়ে গেলাম । টাঙ্কিটার উপরে এসে বসলাম, এতক্ষণে মুখটা নিশ্চয় ঝলসে গেছে । ও কী আমাকে চিনতে পেরেছে ? আমার তো শুধু চোখ দুটো দেখা গিয়েছিল, না সে শুধু চোখ দেখে আমাকে চিনবে না, আমার দিকেই সে কখনো ভাল করে তাকায় নি, শুধু একবার তাকিয়ে থুথু মেরেছিলো । আমার বুকে খুব ব্যথা করছে, আমি মনে মনে শুধু জপছি তার মৃত্যু যেন না হয়, শুধু তার মুখটা ঝলসে যাক, তাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না। তার যন্ত্রণা যেন আমিও অনুভব করছি, আমার খুব কান্না পাচ্ছে, আমি নিজের মুখে হাতের নখ দিয়ে ক্রমাগত খামচি দিচ্ছি । কিন্তু কোন যন্ত্রণা হচ্ছে না সেখানটায়, শুধু বুকের মধ্যে সকল যন্ত্রণা ভর করছে ।

ছেলেটা থেকে তাকে আমি রক্ষা করতে চাই নি, আমি স্বার্থান্বেষী প্রেমিক । আমি চেয়েছি তার উপর একমাত্র আমি ছাড়া আর কারো অধিকার থাকবে না । আমি চাইলে ছেলেটাকে হত্যা করতে পারতাম কিন্তু এরপর হয়তো অন্য কেউ আসবে তার জন্য যেমন প্রথমটার পর এই ছেলেটা এসেছে । তাই ওকেই ঝলসে দিলাম। এখন তার জন্য আর কেউ আসবে না । বেশ কিছুদিন পর তার সাথে রাস্তায় আমার দেখা হলো। শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে তার, পুরো মুখ নেকাপ দিয়ে ডাকা । আমি তাকে আবারও ভালোবাসার কথা বললাম । সে মুখের নেকাপ খুলে আমাকে বললো আমাকে বিয়ে করবে তুমি ? সে মুখে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে পাশ কেটে চলে গেলো আগের মত । তবে এখন আমি আর পেঁছন ফিরে তাকাই নি কারণ আমার কাজ হয়ে গেছে । সে এখন সম্পূর্ণ আমার ।

তাকে আমি বিয়ে করেছি । আমাদের বিয়ের দুই বছর হবে আজ । এই দুই বছর পোড়া মুখটা নিয়ে আমি বসবাস করছি । এমন অনেক রাত পার হয়েছে তার মুখ দেখে আমি খুব ভয় পেয়েছি, বারান্দায় কাটিয়ে দিয়েছি সারারাত । আমাদের এক বছরের একটা ছেলেও আছে । সে প্রথম প্রথম মাকে দেখে ভয়ে কাঁদতো । তাই সে বাচ্চাকে মুখ ডেকে দুধ খাওয়াতো আর তার চোখ বেয়ে অঝরে জল পড়তো । সেই জল বাচ্চার মাথা ভিজিয়ে দিত । এখন বাচ্চার সয়ে গেছে, সে তার মাকে দেখে অভ্যস্ত, সে ভয় পায় না, মায়ের এই পোড়া মুখে চুমোও খায় । শুধু আমি অভ্যস্ত হতে পারি নি এখনো, তাকে দেখলে বুকে প্রচন্ড যন্ত্রণা হয় । অফিস শেষে বেশিরভাগ সময় আমি ক্যাম্পাসের সেই টাঙ্কিটার উপর কাটাই, বাসায় ফিরি অনেক রাত করে । তবুও সে কিছু বলে না, সে যেন আমার নিকট এখনো কৃতজ্ঞ হয়ে আছে তার মত পোড়া মুখকে আমি বিয়ে করেছি বলে । হা হা খুব হাস্যকর । আর আমার জন্য যেন দোজখ নেমে এসেছে পৃথিবীতে। চিৎ হয়ে টাংকির উপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি । আজ বারোটা এক মিনিটে আমাদের দ্বিতীয় বিবাহবার্ষিকী শেষ হবে । সে আমার কাছে স্পেশাল কিছু চেয়েছে, কিন্তু আমাকে নির্দিষ্ট করে কিছু বলে নি, সে শধু বলেছে তোমার পছন্দই আমার জন্য স্পেশাল । এটাও হয়তো তার কৃতজ্ঞতার প্রকাশ । সময় হতে আর আধাঘন্টা বাকি, তার জন্য আমি স্পেশাল কিছু রেখেছি তা হলো এই দোজখ থেকে আমার মুক্তি চাওয়া । তাকে আজ সব বলে দেব, তারপর তাকে ছেড়ে বহুদূর চলে যাবো । প্রয়োজন হলে মরে যাবো, তবে তো তাকে আমি কখনোই দেখবো না । আমি হাঁটছি ধীরলয়ে, প্রতিটি কদমে আমার পা যেন যাচ্ছে জমে......