প্রযুক্তি গরিবের উপকারে কতটুকু আসে, সুবিধাটুকু নিয়ে নেয় সমাজের ওপরে থাকা অংশ। যে যত ওপরে, প্রযুক্তি হরণ করার মাত্রা তার তত বেশি। নতুন একটি প্রযুক্তি ব্যবহারের শুরুর দিকটায় শ্রমজীবী মানুষের জীবন কীভাবে এলোমেলো হয়ে যায়, তেমনি একটি রাত এই গল্পের বিষয়বস্তু।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ আগস্ট ১৯৭৩
গল্প/কবিতা: ১৭টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩২

বিচারক স্কোরঃ ৩.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

তবু জেগে থাকি
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩২

আহা রুবন

comment ২০  favorite ০  import_contacts ৩৩৯


চারপাশ অসাড় হয়ে আছে। জ্যৈষ্ঠের বিদায়ে কারও কাজ নেই, শুধু শুধু পিঠ পোড়াতে কে যাবে বাইরে। মাথার ওপর জ্বলন্ত সূর্য — আকাশটা যেন উল্টে রাখা তাতানো কড়াই।
নদী বরাবর পশ্চিমের রাস্তা হতে টুকটাক কথা নিস্তব্ধতা ভেঙ্গেচুরে ফুটে উঠছে হঠাৎ হঠাৎ।
‘বাবা বড় পোলাপানদের কিন্তু কাঁধে নিয়ো না।’
‘আর পোলাপান কোথায় পাব, তোকে ছাড়া?’
মেয়েটি খুশিতে বাবার মাথায় থুতনি ঠেকায়। দুই হাতে মাথা জড়িয়ে ধরে আরও নিবিড় করে। বয়স চার পেরুল মাত্র মেয়েটির।
বাবা হাতে দা নিয়ে খালি গায়ে চলছে। গরম ভাপ উঠছে শরীর থেকে।
‘মা, তোর ভাই হলে তখন কী করব?’
‘ভাই তো ছোট হবে, বড় কাউকে নিয়ো না।’
‘নিলে কী হবে রে মা, রাগ করবি?’
‘তুমি যদি ব্যথা পাও?’
‘আচ্ছা মা, তুই যে আমাকে এত ভালবাসিস। আমি মরে গেলে কী করবি?’
‘কী বলে! বাবারা কি কখনও মরে?’ অবিশ্বাসের সাথে জোর দিয়ে বলে মেয়েটি।
‘সত্যই তো, আমি একেবারেই ভুলে গেছি, বাবার মরবে কেন? বাবারা তো মরে না।’


একটা বাঁশঝাড়ের সামনে এসে কাঁধ থেকে নামাল মেয়েকে। রাস্তায় মেয়েকে দাঁড় করিয়ে একটা ঝোপের পাশে লোকটি জলবিয়োগ করতে বসে। জমে থাকা শুকনো বাঁশপাতায় ছরছর শব্দে ভয় পেয়ে কিছু একটা ছুট মারে। হঠাৎ একটা চিৎকার, ‘বাবা দেখো কত বড় টিকটিকি।’
হেসে উঠে বাবা বলে, ‘না রে ওটা গুইসাপ।’
‘ওরা কি মানুষ খায়, বাবা?’
‘আ-রে-য়ে না! সাপের ডিম, ব্যাঙ, মাছ এসব খায়, কাছে যাসনে কিন্তু!’


বাবা ঝাড়ে ঢুকে মুঠো করে আগা-গোড়া নানা কোন থেকে মাথা ঘুড়িয়ে এ-বাঁশ সে-বাঁশ করতে থাকে। সোজা মুঠো মতন একটা লম্বা পাকা বাঁশ পছন্দ করে, হাতে থুথু লাগিয়ে গোড়ায় কোপ দেয়। একাকী দুপুর কেঁপে কেঁপে ওঠে, পাশেই মেয়েটি ঝরে পড়া পাকা ডুমুর কুড়াতে থাকে মনের আনন্দে।
‘ঠাণ্ডা নাকি?’ গম্ভীর কণ্ঠ; ফিরে তাকায় ঠান্ডা।
‘হ্যাঁ স্যার একটা বাঁশ... চাচাকে বললাম দিতে হবে, লগি বানাব।’
‘লগি দিয়ে কি হবে?’
‘স্যার ভাঙ্গা ডিঙ্গিটা ঠিক করলাম ধার-কর্জ করে, দেখি হাটবারগুলোয় কিছু কামাই-পাতি পাই কি না।’
বাঁশের চিপায় ক্ষুদে ক্ষুদে কোপ দিচ্ছিল, আর কথা বলছিল সে। এবার ঘুরে হাতে দা ঝুলিয়ে বলল, ‘এখন তো বসা আছি, কামলা-টামলা কেউ নেয় না। তাই ভাবলাম যদি কিছু করা যায়। খুব কষ্টে আছি স্যার।’
‘সবাই যে হারে ইঞ্জিন লাগানো ধরল, তুমি লোক পাও কি না দেখো আগে।’ এই বলে আপন মনে উচ্চারণ করলেন তওবা তওবা।
‘সেটাই চিন্তা স্যার, তারপরও দেখি। ভাবছি অর্ধেক ভাড়া নেব ...’
চারিদিকে পরিবর্তনের একটা জোরালো বাতাস—সামান্য অর্থকড়ি যার আছে সেও বসে নেই। কিছু একটা করার প্রাণান্তকর চেষ্টা। উন্নয়ন আর প্রযুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে গতর খাটিয়ে দ্রুত অবস্থা পরিবর্তনে ব্যস্ত সবাই। কেবল ঠান্ডার মতো শ্রমসর্বস্য মানুষেরা টাল সামলাতে না পেরে অসহায় চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। এই তওবা স্যারের একটা ইতিহাস আছে। হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন, প্রচণ্ড দাপট! নির্মল পাল নামে একজন তার সাথে শিক্ষকতা করতেন — গলায় গলায় ভাব দুজনার। নির্মল মাস্টার ভারত চলে যাবে — কারণটা অবশ্য খুব সাধারণ — পাকিস্তান আমল সেটা। বন্ধুর জমি-জমা সব কিনে নিলেন তওবা স্যার। টাকা দেবেন একসঙ্গে। টাকা হাতে পাবার আগেই, সব দলিল করে দিলেন নির্মল মাস্টার — কাজ এগিয়ে রাখতে চাইলেন। টাকা হাতে নেবেন আর গাড়িতে উঠবেন, সময় নষ্ট করতে চাইলেন না। অবিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই — বন্ধু বলে কথা। দুদিন না যেতেই ঘার ধরে ঘর হতে বের করে দিলেন নির্মল মাস্টারকে। মা বেরুতে চাইলেন না ঘর হতে — ঘরে আগুন ধরিয়ে দিল সাঙ্গপাঙ্গরা। গোরু পুরে মরল — মা গলায় দড়ি দিলেন। কোনও বিচার না পেয়ে, কাঁদতে কাঁদতে শূন্য হাতে জন্মভূমি ছাড়লেন নির্মল মাস্টার।


ভারতে শুরু হল এক মানবেতর জীবন। অন্যের বাড়িতে কাজও করতে হয়েছে সন্তানদের। এদিকে তওবা স্যারের আনন্দ দেখে কে। এঘর ভাঙ্গেন তো ওঘর তোলেন, গাছ কাটেন, বাগান করেন, কত কী! কিন্তু বেশিদিন সেসব কপালে রইল না — তওবা স্যারের মাথায় সমস্যা দেখা দিল। চাকরি চলে গেল। কেউ বলল — অভিশাপ, কেউ বলল — নির্মলকে ফাঁকি দিয়েছে, বিবেককে ফাঁকি দেবে কেমনে! এখন তার দিন চলে বাড়ি বাড়ি বাচ্চা-কাচ্চা পড়িয়ে। তাও সবাই পড়তে দেয় দয়াপরবশ হয়ে। প্রতিদিন দশ-বিশ টাকা যে যা দেয়, তাই দিয়ে বাজার করেন। মাস শেষ করা পর্যন্ত সম্ভব হয় না কখনও। চেয়ারে চোখ বুজে বসে কী সব ভাবেন, আর মাঝে মাঝে বলে ওঠেন — তওবা তওবা। মেয়েটি বি এ পাশ করার পর সংসারের হাল ধরবে, অথচ পাশ করার পর হঠাৎ করেই মারা গেল। কিছুদিন পূর্বে শুনলাম — নির্মল মাস্টারের সন্তানেরা উচ্চ শিক্ষিত হয়েছে, ভাল চাকরি করে তারা।
মেয়েটি জামার কোঁচে করে ডুমুরফলগুলো এনে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে লাগল।
‘এটা কে ঠান্ডা?’
‘আমার মেয়ে স্যার।’
‘বাঃ ভারী সুন্দর! তোমাদের দুজনকেই ছাড়িয়ে গেছে। যে কেউ তো ভাববে — কোনও বড় ঘরের মেয়ে।’
খুশিতে ঠান্ডা লাজুক হাসে। এমন সে প্রায়ই শুনতে পায়। গর্বে স্নেহের দৃষ্টি বোলায় মেয়ের শরীরে।
‘মেয়ের ঠিকমতো যত্নআত্তি কোরো। সামনেরবার আমাকে দিয়ো?’
‘তাতো দেবই, আপনাকে ছাড়া আর কাকে দেব?’ স্বপ্নের ঘোর লাগা চোখে বাবা বলে, ‘যতো কষ্টই হোক মেয়েকে মানুষ করতে চাই।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ খেয়াল রাখো, ঠিক মতো যেন পুষ্টি পায়। অপুষ্ট শরীরে বিদ্যা ঢোকে না — তওবা তওবা।’
আস্কারা পেয়ে ঠান্ডা বলে, ‘স্যার একটা কথা — মেয়ে পেটে থাকতে ডাক্তার আপার কাছে গেলাম, ওর মাকে বেশি বেশি খেতে বলল। গরিব মানুষ কতই আর কিনতে পারি! চেয়ে-চিন্তে কুড়িয়ে শাক-সবজি যা পাই তাই আনি — আর বলি খাও ভাল করে। দেখো-না, গরু যা পায় সব খায়, তাই বাছুর কত সুন্দর! সে কী মনে করে, সব খাওয়া শুরু করল একেবারে …’
‘হাসির কথা নয় ঠান্ডা — কার মধ্যে কী আছে, কে জানে। কোনও উপাদানের ঘাটতি পড়ে নাই, তাই তোমার মেয়ে এত সুন্দর হয়েছে। ধনিদের বাচ্চারা তাই সুন্দর, লম্বা আর বুদ্ধিমান হয়। একটা ব্যাপার খেয়াল করো। সুন্দর বিষয়টা আসলে কী? সব কিছুর সমঞ্জস্য — কোনও কিছুর কমতি থাকা চলবে না। সামঞ্জস্য অর্থাৎ পরিমাণের প্রসঙ্গ — মানে গণিতের ব্যাপার। তাহলে কী হল — সুন্দর মানেই গণিত। দুনিয়ার সবই সুন্দর! তাই সবই গণিতের খেলা। আমাদের প্রথম হৃৎকম্পন সেটাও নির্দিষ্ট সময় পর পর, মানে গণিত — তওবা তওবা।’
এইসব হাবিজাবি বিড়বিড় করতে করতে চলে গেলেন তওবা স্যার।



দুপুরে খাওয়া সেরে বেলা একটু হেলে গেলে, হাটে যাবার জন্য তৈরি হতে লাগল ঠান্ডা।

‘অনেকদিন হল তো কেবল শাকপাতা, কচুফচু খাই — রোজগার কিছু হলে, দেখি ভাল বাজার করার আশা আছে।’
গায়ে সার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে বলল। উঠোনের মধ্যে মেয়েকে উঁচু করে তুলে বুকের সাথে লাগিয়ে, মেয়ের চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে মা, তোর জন্য কী আনতে হবে?’
‘ছোট মাছ।’
‘ছোট মাছ কেন রে? বড় মাছ পছন্দ না?’ ঘার কাত করল মেয়ে।
‘তবে?’
‘তোমার যে টাকা কম, বড় মাছের টাকা বেশি না?’
‘স্বর্ণার মা শোনো তোমার মেয়ের কথা। চিৎকার করে বলল ‘কত বুদ্ধি আমার মায়ের! তুই ভুল করে আমার ঘরে জন্ম নিলি রে …’ বাবার চোখ ভিজে ওঠে — গালে চুমু খেতে থাকে বারবার। বাবার খোঁচ খোঁচা দাড়ি ছুঁয়ে, ফিসফিস করে মেয়েটি বলে, ‘চুলের ফিতা … মার জন্য মরিচ।’
হাসতে হাসতে বাবা বলে, ‘ঠিক আছে মা।’
আরেকটা চুমু দিয়ে কোল থেকে মেয়েকে নামিয়ে দেয়। স্ত্রীর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে, লগিটা কাঁধে হেলিয়ে হাসি মুখে বিদায় নেয় ঠান্ডা।



নদীঘাটে বসে; কোনও যাত্রী নেই। সবাই ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ভিড় ঠেলতে ব্যস্ত। একজন বলল, ‘তোমার নায়ে উঠলে তো হাটে পৌঁছতে ফজরের আজান হবে।’
‘না ভাই — ভাড়া অর্ধেক, জোরে চালাব। বেশি যাত্রীর দরকার নেই। আসেন ভাই …’
‘তোমার অর্ধেক ভাড়া নিয়ে তুমিই থাকো।’


ছায়া দীর্ঘ হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে, সূর্যের তেজ পড়ে গেছে। শেষমেষ এক ভিখিরি, এক বুড়ো — যে যাচ্ছে মেয়ের বাড়ি; আর মুর্গির ঘর তৈরি করার এক সুতোরকে নিয়ে রওনা হল হাট-মুখে। যদি ফেরার পথে কয়জন পাওয়া যায় — তখন বাড়ি ফেরার তাড়া থাকবে না কারও। তিনজন কে নামিয়ে ভাবল — নদীর এপার ওপার করে। ছয়জনকে নিয়ে ওপারে নামাতে গেল। ঘাট-মাঝির চিৎকার, ‘আমরা এখন ঘোড়ার ঘাস কাটি আর কী ! ফের যদি দেখি টেরটা তখন পাবে।’
যাত্রীরা বলল, ‘তুমি বাপু দূরের যাত্রী ধরো।’


বসে রইল নৌকো পেতে, কিন্তু কেউ ফিরেও তাকায় না। ‘ভাই এদিকে আসেন, অর্ধেক ভাড়া, শব্দের যন্ত্রণাছাড়া, আসেন ভাই, আসেন।’
কেউ কেউ তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। অভাগার মতো তাকিয়ে থাকে সেদিক। হাট-ফেরতাদের দেখতে থাকতে। কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। ডিঙ্গি বেয়ে চলে যায় দক্ষিণ দিকে।
সূর্য ডুবে আছে গ্রামের ওপার — অন্ধকার ধেয়ে আসছে। সামনেই দল ছাড়া হয়ে প্যাঁকপ্যাঁক করছে তিনটি হাঁস। মাথায় বজ্রপাতের মতো একটা চিন্তা খেলে গেল। আগ-পিছ ভাবার ফুরসত পেল না সে। যেই ভাবা সেই কাজ। হাঁসদের তাড়া করে একটাকে ধরে ফেলল। আরও একটা ধরতে পারলে মন্দ হত না। চেঁচাতে চেঁচাতে পানির ওপর দিয়ে দৌড়ে চলে গেল, বাকি দুটো। গলা চেপে ধরায় আর চেঁচাতে পারছে না। রশিতে বেঁধে বাঁশের মাচার নিচে ঢুকিয়ে রাখল। অন্ধকারে ভয়ে চুপ মেরে আছে। হাটের দিকে বাইতে শুরু করল ডিঙ্গি।
‘যাক খালি হাতে ফিরতে হবে না।’
বিক্রি করে বাজা-সদাই করতে পারবে। কিছুদূর এগুনোর পরই ঘাট-মাঝির চিৎকার — ‘এই-ই নাও ভেরাও হাঁসচোর …’
কী করবে বুঝতে না পেরে, অলসভাবে বাইতেই থাকে।
‘কী হল, কথা কানে যায় না?’
এরই মধ্যে লোকজন জমে গেছে দুই পারে। একটি নৌকো লোকে ভর্তি করে এতক্ষণে কাছে পৌঁছে গেছে। গলায় গামছা দিয়ে টেনে তুলল তারা। হৈচৈ শুনে ডিঙ্গির খোলে বসে-থাকা হাঁস চেঁচাতে লাগল। একজন লাফ দিয়ে, সেখান থেকে বের করে নদীর দুই পারের উৎসুক জনতাকে দেখাতে লাগল। ডিঙ্গিটি মাঝ-নদীতে পড়ে রইল ভিত সন্ত্রস্ত আর জড়সড় হয়ে। গলায় গামছা দিয়ে হেঁচকা টান মারায় পানিতে পড়ে গেল ঠান্ডা। ঠ্যাটা ছাগলের মতো টেনে ওঠাল পারে। শুরু হল উত্তম-মধ্যম — হাটুরে-মার। মারের চোটে ঠোঁট কেটে গেল। আলো নেই আর — তাই চোখে পড়ল না কারও। মাটিতে পড়ে গড়াতে লাগল — লাথির সঙ্গে চলতে লাগল চিৎকার, গালাগাল, আর শ্বাসনালী চেপে ধরা। ক্যাঁক ক্যাঁক একটা শব্দ হয় তাতে — সেটায় সকলে খুব মজা পেল। জ্ঞান হারিয়ে ফেলল ঠান্ডা।


এক বুড়ো চাচা পাশের জনকে বলল, ‘ঝাঁকাটা ধর-তো শালাকে কিছু দিয়ে আসি।’
মার দিতে গিয়ে, পিছলে দু-পা ফাঁক হয়ে দু দিকে চলে গেল। চাচা সমানে চিৎকার করছে, ‘মা রে, বাবা রে, মরে গেলাম রে …’ ধরাধরি করে তুলে ধরল সবাই। ‘আ-হা-হা, শালা নির্ঘাত পিশাচের বাচ্চা — মরে গেলাম গো — আমার ঝাঁকা-টা … উ-হু-হু …’
হাঁসচোরের কথা মূহুর্তের জন্য ভুলে গেল সবাই।
‘শালা মরে গেল না কী, নড়াচড়া করে না তো!’
‘ভাগো সবাই …’ হঠাৎ খালি হয়ে গেল জায়গাটা।



হাটের কোলাহল থেমে গেছে। একটু যেন জ্ঞান ফিরে এল লোকটির। তৃষ্ণায় বুকের ছাতি ফেটে যাচ্ছে। নাকে-মুখে রক্তের দই জমে আছে। শরীরটা নড়ে উঠল ধীরে ধীরে মালগাড়ির মতো। দেহটাকে টেনে বসাল, নদীর ধারে। পূর্ণিমা গত হয়েছে মাত্র — মরচেয় খসে পড়া থালার মতো আকাশের চাঁদ, নদীর জলে কেঁপে কেঁপে ভেঙ্গে যাচ্ছে। বাড়ির কথা, মেয়ের কথা, মনে পড়ল। উঠতে নিয়ে আবার বসে পড়ল শরীরের ভারে। ঝিরঝির বাতাস বইছে, আর এক সময় তা গড়িয়ে পড়ছে, নদীর টলমলে জলে। বাতাসের ভেতর শুনতে পেল — মেয়ের উৎকণ্ঠা, বুকের ধুকপুকানি। রাতে ঘুমন্ত মেয়ের বুকে প্রায়ই কান পেতে শোনে যে শব্দ। ভাবল সাঁতরে ডিঙ্গিটায় ওঠে। কোথা থেকে ইট বোঝাই এক নৌকো চলে এল, ডাকাতের মতো চিৎকার করতে করতে। ডিঙ্গিটায় সজোরে আঘাত করে চলে গেল; একটা কুৎসিত গাল দিয়ে। ডিঙ্গিটা কাঁপতে কাঁপতে কিছুক্ষণ ঘুরল, তারপর টুপ করে ডুবে গেল। কানফাটা ভটভট শব্দে মেয়ের ছোট্ট বুকের আনাড়ি-শব্দটা চাপা পড়ে গেল। বোঝার কোনও উপায় নেই, ওখানে একটা ডিঙ্গি ছিল, এই কিছুক্ষণ আগেও। নদীটা খুব বেশি রকমের শান্ত হয়ে এল মনে হয়। বিস্ময়ে সেদিক তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে, মুখ বিকৃত করে ককিয়ে উঠল। পা ফেলল বাড়ির দিকে।


মেয়ে মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা এত দেরি করে কেন!’
মা কোনও জবাব খুঁজে পায় না। তাকিয়ে থাকল ফাঁকা উঠোনটার দিকে। বলল, ‘নুন দিয়ে ভাত খেয়ে নে, সকালে মাছ দিয়ে খাস।’
‘না! বাবা আসুক …’


জানালা দিয়ে চাঁদের আলো এসে বসেছে জীর্ণ বিছানায়। চারপাশ নীরব হতে ধরেছে। কয়েকশ গজ দূরে, রাস্তার ধারের বাড়িগুলো থেকে মাঝে মাঝে চিৎকার ভেসে আসছে — হয়ত খেলা দেখছে টেলিভিশনে। ওদের ওখানে সন্ধ্যা, চা এর সুবাস দোকানে, বিদ্যুতের আলো … এখানে মাঝরাত। কুপিটা কেঁপে উঠে জানিয়ে দিচ্ছে বারবার — হয়ত নিভে যাবে এখনই।
মা মেয়ের কপালে গাল ঠেকিয়ে মরু-নিশ্বাস ছাড়ে। মার অন্যমনস্ক আঙ্গুল বিলি কাটে সমগ্র দেহে। ছোট্ট শরীর অবশ হয়ে আসছে ঘুমে। তবু ছোট্ট বুকের ছোট্ট আশাগুলো তখনও জেগে থাকতে চাইছে …

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement