বসন্তের পড়ন্ত বিকেল৷সূর্যটা পশ্চিম কোনে হেলে পড়েছে৷চার-পাঁচজন সবে কৈশোরে পা দেয়া ছেলের দল খেলতেছে নদীর কাছে৷তাদের দলনেতা দুরন্ত বালক রানা৷তার দুরন্ত এই স্বভাব ই তাকে দলনেতার মর্যাদা এনে দিয়েছে৷অনেক ছনমনে,প্রানবন্ত ছেলেটার মাঝে আজ বড়ই আনমনে ভাব ফুঁঁটে ওঠছে৷ খেলাতে আজ সে মনঃসংযোগ করতে পারছে না ৷কিছুএকটা নিয়ে সে বড়ই চিন্তিত৷সমবয়সী বন্ধু রাসেল এর কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ল৷কিরে দুস্ত আজকা তরে নিরব লাগতেছে কেন??না রে দুস্ত কাল থেইকা থ আর খেলতে পারমু না তাই একটু মনটা খারাপ লাগতেছে৷তরা ভাল কইরা খেলিস৷রানা এই কথাটা বলে আবারও আনমনে হয়ে গেল৷চায়ের দোকানে কাল থেকে তাকে কাজ করতে হবে৷তার পরিবারে মা আর ছোটবোন আছে৷তার বাবা ছোটবোনটার জম্মের কিছুদিন পর যে বিদেশ গিয়েছিল আর কোন খৌঁজখবর নেই নি তাদের৷এক দূর সম্পর্কে চাচা মারফত তারা জানতে পেরেছে তিনি আরেকটা বিয়ে করে নতুন সংসার পেতেছেন৷সেই থেকে তাদের কষ্টের দিন শুরু হয়েছে৷তার মা এর বাসা ওর বাসা কাজ করে তাদের বড় করার চেষ্টা করতেছে৷কিন্তু দিন-দিন খরচ বেড়ে চলায় তিনি সামাল দিতে পারছেন না৷তাই এ বছর লেখাপড়া বাদ দিয়ে তার মামা তাকে কাজ করার জন্য বলেন৷কাজ ও তিনি টিক করে দিয়েছেন৷চায়ের দোকানে কর্মচারীর কাজ৷তিনবেলা খাওয়াবে আর মাসান্তে ১০০০ টাকা বেতন দিবে৷তার মা এর ইচ্ছা না থাকলেও তার ইচ্ছা আছে৷তার মার ইচ্ছে তাকে লেখাপড়া শিখাবে৷রানার ও খুব ইচ্ছে ছিল পড়াশোনার শিখার৷কিন্তু যে ঘরে তিন বেলা ভাত যোগার হয় না সব দিন হয় সে ঘরের ছেলের পড়ালেখা বিলাসিতা ছাড়া কিছু না সে ভাবল৷তবে সে যত কষ্টই হোক তার ছোট আদরের বোনটাকে শিক্ষিত করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে৷বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি পথে পা বাড়াল৷বাড়ি ফিরে শুনল তার মা কে বলতে ভাইজান রানারে কাজ না দিলে হয় না কত আর বয়স?না বইন তুমি আর না কই র না এই বয়েসের অনেকে পোলাপাইন ত কাজ করতেছে৷রানা কাজ করলে তুমার কষ্টও একটু কম হইব৷রানা ও ত মত দিছে৷রানার মা চুপ হয়ে যায় বুকের মানিক নিজের কাছে থাকবে না এটা ভেবে তার কষ্টে বুক ভারী হয়৷অপরদিকে রানার মাঝে বিপুল উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে৷স্কুলে সে শহরের অনেক গল্প শুনেছে৷সেখানে ছবি দেখা যায়,বড় গাড়িতে করে বেড়ানো যায়,সুন্দর-সুন্দর ভবন দেখা যায় আরও অনেক কিছু৷এগুলো তার উৎসাহের উপাদান হয়ে উঠল৷তাই তার মা বারে-বারে যাবে কি না জানতে চাইলে ও তার জবাব একটাই হয় সে যাবে৷তার মা একটা দীর্যশ্বাস দেয়৷ছেলেকে বাহিরে পাঠাতে তার মন চাইছে না৷তার স্বামী বাইরে গিয়ে আর আসেনি তাই তার ভেতর প্রচন্ড ভয় ছিল৷কিন্তু ছেলের আগ্রহের মাঝে তিনি হার মানলেন৷রানা তার খেলার সকল প্রিয় বস্তু সমূহ যেমণ ঘুড়ি,নাটাই,চক্রি,বল ইত্যাদি ছোটবোন ফারজানাকে দিয়ে দিল৷ফারজানা সেগুলো পেয়ে খুশি৷কিন্তু ভাই এর দূরে চলে যাওয়াও তাকে সমান কষ্ট দিতেছে৷র্ানার ও আদরের ছোট বোন,প্রিয় মা,খেলার বন্ধুদের ছেড়ে যেতে অনেক কষ্ট হচ্ছে৷তবেও তাকে যেতে হবে৷পরদিন সকালে সূর্য যখন পূর্ব দিগন্তে সে মা,বোন,প্রিয় গ্রাম,খেলার বন্ধু,স্কুল সব ছেড়ে মামার সাথে রওনা দিল৷তারা একটা ইন্জিনের নৌকার উপর ওঠল৷নৌকাটা যত দূরে যেতে লাগল তার প্রিয় গ্রাাম,খেলার মাঠ সব অস্পষ্ট হতে লাগল৷রানার চোখে পানি চলে আসল৷রানা নদীর দুপাশের গ্রামগুলো দেখতে লাগল৷একসময় তারা নৌকা তীরে ভীড়ল৷তারা নৌকা থেকে নেমে একটা বাসে উঠল৷রানা প্রথম বাসে উঠছে৷তাই সে সিটে বসে আগ্রহ নিয়ে সব দেখতে লাগল৷বাসটা পূর্ণ গতিতে চলতে লাগল৷হঠাৎ রানার শরীর টা অস্হির-অস্হির লাগতে লাগল৷সে বুঝতে পারল তার বমিরভাব করতেছে৷সে বমিটাকে কোনরকম বাধা দেয়ার চেষ্টা করল৷কিন্তু বিধিবাম পারল না৷সে তার মামাকে এই অবস্হার কথা জানাল৷মামা তাকে জানলা দিয়ে মাথাটা একটু বের করে বমি করতে বলল৷রানা তার মামার কথা মত জানলা দিয়ে বমি করে ভিতরের সব বের করে দিল৷বমি করার পর রানা সুস্হ হল৷কিন্তু খুব কাল্ত হয়ে পড়ল৷বাসের সিটে মাথা দিয়ে চোখ মুঝে কখন ঘুমিয়ে পড়ল বুঝতেও পারল না৷মামার ডাকে ঘুম ভাঙ্গল৷আয় রে রানা আমরা পৌছে গেছি৷মামা রানাকে নিয়ে একটা রিক্সায় উঠল৷রানা অবাক চোখে শহর দেখতে লাগল৷অবশেষে তারা গন্তব্যে পৌছল তখন বিকেল হয়ে গেছে৷মামা রানাকে নিয়ে চায়ের দোকানের মালিকের কাছ দিয়ে রানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল৷দোকানটা বেশী বড় না ৷ দোকানের মালিক মাঝ বয়সি৷তিনি রানাকে দোকানের বসালেন৷টিকটাক করে দোকানের তার কাজ বুঝিয়ে দিলেন৷আজ বসে বসে দেখার জন্য বললেন এবং কাল সকাল থেকে কাজে লাগতে বললেন৷রানা বসে-বসে সব দেখতে লাগল৷ক্ষিদে লেগেছে এটা তার মালিককে জানানোর পর তিনি ধমক দিয়ে বললেন এখনও এক টাকার কাজ করসি নি খাওয়ার চিন্তা চুপ করে বসে থাক৷রাত যখন গভীর হল মালিক দোকান লাগিয়ে রানাকে নিয়ে বাড়ি গেলেন৷মালিকের দুইছেলে রানার প্রায় সমবয়সী৷মালিকের বৌ তাদের র্ানার সাথে মিশতে বারণ করল রানার সামনেই খারাপ হয়ে যাবে এই অজুহাতে৷মালিকের পরিবারের সবার খাওয়া পর রানাকে খাবার দিল৷খাবারের পরিমাণ অল্প ছিল রানার পেঠ ভরল না৷রানা ভাত কোনরকম খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল৷খুব ভোরে রানার ঘুম ভাঙ্গল মালিকের ডাকে৷মালিক রানার হাতে একটা বড় বালতি দিয়ে বলল পাশের কল থেকে পাঁচ বালতি দোকানে নিয়ে রাখতে৷রানা বালতি নিয়ে কল চাপতে লাগল৷পানি ভর্তি বালতির ওজন অনেক বেশী হওয়ায় অনেক সময় লাগল৷তার জন্য মালিকের ধমক খেতে হল৷দোকান খোলার পর চায়ের কেটলি,চা কাপ,ঝগ,মগ প্রচুর বাসন রানাকে সাবান দিয়ে ধৌত করার জন্য দিল৷রানার অনেক পরিশ্রম হতে লাগল৷সারাদিন কাজের মধ্য দিয়েই চলতে লাগল৷চা পরিবেশন,কাপ ধোওয়া,পানি আনা ঘোরেফিরে এ কাজ করতে লাগল৷কাজ অনুযায়ী খাবার পেল না৷এভাবেই শহুরে জীবণ চলতে লাগল৷মালিকের বব্যহার দিন-দিন ভয়ানক খারাপ হতে লাগল৷চড়,কিল ,মার চলতে লাগল রানার উপর৷সকালে পানি আনতে দেরী হলে মালিক মারে আবার পানি যদি রাস্তায় পড়ে তাও মারে,চা দিতে দেরী হলে মারে,কাপ ধৌত করতে দেরী হলে মারে৷যত বার ভাত খায় দিনে তার থেকে চারগুন বেশী বার মার খায়৷রানার দম বন্ধ হয়ে আসে৷মারের ব্যথায় রাতে ঘুমুতে পারে না৷তবু সকাল থেকে রাত কঠিন পরিশ্রম করতে হয়৷রানা মায়ের কথা,বোনের কথা,গ্রামের কথা মনে করে একা-একা কান্না করে৷দিনদিন সে শাররীক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে৷হঠাৎ একদিন ভুলবসত রানার হাত থেকে চায়ের কাপ ভেঙ্গ যায় ৷এটা দেখে মালিকের মাথায় বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়৷মালিক বাঁশ দিয়ে রানাকে নির্দয় এর মত পেঠাতে থাকে৷রানা রক্তাত হয়ে পড়ে৷আশেপাশের লোকজন এগিয়ে আসে৷মালিক অবস্হা বেগতিক দেখে কেটে পড়ে৷রানাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়৷রানার গ্রামে খবর যায়৷রানার মা পাগলের ছুটে আসে হাসপাতালে৷রানার মার কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে৷ডাক্তার জানায় সে পূর্ব থেকেই আহত ছিল৷তারউপর আজকের আঘাত প্রচন্ডভাবে ক্ষতি হয়েছে মাথার৷তাই বাঁচানো সম্ভব না৷রানার মা ছেলের সাথে শেষ দেখা করে,রানা মাকে দেখে টোঠের মাঝে হাসি ফোঁটে৷আমার বইনডারে পড়ালেখা শিক্ষাই ও মা কারও ঘরে কাজে দিও না মা বলে রানা মায়ের কূলে লুটিয়ে পড়ে৷রানার মায়ের চীৎকার এ পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে৷সাংবাদিকরা আসে ছবি তুলে৷খবর ছাপায়৷জনতা বিচারের দাবিতে মিছিল করে৷সময়ের হাওয়ায় সব মিলিয়ে যায়৷শুধু মিলায় না রানার মায়ের বিলাপ বছরের পর বছর চলতে থাকে "আমার বাপ ধন কই গেলে রেইইইইইইইই......................................................"