বর্তমান বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে বাংলাদেশ জন্ম সময়ের কথাও আমাদের জানা প্রয়োজন। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই বাংলাদেশ, সেইসব শহিদদের পরিবার এখনো তাদের দুঃখকে, প্রিয়জন হারানোর কষ্টকে আগলেই বেঁচে আছেন। আজকের বাংলাদেশ এইসকল শহিদদের ত্যাগে মহীয়ান। এমনই এক শহিদ পরিবারকে নিয়ে গল্প বলার প্রয়াস “ব্রহ্মপুত্রের ঘ্রাণ”।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

২.৪৮

বিচারক স্কোরঃ ১.২৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - বাংলাদেশ (ডিসেম্বর ২০১৯)

ব্রহ্মপুত্রের ঘ্রাণ
বাংলাদেশ

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৪৮

কেতকী মণ্ডল

comment ১৬  favorite ০  import_contacts ২৩৬
এখানে মার্চ মাসেও মৃদু মৃদু শীত অনুভূত হয়। বরুণ কুয়োর পাশে পিড়ি পেতে গায়ে সরিষার তেল মেখে নেয় একচোট। এতে শরীর কিছুটা গরম হয় আর কুয়োর পানিটা গায়ে ঠান্ডার কামড় বসাতে পারে না। বালতি দিয়ে পানি উঠিয়ে পাশে রাখা ড্রামটা ভরে নিল। ঝপাৎ ঝপাৎ পানি ঢেলে শরীর মুছতে মুছতেই হাক দেয়-” ওই মা, ভাত দাও।”
বিমলা গরম ভাতের পাশে হিদল ভর্তা আর ডালের বাটি নিয়ে ঘরে ঢুকে। “দুপুরে কী না কী খাস! খাবারটা সাথে নিয়ে গেলেই পারিস!”
বরুণ হিদল ভর্তা মাখা গরম ভাতের লোকমা মুখে পুড়তে পুড়তে বলে , ”সমস্যা নাই, মা। যেই মাসী রাঁধে সে মুসলমান হলেও কখনো গরু রান্না করে না। বরং কখনো কখনো খাসির মাংস রান্না করে। মাসী সবার দিকেই নজর রাখেন কার কেমন প্রয়োজন বুঝতে।”

জেলা শহরে মেয়েদের স্কুলের পশ্চিমে গলির মাঝামাঝি বরুণদের বাড়ি। ওরা তিন ভাই। বরুণ, অরুণ আর তরুণ। বরুণ পাশের ইউনিয়নে অবস্থিত বেসরকারি কলেজ থেকে পাশ দিয়ে সিএন্ডবি অফিসে টাইপ রাইটারের চাকুরিটা পেয়ে যায়। কলেজে সাহিত্য পাতার সম্পাদক হওয়ায় কাজের সুবিধার্থে টাইপটা শিখেছিল। এখন রোজগারে সেটাই কাজে লেগে গেল।

অফিস থেকে বেড়িয়ে কিছুদূর হাঁটলেই একটা কালী মন্দির রাস্তার পশ্চিমে। উত্তর পূর্ব দিকে একটা মাজার। আর মাজারের পূর্ব পাশেই সরকারি ডাকবাংলো। পাশ দিয়ে ব্রহ্মপুত্রের কুলকুল করে বয়ে চলা জলস্রোত। এ সময় নদীর জল কিছুটা শুকিয়ে থাকে। আবার আষাঢ়ে ভরে উঠে দু’কুল ছাপিয়ে। তখন ডাকবাংলোর উত্তরে কয়েকজন গজ দূরে সীমানা প্রাচীরে নদীর জল এসে ধাক্কা দিয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দেয়। বরুণ শুকিয়ে যাওয়া নদীর পাড় ঘেষে হাঁটতে থাকে। দেশের চাপা অস্থিরতা ওকেও অস্থির করে তোলে। সবুজ সংঘ ক্লাবে শেষ বিকেলে মেহেদী, শ্যামল আর মীনাক্ষীর আসবার কথা। মীনাক্ষীর কথা মনে হতেই বরুণের ঠোঁটের কোনে হাসি ঝিলিক দিয়ে যায়। সামনের শীতে ওরা বিয়ে করবে। সিএন্ডবি অফিসের চাকুরিটা হওয়ার পর তেমন করেই পরিকল্পনা করেছে দু’জনে। মীনাক্ষী বাম রাজনীতির সাথে জড়িত। কলেজে পড়ার সময় বরুণের কবিতা আবৃত্তিতে মুগ্ধ মীনাক্ষী তখনই বরুণে ডুবেছিল। গণসঙ্গীতে মীনাক্ষীর তেজ দেখার মতো হয়।

অরুণ জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছে। ফুটবলে বেশ ভালো। ক্যাপ্টেন মনোয়ার দাদা ওর ওপর বেজায় খুশি। কলেজ ছাত্রাবাসেই মনোয়ার দাদা থাকেন বলে ছাত্রাবাসে অরুণের যাতায়াত বেশি। পাশের জেলার কলেজ টিমকে গত মৌসুমে ওদের কলেজ ফুটবল টিম ৫-০ গোলে জিতে এসেছে। ফেরার সময় সেই কলেজের আনারউদ্দিনের সাথে কী কথা প্রসঙ্গে তর্কে জড়িয়ে অরুণের সাথে হাতাহাতি লেগে যাবার অবস্থা হয়। মনোয়ার দাদা মধ্যস্থতা করে থামিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আনারউদ্দিন গা ঝেড়ে “দেখে নিব” বিড়বিড় করতে করতে চলে যায়।

এলাকার সবচেয়ে পুরনো স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া বরুণের ছোটভাই তরুণ। মাথাভরা কোকড়া চুল, ভরাট শ্যামলা মুখ। মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান হিসেবে খ্যাত সিরাজুল ইসলামের পেছন পেছন সারাক্ষণ ঘুর ঘুর করে। তরুণের কাজই হচ্ছে পড়ার বাইরে সিরাজুল ইসলামের কাছ থেকে শরীর তৈরির কলাকৌশল শিখে নেওয়া। সিরাজুল ইসলাম এলাকার বিশিষ্ট এডভোকেটের ছেলে। কিন্ত লেখাপড়ায় মন বসেনি। বাঁশী বাজাতেন, ছবি আঁকতেন, আর পুরোটা দিন খেলা নিয়েই মেতে থাকতেন। পাড়ার ছেলেদের নিয়ে ফুটবল খেলতেন। আর বিকেল হলেই ছুটে যেতেন এলাকার ব্যায়ামাগারে। এরপর এই ব্যায়ামাগার থেকে একদিন এলাকায় প্রাদেশিক শরীর গঠন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান হয়ে ফিরে আসা। এরপর একদশক পেরিয়ে গেছে।

বিমলা সন্ধ্যাবাতি দিয়ে বরুণের অপেক্ষায় থাকে। অরুণ আর তরুণ সাধারণত সাঁঝের মধ্যেই বাড়ি ফিরে আসে। রেডিওর খবরে দেশের পরিস্থিতি ভালো ঠেকছে না। সারাদেশে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ছড়িয়ে পড়ছে। হানাদার বাহিনী যতটা বিপজ্জনক তারচেয়ে বেশি বিপজ্জনক অবাঙালী, রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। এরা নিজেদের সব ঝাল উসুল করে নিতে বড্ড তৎপর হয়ে উঠেছে। এদিকে শোনা গেল ডাকবাংলোর সাইনবোর্ড নামিয়ে সেখানে শান্তি কমিটির সাইনবোর্ড ঝুলিয়েছে আনারউদ্দিনের নেতৃত্বে ওদেরই কিছু ছেলে। কিন্তু শান্তি কমিটির নামে ওখানে ইসলামী ছাত্র সংঘের কাজ চলছে সেখানে।

ঋতুর পালাবদলে এখন ব্রহ্মপুত্রের জল দু’কুল ছাপিয়ে থৈ থৈ করে। অফিস শেষে বরুণ যখন নদীর পাড়ে হাঁটতে যায় ইচ্ছে করে ভরা ব্রহ্মপুত্রে মীনাক্ষী আর ও জলের উপর ভেসে থাকে। মুখের উপর সুনির্মল আকাশ আর কখনো হঠাৎ করে টুপটাপ বৃষ্টির ফোঁটা পড়বে ওদের মুখের উপর।

শীতের আমেজ ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের মানুষগুলোর গায়ে লাগতে শুরু করেছে। মীনাক্ষীর মাঝে কনে ভাবটা এখনো আসেনি। সে পোস্টারিং, মিটিং নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটায়। বরুণের সাথে মীনাক্ষীর কথা হয়েছে। দেশের এমন সময় বিয়ে করাটা ঠিক হবে না। দেশের জন্য কিছু করা জরুরি। মীনাক্ষী আরেক জেলায় চলে যাবে সেখানকার মেয়েদের সংগঠিত করতে।


এদিকে গোপনে খবর ছড়িয়ে পড়েছে শান্তি কমিটির নামে ডাকবাংলো হয়ে উঠেছে টর্চার সেল।
ডাকবাংলোর পাশেই বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘর তুলে থাকতো সমলা আর তার বাবা-মা। সমলা ডাকবাংলোয় আসা অফিসারদের জন্য রান্নার কাজ করতো। কিন্তু সমলার বাবা-মা যখন জানতে পারলো ডাকবাংলোয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঘাটি গেড়েছে তখন আর মেয়েকে রান্নার কাজে পাঠাতে ভরসা পায়নি। কিন্তু আনারউদ্দিনের ভয়ে মেয়েকে পাঠাতে বাধ্য হয়েছে। কয়েকমাস মেয়ের চেহারা তারা দেখেনি। আতঙ্কে দিন-রাত পার করেছে আর মেয়ের জন্য দিন গুনেছে। আনারউদ্দিনের সাথে দেখা হলেই আশ্বাস পেয়েছে মেয়ে ভালো আছে। নিরাপত্তার স্বার্থে বাইরে আসতে পারছে না আপাতত।

এক বিকেলে অরুণের বড় ভাই পরিচয়ের কারণে বরুণকে সিএন্ডবি অফিস থেকে আনারউদ্দিনের সাথের ছেলেরা ধরে নিয়ে যায় ডাকবাংলো শান্তি কমিটির আস্তানায়।
অরুণ খবর পেয়েছে সিরাজুল দাদা, মনোয়ার দাদাকেও ধরে নিয়ে গেছে। কিন্তু বাইরে থেকে কেউ কোন খবর আনতে পারছে না যাদেরকে ধরে নিয়ে গেল তাদের কী হলো! এমনই এক সন্ধ্যায় বাড়ির সামনে কয়েকজন বন্ধুর সাথে কথা বলে সবে বাড়িতে ঢুকেছে এর মধ্যেই কয়েকজন অপরিচিত বাঙালী যুবক এসে অরুণকে ধরে নিয়ে গেল। আনারউদ্দিন অরুণের উপস্থিতি নিশ্চিত করে সেদিন সন্ধ্যায় নিজ জেলার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় দু’দিন পর সেখানকার কাজ শেষ করে ফিরে আসবে বলে।
বরুণ গেছে, অরুণও গেল! বিধবা বিমলা পাগল প্রায়। সন্তানদের না জানি কী ক্ষতি হয় ভয়ে। কারণ শান্তি কমিটির আস্তানায় যারা গেছে তাদের কেউ ফিরে আসেনি। পাশের বাড়ির স্কুল প্রধান শিক্ষিকা রোশনি আপার পায়ে পড়লো বিমলা ছেলেদের উদ্ধারের জন্য। কারণ অরুণের বন্ধুদের কাছ থেকে ছেলেদের ফিরে পাওয়ার কোন আশ্বাস বিমলা পাননি।
রোশনি আপা দু’দিন খুব ছুটোছুটি করে অরুণকে ফিরিয়ে আনতে পারলেও বরুণের কোন খোঁজ কোনভাবেই আর পাননি। কারণ বরুণের সাথে যা হবার তা হয়তো আগেই হয়ে গিয়েছিল। আর তরুণও তখন এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে নিজেকে বাঁচাতে।

তরুণ পলাতক জীবন থেকে ফিরে এসেছিল বেশ অনেক পরে। ততদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। এলাকার কৃতিসন্তান অনেককেই হারিয়েছে ওরা। মিস্টার ইস্ট পাকিস্তান, মনোয়ার দাদা কাউকেই বাঁচতে দেয়নি আনারউদ্দিনের লোকেরা। তুলে দিয়েছিল শান্তি কমিটির নামে টর্চার সেলে হায়েনা পাকিস্তানী হানাদারদের হাতে। তখন অনেকদিন আনারউদ্দিনকেও দেখা গেছে থ্রি নট থ্রি বন্দুক হাতে মোড়ে মোড়ে ঘুরে বেড়াতে!

অরুণ ফিরে আসার পর তার হাতের একটা আঙ্গুল কাটা আর হাতের অন্যান্য অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেখা গেলেও কি এক অদ্ভুত কারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার এতোবছর পরও অরুণ মুখ খুলেনি বাড়ি থেকে কারা তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কেউ তথ্য সংগ্রহের কাজে অরুণদের বাড়িতে এলেও সে সামনে আসেনি কখনো। মীনাক্ষীর আর কোন খবর পাওয়া যায়নি।
সমলা ফিরে এসেছিল ডাকবাংলো থেকে। ১৮/১৯ বছরের সমলা কি শুধুই রান্নার কাজ করেছে নাকি টর্চার সেলের অত্যাচারীদের নির্যাতনের শিকারও হয়েছে এ ব্যাপারে কখনোই কিছু জানা যায়নি। যে সমাজে নির্যাতিত, সম্ভ্রম হারানো নারীকে তুচ্ছ করা হয়, করুনার চোখে দেখা হয় সে দেশের নারীরা নির্যাতিত হয়েও, সম্ভ্রম হারিয়েও সব কষ্ট, অসম্মান লুকিয়ে রাখতে চায়। কিন্তু সমলা মুখ খুলেছিল। মুখ খুলেছিল সে প্রায়ই গুলির শব্দ শুনতো, শুনতো মানুষের আর্তনাদের কথা। বাবা-মার কাছ থেকে জেনেছে ডাকবাংলোর উত্তর পাশে ব্রহ্মপুত্রের পানিতে রক্তাক্ত লাশ ভেসে যাওয়ার কথা। জেনেছে পিতা আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পুত্রকে ধরে আনলে পিতা বেঁচে গেলেও পুত্রকে বাঁচাতে পারেনি পিতা।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তরুণ ডাকবাংলোর উত্তর পাশে যেখানে ব্রহ্মপুত্র ছুঁয়ে গেছে প্রাচীর সেখানে প্রায় সময় গিয়ে বসে থাকতো। চারদিকে হাড়গোড় সরিয়ে কিশোর, যুবক ছেলেরা ডাকবাংলোর দেয়ালে গিয়ে বসতো বিকেলের সময়গুলোতে।

অনেকগুলো বছর পেড়িয়ে গেছে। দেশের সূবর্ণ জয়ন্তী পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আড্ডা দিতে আসা কলেজ পড়ুয়া কিছু ছেলেকে সেদিন বয়সী তরুণ জিজ্ঞেস করে জেনেছিল ওরা ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত। কিন্তু ওরা ব্রহ্মপুত্র পাড়ের ছেলে হয়েও, ওরা ছাত্র রাজনীতি করা সচেতন, সোচ্চার নাগরিক হয়েও এই দেশ স্বাধীন হয়েছে যাদের রক্তের, জীবনের দামে তাদের নাম ওরা জানে না। জানার প্রয়োজনও মনে করে না!

স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ এখন আর রাতে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে পারে না। বড় ভাইয়ের শরীর ঘেষে ঘুমিয়ে অভ্যস্থ তরুণ ভাইয়ের শরীরের ঘ্রাণ পায় সন্ধ্যা হয়ে আসা ব্রহ্মপুত্রের জল থেকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement