লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১৮টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৪৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৭ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ঘৃণা (সেপ্টেম্বর ২০১৬)

আসমানি পক্ষপাতিত্ব
ঘৃণা

সংখ্যা

মোট ভোট ৩১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৪৭

ফেরদৌস আলম

comment ১১  favorite ০  import_contacts ৮১৬
মাথায় তার নিখুত সিঁথি, দুপাশে নারিকেল তেলে চিকচিক করা মসৃণ চুল আর তার পেছনে শেষ প্রান্তে অনিন্দ্য খোঁপা, সেই সাথে কপালের মাঝখানে রক্ত-জবার মত অতিক্ষুদ্র একটি টিপ দেখে আলেয়ার মনে হল – সে আবার নায়িকা শাবানার চাইতে কম কীসে? শাবানার একটা ছবিও তার আজ পর্যন্ত বাদ যায়নি বুদ্ধি হবার পর থেকেই। সেই মাকছুদ মাস্টারের বাড়ি গিয়ে প্রতি শুক্রবার পিঁড়ে পেতে বসে হা-করে গিলতে থাকা শাবানা-আলমগীরের ছবি দেখা, কী উত্তেজনা ছড়াত আলেয়ার মনে! হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে গিয়ে তার আসন দখল করতে হত, বাড়ি ফিরে বাজানের হাতের মাইর খেতে হত-তবুও চৈত মাসের খাড়া দুপুরে নদীর ঘোলা কিন্তু মিঠে পানি খাওয়ার মত পরান জুড়ানে শান্তি ছিল তাতে। “এইবার যেই আইব হেই কিন্তু আমারে দেইখ্যা হা হইয়া যাইব”-আলেয়ার তাই মনে হয় মুহূর্মুহু। ছোটবোন মাইমুনা এসে তাড়া দেয়, ঐ বু, তাড়াতাড়ি করো না ক্যান্‌, মায়ে তুমারে মুখে পাউডার ম্যাখ্‌বার কইছে ভালো কইরা! সত্যি বু, তুমার কাটিন এক্কেবারে শাবানার লাহানই ল্যাগতাছে, শুধু গালের দিহে তিলটা যদি থাকতো, তাইলেই জব্বর হইত! যাহ্‌, ভাগ কইতাছি, খালি পাকা পাকা কথা শিখছস্‌, লজ্জা শরমের বালাই এট্টুও নাই, বলে আলেয়া মাইমুনারে তাড়িয়ে দেয়। পাঠখড়ির বেড়ার সাথে সাটানো ছোট্ট আয়নাটার মাঝে আলেয়া আরেকবার নিজের মুখটা দেখে মুচকি হেসে মায়মুনার উদ্দ্যেশ্যে বলে, বেশি বেশি ঢং দেহায় মাইয়াডা। গরীবের মাইয়া বইল্যায় আশেপাশের কোন মাইয়ারা আলেয়ার সাজগোজ কইরা দিতে আহেনাই তো কী অইছে, আলেয়া নিজেও কী কম সাজগোজ করতে জানে নাহি! গরীবের কারো থাহন লাগেনা, আল্লাই থাহিলেই চলে!

আলেয়ার বাবা মন্টু এইবারও মারাত্মক রকমের উদ্বিগ্ন হয়ে বাজার হতে ছুটে এসে আলেয়ার মাকে বলল, ছেলেপক্ষেরে এবার খাওন একটু অমৃত করে খাওয়াও দেহি! গরুর গোশ্‌ত পাক্কা তিনশ ট্যাহায় কিন্যা আইন্‌ছি। কেনার সময় বক্কর কশাই ক্যামন ড্যাবড্যাব কইরা চাইয়া থাহে আমার দিহে। কারণ আর যতইহোক, কালেভদ্রে আমগো খুউব একটা গোশ্‌ত কেনা তো তেমন একটা হইয়াই উঠেনা। সবই আমার আলেয়ার লাইগ্যাই। ওর একটা বিহিত কইরা যাইতে পারিলে কী ভালো যে লাইগ্‌ত বউ! বউ তার এমন কথা শুনে এমনভাবে তাকাল, যেন ঘন মেঘে ঢাকা চাঁদটি দেখতে পাওয়া একদম নিষ্ফল জেনেও খুব ঘাড় উচু করেই দর্শনার্থী উঁকি দিচ্ছে-যদি একটু দেখতে পায়।দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে আঁচলে চোখ মুছে বাজারের ব্যাগ নিবিষ্ট মনে ঘাটতে লাগল। ঘাড়ের উপরের ঘামছাটি দিয়ে মন্টু নিজের পায়ে বাড়ি দিতে দিতে ধূলা ঝাড়তে লাগলো আর বলল, তুমার এই কান্দন তো আর ভাল্লেগানা, আল্লাহই যেহানে আমার মাইয়ার কপাল লিখ্যা রাইখ্‌ছে সেইহানেই ও যাইবো, এত চিন্তা-মিন্তা কইরা কুনো লাভ আছেনি?
-আমি কি তা চাইনে? চাই, চাই, কিন্তু এত বার দেইখ্যা দেইখ্যা মুন্‌ডা অনেক দূর্বল হয়া যায় যে.....
- তুমি হইলে হের মাও, তুমারেই তো সাহস এট্টু বেশি রাখন লাইগ্‌ব। আল্লার কাছে দুয়া কইরো, ঠিক অইয়া যাইব।
-পোলা হইলে কি এত চিন্তা-মিন্তা কইর্‌তাম, হে আমার পয়লা মাইয়া, তার উপ্‌রে এমন দেইখ্যা..........
-উহ্‌, তুমি থাম দেহি এট্টু, যাও, মুন্‌ডা দিয়া রান্না কইরা সব গোছগাছ কইরা রাইখ্য, আমি দেহি কয়ডা মুরুব্বীরে ডাইক্যা আনি, ছেলে-পক্ষ আইলো বলে।বলেই, ঘাড়ের উপর আবার গামছা আলতো বেগে রেখে উঠানের রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যাবেলার মাছের বাজার ধরার উদ্বেগাক্রান্ত মাঝির মত খানিক দৌড়ের মত করে হেটে হেটে বের হয়ে গেল

প্রায় সন্ধ্যা ঘনার আগে আগে, পাখিদের দু একটা দল খানিক ক্লান্তিময় পাখা ঝাপ্টাতে ঝাপ্টাতে যে যার দখল করা বাঁশঝাড়ে লুকাবার সময় ঠিক ছেলেপক্ষ বাড়ির উঠোনে এসে কিছুটা রব তুলে এসে পৌছল, ছেলের বাড়িও বেশি দূরে নয়, পাশের গ্রাম কাঞ্চনপুরের। সমন্ধটা বেশ ঘাম ঝড়িয়েই মন্টু মিয়াকে নিজের নাগালে আনতে হয়েছে প্রায় মাস খানেক হাড়ভাঙ্গা হাটা-পথ মাড়বার পরেই, কতজনকে তার যেচে যেচে শোনাতে হয়েছে, আমার তো ভাই বিবাহযোগ্য একখান মাইয়া আছে, হের বিয়া দেওন লাইগ্‌ব, বাপ হিসেবে একটা ভালা ছেলে অইলেই ভারী খুশি অইত মুন্‌ডা আমার!

লেবুর শরবত বুড়া বুড়া লোকগুলো কী রহম ঢকঢক কইরা গিল্যা খাইল, হেরা মনে অয় বাপ-জন্মেও কুনোদিন শরবত খাইয়া দেহে নাই। জানালার ছিদ্র দিয়ে তাই দেখে আলেয়া মুখ টিপে হেসে ফেলে। মাইমুনা দৌড়ে এসে বলে, বুজান, আইজ মায়ে আমারে লেবুর শরবত দিছিলো, কী যে মিঠা! তুমি খাইবা?

-আমি কি তুর লাহান পেটুক, সারাদিন খালি খা-খা কইরা ঘুইরা বেড়াই। আমার খাওন লাইগ্‌ত না, তুই খা গে যা! - শুনে মাইমুনা গুনগুন করে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। আলেয়া আবারও দেখতে থাকে, আলমগীরের মত দেখতে মানুষটা ঠিক কোথায় বসে আছে, দেখতে নিশ্চয় আলমগীরের মতনই হবে নয়তো কাছাকাছি তো হবেই। আলেয়া উদাস মনে আওড়ায়, যহন মানুষডা তারে বউ বইল্যা ডাইক্‌ব, তহন কত্ত লজ্জা যে তার লাইগ্‌ব। যাহ্‌, কী সব আবোল-তাবোল ভাবতাছি! মাইন্‌ষে কী কইব? বলব, পাত্রীর এক্কেবারে কুনো লজ্জা-শরমের বালাই নাই। আলেয়া আবার বেঞ্ছিতে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে থাকে, মধ্যিখানের মানুষটাই বুঝি হেই হইব, দেখতে তো বেশ কালা, মাথায় চুলও খানিকটা নাই হইয়া গ্যাছে, লম্বায় তো বেশী নয়, গাল দুইড্যা কেমন জানি চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা লাগে-ইশ্‌ মানুষডা তো আলমগীরের লাহান না, তয় সোহেল রানার লাহান কিছুটা-খালি চুল যদি আর কিছু থাইক্‌ত আর গায়ের রঙটা দুধের লাহান হইত। দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো সে ভাবে, যাই হউক, ভালোই ভালোই তাও যদি এই মানুষডাই তার স্বপ্নের মানুষ হইত! পুঁটি মাছ আর পুঁই শাকে যেমন গরীব মাইন্‌ষের অমৃত, তেমন পুরুষ মানুষ হইলেই সেডাই গরীব মাইয়ার রাজপুত্র!

খানিক বাদেই আলেয়ার মায়ে তারে নিয়ে মানুষগুলার সামনে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দেয়। লম্বা ঘোমটা টেনে মাটির দিকে চেয়ে খুব জড়সড় হয়ে আলেয়া একটা আধা-পুরানো চেয়ারে বসে। যেন পুতুল পুতুল লাগে, খুব সাজানো, রঙ্গিন, চাবি দিলে চলবে নইলে লজ্জাবতীর মত চুপসানো থাকবে। আলেয়ার নাকে ঝাঁঝালো আঁতরের ঘ্রাণ এসে ধাক্কা দেয়। সে বুঝতে পারে, ঈদের সময় বাজান হাট থাইক্যা যে দশ ট্যাহার আতরের শিশি লইয়া আনে এটা সেই রহমেরই আঁতর। গোধূলির নিষ্পাপ আঁধারি আঁধারি আকাশটা যেন একটা নিষ্পাপ দরিদ্র মেয়েকে তার স্নেহের কোলে ঢেকে বারবার বলছে, মানবের মন যদি শুভ্র হয় তবে তার চাইতে বড় দাগহীন কুসুমকলি দ্বিতীয়টি আর কিছুই হতে পারেনা সমস্ত পৃথিবীর মাঝে।
তুমার নামডা কী মা? বয়স্ক এক লোক প্রশ্ন করল আলেয়াকে।
- মুছাম্মাত আলেয়া খাতুন।
- ঘোমটাডা একটু তুইল্‌বা মা?
পেছন থেকে আলেয়ার মা ঘর্মাক্ত আর অবসন্ন দৃষ্টি নিয়ে ঘোমটা উঠিয়ে দিল! কিছু একটাতে যেন অতিথিমহল নিমেষেই ধাক্কা খেল, তার পরে মুখ চাওয়া-চাওয়ি হল কিছুক্ষণ। পাত্রের বাবা মন্টু মিয়াকে বলল, ভাইজান, একটুখানি আমরা কতা বইলা আসি। পাত্রসহ সকলেই উঠল, গুজবের মত গুনগুন করে কথা সারল, তারপরে মন্টু মিয়াকে আহত করে, কাঁদিয়ে দিয়ে বাড়ি থেকে দ্রুতবেগে যে পথে এসেছিল সেই পথেই সন্ধ্যার আঁধারে মিলে গেল। মন্টু মিয়া সেই যে সন্ধ্যার পর মাথায় হাত দিয়ে কোমর ভেঙ্গে বসে পড়েছে, নিশ্চুপ আর হতবাক হয়ে চোখের জল গড়িয়ে দিয়ে কথা বন্ধ করেছে, তার পরে শূন্য উঠোনে সে ছাড়া মধ্যরাত্রি পর্যন্ত আর কোন মানব উপস্থিত ছিলনা।

ঘরের মধ্যে দুই দিক থেকে ফোঁপানো কান্নার স্বর এক মারাত্মক বেদনাবিধূর মূর্ছনা ছড়িয়ে দিল, যার একটি ছিল আলেয়ার আরেকটি তার মমতাময়ী মায়ের। একলা ঘরে বাঁশ-বাতির জানালা গলে শীতল জোৎস্নার আলো আলেয়ার নোনা-জলমাখা মুখের উপর আছড়ে পড়ে এক অদ্ভুত মায়ার জাল তৈরি করেছে। আলেয়ার মনে কত কত প্রশ্ন জাগে-একবার তার বাবাকেই দোষী মনে হয়। “বাজান এত্ত কালো হইয়াও মায়ের মত এত্ত কালো মাইন্‌ষেরে ক্যান বিয়া কইরতে গ্যালো? কালো হইলেও তো আমার ফেস-কাটিং তো শাবানার লাহানই, রঙই কি সব? আল্লাই বা ক্যান আমারে এরম করলো, কালো মাইনষেরও তো কত সুন্দর পোলাপান অয়, আল্লাই কি আমারেও এরম কইর্‌তে পারত না? শাবানার উপ্‌ড়েই আল্লার বেশি দরদ, বেশি পক্ষপাত! তার প্রতি তার এট্টু করলেই কী অইত? কোন প্রশ্নেরই উত্তর আলেয়ার কাছে আসেনা। শুধু তার অবুঝ বাবার শত মিনতি সত্বেও, কাঁদো কাঁদো অনুরোধ সত্বেও পাত্রের বাবার সেই উচ্চকণ্ঠের কথাটি তীরের মত কানে বাজে- ভাইজান, মাইয়া তো পাতিলের কালির লাহান কালা! আর কালা রঙ না হয় বাদই দিলাম, এক্কেবারে সামনের দাঁত দুইহান হাতীর দাঁতের লাহান উঁচা?

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement