কিছুদিন আগের কথা, শিহাবের বাড়ির পাশ ঘেঁষেই অনেক বড় একটা ফ্ল্যাট ওঠেছে। এই ফ্ল্যাটের পাশে ওদের পুরনো দোতলা বাড়িটিকে ক্ষুদ্র ও হাস্যকর মনে হয়।
শিহাবের রুমটা দোতলায়। ওর জানালার বিপরীত দিকে যে ফ্ল্যাটটা আছে, তাতে বড়ো একটি পরিবার থাকে। একান্নবর্তী বলা যেতে পারে। এই আধুনিক সময়ে কোন পুত্র তাঁর মা-বাবাকে নিয়ে একসাথে থাকে, এটা আশ্চর্য ঘটনা। সময়ের সাথে সবই বদলায়, কিন্তু সবাই বোধ হয় বদলায় না।
ওই পরিবারের বড় পুত্রের পনেরো বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। নাম— ‘নিনা।’ শিহাবের জানালার পাশে যে বারান্দাটা আছে, সেটা ওর। সে বারান্দার কোণায় একটি গোলাপের টব রেখেছিল। অনেকদিন পার হলেও এই গাছে কোন ফুল ফুটেনি।
সবচে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রায় প্রতি রাতেই মেয়েটা বারান্দায় এসে গাছটার সাথে আপনমনে কথা বলে। এ কারণে সে নিনাকে বেশ কয়েকবার ‘গাছকন্যা’ বলে ক্ষেপিয়েছে। অবশ্য মেয়েটা এতে রাগ করেছে।
শিহাব অনেকখানি নিশ্চিত ছিল, নিনার টবে কোন ফুল ফুটবে না। সে ঠিক করেছে, টবটা অ্যাশট্রে হিসেবে ব্যবহার করার জন্য চাইবে। মেয়েটা এতে রাগ করবে। রাগ করলে ওকে সুন্দর দেখায়।
নিনার টবে একটা গোলাপ ফুল ফুটেছে। সন্ধ্যেবেলা দৃশ্যটা শিহাবের চোখে পরেছে। এতে সে খুবই অবাক হয়েছে। মেয়েটা নিশ্চয়ই অনেক খুশী হবে। বারান্দাটা দেখতে এখন অন্যরকম লাগছে। নিঃসঙ্গ বারান্দার কোণায় একটি লাল গোলাপ!
গাছ মনে হয় মানুষের কথা বোঝে। তা না হলে, এতদিন পর ফুল ফুটবে কেন? গাছের উত্তর দেবার পদ্ধতিটা সুন্দর। শিহাবের ভালো লেগেছে। মানুষ মানুষ বোঝে না, প্রকৃতি হয়তো বোঝে। সঠিক সময়ে নড়াচড়া করে।
আজকাল মানুষ ফুলের সৌরভ নেয় না। ফুল মানেই কাউকে উপহার কিংবা বিক্রি করে দেয়া। আচ্ছা, নিনা প্রথম ফুলটা কাকে দিবে? এটা নিয়ে শিহাবের সামান্য কৌতূহল আছে। কৌতূহলটা সত্যি হলে সে বলবে—
‘ডাঙর ঢেমনি এইখানে আয়,
তর্জনীতে কাদা মেখে তোর কপালে পরিয়ে দিই
বিঘা বিঘা সুন্দরের টিপ।’

নিনা তার দাদীজানকে খুব পছন্দ করে। সে সুযোগ পেলেই ওনার সঙ্গে গল্প করে। সমস্যা হল, এই মহিলা সবসময় পানের ওপর থাকেন। তাঁকে দেখলে মনে হয়, জাবর কাটা এই পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। এই মহিলাকে সে কখনো রাগ করতে দেখে নি। তবে পান- চুন শেষ হয়ে গেলে তাঁর গলায় সামান্য অস্থিরতার আভাস পাওয়া যায়। তখন তিনি বলেন, ‘হারামজাদাকে বলবি পান-চুন-জর্দা-সুপারি এসব নিয়ে আসতে।’
হারামজাদা হল নিনার পিতা, কোন এক কারণে বৃদ্ধা তাঁর একমাত্র পুত্রকে হারামজাদা ডাকেন।
সম্প্রতি তিনি একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন। তাঁর নাতনী যতবার বারান্দায় যায়, ওপাশের জানালায় একটা শ্যামলা রঙের ছেলে এসে দাঁড়ায়। ওরা ফিসফাস করে কথা বলে। নিনাকে তিনি বারান্দায় যেতে বারণ করেন, ‘ওদিকে যাবি না, ওই পোলাটা ক্যামন করে তাকায়’
নিনা যদিও আর বারান্দায় যাবে না বলেছে, তবুও তিনি সংশয়মুক্ত হতে পারেন নি।
তাছাড়া মেয়েটা বদলে যাচ্ছে। হুট করে বদলে যাওয়াটা খারাপ। ছোটবেলা থেকেই মেয়েটা ঘুমাবার সময় গল্প শুনতে চায়। এটা ওর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। আজকাল সে গল্প শুনতে চাচ্ছে না।
রাতের বেলা নাতনীকে কোন গল্পটা বলবেন, বৃদ্ধা সেটা সকালেই ঠিক করে রাখেন। বয়স্ক মানুষের গাঁ ঘেঁষতে খুব কম মানুষই চায়। মেয়েটা ব্যতিক্রম। কাছাকাছি থাকে। তাই সে দূরে গেলে তাঁর জন্য সমস্যা।
বৃদ্ধা ঠিক করেছেন, নাতনীকে এবার আসহাবে কাহাফের গল্পটা বলবেন। তাঁদের সাথে একটা কুকুর ছিল। নাম— 'কিতমির।' নেয়ামুল কোরআনে বলা হয়েছে, যে দশটি পশু বেহেশতে যাবে, এটি তাদের একটি। অতি আশ্চর্য ঘটনা।
কিন্তু এই গল্পটা নাতনীকে বলা যাচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে, সে এখন গল্প শুনতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। শ্রোতার আগ্রহ না থাকলে গল্প জমে না।
নিনার এখন সবকিছু অদ্ভুত লাগে। নিজেকে অচেনা মনে হয়। দাদীজানের যা বলেছে সত্যি। ছেলেটা আসলেই ক্যামন করে তাকিয়ে থাকে। সে আগে খেয়াল করেনি।
আজ তার টবে ফুল ফুটেছে। ফুলটা কাকে দেয়া যায়?
মাঝে মাঝে যেমন কষ্ট পেলে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করে, ঠিক তেমনি ইদানীং তার তারায় তারায় রটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে—‘ক্যামন’ ব্যাপারটাকে সে খুব পছন্দ করে ফেলেছে।
এই মুহূর্তে ‘ক্যামন’ নিনার সবচে পছন্দের শব্দ।