লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ এপ্রিল ২০১৯
গল্প/কবিতা: ১৭টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftস্বাধীনতা দিবস (মার্চ ২০১৭)

১৭৫৭ এর অভিজ্ঞান থেকে আজকের স্বাধীনতা।
স্বাধীনতা দিবস

সংখ্যা

সালমা সেঁতারা

comment ১  favorite ০  import_contacts ৪২৬
যেদিন বাংলা, বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব, সিরাজউদ্দৌলার জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয়েছিলো, “লর্ড ক্লাইভের” নিয়োজিত জল্লাদ “মোহাম্মদি বেগ” এর খড়গের নীচে।
আমাদের স্বাধীনতা হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৪৮ বছরে পা দিল। ঘুমিয়েতো থাকেনা মহাকাল, তবে নির্দিষ্ট সময় আসলেই মহাকাল পাশ ফিরে শোয়, কোলে থাকে তার ফেলে আসা দিনের ব্যর্থতা, সফলতা অর্জন, বিসর্জন, আর থাকে কিছু রক্তাক্ত ইতিহাস।

যতই মালা কেড়ে নির্মাল্য করি,
মুকুট খুলে ফেলি বিস্মরণের অন্ধকুপে,
ইতিহাস হেঁটে যাবে নগ্নপায়ে পায়ে
ভ্রুকুটি করার তার সময় কোথায়!
অতিক্রম করে যায় কক্ষপথ রাজি
হাওয়ার সাথে সে ঘটনাবান্ধব
যুগের সাথে ধরে সকল বাজী।

আমরা সকলেই জানি আমাদের জাতিয়তার বার বার উত্থান পতনের গল্প । ৪৭ এ জন্ম নিয়ে ৫২ এর রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ৭১ এসে রক্ত সায়রে ভাসালাম আ-বহমান বাংলাদেশের সাম্পান। তখন থেকেই চলছে ইতিহাসের এই পূণর্পাঠ। এই পূনর্পাঠ থেকেই আমরা সংবৎসরের ব্যর্থতা, ভুলগুলোকে শুধরে নেবার সূত্র ধরেই শোধরানো হল একটি ভুল। যা ছিলো ৪৭ বছরের ধ্র“বসত্য ভীন্ শাসকের দ্বারা উৎপীড়িত আত্মার অঘোষিত প্রস্তাব। তা হল ১০ম জাতিয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এর প্রত্যক্ষ প্রস্তাবের মাধ্যমে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করার জন্য। এই প্রস্তাব ১০ম জাতিয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে, সার্বজনীন ও সর্বান্তকরণে গৃহীত হয়েছে।

সম্মানীত নুতন প্রজন্ম, চলুন এবার একটু ঘুরে আসা যাক, সেই সব স্মৃতির রক্তাক্ত প্রাঙ্গন থেকে। সারাদেশ জুড়ে যে তান্ডব চলেছিলো সেই বিভৎসতা, বর্ণনায় সবটুকু চিত্র আনা যায়না। ২৬ মার্চ ঢাকায় গণহত্যা হল। ২৭ মার্চ আমি সদ্য বিবাহিতা। আমি তখন কিশোরী বধু। তৎকালীন স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে (রূপালী ব্যাংক) চাকুরীরত স্বামীর হাত ধরে রংপুর শহরের মুলাটোল পাড়ার এক জজকোর্টের পেশকারের বাসায় ভাড়া এসেছি। ২৭ মার্চ আনুমানিক দুপুর ২ ঘটিকা। হঠাৎ রংপুর শহর ধোঁয়ার কুন্ডলিতে পরিণত হলো। পুরো শহর আতংকে কাঁপছে। বিখ্যাত প্যারাডাইস কোম্পানীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তুমুল গোলাগুলি চলছে। যে বাসায় ভাড়া এসেছি তার সামনের বাসার এক মধ্য বয়সি চাকুরীজীবী বেতন তুলে বাজার করতে গিয়েছিলেন। তিনি বেতন তুলে বেতনের টাকা পাঞ্জাবির বুক পকেটে রেখে বাজার করে বাড়ী ফিরছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবন নিয়ে ফেরা হলো না। রিক্সাআলাকে কোনরকম মুলাটোলের লোকেশনটা হয়তো বলতে পেরেছিলেন। তারপর রিকসায় করে আসলো তার লাশ। পকেটের টাকা ভেদ করে গুলি হৃদয়ে ঢুকে তার প্রানবায়ু বের করে দিয়েছিলো। রক্তে ভিজে গিয়েছিলো তার টাকাগুলো। একদল ছেলে মেয়ে তার এতিম হয়ে গেল। তাপর “কারফিউ” । অর্থাত সান্ধ্য আইন জারি হল। মানুষের বাজার ঘাটি খাওয়া দাওয়া সব বন্ধ হয়ে গেলে। সবার রুমের দরজা বন্ধ। লুকিয়ে লুকিয়ে শুধু ভারি বুটের আওয়াজ আর গুলির আওয়াজ শোনা যেত। কোনভাবে কেউ বের হলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি করে মারা হচ্ছিলো। চোখের সামনেই আমাদের ভিতরের উঠোনে স্বপন নামে একটি ছেলেকে গুলি করে মারা হলো। এই রকম অগনিত ঘটনা চোখের সামনে ঘটেছে যার হিসেব দেবার মত ক্ষমতা নেই। তখন সকলেই আমরা পুরুষ নারী নির্বিশেষে জয় বাংলা বেতারে প্রচারিত গানগুলি শুনে বোবা কান্নায় লুটিয়ে পড়তাম। হ্যালো, আমার প্রিয় প্রজন্ম, ক’দিনের ঘটনা বা ক’জনার কথা বলবো। সেই ভয়াবহ গণহত্যার দৃশ্য কতটুকু বুঝাতে পারব? পারেনিতো সবটুকু জহির রায়হানের “স্টপ জেনোসাইট” পারেনিতো আনোয়ার পাশার “ রাইফেল রোটি আওরাত” এর মত প্রামান্য বইও। চলুন প্রজন্ম আমরা ইতিহাসের অভিজ্ঞান ঘুরে আসি-
ভগীরথি নদী দিয়ে দুঃখজনকভাবে পরাজিত নবাব পাড়ি দিচ্ছিলেন, প্রিয়তমা পত্নি লুৎফুননেসা ও শিশু কন্যাকে নিয়ে। প্রধান সেনাপতি “মীরজাফর” এর বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব ইংরেজ বেনিয়া “লর্ড ক্লাইভের” সাথে পলাশির প্রাঙ্গনে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি ভগীরথি নদী দিয়ে গোপনে আত্মরক্ষার্থে ঢাকার নবাবদের কাছে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশতঃ সেই সময়ে মীরজাফর আলীর পুত্র “মীরন” এর নিয়োজিত গোয়েন্দা “ফকির দানিশ শাহ্” ধরিয়ে দিয়েছিলেন নবাব পরিবারকে এই নদীপথেই। নৌকার মাঝি তখন হƒদয়বিদারক একখানি গান গাইছিলো। আমরা সে গানখানি সবাই জানি- নদীর একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে এইতো নদীর খেলা। তারপরের ঘটনা বাঙালি মাত্রই জানি। ১৬৪৪ - ১৬৫০ঃ মোঘল সম্রাট শাহ্জাহান দাক্ষিনাত্যে অবস্থান করছিলেন। এই সময়ে তাহার কন্যা রাজকুমারি জাহান আরা অগ্নিদগ্ধ হন। সম্রাট শাহ্জাহানের দুই কন্যা ছিলেন। জেবুন্নেসা ও জাহান আরা। রাজকুমারি জাহান আরা ছিলেন একাধারে কবি ও সর্বগুণে গুনান্বিতা। সম্রাট এই কন্যাটিকে খুব পছন্দ করতেন। অগ্নিদগ্ধ হবার খবরে সম্রাট ভীষণ বিচলিত হয়ে উঠলেন। তখন সুরাট বন্দরের ইংরেজ ডাক্তার “গ্রাবিয়েল বাউটন” সম্রাট নন্দিনীকে আরোগ্য করে তোলেন। এই কৃতজ্ঞতায় সম্রাট, ডাক্তার বাউটনের অনুরোধে, ইংরেজ কোম্পনিকে বাংলায় আংশিক বাণিজ্যের অনুমতি দান করেন। এই শাহী ফরমানটি বাংলার সুবাদার এর দায়িত্বে (গভর্ণর) নিয়োজিত স্বয়ং সম্রাট নন্দন শাহ্ সুজা ছিলেন। সুবাদার সুজা শাহী ফরমান খানা না দেখেই, মাত্র ৩ হাজার টাকা বার্ষিক নজরানার বিনিময়ে ইংরেজদের বাণিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। এই সেই কুখ্যাত “ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” যার অগ্রনায়ক ছিলো কুখ্যাত “রবার্ট ক্লাইভ”।

সেই শুরু হলো বাংলার আকাশে সূর্য্যগ্রহণ। বিত্তের বিনাশ হলো, বাঙালির চিত্তের বিনাশ হলো, সর্বোপরি বিনাশ হলো বিশ্বাসের। সেই “বিশ্বাসঘাতকতা” এখনও বাংলার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে ইতিহাস পাশ ফিরে শোয়। ইতিহাস কালে কালেই কিংবাদন্তী। প্রত্যেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার চলমান সময়ের যারা প্রত্যক্ষদর্শি থাকে, তারা বিগত হলেই ইতিহাস বিভিন্ন রচয়িতার কলমে কলমে, ক্রমেই মতান্তর ঘটতে থাকে। এ ভাবেই পরিণতি পায় ইতিহাস কিংবদন্তীতে। এই পরিবর্তনের ধারাক্রমেই একটা জাতির উত্তরণের কালকে, সঠিকভাবে ধরে রাখতে পারে না উত্তরকাল।

উত্তরণ ঘটিয়ে দিয়ে ইতিহাসের মহানায়করা অত্যন্ত দুঃখজনকভাবেই বিদায় নিয়ে যায় করুন দৃশ্যপট রচনা করে। বিশ্বের ইতিহাসে এটাই চিরসত্য। বাঙালি, বাংলা তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলার মানুষ-ই সেদিন বাংলাভূমির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো, নিচ্ছে, এবং নেবে - চিরদিন শুধুমাত্র ব্যক্তি স্বার্থের কারণে। তাই বাঙালির ভাগ্যে একদিন নয় প্রতিদিন পলাশি, প্রতি মার্চেই ৭১। জাতির মহানায়কদের যতই করুন মৃত্যু হোকনা কেন, পরবর্তী যুগ বা কাল কখনই শিক্ষা নেয়না ইতিহাস থেকে। এটিই কালের ঝুড়িতে অক্ষমতার চরম সত্য।

ইতিহাসকে অতিত আখ্যায়িত করে, “কাল” তার আপন চরিত্রে নতুন নতুন পাঠ রচনা করে চলে। ইতিহাস ও তার বদলা নিতেই থাকে পর্যায়ক্রমে। এই জন্যই সেই শ্বাপদ চরিত্রের লোকগুলো ঘুরে ফিরেই জন্ম নেয় জাতির কোলে। শুধু চিহ্নিত করে নিতে হয় এদেরকে প্রজ্ঞার অনুসন্ধানি দৃষ্টিতে। কে নেই? যাদের হাতে বাংলার স্বাধীন সূর্য্য অস্তমিত হয়েছিলো ভগীরথি তীরে? মীর জাফর, জগত শেঠ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, ইয়ারলতিফ, মীরণ, ফকির দানিশশাহ্ এরা আমাদেরি রায়ে স্বপৌরুষে আমাদেরি চারিপাশে। আমরা নিরুপায় বাক প্রতিবন্দি।
তবু, আমাদের সামনে চলে আসে সেই দুঃখজনক দিবসগুলো বিস্মরণের পার থেকে একদিনের স্মরণসভায়।
তবে এ কথাও সত্য, জসীমতো ভোলেনা বাংলার মেঠোপথ, বাউল কী ভোলে লালনতত্ব? মুছে গেছে কী নূরুলদীনের জোয়াঁল কাঁধের খত? ভোলে কী নাট্যকার? অন্ধনিয়তি শপথ রঙ্গমঞ্চ, বুদ্ধির বাজী খেলেছিলো যে ঘৃন্য জাফর জাগলার।
ইতিহাস যে বদলা নেয় তার দৃষ্টন্ত রেখে যায় গাদ্দারদের বিচিত্র বিনাশের মাধ্যমে। কথিত আছে সেই পলাশি দিবসের বিশ্বাসঘাতকদের দৃষ্টান্তমূলক মৃত্যুর ঘটনায়-
১। মীর জাফর আলী খানের মৃত্যু হয় কুষ্ঠরোগে।
২। মীর জাফরপুত্র মীরণের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে।
৩। জগতশেঠ গঙায় তার সলীল সমাধি হয় (সলিলচিতা)।
৪। মোহাম্মদি বেগ পাগল কুয়ায় ঝাঁপ দিয়ে মারা যায়।
৫। ইয়ারলতিফ নিরুদ্দিষ্ট হয়ে যান।
৬। রায় দুর্লভ কারাগারে মৃত্যুবরণ করেন।
৭। ফকির দানিশ শাহ্ সর্পদংশনে মৃত্যু হয়।
৮। রবার্ট ক্লাইভ টেমস নদীতে আত্মহত্যা করেন।
৯। ওয়ারেন হেষ্টিংস মামলায় জড়িয়ে সর্বহারা হয়ে পরের দানে শেষ জীবন কাটান।
এটাই সত্য লোভিদের স্বর্ণপিন্ড কখনই পাওয়া হয় না।
বিঃদ্রঃ ইতিহাসে মতান্তর থাকতে পারে।

অতএব, অনুধাবন কর হে আমার প্রিয় প্রজন্ম, নিজের অস্তিত্বকে। তোমরা প্রত্যক্ষে পরোক্ষে কোন না কোনভাবে এদেশের শহীদদেরি সন্তান। ৩০ লক্ষ প্রাণের আত্মজ উত্তরসূরী। স্বাধীনতাকে জাগ্রত রাখ দ্বারে। স্মরণ কর জাতির জনক কে, স্মরণ কর তাদেরকে যারা জাতির জনকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে করে গেছে আত্মদান। জাতির সেই সব বীরশ্রেষ্ঠ, বীর প্রতীক, বীরউত্তমদেরকে। আল্লাহ পাক তাদের তাত্মত্যাগে দান করেছেন আমাদের আজকের স্বাধীনতা। এ গল্প কোন সত্য মিথ্যা মিলেয়ে কিংবদন্তী নয়! আল্লাহ পাক স্বয়ং এ মাটির বুকে দান করেছেন কিছু কিছু ক্ষণজন্মা প্রাণ। তাদের আত্মদানের মাধ্যমেই অর্জিত এই ভূমি, এই স্বাধীন বৈজয়ন্তী।

অতএব; রক্ষা কর এই জাতিয়তা, এ দেশের মান, যার ভিটি থেকে দাঁড়িয়ে যাও সম্পদের পাহারাদার। সকলেই আমরা আমাদের সীমান্তরক্ষীকে জ্ঞাপন কর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা ভাষা শহীদানদের প্রতি, কারণ শহীদরা আমাদের মায়ের ভাষাকে যদি আমাদের মুখে ফিরিয়ে না দিত তাহলে আসতোনা চেতনায় রণহুংকার, বাজতোনা জয়ভেরী।

জাতিয় কবির ভাষায় উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল বাংলা ভাষাকেই ধ্বনিত হয়েছিলো আকাশে বাতাসে। আল্লাহ পাক বলেছেন, মাতৃভূমির সম্পদ ও সীমান্ত যে ব্যক্তি একরাত জেগে পাহারা দেবে তাকে দেয়া হবে হাজার রাতের এবাদতের সওয়াব। প্রজন্ম; বর্ষিত হোক করণাবারী আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement