বেশ আনন্দেই দিন কাটছিল। বান্ধবী ছিল,ভাসির্টি ছিল, ক্লাস ছিলো আর ছিল ক্রিকেট মাঠে বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলা, সন্ধ্যায় টিএসসিতে আড্ডা। সব হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম কেবল আমার জীবনটাই বোধ হয় বরবাদ করার জন্য এরকম একটা ঘটনা ঘটতে চলেছে। যেদিন প্রথম সংবাদটা কানে আসলো সেদিন ছিলো পহেলা ফাল্গুন। বেশতো আনন্দের সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছিলাম । হঠাৎ ফাহিমের ফোন “ দোস্ত সবর্নাশ হইছে,এই মাত্র টিভিতে খবরে শুনলাম এ বছর ২১ ডিসেম্বরেই দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাবে।” প্রথম প্রথম আমি ওর কথায় পাত্তা দিইনাই। বলেছি হলে হবে তাতে আমার কি? যত সব আউল ফাউল কথা বলে আমার মুড অফ করে দিসনা। ও বার বার আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করলো এটা আউল ফাউল কথা নয় এটা সত্যি কথা। তুই একবার টিভি দেখ। আমি কোন কথা না শুনে ফোন রেখে দিলাম। ফোন রাখতে না রাখতেই আকিবের ফোন। “শোন দুনিয়াটা ধ্বংস হয়েই গেল । ওরাতো তাই বলছে।” আমি আর কি বলবো এতো জনে যেহেতু বলছে তাহলে বিষয়টা নিয়ে একটু ভাবতে হয়। বাসায় ফিরে রাতে টিভিতে দেখলাম একই খবর। ইন্টারনেট ঘেটে নাসার ওয়েব সাইটেও কিছু কিছু তথ্য দেখলাম। আমি বেশ ভাবনায় পড়ে গেলাম। মাত্র কদিন আগে সায়না আমার প্রেমে সাড়া দিয়েছে এক বছরও যাবেনা এর মাঝেই পৃথিবী শেষ হয়ে গেলে আমার ভালবাসার কি হবে! দেখলাম বাসার অন্যদের মাঝেও বেশ দুঃশ্চিন্তা বিরাজ করছে। আমার বড় ভাই বেশ কিপ্টে। কোন দিন নিজের থেকে কিছু কিনে দেয়না,চাইতে চাইতে মুখে ফেনা উঠে গেলেও সে কিছু দিতে চায়না। শেষে কানিজ আপা যখন বলে তখনই ভাইয়ার মন গলে। এবার দেখলাম সব উল্টে গেছে। দুনিয়া ধ্বংস হচ্ছে এই খবরটা প্রচার হয়ে বেশ ভালোই হলো। বড় ভাইয়া নিজে আমার রুমে এসে আমার পাশে বসলেন। কিছু একটা বলবেন এটা আমি অনুমান করতে পারছিলাম। ভাইয়া নরম সুরে বললেন কত কত টাকা ইনকাম করলাম কিছুইতো থাকবেনা। আমরাই থাকবোনা তার আবার টাকা। তোকে তো কোন দিন কিছু দিতে পারিনি তুই আমাকে ক্ষমা করিস। আমি মনে মনে বেশ খুশি। ভাইয়া এবার বোধ হয় আমার অনেক দিনের স্বপ্ন অ্যাপলের একটা ল্যাপটপ কিনে দেবে। কিন্তু কিসের কি! ভাইয়ার কথা শুনে আমি দুনিয়া ধ্বংসের খবর শুনে যতটা না শক খেয়েছিলাম তার চেয়ে বেশী আহত হলাম। ভাইয়া বললো তোকে তো কিছু দিইনি তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যদি ২১ ডিসেম্বর দুনিয়া ধ্বংস না হয় তবে তোকে একটা অ্যাপলের ল্যাপটপ কিনেই দেব। আমি হ্যা না কিছুই বললাম না। সবার মুখে যেভাবে শুনেছি তাতে সব আশা ছেড়েই দিতে হচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবলাম থাক তোমার আর ল্যাপটপ কিনে দিতে হবেনা আমি নিজেই কিনে নেব। যেহেতু দুনিয়া ধ্বংস হয়েই যাবে তাই যেখানে যে আছে তার কাছ থেকে ধার নিয়ে নিই। সেই টাকায় ল্যাপটপ কিনে আর বান্ধবী নিয়ে আড্ডায় সময় কাটাই। যে কথা সেই কাজ। ধার চাইতেই কম বেশি সবাই ধার দিয়ে দিল। আমিও ল্যাপটপ কিনলাম বান্ধবীকে নিয়ে কে এফসি বিএফসি আর আমেরিকান বার্গার পিজা হাটে সময় পার করতে লাগলাম। আমার বান্ধবী খুব ভালো। সায়না নাম। ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। আমার সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আমি লেগে ছিলাম ওর প্রেম প্রত্যাশায়। সেই প্রেমেই পড়লি তো আরেকটু আগে পড়লে কি হতো? এখন মাত্র কদিনই বা সময় পাবো ভালোবাসার। পড়ালেখা শিকেয় তুলে তাই জীবনটা এনজয় করতে শুরু করলাম। সব মিলিয়ে মোটামুটি সাড়ে চার লাখ টাকা মত ধার করলাম। সায়নার এবছর ডিসেম্বরের বার তারিখ ফাইনালের রেজাল্ট হবে। ও ডাক্তার হয়ে বের হবে। আমিও পাশ করে বের হবো। তার পরইতো ঘর বাধার আগেই দুনিয়াটা শেষ। আচ্ছা দুনিয়াটা ধ্বংস হওয়ার কি আর কোন সময় ছিলনা! আর দুটো কি তিনটে বছর দেরি হলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো? আমাদের বিয়েটা শেষ হতো দুটো তিনটে না হোক একটা বাচ্চা হতো তার আর কিছুই হলোনা। আমি আমার বান্ধবীকে বলেই ফেললাম দেখো দুনিয়াতো ২১ ডিসেম্বর ধ্বংস হয়েই যাবে এসোনা আমরা তার আগেই বিয়ে করে ফেলি। ও রাজি হলোনা। বললো বিয়েতো করবোই তবে এখনই নয়। একুশ ডিসেম্বর চলে যাক দেখি নতুন বছরের কি উপহার তোমাকে দেয়া যায়। আমি খুব আশায় রইলাম যেন ভালোয় ভালোয় একুশ ডিসেম্বর চলে যায়। হঠাৎ খেয়াল হলো আরে একুশ ডিসেম্বর দুনিয়া ধ্বংস না হলেতো আমার সবর্নাশ হবে। সাড়ে চার লাখ টাকা ধার নিয়ে রেখেছি তা শোধ করতে গেলেতো আমার কিডনি বেচতে হবে। আবার ধ্বংস না হলে সায়নার বলেছে নতুন বছরের শুরুর দিন উপহার দেবে। কোন দিকে যে যাই। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ধারের গুষ্টি কিলাই যেভাবেই হোক ধার শোধ করবো তবুও সায়নার দেয়া নতুন বছরের উপহারটাতো থাকবে। সেই আশায় রইলাম এবং সত্যি সত্যি একুশ ডিসেম্বর এলো আর কিছুই ঘটলোনা। আমি একদিক থেকে হাফ ছেড়ে বাচলাম। এর মাঝেই বন্ধুরা ধারের টাকা ফেরৎ চাইলো। আমি বললাম একটু অপেক্ষা কর সায়নার সাথে জানুয়ারির এক তারিখ আমার বিয়েটা হয়ে যাক তার পরই তোদের টাকা ফেরৎ দেব। ভাইয়া কথা দিয়েছিল দুনিয়া ধ্বংস না হলে ল্যাপটপ কিনে দেবে । তাই ভাইয়াকে বললাম তুমি কথা দিয়েছিলে ল্যাপটপ কিনে দেবে এখন সেই টাকাটা যদি দিতে। ভাইয়া বললো টাকা দিয়ে কি হবে তোর তো ল্যাপটপ কেনা হয়েই গেছে। ভেবেছিলাম টাকাটা পেলে বন্ধুদের ধারের কিছুটাকা শোধ করবো তা আর হলোনা। ক্রমান্বয়ে বন্ধুরা ধারের টাকা ফেরত চাইতে শুরু করলো। সায়নাও ইদানিং দেখা করেনা। ফোন দিলে সহজে ফোন ধরেনা। কয়েক বার ফোন দিলে ফোন দরে বলে এক তারিখটা আসতে দাও এতো অধৈয্য হচ্ছো কেন? এক তারিখেইতো তোমার জন্য জীবনের সেরা উপহার অপেক্ষা করছে। আবার আশায় আমার বুকটা ভরে ওঠে। মনে মনে ভাবি ভাইয়াকে ব্যাপারটা বললে কেমন হয় কিন্ত আবার ভাবি নাহ থাক পরে না হয় বলবো। নতুন বছরের এক তারিখ রাত বারটা। সাথে সাথে সায়নাকে ফোন করলাম। ফোন বন্ধ। আমিতো অবাক। রাত তিনটায় ফোন করলাম ফোন বন্ধ। সকাল হলো তাও ফোন বন্ধ। এইকি তাহলে সায়নার দেয়া জীবনের সেরা উপহার। ভাবলাম যাই খোজ নিয়ে দেখি তাই বাসা থেকে বের হলাম। ওদের বাসায় গেলাম কেউ বাসায় নেই। এমনকি দারোয়ান পযন্ত নেই। কী ব্যাপার কিছুই ভেবে পেলাম না। সন্ধ্যার সময় হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে দেখলাম সায়না লেখা। সারা দিনের সব অভিমান মুহুর্তেই হারিয়ে গেল। আমি রিসিভ করে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে সায়নার মায়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম। সালাম দিলাম। উনি বললেন রক্সি সেজে গুজে সোজা বন্ধন কমিউনিটি সেন্টারে চলে আসো। আমার মনটা দুলে উঠলো। আর দেরি করতে পারলাম না। মনে মনে সায়নাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ দিলাম আর বাকিটা কাছাকাছি এলে দেব বলে রেখে দিলাম। বেশ একখান পাঞ্জাবী গায়ে চাপিয়ে সেন্ট মেখে রওনা দিলাম কমিউনিটি সেন্টারে। সায়না তাহলে বাবা মাকে ম্যানেজ করে এক বারে বিয়ের আয়োজন করেই আমাকে সারপ্রাইজ দিলো। নতুন বছরে ও আমাকে সব চেয়ে দামি উপহার দেবে বলে কথা দিয়েছিল আজ সত্যি সত্যি তা পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছিলাম। একটা সি এন জি নিয়ে দ্রুত কমিউনিটি সেন্টারে উপস্থিত হলাম। ঢোকার আগেই সানাইয়ের সুর শুনতে পেলাম। গেটের কাছে আসতেই একজন এগিয়ে আসলো আমাকে রিসিভ করতে। হেসে হেসে বললো আপনার জন্যই আমরা অপেক্ষায় আছি। বিয়েটা তাড়াহুড়ো করেই সারতে হচ্ছে। আমি বললাম এ আর এমন কি। কোন সমস্যা নেই। আজ আমার মনে সে কি আনন্দ। ভিতরে গিয়ে দেখলাম অনেক অনেক মেহমান। সামনে কনের আসনে বসে আছে সায়না। আমার আর দেরি করা চলেনা। সোজা বরের আসনের দিকে এগিয়ে গেলাম। কেননা ওখানেতো আমাকে বসতেই হবে। ওরা আমার জন্য কতক্ষন অপেক্ষায় আছে। যখন আমি ওখানে গেলাম তখন আমার পৃথিবীটা বদলে গেল। যেখানে আমার বসার কথা সেখানে আগে থেকেই একজন বসে আছে। আতাউর ভাই যে কিনা আমাদের সিনিয়র। তিনি ওখানে কেন তা কোন ভাবেই ভেবে পচ্ছিলাম না। আমাকে দেখে আতাউর ভাই মুচকি হেসে বললেন রক্সি তুমি এসেছো তাহলে। সায়নার একটাই ইচ্ছে ছিল আমাদের বিয়েতে সে তোমাকে প্রধান অতিথি হিসেবে দেখতে চায়। আমিও না করিনি। আমি তখন হিতাহিত জ্ঞান শুন্য। সায়নার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। বললাম নতুন বছরে আমার গলা কেটে আমার হাতে ধরিয়ে দিলে! এমন জীবন সেরা উপহার কেউ কোন দিন আমাকে দিতে পারবেনা। আর কোন কথা না বাড়িয়ে চলে এলাম। চলে এলাম সারা জীবনের জন্য সায়নার পথ ছেড়ে। কানিজ আপা ধারের টাকা সব শোধ করে দিয়েছে। নতুন বছরে কোন দিন আর কোন উপহার আমি চাবোনা। সারা জীবনের যত নতুন বছর আসবে তার সব গুলোর জন্যতো সায়না আমাকে দামী একটা উপহার দিয়ে গেছে।