গল্পের এই সংখ্যার বিষয়ের শিরোনাম ‘মাঝ রাত’। আমার গল্পটিও মাঝরাতে সন্তানহারা একজন মায়ের কাহিনী নিয়ে। গল্পের প্রধান চরিত্র তামান্না তার শিশু পুত্র তমালকে হারিয়ে প্রতিরাত্রে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সবার অলক্ষ্যে। তার ধারনা সে পানিতে ডুবে মারা যাওয়া তার ছেলে তমালের কান্না শুনতে পায় মাঝ রাতে। ডাক্তারদের ধারণা তামান্না ‘হ্যালুসিনেশন’-এ আক্রান্ত।
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মাঝ রাত (সেপ্টেম্বর ২০১৮)

হ্যালুসিনেশন
মাঝ রাত

সংখ্যা

মোট ভোট ১৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৮

জসিম উদ্দিন আহমেদ

comment ৭  favorite ১  import_contacts ২২৬
ছেলেটার সাংঘাতিক গোঁ ধরার স্বভাব ছিল। কারণে অকারণে রাগ করত। কোন কিছু চেয়ে না পেলে সাথে সাথে কান্না জুড়ে দিত। স্বভাব-সুলভ নাকি কান্না। এইতো! এই সেই কান্না। পুকুরঘাট থেকে ভেসে আসছে। রাত যত বাড়বে কান্নার আওয়াজও তত বাড়বে। এই কান্নাটা তামান্নার খুব পরিচিত। একঘেয়ে এবং বিরামহীন কান্না। তমাল এমনি সুর ধরে কাঁদত।

তমাল বেঁচে থাকতে এই কান্না থামানোর উপায় তামান্নার ভাল জানা ছিল। একটু আদর করে দুটো মিষ্টি কথা বললেই হলো। কান্না থামিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আহ্লাদে গদগদ করত তখন।

তমাল মারা গেছে দুই বছর হলো। ছেলে মারা যাওয়ার পর তামান্নার স্বাভাবিক জীবনে ছেদ পড়েছে। সংসার তার গেছে। কোন কিছুই আর আগের মত নেই। স্বামী শাহীনের প্রবাস জীবনের কষ্টার্জিত টাকায় তার নিজের হাতে তিলে তিলে গড়া সংসার। সব কিছু চোখের সামনে ধব্বংস হয়ে গেল। পুত্র-বিয়োগের সংবাদে শাহীন প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরে আসে। কিন্তু সে এসেই বা কি করতে পারল? পরিবারের একটু সুখ-সমৃদ্ধির আশায় প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিল। সব কিছু প্রায় গুছিয়ে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ছেলেটার অকাল মৃত্যু সব কিছু এলোমেলো করে দিল। ছেলেকে হারিয়ে স্ত্রী কেমন তরো হয়ে পড়ে। একেকদিন গভীর রাতে উঠে পড়ে বিছানা থেকে। ছুটে চলে যায় পুকুরঘাটে। যেখানে ছেলেটা ডুবে মরেছিল। চুপচাপ বসে থাকে সেখানে। সে নাকি ছেলের কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। শাহীন অনেক ডাক্তার কবিরাজ করেছে স্ত্রীকে নিয়ে। কিন্তু কোন কুলকিনারা করতে পারে নি।

দিন ভাল কাটলেও প্রতিটি রাত এক একটা মূর্তিমান আতংক হয়ে দেখা দেয় তামান্নার কাছে। ছেলের চাপা কান্না তাকে গভীরভাবে টানে। সে পাগল হয়ে ছুটে যায় পুকুরঘাটে; যেখানে তমাল ডুবে গিয়েছিল।

শাহীনের স্পর্শ বাঁচিয়ে আজ সে চুপিচুপি বিছানা থেকে নেমে পড়ে। অন্ধকারে হাতড়িয়ে সে দরজা খুঁজে বের করে। ঘর হতে বাহির হয়ে দেখে চমৎকার চাঁদের আলোয় ভরে গেছে চারিদিক। হাসনা হেনার সুন্দর সুবাস আসছে উঠোনের কোণের গাছটা থেকে। তমালের হাতে লাগান গাছ। ফুল ভাল বাসত ছেলেটা। রাজ্যের যত ফুল-গাছ এনে লাগিয়েছে। সে নেই, কিন্তু তার হাতে লাগান গাছগুলো সুবাস ছড়িয়ে আজও যেন তার অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে।

আরেকজনও ফুল ভালবাসত। সজিব, তমালের গৃহশিক্ষক। এই বাড়ীতেই সে থাকত। তমালকে পড়াত, দুই জনে মিলে সারাদিন ফুল-পাখি করে বেড়াত। তমাল মারা যাওয়ার পর সেও এই বাড়ী ছেড়ে চলে গেছে। এটাও তামান্নার জন্য বড় কষ্ট।
শাহীনের ঘুম ভাঙ্গলে সে দেখে তামান্না বিছানায় নেই। নিশ্চয় পুকুরঘাটে গিয়ে বসে আছে। প্রথম প্রথম শাহীন স্ত্রীর এমন আচরণে বিচলিত হয়ে যেত। কিন্তু ইদানিং এসব তার গাঁ-সওয়া হয়ে গেছে। সে মোটেও তাড়াহুড়ো না করে বিছানায় শুয়ে থাকে। খানিক পরে আলো জে¦লে বিছানা থেকে নেমে সে উঠোনে এসে দাঁড়ায়। উঠোনে কিছু সময় পায়চারি করে। একবার ভাবে, পুকুরঘাটে যাবে। পরক্ষণে কী মনে করে আবার ঘরে ফিরে যায়।

প্রথম প্রথম তামান্নাকে সে বুঝাত। মরা ছেলের কান্নার আওয়াজ কেউ কি শুনতে পায়? এটা তামান্নার মনের ভুল। তামান্নার এই কান্না শুনতে পাওয়ার বিষয়টি তার নিকট দুর্বোধ্য লাগে। এক সাথে থেকে শাহীন তো কোন কান্নার শব্দ শুনতে পায় না! অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনেছে শাহীন, তারাও কোন কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় নি কখনো। তাহলে তামান্নার ক্ষেত্রে এটা কেন ঘটবে?

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দেখে বলেছেন, তামান্না ‘অডিটরি হ্যালুসিনেশন’ নামক জটিলতায় আক্রান্ত। এক্ষেত্রে রোগী মনে করে যে, সে কোন নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছে। যা আর কেউ শুনতে পায় না। শুধু তাই নয়, সে ঐ নির্দিষ্ট শব্দের বিষয়ে অতিমাত্রায় প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে উঠে। যেমনটি তামান্নার ক্ষেত্রে ঘটেছে।


আরেকটি বিষয়ে শাহীনের মনে খটকা লাগে। তার তমাল মারা যায় পানিতে ডুবে। একদিন সকাল বেলা পুকুরের পানিতে তমালের উবু হয়ে ভেসে থাকা লাশ পাওয়া যায় পুকুরে। তমাল ভাল সাতার জানত, সময়ে অসময়ে চাচাত ভাইবোনদের নিয়ে এই পুকুরে সে হাঁসের মত সাঁতরে বেড়াত অনায়াসে। সেই তমাল কিভাবে পুকুরের পানিতে ডুবে গেল তা আর সকলের মতো শাহীনের নিকটও দুর্বোধ্য লাগে। এ-বিষয়ে মনের গোপন কোণের বিক্ষিপ্ত ভাবনাকে প্রশ্রয় দিলে দেখা যাবে- সকলেই একটি বিষয়ে একমত, তমাল স্বাভাবিকভাবে পুকুরে ডুবে মারা যায় নি, তাকে হয়তো কেউ হত্যা করেছে। কিন্তু কেন? আর এই ‘কেউ’ টা-ই বা কে?
তামান্না ধীর পদক্ষেপে পুকুরঘাটের দিকে এগিয়ে যায়। সে যত এগিয়ে যেতে থাকে কান্নার আওয়াজটাও তত স্পষ্ট হতে থাকে। আজকের কান্নার আওয়াজটা অন্য দিনের থেকে বেশি স্পষ্ট আর তীক্ষè বলে মনে হয় তার কাছে।

মস্তবড় পুকুর কাটিয়েছে শাহীন। শুধু তাই নয়, শখ করে পুকুরের চারিধারে বসার জন্য পাকা বেঞ্চি তৈরি করে দিয়েছে। পুকুরের ঘাট বাঁধান। চারদিকের পাড়ে ফুল ও ফলের বাগান। চাঁদের আলো গাছের উপর পড়ায় সমস্ত পুকুর পাড় জুড়ে চাঁদের আলো ও গাছের প্রতিবিম্ব মিলে মনোরম আলো-আধাঁরির সৃষ্টি হয়েছে। তামান্না এই আলো-আধাঁরের চক্র ভেদ করে একেবারে পুকরের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। নিজের চোখকে যেন সে বিশ^াস করতে পারছে না। সিড়ির কয়েকটা ধাপ নিচে তমাল দাঁড়িয়ে আছে । তার শরীরের কিছু অংশ পানিতে, বেশির ভাগই পানির উপরে। আজও সে কাঁদছে। তামান্না মন্ত্র-মুগ্ধের মত এগিয়ে যায়। একধাপ, দুই ধাপ করে সে সিঁড়ি ভেঙ্গে পুকুরের পানিতে নামতে থাকে। যেখানে তার ছেলে তমাল দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে না পৌঁছে সে মনে হয় থামবে না।

মায়ের কান্ড দেখে তমাল ঘাবড়ে যায়। সে কান্না থামিয়ে উচ্চস্বরে চিৎকার করে তার মাকে পানিতে নামতে বারণ করে।
‘কী করছ মা, তুমি ডুবে যাবে তো। খবরদার পানিতে নেমো না’ তমাল চিৎকার করে বলে।
‘না, আমি থামব না, আমার কিছু কথা বলার আছে তোকে, না বলে আমি থামব না। বাবা রে! আমি তোকে মারতে চাই নি! বিশ^াস কর মানিক, আমি তোকে মারতে চাই নি।’ তামান্নার কথাগুলো আহাজারির মত শোনায়।
‘জানি মা, আমি সব জানি। আগে জানতাম না, মরে যাওয়ার পর জেনেছি। তুমি তো আমাকে মারতে চাও নি। কোন মা কি তার সন্তানকে মেরে ফেলতে পারে?’
‘লোক-লজ্জার ভয় দেখিয়ে, তোর বাবার ভয় দেখিয়ে ...’
‘থাক না মা এইসব কথা। যা ঘটার তা তো ঘটে গেছে! এখন এসব ভেবে কী লাভ?’
‘আমি যে ঘরে থাকতে পারি না বাবা, তোর জন্য মন কাঁদে। রাত হলে তুই এমন করুণ স্বরে কান্না করিস। আমার মাথার মধ্যে সব এলামেলো হয়ে যায়। তাইতো এই পুকুরঘাটে ছুটে আসি। তোর কান্না শুনি বসে বসে। কিন্তু তুই দেখা দিস না কখনো। মরে যাওয়ার পর আজই তোকে দেখলাম প্রথম!’
‘আমার খুব কষ্ট মা, খুব কষ্ট! তাইতো কাঁদি.. ’ বলতে বলতে তমাল পিছন হটতে হটতে আস্তে আস্তে পুকুরের পানিতে নেমে যেতে লাগল। হাটু পানি, কোমর পানি, গলা পানি, ধীরে ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল পুকুরের পানিতে। তামান্না চিৎকার করে ছেলেকে ডাকতে লাগল। ‘তমাল, আমার মানিক! তোকে ছেড়ে থাকতে আমারও যে বড় কষ্ট’। সেও সিঁড়ি ভেঙ্গে পানিতে নেমে যাচ্ছে। সেদিকে মোটেও তার খেয়াল নেই। হাটু পানি, কোমর পানি, গলা পানি....।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement