লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৬টি

সমন্বিত স্কোর

৪.২১

বিচারক স্কোরঃ ২.১৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - শ্রমিক (মে ২০১৬)

বিপ্লবীর মৃত্যু
শ্রমিক

সংখ্যা

মোট ভোট ১৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.২১

জসিম উদ্দিন আহমেদ

comment ১২  favorite ২  import_contacts ৮০১
এক
সকাল বেলা মোবাইলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল। গত কয়েক রাত প্রায় ঘুমহীন কেটেছে। পোষাক শ্রমিকরা তাদের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমেছে। আমি তাদের আন্দোলনের কো-অর্ডিনেটর। পোষাক-শ্রমিকদের নায্য দাবী-দাওয়া মালিক পক্ষের নিকট উপস্থাপন করি। মালিক পক্ষের মতামত শ্রমিক নেতৃবৃন্দের নিকট জানাই। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ বের করার চেষ্টা করি। একজন কো-অর্ডিনেটরকে অনেক কাজই করতে হয়।
কল রিসিভ করতেই মোক্তারের কন্ঠ শুনা গেল। মোক্তার শ্রমিক নেতা। মোক্তার বলল, “আপা আপনি দ্রুত কোনাবাড়ি চলে যান। সেইখানে ঐক্য পরিষদের নেত্রী সালমা ও শাহনাজ আপা আপনার অপেক্ষায় আছে। আমিও আসতেছি। সবাই মিল যাব ‘জান গ্রুপ’-এর মালিকের সাথে দেখা করতে। দেখা করার সময় বেঁধে দিয়েছে ১০-১১ টার মধ্যে। সুতরাং কোন অবস্থাতেই দেরি করা যাবে না।”
‘জান গ্রুপ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বেশ কয়েকটি গার্মেন্টস্ ও সোয়েটার ফ্যাক্টরী আছে। শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ারের মানদন্ডে যে কয়টি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে নি¤œমানের, জান গ্রুপের ফ্যাক্টরী গুলো সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। আমি দীর্ঘদিন যাবৎ এ কোম্পানীর মালিকপক্ষের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু দেখা করতে পারিনি। আজ দেখা করার সুযোগ পাওয়া গেছে। সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। আমি দ্রুত রেডি হয়ে গাজীপুরের বাস ধরলাম।
আমি গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছি দশ বছর ধরে। দিন রাত তাদের সাথেই থাকি, খাই। আমি তাদেরই একজন হয়ে গেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই বাম-রাজনীতির হাতেখড়ি। লেখাপড়া শেষ করে আর দশজনের মত চেনা জানা গতানুগতিক জীবনে আমি বাঁধা পড়িনি। এজন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অধিকার বঞ্চিত শত-সহ¯্র পোশাক-শ্রমিকের কথা ভাবতে গিয়ে নিজের জীবনের কথা সেই অর্থে ভাবা হয়নি। কি হত ভেবে? ভাল কোন চাকুরী ধরে বিয়ে শাদী করে সংসারী হতাম। এই-তো সবাই করে। এ-তে কি এমন ক্রেডিট! তার পরিবর্তে যে জীবন আমি বেছে নিয়েছি, এ জীবনের সৌন্দর্য কম কিসে! এর সৌন্দর্য যে একবার উপলবদ্ধি করেছে সে জানে পৃথিবীর আর সব কিছু এর কাছে তুচ্ছ। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। তারা আমাকে নিয়ে দুঃখ করে। বলে,“তোকে দিয়ে আর কিছু হলো নারে! মেয়ে মানুষের কি এ-সব শোভা পায়? আচ্ছা! চাকরি-বাকরি না হয় না-ই করলি। বিয়ে করে অন্তত সংসারী হতে দোষ কি?” আমি ওদের কি করে বুঝাই যে পৃথিবীর সব মেয়েদের একই ট্রাকে দৌড়াতে নেই! মাঝে মাঝে ট্রাক চেঞ্জ করে কাউকে কাউকে ইলা মিত্র, প্রীতিলতাদের ট্রাকেও দৌড়াতে হয়!

আমরা যথাসময়ে গাজীপুরের মিলিত হলাম। ‘জান গ্রুপ’এর একটি ফ্যাক্টরীতে এসেছি। এর মালিকের সাথে দেখা করব। মালিকের সম্পর্কে যতটুকু জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে এই নব্য পুঁিজপতি শ্রমিকদের নূন্যতম কল্যাণের কথাও চিন্তা করেন না। আন্দোলন সংগ্রাম করে আমরা অনেকের মন গলাতে পেরেছি। কিন্তু এদের মত গুটিকয়েকের ধারে কাছেও পৌঁছাতে পারিনি। এরা আমাদের কোন কথাই কানে তোলে না!
যথাসময়ে আমাদের ডাক পড়ল। আমরা চারজন মালিকের রুমে ঢুকলাম। মালিকের চেয়ারে যে লোকটি বসে আছে তাকে দেখে আমি তো হতবাক। তিনিও আমাকে চিনতে পেরেছেন। নিজের চোখকে যেন আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “সাইমন না!”। আমাকে দেখে সাইমনও অবাক হয়েছে। সে বলল, “আরে চৈতি যে, তুমিও এদের সাথে নাকি? এখনো লেগে আছ! তা বেশ ভাল... দাঁড়িয়ে কেন? বস”
সাইমনের একটি কথাও আমার কানে যাচ্ছে না। আমি ভাবলাম, এই সে কি সেই শিল্পপতি সাইমন হায়দার যার সম্পর্কে শ্রমিকদের অভিযোগের শেষ নেই। শ্রমিকেরা যার নাম দিয়েছে রক্ত-চোষা সাইমন। সাইমনকে দেখে আমার খুবই দুঃখ হচ্ছে। মানুষ কিভাবে এমন করে আমূল পাল্টে যেতে পারে! সাইমন মোক্তারদের সাথে কথা-বার্তা শুরু করে দিয়েছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার সময়ের খুব দাম। আজ দীর্ঘ প্রায় দশ বছর পর তার সাথে আমার দেখা হল। একসময় আমি তার কী ছিলাম সে কথা না হয় সে না-ই মনে রেখেছে। তবুও সহপাঠী হিসেবে, ভার্সিটি জীবনের বন্ধু হিসেবে যতটুকু গুরুত্ব ও আন্তরিকতার দাবিদার আমি, সাইমনের নিকট থেকে তা না পেয়ে আরেকবার আহত হলাম। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এই কি সেই সাইমন! যার দরাজ গলার শ্লোগান একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঁপন ধরাত! “দুনিয়ার মজদুর! এক হও লড়াই কর!!” “লড়াই লড়াই লড়াই চাই! লড়াই করে বাঁচতে চাই!!”

দুই
বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইমনকে সবাই ‘চে সাইমন’ নামেই চিনত। বিপ্লবী চে গুয়েভারা’র মত লম্বা চুল ছিল ওর মাথায়। ঝাকড়া চুল দুলিয়ে মিছিলের আগে আগে সাইমন যখন শ্লোগান তুলত। আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ওকে দেখতাম।

সাইমন ছিল উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। কিন্তু আর দশজনের মত ও আভিজাত্যের বড়াই করত না। গরীব, মেহনতি মানুষের জন্য ওর মন কাঁদত। ও যেন ছিল “হাজার চুরাশির মা”র সেই ‘ব্রতী’। সমাজের উঁচু তলা থেকে সাধারণের কাতারে নেমে আসা একজন বিপ্লবী। একারনে আর সবার থেকে সে আমার চোখে আলাদা হয়ে ধরা দেয়। বাম রাজনীতির দীক্ষা মূলত আমি সাইমনের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। রাজনীতিতে আমার কোন কালেই ইন্টারেস্ট ছিল না। বাম-রাজনীতিতে তো নয়ই। শুধুমাত্র সাইমনকে ভালবাসতাম বলেই ওর সকল কাজকে সমর্থণ করতাম। জোঁকের মত ওর সাথে লেগে থাকতাম
সাইমনের সাথে কত জায়গায়ই না চষে বেড়িয়েছি। সাইমন গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের নিয়ে বেশি কাজ করত। সারাক্ষণ শুধু তাদের কথা বলত। ওর কথা বলার ভঙ্গিটাও ছিল অসাধারণ। শ্রোতারা মন্ত্র-মুগ্ধ হয়ে শুনত। শ্রেণী-শত্রু, বিপ্লব, সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ-শব্দগুলোর সাথে আমার পরিচয় ঘটে সাইমনের হাত ধরে। সে ছিল আশাবাদী ও স্বপ্নবিলাসী মানুষ। নিজের ভাবনাকে অনায়াসে অন্যের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল সাইমনের। আলোক-পিয়াসী পতঙ্গের মত আমি সাইমনের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমার ঘোর কেটে যায়। দেরিতে হলেও আমি বুঝতে পারি, ব্যক্তি সাইমন নয় আমি ভালবেসেছিলাম তার আদর্শকে। তা-নাহলে ওর দেখান পথে আজ এতটা বছর চলতে পারতাম না।
তিন
সাইমনের অতিবিপ্লবী হাবভাবকে বন্ধুদের কেউ কেউ সন্দেহের চোখে দেখত। তারা বলাবলি করত, এগুলো হচ্ছে বড় লোকের ছেলেদের একধরণের ফ্যাশন। ভার্সিটি-জীবনে সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি মুখরোচক বুলি আওড়াবে। লেখাপড়া শেষে ঘরের ছেলে ঠিকই ঘরে ফিরে যাবে! তারপর ইন্ড্রাস্ট্রিয়ালিস্ট বাবার কোন একটি কোম্পানির হাল ধরে নিজেই একসময় ক্যাপিটালিস্ট বনে যাবে!
শুভাকাঙ্গীরা আমাকে বার বার সর্তক করত। আমি যেন সাইমনের তালে প’ড়ে নিজের জীবনটা নষ্ট না করি। সাইমন সম্পর্কে বন্ধুদের কথায় আমি কান দিতাম না। ওর প্রতি ছিল আমার অগাধ বিশ্বাস। কিন্তু সাইমন কি সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে পেরেছিল?
সাইমনের সাথে আমার শেষ দিনটার কথা কিছুতেই ভোলার নয়। সেদিন ছিল ১লা মে। শ্রমিকদের সাথে মে দিবসের নানান কর্মকান্ড শেষে আমরা কøান্ত, শ্রান্ত হয়ে সাইমনের হলে ফিরেছি। নিজেদের ব্যাপারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমার বিয়ের জন্য বাড়ী থেকে চাপ দিচ্ছে। সাইমনকে আমি এ বিষয়ে জানিয়েছি। মে দিবসের ব্যস্ততা শেষ হলে এ-ব্যাপারে আমরা দুজনে মিলে একটা সিদ্ধান্ত নিবে বলে ঠিক করি।
সে-দিন সাইমন আমার ভালবাসাকে অস্বীকার করেছিল। আমাদের দুইজনের মাঝে ছিল ধনী গরীবের সেই চিরন্তন দেয়াল। সে দেয়াল টপকানোর মত সাহস সাইমনের ছিল না। আর মনে হল এতদিন যা শিখেছি তার সব মিথ্যা। সবই স্বপ্ন, ঘোর। সাইমন নামের কারুর সাথে আমার কোন দিন পরিচয়ই ছিল না। পরক্ষণেই মন শক্ত হয়ে গেল। দুঃখের জায়গায় মনে দৃঢ়তা জাগল। আমি ভাবলাম ব্যক্তি সাইমন আমাকে অপমান করতে পারে। সে আমাকে ভালবাসতে না পারে। আমি তো তাকে ভালবেসেছিলাম। এতে কোন ফাঁকি নেই। আমার ভালবাসা ছিল নির্ভেজাল। আমি স্থির করলাম তার দেখান পথেই আমি সারাজীবন চলব। তার দেয়া কষ্টকে আমি নিজের মাঝে লালন করে যাব সারা জীবন। আমি সাইমনকে বললাম, ‘তোমার সাথে কখনো আর দেখা হবে তা আশা করি না! তবে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর না পেলে তোমাকে আমি সারা জীবনও ক্ষমা করতে পারব না!’
সাইমন বলল, কি প্রশ্ন?
আমি বললাম, যা তুমি প্রচার কর তা কি নিজে বিশ্বাস কর? যে ব্যক্তি একটি মেয়ের দায়িত্ব নিতে ভয় পায়, তার দ্বারা সমাজে কি বিপ্লব আনা সম্ভব? কোন দিন এদেশে যদি সমাজতন্ত্র কায়েম হয়, তুমি কি স্বেচ্ছায় হাসিমুখে তোমার সম্পদ গরীবদের মাঝে বিলিয়ে দেবে?
বলা বাহুল্য, সেদিন সাইমন আমার কোন প্রশ্নেরই উত্তর দিতে পারেনি। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর সেই ভিরু, কাপুরুষোচিত দৃষ্টিতে কোন বিপ্লবীর ছবি ছিল না। তবে কি বিপ্লবীর মুত্যু হয়েছে! বন্ধুদের কথা গুলো আমার কানে বার বার আঘাত করতে লাগল, ‘এ-সব বড় লোকের ছেলেদের কাছে বিপ্লবী সাজাটা একধরণের ফ্যাশন! এরা ক্ষনিকের জন্য গরীব গরীব খেলা খ্যালে স্রেফ আনন্দ পাওয়ার জন্য!’

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement