লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭৯
গল্প/কবিতা: ২৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবৈশাখ (এপ্রিল ২০১৬)

বিজ্ঞাপন বন্ধ করুন

ঝড়া ফুল
বৈশাখ

সংখ্যা

জসিম উদ্দিন জয়

comment ০  favorite ০  import_contacts ১৯৯
দিনটি ছিলো ১লা বৈশাখ । বাংলা নববর্ষ । সবাই গুনগুন করে গাইছে ‘‘ এসো হে বৈশাখ, এসো.. এসো..’’। আমরা সবাই একসাথে বলি “শুভ হোক নববর্ষ”। সবাই যখন একসাথে উচ্ছাস্ আর আনন্দ নিয়ে নববর্ষকে স্বাগত জানালো তখন চোখের বাধঁ ভেঙ্গে উতপ্ত জল গড়িয়ে পরছিলো অনন্যার। স্বাধীন এই উম্মুক্ত আকাশ আর প্রকৃতি মাঝে অসংখ্য মানুষ আজ এসেছে রমনা বটমূলে। দিগন্ত-বিস্তৃত খোলা মন নিয়ে নিষ্পাপ সাধারণ মানুষগুলো জানাতে এসেছে বাংলাকে ও বাংলার প্রকৃতিকে তারা কত ভালোবাসে। অনন্যার চোখে জল । একটু ভিন্ন অশুভ ছায়া মনে হচ্ছে। পারভেজ সরাসরি প্রশ্ন অনন্যাকে ।
কি হয়েছে অনন্যা ?
অনন্যার ভিতরে তখনও আতংকের ছাপ। তবু সহসায় নির্লজ্জের মতো বলে ফেলে। “কাল রাতের অন্ধকার আমার সমস্ত কিছু ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ভয়ংকর অন্ধকার আমার শরীরের সমস্ত কাপড়গুলো খুলে নিয়েছে । সারা রাত আমাকে বস্ত্রহীন হয়ে থাকতে হয়েছে। উনি জোড়পূর্বক যৌনলিলায় ভোগ করেছে আমাকে। অন্ধকারে সারাটি রাত কামঁড়িয়ে কামঁড়িয়ে খেয়েছে আমায়। অনন্যার কথা শুনে সবাই হতভম্ব ও উত্তেজিত ।
পারভেজ সরাসরি বলে ফেলে ‘‘নরপশু উনিটা কে ?
অনন্যা : আমাকের জোড় পূর্বক বিয়ে দেওয়া স্বামী তথাকথিক নামধারী মাওলানা সাহেব ।
পারভেজ : তোমার আপরাধ কি ?
অনন্যা : আমার অপরাধ আমি পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে আসতে চেয়েছি । উনি বারন করেছে । পুনরায় আমি অনুরোধ করেছি তাই ।
পারভেজ বিস্মৃত চোখে দেখতে পায়। অনন্যার হাতে, গলায় কামড়ের চিহ্ন। পারভেজ এর বুকের ভেতরটা হাহাকার করা আত্মনাথে কেঁপে উঠে। এবার পারভেজ এর চোখের বাধেঁ উতপ্ত জল। কিন্তু করার কিছুই নেই। পারভেজ ও অনন্যার মাধ্যে ছিলো নিষ্পাপ ভালোবাসা। অনেকদিনের সে ভালোবাসা । নিঃশব্দে নিরবে গড়ে উঠা সেই ভালোবাসা। সেদিন সেই ভালোবাসার গভীর আকৃতি মিনতী কোন কাজে আসেনি। পারভেজ অর্থবিত্তের কাছে জলাঞ্জলি দিয়েছে তার ভালোবাসা। অনন্যার মা ও বাবা জোড় করে বিয়ে দেয় সে বিত্তবান তথাকথিত মাওলানা সাহেব এর কাছে। জার্মানে একটি নামকরা নাইটক্লাবে দীর্ঘদিন চাকুরী করেছে। বিদেশ ফেরত প্রচুর সম্পত্তি ও টাকা আছে মাওলানা সাহেবের। বাংলার মাটিতে পা রাখার আগেই গোঁফ কেটে রেখেছে একগুচ্ছ দাঁড়ি। নিজের নামকে পাল্টিয়ে ফেলে রেখেছে . . মাওলানা সাহেব। পারভেজ মেধাবি স্টুডেন্ট ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের । ভালো রেজাল্টও করেছে । সাদাসিধে খুব সাধারণ এবং সংস্কৃতিমনা । কিন্তু সেদিন তার এই মেধার কোন মূল্য দেয়নি অনন্যার পিতা-মাতা। পারভেজ ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে অনন্যার দিকে। তার ভালোবাসার মানুষটি কষ্ট একদম সহ্য করতে পারছে না। সে এতদিন ভেবেছিলো অনন্যার বিয়ে হয়েছে বিত্তবান মাওলানা সাহেব এর সাথে । কথাটি শুনে একটু মনে সান্তনা পেয়েছিলো পারভেজ । ভেবেছে মাওলানা সাহেব ভালো মানুষ । মাওলানারা খুবই আল্লার প্রিয় মানুষ হয় । তারা সমাজে শান্তির জন্য সংগ্রাম করে। আমাদের সমাজ ও সংসারকে পবিত্র রাখে। অনন্যা অনেক সুখী হবে। পারভেজ এতদিন শুধুমাত্র এই ভেবে সান্তনা পেয়েছিলো । এখন অনন্যার এই অবস্থা দেখে পারভেজ বুঝে যায় এটা ‘‘ভূয়া মাওলানা’’। পারভেজ এর বুক ফাটা কষ্ট হচ্ছে । পারভেজ এর চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে । সামাজিকতার শব্দের দঁড়ি দিয়ে পারভেজ এর হাত পা বাঁধা । কিছুই করতে পারবে না অনন্যার জন্য। ইত্যাদি নানান কথা ভাবছে । এরই মাঝে অন্যন্যা পারভেজ কে বলে “
‘‘পারভেজ দেখো কি সুন্দর আমাদের প্রকৃতি ? খোলা আকাশ-বাতাস আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে । দিগন্ত বিস্তৃত আলো । আলোর মাঝে জড় হয়েছে এই মুক্তমনের মানুষগুলো। আমি পালিয়ে এসেছে। আমাকে ঘরে আটকিয়ে রেখেছিলো। আমি অন্ধকারকে ফেলে আলোর মাঝে এসেছি। এই আলোতে আমি মিশে যেতে চায়। তখনও অনন্যার ভেতরে আতংক ও প্রতিবাদি চোখ। পরিবেশকে শান্ত করার জন্য শ্রাবনী, আলো , শতরুপা, সবুজ , রাজ, শামীম, পারভেজ সকলই একসাথে গেয়ে উঠে ‘“ আলো আমার আলো ওগো আলোর ভ’বন ভরা’ এই রবীন্দ্র সংগীতটি।
গানটি শেষ হতে না হতেই অনন্যার বাবা মা ও অনন্যার স্বামী তথাকথিত মাওলানা সাহেব এসে হাজির। আতংকে অনন্যার মুখে কোন সারা শব্দ নেই। ভয়ে চুপচাপ দাড়িঁয়ে পড়ে। তারপর ধীর পায়ে হেটে চলে তার স্বামীর সাথে । পেছন ফিরে একবার তাকালো। ক্লান্ত চোখ । অনন্যার এই পেছন ফিরে তাকানোটাই, হয়ত শেষ দেখা। পারভেজ নিজের বুকটা চেপে ধরে । কি যেনো কষ্ট হচ্ছে বুকের মাঝে। আর এভাবেই বুকের কষ্ট চেপে রেখে দিন পার করে। প্রতিদিন ভোর হতেই ছুটে যায় বকুল গাছ তলায় সেখানে একঝুড়ি ফুল কঁড়িয়ে বাসায় ফিরে। বকুল ফুলের ঘ্রান খুব প্রিয় অনন্যার । তাই সে এ ফুলগুলোকে নিয়ে অনন্যার জন্য শুভ কামনা করে । মনে মনে প্রার্থনা করে অনন্যা যেন সুখে থাকে। বাড়ীর ছাদের উপর উঠে ফুলগুলোকে উড়িঁয়ে দেয় আকাশে-বাতাসে। আকাশকে চিৎকার দিয়ে বলে ‘‘হে আকাশ তুমি অনন্যাকে ছায়াঁ দিও । হে বাতাস তুমি বকুল ফুলের ঘ্রানটা অনন্যার কাছে পৌছে দিও ।’’

আর এভাবেই চলে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। একটি দুঃসংবাদে পারভেজ এর জীবনের মোড় ঘুঁড়িয়ে দেয়। অনন্যার জন্য ভালোবাসার পাগলামি ছেরে জীবনের সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে পরে পারভেজের । তারপরও বছর কেটে যায় আসে বসন্ত ।
এমনি এক বসন্তের দিন । মেয়েটি তার সামনে দিয়ে রিকসা করে চলে গেলো। বসন্তে বাতাসে মেয়েটি চুলগুলি উঁড়ছে। বকুল ফুলের মালা পরেছে মেয়েটি। চিরচেনা সেই ঘ্রান। চুলের একপাশজুরে ছড়িয়ে দিয়েছে নানা রংয়ের বাসন্তি ফুল। বাঁকা ঠোটে একটু মিষ্টি হেসে চলে যাচ্ছে। পারভেজ এর ঠোঁটে তখন জলন্ত সিগারেট। সেটি মাটিতে পরে যায়। হা করে তাকিয়ে দেখে আর বলে
তোমার চুলে মনের ঘুড়ি,
ইচ্ছে হয়, ইচ্ছেমত উড়ি।
মেয়েরা সাজলে এত সুন্দর লাগে। মনে হচ্ছে শিশির ভেজা ফুটন্ত গোলাপ। জানিস আমার না ঐ মেয়েটির সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো। পারভেজ এর কথাগুলো শুনে হোঃ হোঃ করে হেসে উঠে তার বন্ধুরা ।
শামীম বলে ফেলে, “মেয়েদের হাতের চর খেয়েছিস, চর খেতে ইচ্ছে হলে যা, ওর রিকশা থামিয়ে কথা বল।”
পারভেজ নিজেকে একটু অপমান বোধ করলো। এবং বাজি ধরলো বন্ধুদের সাথে। ঐ মেয়েটির রিকসা থামিয়ে সে কথা বলবে। যেমন বাজি তেমন কাজ। দৌঁড়ে মেয়েটির রিকসা থামালো । পারভেজ মেয়েটির দিকে ভালো করে তাকালো । খুব চেনা সেই মেয়েটি। মেয়েটি একটু হেসে বলে ‘‘ কেমন আছো ” । পারভেজ হতভম্ব আসেপাশে তাকিয়ে বলে । জি¦ আমাকে বলছেন ।
মেয়েটি ঃ হ্যা ঁ তোমাকে । ‘‘পারভেজ তুমি আমাকে চিনতে পারছো না।’
পারভেজ এর দৃষ্টি মেয়েটির বরাবর। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে । দূর থেকে মনে হবে মেয়েটি সে গিলে খাবে। মেয়েটি রিকসা আবার চলতে শুরু করে। পারভেজ এর দৃষ্টি তখনও মেয়েটির রিকসা বরাবর । মেয়েটি অনেকদূর চলে যায় পারভেজ তথনও দাড়িঁয়ে। বন্ধুরা সবাই ছুটে এলে। শামীম আবারও হোঃ হোঃ করে হেসে বলে, ‘‘কিরে, চর খেয়েছিস নাকি ? নাকি খাটিঁ বাংলা বকা খেয়েছিস ?” পারভেজ কারো কথার কর্নপাত করে না। সে সোজা ফ্রিজ হয়ে দাড়িঁয়ে । একটু আগে যে মানুষটি হাসিখুশি ছিলো সে পারভেজ এর চেহারায় ভিতরে যেনে কষ্টের তুফান বয়ে যাচ্ছে। কষ্টের বাধঁ ভাঙ্গার আগেই শ্রাবনীর দিকে তাকিয়ে বলে “জনিস শ্রাবনী , ‘‘অনন্যাকে বড় সুন্দর লাগতো, বাসন্তি কালার শাড়ী পারলে। উড়ন্ত বাতাস তার ঝর ঝর চুল গুলো যখন বাতাসে উঁেড় বেড়ায় । আমি তাকে ভীষন ভীষন ভালোবাসি। অথচ এমন একটি বসন্তে দিনে আমাদের দেখা হয় নাই। বসন্তদিনে আমাদের বিচ্ছেদ হয়েছিলো। সবকিছু ফেলে অনন্যা আমার কাছে ছুটে এসেছিলো । আমি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি । এ ছাড়া আমার কোন উপায় ছিলো না । কেননা আমি জানি সেদিন তার সাথে পালিয়ে বেশী দূর যেতে পারতাম না । ওরা খুবই ভয়ংকর । অনন্যাকে মেরে ফেলতো ।
শ্রাবনী কৌতুহল নিয়ে বলে ঃ “তারপর ”
পারভেজ ঃ “ তারপর অনন্যা চলে যায়। সে নিজে গাড়ী চালাচ্ছিলো । সেদিনই তার গাড়ী একসিডেন্ট করে । হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায়। অবশ্য খবরটা শুনেছিলাম ৫ দিন পরে ।
আর একটু আগে যে মেয়েটি রিকসা করে যাচ্ছিলো । প্রতি বসন্তে এমন একটি দিনে তার সাথে দেখা হয় । রিকসায় চলে যাওয়া ঐ মেয়েটিই অনন্যা। অনন্যা প্রতি বসন্তে একা একা রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় শহড়জুড়ে।
শ্রাবন্তী ব্যপারটা অদ্ভুদ মজার ঘটনা মনে হলে। তাই পারভেজকে প্রশ্ন করলে । তুই বললি অনন্যা মারা গিয়েছে । এটা কে ? তুই তার সাথে কথা বললি না কেন ?
পারভেজ ঃ মনে মনে ভাবছে ব্যপারটা সবাইকে বললে বিশ^াস করবে না । তবু বলতে হবে। আর বললেই যদি অনন্যা না আসে। দেখা না দেয়। তবু বলতে হবে। সকল বাধা সংকোচ ফেলে পারভেজ বলে ফেলে ‘‘এটা জীবন্ত অনন্যা নয়, এটা তার আত্মা। সে প্রতি বসন্তের দিবসে আসে। . . . . . . . . .

advertisement

GK Responsive
GolpoKobita-Responsive
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
    GolpoKobita-Masonry-300x250