লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৩৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.০৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৩ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

কোন এক বিষণ্ণ ফাল্গুন
ফাল্গুন

সংখ্যা

মোট ভোট ৪৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৩৮

সাবিহা বিনতে রইস

comment ২৩  favorite ১  import_contacts ২,০৬১
মাথার কাছে জানালা টা খুলে দিতেই এক পশলা ফাল্গুনী হাওয়া ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লো।সে বাতাসে শীতের আমেজ।আমার পরনে তখন প্রিয়ন্তির দেওয়া হলদে রঙা পাঞ্জাবী। প্রিয়ন্তির সাথে শেষবার যখন কথা হয়েছিল খুব রেগে বলেছিলো,হিমু হওয়ার যখন এতই শখ তো নিন এই পাঞ্জাবী টা।এবার সব ছেড়ে খালি পায়ে রাস্তায় রাস্তায় হাটুন।আমি আর কখনই আপনাকে বিরক্ত করবো না।কথাটি বলেই হনহন করে হেটে বেড়িয়ে গিয়েছিলো সে।আমি ভাবলেশহীন ভাবে তাকিয়ে ছিলাম তার গন্তব্য পথে।প্রিয়ন্তি অবশ্য তার কথা রাখেনি।তার দিন পনেরো পর আবার এসেছিল আমার খোজে।আমি তার আসার খবর আগেই পেয়েছিলাম বলে সরে পড়েছিলাম।প্রিয়ন্তির মুখোমুখির হওয়ার সাহস ছিলনা আমার।তার মায়াময় মুখটির দিকে তাকালে সে মায়ার অতলে ডুবে যাওয়ার ভীষন সম্ভবনা আছে,কিন্তু হিমুদের যে মায়ায় জড়াতে নেই।তাই পালিয়ে গিয়েছিলাম চুপটি করে।গভীর রাতে মেসের রুমে ঢুকেই দেখলাম বিছানা জুড়ে সাজানো প্রিয়ন্তির দেওয়া সব জিনিস পত্র।টুথপেস্ট-টুথব্রাশ থেকে সাবান,স্যাম্পু,তেল,পারফিউম,শার্ট,পাঞ্জাবি,স্যান্ডেল,টিন ভর্তি মুড়ি-চানাচুর আরো কত কি।আমার অগোছালো যাযাবর জীবনকে গুছিয়ে তোলার চেষ্টায় যেন কোন কমতি নেই। সেই সাথে একটি গোলাপ রঙা কাগজে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ছোট্ট একটি চিঠি।
"ইমন ভাই,আপনাকে জড়িয়ে একটা মায়া ঘর বাধঁতে চেয়েছিলাম।সবুজ পাহাড়ের চূড়ো তে সাদা রঙের একটা বাড়ি হত সেই মায়া ঘরের বহিরাবরন।আকাশ ছোয়া পাহাড়ের ঢালে তৈরী ছোট্র বাড়িটির সামনে দিগন্ত ছোয়া সমুদ্রের সৌন্দর্য।আপনি আর আমি দিন শেষে সে সমুদ্রে সূর্যের অস্তাচল দেখতাম...
স্বপ্নগুলো অপূর্ন থাকুক।অপনিই তো বলেছিলেন সব স্বপ্ন পূরণ হতে নেই।স্বপ্নগুলো বরং থমকে থাকুক সময়ের বিপরীতে।শুধু সময়ের পথে আমি এগিয়ে গেলাম।
ইতি,
প্রিয়ন্তি
আমি চিঠিটি বালিশে নিচে রেখে মুড়ির টিন খুলে এক খাবলা মুড়ি মুখে চালান করে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।তারপর আর কখনই প্রিয়ন্তির সাথে যোগাযোগ হয়নি।আমি চেষ্টাও করিনি।করবোই বা কেন?আমি তো হিমু হওয়ার প্রচেষ্টায়।হিমুদের কারো প্রতি মায়া বাড়াতে নেই।
প্রিয়ন্তির সাথে আমার প্রথম দেখা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটারে।আমি তখন সদ্য ভার্সিটি পেরুনো যুবক।আর প্রিয়ন্তি সাহিত্যের ছাত্রী।থিয়েটারে রবীন্দ্রনাথের শাপমোচন নাট্যনৃর্ত্য প্রদর্শনের আয়োজন চলছে।ছোট ভাইদের অনুরোধে আমাকে অরুনেশ্বর চরিত্র করতে হল।আর আমার কমলিকা প্রিয়ন্তি।সেই প্রথম প্রিয়ন্তির সাথে পরিচয়।এক কোমর ঘন চুলের মেয়েটিকে দেখে সেদিন আমি রূপাঞ্জেল বলে ডেকেছিলাম।সে মিষ্টি হেসে বলেছিল,
-ইমন ভাই আমি প্রিয়ন্তি।
পর পর ২ দিন রিহার্সেলের পর মঞ্চের পর্দা উঠলো।অন্ধকার আধো আলোকিত মঞ্চে তখন শুধু অরুনেশ্বর আর কমলিকা।কমলিকা তার হাতে প্রদীপ টি ধরলো অরুনেশ্বরের মুখের কাছে।প্রদীপের মৃদু আলোতে চোখে চোখ রেখে দৃষ্টিপাত করলো কমলিকা।মঞ্চের বাইরে তখন তুমুল হাততালি।কমলিকার চোখ তখনও অরুনেশ্বরের উপর।আমি কমলিকার চোখকে অতিক্রম করে আসল প্রিয়ন্তির চোখে তাকালাম।সে চোখের মায়া ভর্তি টলটলে পানি অগ্রাহ্য করার সাধ্য কার?তবুও আমি উঠে দাড়ালাম।প্রিয়ন্তিকে উপেক্ষা করে বেরিয়ে এলাম থিয়েটার থেকে।আমি পরিপূর্ন হিমু হতে চাই।যে জীবনে রমনীর চোখের টলটলে পানির কোন অস্তিত্ব নেই।

-ভাইজান,আইবো?
দরজার ওপাশ থেকে ছোটনের ডাক শোনা গেল।
-হুম আয়।
-এই যে আপনের কৃষ্ণচূড়া।
এক গাল হাসি দিয়ে ছোটন কৃষ্ণচূড়ার থোকা টা আমার হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল।ছোটন আমাদের মেসে কাজ করে।হাতে বাড়তি ১০টা টাকা দিলেই মেসবাসীর যে কোন দরকারে সে হাজির।তবে আমার বেলায় সে বরাবরই নিস্বার্থ ভাবে নিবেদিত প্রান।
প্রথম ফাল্গুনের প্রখর দুপুর।আমি হাত ভর্তি কৃষ্ণচূড়া নিয়ে হেটে চলেছি।থিয়েটারে সেই দিনটির পর অজস্র বার প্রিয়ন্তি আমার কাছে ছুটে এসেছে।কিন্তু আমার কাছে তখন তা নিতান্তই ছেলে মানুষী বৈ আর কিছু নয়।নিরা চলে যাওয়ার পর ভালবাসা আমার কাছে আদিক্ষ্যেতার মত।৭বছরের সম্পর্ক যদি ভেঙে যেতে পারে,তবে ভালবাসা বলে সত্যি যে কিছু নেই,এ কথা মানতে কি??তবে প্রিয়ন্তি ছাড়লো না আমাকে।ছায়ার মত সব সময় পিছু লেগে থাকতো।মাঝে মাঝে ভাল লাগলেও,বেশীরভাগ সময় আমি চরম বিরক্ত হতাম।আমার প্রতি ওর পাগলামি যতই বাড়ছিল, আমার তার প্রতি অবহেলাও তার সমানুপাতিক হারে বাড়ছিল।কারন আমার মন জুড়ে যে তখনো কেবল নিরা।
প্রিয়ন্তী চলে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন ভালই ছিলাম।কিন্তু মাস না ঘুরতেই তার অনুপস্থিতিটা ভালভাবেই টের পেলাম।প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে,অবচেতন মনে এক ছায়া মানবীর চুড়ির টুংটাং আওয়াজ অথবা উত্তপ্ত কপালে একটা কোমল হাতের স্পর্শ পাওয়ার আশা আমাকে পাগল করে তুলেছিল।আমি বুঝলাম,সেই ছায়া মানবীর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা মানুষটি নিরা নয়,প্রিয়ন্তি। রুমের দরজার নিচে হুটহাট পাওয়া তার উড়ো চিঠি গুলো,কিংবা মুঠো ফোনের বার্তা সবকিছুতেই তখন তার শূন্যতার নিস্তব্ধ হাহাকার।আমি বুঝলাম প্রিয়ন্তিকে ছাড়া আমার জীবন অসম্ভব।তাই হিমু হওয়ার বাসনা কে পেছনে ফেলে উঠে দাড়ালাম।
বসন্ত বরনের উত্‍সব চলছে ক্যাম্পাস জুড়ে।সবার মধ্যেই রঙের আমেজ।সাহিত্য বিভাগের সামনে গিয়ে দাড়ালাম আমি।আমার চোখ তখন প্রিয়ন্তিকে খুজে চলেছে।হাঠাত্‍ বাসন্তি রঙা শাড়ী পরা কোমড় অবধি ঘন কালো চুলের রূপাঞ্জেল কে দেখতে পেলাম।প্রিয়ন্তীও আমাকে দেখে থমকে দাড়িয়েছে।প্রিয়ন্তীর চোখে চোখ রাখতেই সেই নাট্যমঞ্চের কথা মনে পড়ে গেল।সেদিন প্রিয়ন্তীকে উপেক্ষা করে চলে গিয়েছিলাম,কিন্তু এমন ভুল আর নয়।প্রিয়ন্তীর দিকে এগুতে গিয়ে হঠাত্‍ পা আটকে গেল।প্রিয়ন্তীর কাঁধে হাত রেখে দাড়িয়ে আছে এক সুদর্শন যুবক।প্রিয়ন্তি এবার নিজেই এগিয়ে এল।শুকনো একটা হাসি মুখে ফুটিয়ে বললো
-ইমন ভাই,এ আমার......।
আমি বসন্তের আগুনলাগা কৃষ্ণচূড়ার গুচ্ছ তাদের হাতে দিয়ে পেছন ফিরলাম।তারপর দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাবলাম,
আরো একবার নাহয় হিমু হওয়ার প্রচেষ্টায় নামা যাক।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement