লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ অক্টোবর ১৯৭২
গল্প/কবিতা: ৩৫টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবন্ধু (জুলাই ২০১১)

বাবা ও বটগাছ
বন্ধু

সংখ্যা

সূর্য

comment ১০৯  favorite ৬  import_contacts ১,২৯৭
বাসের জন্য অনেকের মতো সিফাতও দাড়িয়ে আছে। ভীড়ের ভেতর থেকে কেউ একজন বলল-
: আপনি কি দনিয়াতে থাকেন?

কারো কোন উত্তর নেই। সিফাতও নির্লিপ্ত বাস আসার পথটার দিকে তীর্থের কাকের মত তাকিয়ে থাকে। ছেলেটা আস্তে আস্তে সিফাতের পাশে এসে দাড়ায়। আবারও প্রশ্নটা করে। এবার সে বুঝতে পারে, প্রশ্নটা তাকেই করেছে।

- হ্যা আমি দনিয়াতেই থাকি। তা কেন জানতে চাইছেন বুঝলাম না। আমিতো আপনাকে চিনি বলেও মনে হচ্ছেনা।
: আমি আপনাকে চিনি। আপনার ক্লাশ মেট আমি, সাইকোলোজিতে ভর্তি হয়েছি।

দুজনের আলাপচারিতা চলতে থাকে, ইত্যোবসরে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো আদমজী টু ঢাকা খোদিত বিশালদেহী বাসখানা হেলেদুলে কোন রকমে এসে দাঁড়ায়। ভিতরে তিল ধারণের ঠাই নেই তবুও হেলপার গুলিস্তান-গুলিস্তান বলে কান ঝালাপালা করে দিচ্ছিল। ওতেই রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা যাত্রীদের প্রায় সবাই উঠে পড়েন। তাদের মধ্যে সিফাত ও তার নব্য পরিচিত ক্লাশমেট রুহুল আমীন বাদুরের মত ঝুলতে ঝুলতে রওনা হল।

কলেজে পৌছে দুজনের পরিচয় হয়। রুহুল আমীন খুলনার কয়রা থেকে এসেছে। এখানে বোনের বাড়িতে উঠেছে। বোন জামাই কোন একটা গার্মেন্টের সুপারভাইজার। তার অবস্থাও এমন নয় যে, একটা সোমত্ত শ্যালককে ঢাকায় রেখে দিব্যি পড়াশোনা করাতে পারেন। রুহুল আমীনের বাবার চিংড়ির ঘের নাকি আছে। ওরা তিন ভাই পাঁচ বোন। তাদের মধ্যে ও হলো দ্বিতীয়। বড় ভাই পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে বিয়ে করে বাবার সাথে ব্যবসা দেখেন, ছোটটা স্কুল ফাইনাল দিবে।


এমনিতে সিফাত বেশ ভদ্র বলে এলাকায় সবার কাছেই একটা সমীহ আদায় করে নিয়েছে। তবে এলাকায় বা এলাকার বাইরে তার কোন বন্ধু কেউ কখনো আবিস্কার করতে পারেনি। তার সারাদিনের রুটিনটা এই রকমঃ ভার্সিটির ক্লাশ যদিও ১১টায় শুরু তবুও ৮টার মধ্যে রেডি হয়ে ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। ক্লাশ মন চাইলে করা নয়তো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো, পকেট হাতরে যদি বাস ভাড়ার অতিরিক্ত কিছু থাকে তা দিয়ে হয় দু'চারটা কলা বা কোন মৌসুমী ফল কেনা এবং তা খেতে খেতে হাঁটা। ক্লাশের সময় শেষ হলে আবার বাড়ীর গাড়ী ধরে ফিরে আসা। বাড়ীতেও নির্ঝঞ্জাট থাকতে পছন্দ করে। কখনও খাবার-দাবার বা অন্য কোন চাহিদায় উচ্চবাচ্য করেনা।

সিফাতদের বাড়ীটা একতলা একটা পুরোনো জীর্ণ বাড়ী। গেটের সামনে অল্প একটু জায়গা বাদে পুরোটাই ঘর তোলা হয়েছে। ওরা দু'ভাই, কোন বোন নেই। বাড়ীতে দুটো ভাড়াটিয়া আছেন। ওর জন্মের আগেই বাবা, দাদাবাড়ীর সবকিছু বিক্রিবাট্টা করে ঢাকার বুকে ৫কাঠার একটুকরো নালা কিনেছিলেন। বছরের আট মাসই সেখানে পানি জমে থাকতো। বর্তমানে অবশ্য এখানে ইট-পাথরের জঙ্গল তৈরি হয়েছে। বাড়ীর একটা ভাগারমত কামরাকে কোন ভাবে একাকী থাকার একটা উপায় করে সেখানেই থাকে। আসবাব বলতে একটা চেয়ার, একটা টেবিল আর পাশেই একটা তাকে বেশ কিছু যন্ত্রপাতির কৌটা সাজানো আছে। তাকের অন্য পাশটায় কিছু পুরোনো সাইকোলজির বই খাতা।

সিফাত সহজে কাউকে তার থাকার স্থানটায় নিয়ে যায়না। আজ রুহুল আমীনের সাথে প্রথম পরিচয়ের পরেও ওকে বাড়ীতে নিয়ে এসেছে।
- তোমার যদি কোন আপত্তি না থাকে তুিম আমার সাথেই থাকতে পারো। তবে সেটা তোমার রুচির উপর নির্ভর করবে। কারন এ ঘরটা ভদ্রভাবে বাসের উপযোগী নয়। সিফাত বললো।
: আমিতো বলেছিই, আমার এখানে থাকার কোন জায়গা নেই। তোমার কষ্ট না হলে আমি থাকতে পারবো।

দুজনে মিলে চলে যায় একটা খাট বা চৌকি যা হোক কেনার জন্য। শানারপাড় হতে ৫হাত বাই ৭হাত একটা চৌকি দরদাম করে ফেলে।
: দুজন মানুষের জন্য এতো বড় চৌকির কি দরকার আছে? রুহুল আমীন বিষ্ময়ে প্রশ্ন করে।
_ তা হয়তো সবার জন্য দরকার নেই তবে আমার কিছু সমস্যা আছে, তাই বড় দেখেই নিলাম।

শুরু হয় দু'বন্ধুর সংসার।

২.
এখন দুজনের মাঝে কথা হলে আর তুমি করে কেউ বলে না। দু'জনেই তুই বলেই সম্ভোদন করে। ওদের দিন গুলো ভালই যাচ্ছিল। তবে রুহুল আমীনের একটা প্রশ্ন বার বার সিফাতের কাছে রেখেও তার কোন জবাব পায়নি।

: আচ্ছা দোস্ত, আমাদের ক্লাশ শুরু হয় ১১টা বা তারও পরে। এখান থেকে যেতে বড় জোর ঘন্টা খানেক সময় লাগে। কিন্তু তুই প্রতিদিন ৮টায় আমাকে নিয়ে বের হয়ে যাস। তারপর খামোখাই ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট। এর কারন কি?
উত্তরে সিফাত শুধু হাঁসে।
-দেখনা বের করতে পারিস কিনা?

রুহুল আমীনের সাধ্যে কুলায়না তা বের করার। বাড়ী থেকে অনেকের চিঠি আসে রুহুল আমীনের। মাঝে মাঝে সেগুলো সে সিফাতকে পড়ে শোনায়। সে মুগ্ধ হয়ে শোনে।

প্রিয় আমীন,
সেই যে গেলে, আরতো কোন খোজ নেই, আমি কি কোন অন্যায় করেছি? কোন অপরাধ কি ছিল আমার? তবে কেন আমার কোন চিঠির উত্তর পাইনা? আমাকে যে এত ভালবাসার কথা বলেছ তা কি সবই মিথ্যে ছিল? প্লিজ লক্ষীটি আমাকে এভাবে কষ্ট দিওনা। দোহাই তোমার আমাকে কিছু একটা বল। আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচবোনা।
তোমার
ঝর্ণা

- তোকে এত ভালবাসে, তবুও কেন ওকে এত কষ্ট দিচ্ছিস?
: আরে ধ্যত! কারো সাথে একটু ভালো করে কথা বললেই যদি ভাবে ভালবাসি তবে আর কি বলার আছে?
-আমার কিন্তু মনে হয়না, তুই শুধু ভালভাবে কথাই বলেছিস। হয়তো ভালবাসিস বলেও জানিয়েছিলি।
: বাদ দে ওসব কথা। ক'দিন পরে এমনিতেই ভুলে যাবে।

সিফাত রুহুল আমীনের কথা শোনে আর ভাবে, "ও কত ভাগ্যবান। ওকে ভালবেসে কেউ একজন পথ চেয়ে বসে থাকে। আর আমি! আমি কেন মানুষের সাথে মিশতে পারিনা, আমি কেন এমন হলাম? নিজের কথা কাউকে জোর দিয়ে বলতে পারিনা?"

ওর স্মৃতি পটে ঘোলাটে কিছু একটা ভেসে উঠতে শুধুই আকুলি-বিকুলী করতে থাকে। কিন্ত সে তা পশ্রয় দেয়না।

আজ রুহুল আমীন অনেক রাত করে বাড়ী ফিরে। সিফাত ইলেক্ট্রনিঙ্ এমপ্লিফায়ার, টেপ রেকর্ডার, টেলিভিশন এর টুকটাক কাজ মাঝে মধ্যে করে থাকে। নিজের খরচটা এখান থেকেই সে চালিয়ে নেয়। আজও একটা এমপ্লিফায়ার বানাচ্ছিল।

: দোস্ত শেখ ইশতিয়াকের ঐ গানটা একটু বাজাবি- "একদিন ঘুম ভেঙ্গে দেখি, সুখের সমুদ্র শুকিয়ে গেছে................। ওর নিজেরও এই গানটা ভীষণ প্রিয়। তাই সে আর দ্বিমত করেনা। দু'জন মিলে গানটা শুনতে থাকে। রিপ্লে করে আবার শোনে, তার পর আবার..............

রুহুল আমীনের দু\'চোখে অশ্রু খেলা করে।

-দোস্ত আমার সম্পর্কে তোর অনেক প্রশ্ন ছিলনা! আজ শুনবি? উত্তরের তোয়াক্কা না করে সিফাত হরহর করে বলে যায় তার ভেতরের কষ্টের কিছু কথা, যা সে শুধুই নিজের ভিতরে জমিয়ে রেখেছিল। কিছুক্ষন পর সে আবিস্কার করে রুহুল নাক ডাকছে।


৩.
পরদিন দু'জন মিলে "বাউলের বাজার" নামক একটা জায়গায় ঘুরতে যায়। শীতলক্ষার একটা শাখা বালু নদীর পাড়ে, আগে নাকি এখানে অনেক বাউল- ফাল্গুন মাসের আট তারিখ একসাথে হতো। এখনো সেই উপলক্ষ্যে মেলা হয়। নদীর পাড় ঘেষে প্রাগৈতিহাসিক কালের স্বাক্ষী হয়ে একটা বটগাছ নদী এবং নদীপাড়টাকে জড়িয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে। গাছটার পূর্বদিকের নদীর অংশের মূলগুলো অনেক দুর পর্যন্ত
বিস্তৃত। নদীতে যান্ত্রিক যান চলার ফলেই নদীর পাড়ের মাটি সরে এমন হয়েছে। সাপ থাকতে পারে ভেবে পারতপক্ষে সেদিকটায় কেউ যায়না। আজ সিফাত রুহুল আমীনকে নিয়ে সেই মূলের উপর চড়ে বসে। বসার যায়গাটাও বেশ, রাস্তা থেকে কারো বোঝার সাধ্য নেই ওখানে মানুষ থাকতে পারে। নিরিবিলি শান্ত একটা পরিবেশ, যেন বটগাছটা আপন মনে সিফাত আর রুহুল আমীনকে কোলে জড়িয়ে রাখে।

- দোস্ত তুই এই জায়গা আবিস্কার করলি কিভাবে?
: আমি যখন অনেক কষ্টে থাকি, চুপচাপ এখানে এসে এই গাছের নিচে বসে থাকি। গাছটা যেন আমায় বুঝতে পারে। আমাকে বাতাসে দোল খাওয়ায়। আর মনটা ভাল হয়ে যায়।
- কাল রাতে তোর অতীতের কথাগুলো শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে গেছি বলতেও পারবনা। আমিতো মনে করতাম আমিই জগতের সবচেয়ে দুঃখী, এখন দেখি তোর দুঃখের কাছে আমি শ্রেফ শেওলার মতো।
: তুই তাহলে সব শুনেছিস? আমিতো ভেবেছিলাম বোর হয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছিস।
- তবে আমি কিন্তু তোর সকাল সকাল বেরিয়ে যাওয়ার কারন বের করে ফেলেছি।
: বলিস কি? কিভাবে?
-রিমাকে তোর অনেক পছন্দ তাই না?
: কিভাবে বুঝলি? গতকাল যখন আমরা কলেজে যাওয়ার জন্য বের হই তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আজ জানতেই হবে। তোদের গোপন যোগাযোগটা আমি ধরে ফেলেছি। শুধু চোখে চোখে যে এত কথা বলা যায় তা কিন্তু আমি আগে জানতাম না। তা ওকে এখনও বলিসনি কেন?
- তুই কিভাবে জানলি বলিনি?
: আমি ওর বান্ধবী আছিয়ার সাথে কথা বলেছি। তুই নাকি ওকে বলেছিলি "ভালবাসি এ কথা মুখে কেন বলতে হবে? আমার চোখ দেখে আর আমায় বুঝে যদি সে জানতে পারে ভালবাসি, তবেইনা সে ভালবাসা স্বার্থক" আরে বোকা এখন কি সে যুগ আছে?

- যুগ না থাকলেও দু'একজন যে এমন প্রেমিক থাকতে পারবেনা এটা তোকে কে বলল?

ওদের কথা আর এগুতে পারেনা। বৃষ্টি শুরু হয়। দুজন দৌড়ে চলে আসে।

৪.
রিমা আশ্রাফ সাহেবের মেয়ে। সিফাতের বাবা যে কোম্পানীতে চাকুরী করে তার উৎপাদন ব্যবস্থাপক। তাই সে কখনো সাহস করে রিমাকে ভালবাসে কথাটি বলতে পারেনা। তবে সেও জানে রিমা তাকে পছন্দ করে।

দু'বন্ধুর সময়গুলো ভালই চলতে থাকে। একদিন সিফাত আবিস্কার করল রুহুল আমীন প্রায়ই তার সাথে ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য বেরোয়না, আর এখন রিমাকেও সে দেখতে পাচ্ছেনা, ফলে তার ভার্সিটি যাবার রুটিনের পরিবর্তন হয়। সকাল ১০টায় বের হয়, কিন্তু যাওয়ার সময় রুহুলকে ঘরে পায়না। কলেজে গিয়ে দেখা হয়।

-আজকাল তুই আমার সাথে আসিস না কেন? আর এত সকালে কোথায় যাস? রুহুলকে প্রশ্ন করে।
: সকালে একটা টিউশনি করিতো, তাই একসাথে আসা হয়না।
- একথাটা আমাকে বললেই পারতিস।

উত্তরটা যদিও সাবলীল তবুও সিফাত আস্বস্ত হয়না। ওর ভিতরে একটা শীতল কষ্টের স্রোত বয়ে যায়। তার একমাত্র বন্ধুকে তার জীবনের অনেক ঘৃনামিশ্রিত কিছু কষ্টের কথা বলেছিল, সে কথাগুলো আছিয়ার জানার কথানা। কিন্তু আছিয়া সিফাতকে জানায় রুহুল এ কথাগুলো রিমাকে বলেছে এবং সবচেয়ে অবাক ব্যপার সিফাত রিমাকে ভালবাসে একথা জানার পরও রুহুল রিমাকে ভালবাসার প্রস্তাব দিয়েছে। ওর ভিতরটা ভেঙ্গে দুমড়ে মুচড়ে যেতে থাকে।

দুজনের মধ্যে সম্পর্কে একটা শীতলতা চলে আসে। সপ্তাহ খানিক এভাবেই চলতে থাকে।

-রুহুল আজ তোকে কিছু কথা বলব, তুই সত্যি জবাব দিবি এটাই আমি চাই।
: কি বলবি বল।
-খুব ছোট বেলাতেই আমাদের বাবা-মা দুজনকেই পরিবারের খরচ চালানোর জন্য কাজ করতে হয়েছে। আমরা দুটো ভাই বাড়ীতে থাকতাম। আমাদের যত্ন নেয়ার সময় তারা খুব বেশি পাননি। কিছু মানুষ রুপী পশু আমি পুরুষ হওয়ার পরও আমাকে যৌণ নির্যাতন করেছে। একটা অসহ্য যন্ত্রণা আমাকে সেই ছোট বেলা থেকেই কুরে খেত। আমি মানুষের সাথে মিশতে পারতামনা। মানুষের স্পর্শ লাগলেই মনে হতো আবারও আমি নির্যাতনের শিকার হব। আমার কোন বন্ধু নেই ছোট বেলা থেকেই। বাবা-মাকে প্রচন্ড ঘৃণা করি, সবসময় মনে হয় আমার এই করুণ পরিনতির জন্য তারাই দায়ী। একথাগুলো তুই ছাড়া আমি কাউকে বলিনি।

কথাগুলো বলতে বলতে ওর দুচোখ ভেঙ্গে জল গড়িয়ে পড়ে, সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই। মাটির দিকে তাকিয়ে একটা ঘোরের মাঝে থেকে কথাগুলো বলছে-

- আমার এই দুঃসহ জীবনে তুই ই একমাত্র মানুষ যাকে আমি আপন ভেবেছি। তুই জানতে চেয়েছিলিনা, দুজন মানুষের জন্য এত বড় চৌকি কেন কিনব? আমি মানুষের স্পর্শ এড়িয়ে থাকতে চাই। কারো ছোয়া লাগলে তাকে আমার খুন করতে ইচ্ছে হয়। তাই আমরা একই বিছানায় থাকলেও যেন তোর কোন ছোয়া আমার শরীরে না লাগে তাই এত বড় চৌকি কেনা। আমি রিমাকে পছন্দ করি তবুও ওকে কখনো তা বলিনি, একটা ভয়, একটা জড়তা আমাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখতো। আমার জীবনটা খুবই নষ্ট একটা জীবন, আমি কোন মুখে তার সামনে দাড়াবো?

তুই রিমার স্কুলে যাওয়ার পথে রোজ দাড়িয়ে থাকিস। তাকে ভাল লাগার কথা জানিয়েছিস, আছিয়া আমাকে সব বলেছে। তোর কাছে আমি জানতে চাই, তুই কি ওকে সত্যি ভালবাসিস নাকি শুধু ঝর্ণার মতো বলার জন্যই বলা?

অনেকক্ষন চুপ করে থাকার পর রুহুল মাথা নিচু করে থেকে বলে-
: আমি রিমাকে ভালবাসি তবে রিমা আমাকে পছন্দ করবেনা।

সিফাতের ভিতরটা তোলপাড় করে। মনে মনে ভাবে; মানুষ কি ভাবে এমন ভাবতে পারে? একেই কি বলে বন্ধুত্ব? সব জানার পরও কিভাবে বলে, রিমা ওকে পছন্দ করবেনা? ওর চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। কষ্টটাকে আড়াল করে মাটির দিকে তাকিয়েই বলে-
-দোস্ত তুই যদি সত্যিই রিমাকে ভালবাসিস আমি ওকে বলব তোর কথা।
: বলে লাভ হবেনা মনে হয়।

সিফাতের মাথাটা ঝিমঝিম করতে থাকে। রুহুল কেন বলেনা- আরে বন্ধু যাকে তুই ভালবাসিস তাকে আমি কিভাবে ভালবাসার কথা ভাবতে পারি?
ওদের মাঝে আর কথা হয়না। সময়গুলো খুব নিঃসঙ্গ কাটতে থাকে ওর।


৫.
রিমার এস.এস.সি পরীক্ষায় পাশ করে দনিয়া কলেজে ভর্তি হয়। অনেকদিন পর আছিয়া সিফাতদের পাশের বাড়ীর জানালায় এসে ডেকে কথা বলে-
= সিফাত ভাই রিমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে। আপনিকি ওকে কিছুই বলবেন না?
-কি বলব? আমি কি ওকে পাবার যোগ্য? আমার জীবনের কালো অধ্যায়তো সে জানে। আমাকে কি মানতে পারবে?
=একবার বলেই দেখেন না।
- যা হবার নয় তা বলে লাভ কি? তুমি যাও আমার কথা বলতে ভাল লাগছেনা।

তারপরও আছিয়া অনেকক্ষন দাড়িয়ে থেকে চলে যায়। সিফাত জানতেও পারলনা আড়ালে রিমা দাড়িয়ে ছিল, শুধু সিফাত তাকে ভালবাসে, শুধু একথাটা শোনার অপেক্ষায়।

সপ্তাহ খানেক পরে এসে আছিয়া জানায় রিমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। সিফাত বিছানায় শুয়ে ছিল আর রুহুল চেয়ারে বসে। নির্লিপ্তভাবে সিফাত জবাব দেয়
- দাওয়াত দিতে বলো, গরীব মানুষ, খুব বেশি কিছু দিতে পারবোনা তবে যাব।
: দোস্ত এমন বললে হবে, কিছু একটা কর। মাঝখানে রুহুল আমীন বলে যায়।
- কি করব? কি করার আছে? তোর যদি কিছু করতে মন চায় তবে বাবাকে বল কিছু একটা করতে।
: এহ এটা আমি বলতে পারবোনা। তোর মা-বাবার কাছে আমি ছোট হতে পারবোনা।
- তুই কি আমার বন্ধু না আমার বাবার? আমার বন্ধু হলেতো আমার দিকটাই আগে ভাববি।
: তারপরও আমি তাদের বলতে পারবোনা।
-তাহলে যা আর কানের কাছে ঘেনর ঘেনর করিসনা।

আছিয়া ও রুহুল দুজনেই চলে যায়। সিফাত একা একটা দুঃসহ যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে। তার কিছুই করার নেই। কোন সাহায্যকারী নেই। এই পৃথিবীতে সে একা নিঃসঙ্গ।

ঘর থেকে বের হয়ে এসে ডিসপেনসারি থেকে একপাতা ফ্রিজিয়াম-১০ ট্যাবলেট কিনে নেয়। তাকে ঘুমাতে হবে, একটা শান্তির ঘুম। ফিরে এসে রুহুলকে বলে
-আজ তুই অন্য কোথাও গিয়ে থাক। আমি একটু একা ঘুমাতে চাই।
: ঠিক আছে। থাকবো।

রুহুলের সামনেই ঘুমের ঔষধের পাতা থেকে তিনটা ট্যাবলেট খুলে মুখে দেয় সে। রুহুল হঠাৎ পানির জগটার পানি ফেলে দেয়। ঔষধের তেতো স্বাদে ওর মুখটা অসহ্য হয়ে আসে। সে রুহুলকে আবারও বলে তুই আজ অন্য কোথাও গিয়ে ঘুমা। আমার বমি হতে পারে তোর ভাল লাগবেনা। বলে আবার বাইরে আসে। মোড়ের দোকানটা থেকে মিষ্টি কিছু চকোলেট কিনে মুখে দেয়। এতে ওর শরীরে আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয় একটা নেশা ওকে পেয়ে বসে। কোন রকমে বাড়ী এসে শুয়ে পরে।

৬.
চারদিন হাসপাতালে থাকার পর সিফাতের জ্ঞান ফেরে। এই চারদিনের কোন কিছুই সে জানেনা। ওর পাশে রুহুল আমীনকেও সে দেখতে পায়না। সে আবিস্কার করে ওর বাবা হাসপাতালের বেডের পাশে বসে আছে। জ্ঞান ফিরার পর তাকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে থাকে বাবা।

/ বাবারে আমিতো গরীব মানুষ, অনেক চেষ্টা করলাম, রিমার বাবার হাতে পায়ে ধরলাম, কোন লাভ হলনা, আমার সম্মান আছে কিন্তু টাকাতো নাই।

সিফাতের শরীরে বাবার চোখের গরম জলের বড় বড় ফোটা পড়তে থাকে। সেগুলো এসিডের মত ওর মনটাকে পুড়িয়ে দেয়। এত বছর বয়সে, এত ঝড়-ঝঞ্জায়, বাবাকে সে কখনো কাঁদতে দেখেনি। কিন্তু আজ ওর জন্য বাবা বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। ওর নিজের চোখ বেয়েও অশ্রুর বান বয়ে যায়। বাবাকে অনেক যত্নে জড়িয়ে ধরে বলে-

-বাবা আমি মরে যেতে কিন্ত কিছু করিনি। আমার ভাল লাগছিলনা তাই ঘুমের ঔষধ খেয়েছিলাম। অন্য কিছু না বাবা।
/তোর মনের কথা আমাকে আগে কেন বলিসনি? আমি তোর বাবা, তোর ভাল আমি কি ভাবব না?

অনেক আবেগে বাবা-ছেলে দুজন দুজনকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে।

তিনদিন পর সিফাত বাড়ীতে ফিরে আসে। রিমার বিয়ে হয়ে যায়। রুহুল আমীন মাঝে মাঝে সিফাতের কাছে আসে, কতক্ষন পাশে বসে থাকে, দুজনের মধ্যে কোন কথা হয়না। একটু সুস্থ হয়ে সিফাত কাউকে কিছু না বলে চলে যায়, তার জীবনের নির্মল ভাল লাগা সেই বাউলের বাজার বটগাছের কাছে। একা একা গাছের সাথে কথা বলে-

-জানিস, আমি সারা জীবন একটা ভুলের মধ্যে বেঁচেছিলাম, তুই আর আমার বাবা-মা ছাড়া আমার আর কোন বন্ধু নেই। আমি অনেক লজ্জিত। বাবা-মাকে আমি মিথ্যেই ঘৃণা করেছি। আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কালো অধ্যায়ের জন্য তাদের কি করার ছিল? আমিতো তাদের কোনদিন তা জানাইনি।

সিফাত বট গাছটার মূলের উপর পরম নির্ভরতায় গা এলিয়ে দেয়। গাছটাও যেন নিরন্তর প্রেমে তাকে জড়িয়ে নেয়। আকাশ ফুরে শব্দহীন বৃষ্টি সিফাত ও তার বন্ধু বটগাছটাকে ভিজিয়ে দেয়। দু'বন্ধু যেন সিফাতের বাবার হৃদয় ফুটো হয়ে ঝরা অশ্রুর কথা মনে করে কাঁদতে থাকে। সেখানে রিমা বা রুহুল আমীন দুরে, অনেক দুরেও নজরে আসেনা।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • স্বপ্নীল
    স্বপ্নীল ভালো হইয়াছে। কিন্তু ভোট দেওয়ার অপশনটা নাই কেন?
    প্রত্যুত্তর . ২৭ জুলাই, ২০১১
  • রাজিয়া  সুলতানা
    রাজিয়া সুলতানা মা-বাবাই হলো এই পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ প্রকৃত বন্ধু,এটা হয়ত অনেকেই বুঝতে পারেনা,....আর তারই পরিপ্রেক্ষিতে মরীচিকার পিছনে ছুটে চলা ........ভাইয়া আপনাদের মত লেখকদের লেখায় মন্তব্য করার মত কিছু থাকেনা.....অনেক শুভকামনা রইলো......
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • রাজিয়া  সুলতানা
    রাজিয়া সুলতানা আর এই বোনের পক্ষ থেকে অভিনন্দন তো রইলই.....
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • সুমননাহার  (সুমি )
    সুমননাহার (সুমি ) তোমার লিখা বরাবর সুন্দর হয় সেটা তুমি ভালো করেই জানো ,তোমাকে ভোট দেওয়ার সুযোগ নাই তাই ভোট দিতে পারলামনা ভাই
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য মিতা, এখানে তোমাদের মাঝে, আমি তোমাদেরই একজন। তাই ভালমন্দ কোন চিন্তা না করেই বলে দিতে পারো, তাতে আমি বরং আনন্দিতই হব।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য সুমন নাহার সুমি, সারাটা মাস এই সাইটে আমরা সবাই তোমার প্রাণবন্ত উপস্থিতি মিস করেছি। আবার দেখে ভাল লাগলো।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • খন্দকার নাহিদ হোসেন
    খন্দকার নাহিদ হোসেন সূর্য ভাই, আপনার গল্পগুলো সত্যি বড় সুন্দর হয়। ভীষণ ভালো লাগলো। লেখায় জীবন আনা কম কথা না, আর আপনি তা খুব সহজেই দেখি পারেন।
    প্রত্যুত্তর . ২৯ জুলাই, ২০১১
  • সূর্য
    সূর্য এই গল্পটা চার (৪.) নম্বর প্যারাটা লিখতে গিয়ে একটু সময় নেয়ার জন্য বাইরে যাই। ফিরে এসে দেখি দুটো সেলফোন জানালা দিয়ে কে বা করা নিয়ে গেছে। মনটা খারাপ থাকায় গল্পটা আমার মনমতো লিখা হয়নি। পাঠক হিসাবে আমি একে ৪এর বেশি দিতামনা। সবাই যারা আমার গল্প পড়েছেন তাদের ...  আরও দেখুন
    প্রত্যুত্তর . ৩১ জুলাই, ২০১১
  • বিন আরফান.
    বিন আরফান. ভালো থাকবেন.
    প্রত্যুত্তর . ৩১ জুলাই, ২০১১
  • পন্ডিত মাহী
    পন্ডিত মাহী খুবই ভাল লাগল
    প্রত্যুত্তর . ৩১ জুলাই, ২০১১

advertisement