লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯১
গল্প/কবিতা: ২১টি

সমন্বিত স্কোর

৩.০৬

বিচারক স্কোরঃ ১.৬৬ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৪ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - ত্যাগ (মার্চ ২০১৬)

অরুন আলো
ত্যাগ

সংখ্যা

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.০৬

নাফ্হাতুল জান্নাত

comment ৭  favorite ১  import_contacts ৭৫৮
আজ অনির গায়ে হলুদ। চারদিকে সাজ সাজ রব। আত্মীয় স্বজনরা সকাল থেকেই আসতে শুরু করেছে। বিরাট বাড়ি তার অর্ধেক জুড়ে গায়ে হলুদের আয়োজন আর বাকীটা জুড়ে আছে হেসেল ঘর-ফলের বাগান-হাঁস মুরগি-গরু বকরীর ঘর। মা কাকীমা মামীমারা আজ সবাই হাত লাগিয়েছে। শতব্যস্ত বাবা কাকার মনে ফুর্তি যেন আর ধরেনা। অনির জন্য হলুদ বাটা,গোলাপজল ফুটানো, নতুন গামছা, শাড়ি, তোয়ালে সবই রেডি। সবকিছুই মা বাবা আর ছোট বোন সদর বাজার থেকে দেখে শুনে কিনে এনেছে। বাবার পছন্দের পোষা বড় গরু আজ সকালে জবাই হয়েছে। মনে হয় এত বড় উৎসব বুঝি দশ গ্রামে আর কখনও হয়নি। গ্রামের প্রায় সবাইকে দাওয়াত করা হয়েছে। শুধু পশ্চিম পাড়ার একটা বাড়ি বাদে আব্দুল চাচার। সবাই হাতে হাতে মিষ্টি নিয়ে ঢুকছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যেন আনন্দের ধুম পড়ে গেছে। দুপুর থেকেই সবাই উঠানে সারিবেধে শুরু হয়েছে গায়ে হলুদের গান আর নাচ। অনির শহরের সব বান্ধবীরা যোগ দিয়েছে গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে।

এখন মাঘের শেষবেলা। কথায় নাকি বলে আধা মাঘে কম্বল কাঁধে। তাই শীত শীত ভাবটা আছে একটু তেমন গাঢ় নেই। চারদিকে পিঠা-পায়েশের আমেজ ও কমে এসছে। তবে গাছিরা এখনও খেজুরের রস নামায়। আহ্ মুড়ি দিয়ে খেজুরের রস খেতে মন্দ লাগেনা। ক্ষেতে এখন টমেটো, পালং শাক, ফুলকপি, বাধাকপি, আর কত কি। সরিষার ক্ষেত অনির ভাল লাগে-নদী মাছ পুকুর সবই। মেঠো পথ ধরে ভ্যানে করে বিয়ের বার্বুচি আসে। বিয়ের কনেকে দেখবে বলে পাড়ার লোক শুদ্ধ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এদিকে অনি মাঘের ঠান্ডা গায়ে বসিয়ে ফেলে। চোখ মুখ লাল হয়ে একাকার। বিয়ে ঠিক হয়ে যাওয়ার সময় থেকেই অনির মনটা মরে যায়।

অনির বাবা তালুকদার সাহেব মেয়েকে বোঝাতে চেষ্টা করেন,
-বলেন মা পাত্র তো ছেলে হিসেবে মন্দ নয়। সদ্য বিলেত থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় ডিগ্রী নিয়ে ফিরেছে। শহরে নিজ চেম্বার খুলে বসেছে, বড় কন্সট্রাকশান কাজ হাতে নিয়েছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অনির বাবা আবার বলে ওঠে, সব মেয়েকে তো বিয়ে করতে হয় মা। বাবা-মা ছেড়ে নতুন জগতে প্রবেশ করতে হয়, এতো নতুন কিছু নিয়ম নয় চিরাচিরিত ভাবে চলে আসছে। তবে কেন মন খারাপ করে আছিস মা।
অনি চুপ করে থাকে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনা।
বাইরের আত্মীয়রা সবাই অনিকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগল-
কত ভাগ্য করে এসেছিস যে এমন ঘর বর পেয়েছিস, শুনেছি শহরের উপরে নিজের বাড়ি, বিলেত থেকে প্রকৌশল বিদ্যায় পারদর্শী।
আরেকজন বলে বসে- হাঁড়ির মত মুখ করে বসে আছিস কেন? চেহারার এ কী অবস্থা করেছিস?
অনি চুপ করে থাকে দেখে অনির মা তড়িঘড়ি করে বলে, আসলে বাবা-মাকে ছেড়ে দূরে কোথাও থাকেনি তো...তাই বোধ হয়।

অনির ফুপু অনির বাবাকে লক্ষ্য করে বলে-
দাদা কী করে পেল গো এত ভাল সমন্ধ? আমার মেয়ের জন্যে এখন ও মনের মত পাত্র পেলাম না।

অনির বাবা বলে-
সেদিনের কথা ভাবলে আমার নিজের খুব অবাক লাগে। বিকেলবেলা বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিব, হঠাৎ দেখি সুন্দর এক যুবক আমার দিকে এগিয়ে আসে নিজ পরিচয় দিয়ে বলে অনির কথা। কলেজ ফাংশানে অনিকে দেখে ভালো লেগে যায়। বিয়ের জন্যে বৌ খুজছে অনিকে এক পলক দেখে নাকি খুব পছন্দ হয়েছে।
তারপর ....আর কী খোজ খবর নেওয়া শুরু করলাম...মিলিয়ে দেখলাম সব ঠিক আছে। পরের সপ্তাহ
পাত্রপক্ষ এল অনিকে দেখতে আর দেখতে এসে আংটি পরিয়ে গেল।
বাবার কথা শেষ হলে ছোট কাকা বিয়ের গয়না হাতে হাজির। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

এদিকে অনির মন যেন কিছুতেই ভাল লাগেনা। বারান্দায় এসে মানিপ্ল্যান্টের গাছের পাশে এসে দাঁড়ায়। চোখটা জলে ভরে ওঠে। কিছুতেই কলেজের কথা ভুলতে পারছেনা। কত স্বপ্ন ছিল পড়াশুনা করবে, পেশা হিসাবে শিক্ষকতা করবে। গ্রামে থাকবে, ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়াবে। শুধু যে এজন্য মন খারাপ তা নয়। কলেজে যাওয়া আসার পথে ইউসুফকে ভাল লাগে অনির। ইউসুফ পশ্চিম পাড়ার আব্দুল চাচার ছেলে। বন্ধুত্ব হয়, সে থেকে কখন যে তা ভালোবাসায় রূপ নেয় তা দুজনের কেউই বুঝতে পারেনা। কিন্তু কখনও ইউসুফকে বলা হয়ে ওঠে না। ফাগুন মাসের মাতাল হাওয়ায় অনি আর ইউসুফ পরস্পরের খুব কাছে আসে। বাবা ব্যাপারটা না জানলেও মার জানতে বাকী ছিলনা, মা বুঝতে পারত মেয়ের মন রঙিন হয়ে উঠত মাঝে মাঝে। এসব ভাবনার জালে হারিয়ে গেছে অনি....কখনও যে পেছন থেকে সুমনা এসে দাঁড়ায়, বুঝতে পারিনি।

সুমনা বলে- পেছনের কথা মনে করে কী লাভ বল, নে তৈরি হয়ে নে। হলুদে সন্ধ্যার সময় যে হয়ে এল। যে ভালবাসার ফুল ফোটবার নয় তা নিয়ে কেঁদে কী লাভ। যদিও গ্রামের সবাইকে দাওয়াত দেয়া হয়েছে কিন্তু ইউসুফদের নয়।কারন খালাম্মা ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছিল, বুঝেছিস। কী করবি খালাম্মার মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের ভালোবাসা জলাঞ্জলি দে।
এমন সময় মোবাইলটা বেজ ওঠে------ অনি দেখে স্ক্রীনে ইউসুফের নাম্বার। অনির মনটা রঙিন প্রজাপতির মত নেচে ওঠে। ভালোবাসার নীল জোছনায় ভেসে অনি ফোনটা রিসিভ করে। কিন্তু ইউসুফ বলে অনি কেমন আছ? ভাল আছ নিশ্চয়....শুনলাম বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার বাবুর সাথে আজ তোমার বিয়ে। শুভকামনা রইল .....ভলো থেকো। এই বলে ফোন কেটে দেয় ইউসুফ।

এরপর আর কিছু ভাবতে পারেনা অনি। শুধু আফসোস করতে থাকে কেউ তাকে বুঝলনা ইউসুফ না। ভাবল সুখের লোভে অনি বিয়ের পিঁড়িতে বসছে, তা নয় বাবার উপর দিয়ে অনি কোনদিন কথা বলেনি। তাই তো নিজের ভালো লাগা ভালোবাসা বির্সজন দিয়ে অজানা অচেনা লোকের সাথে নতুন জীবনে পা বাড়াই অনি।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement