লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঘৃনা (আগস্ট ২০১৫)

থ্রী এফ
ঘৃনা

সংখ্যা

মনিরুজামান লিংকন

comment ৪  favorite ০  import_contacts ৮৩৩
প্রধাণ শিক্ষকের মুখ ভর্তি পানের পিক থৈথৈ করছে। ইচ্ছে হচ্ছে বেড়ার ফাঁক গলিয়ে পিক শব্দে বাহিরে ফেলে দিতে। প্রতিদিন তাই করেন। খানিকটা কাঠের দেয়ালে লেপ্টে যায়। অদ্ভুত চিত্রকর্ম তৈরি হয়। তিনি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন। তবে আজ তা করবেন না।
এক বৃটিশ সাহেব আসছেন স্কুল পরিদর্শনে। নাম উইটেনবার্গ; ছয় ফুট লম্বা , গায়ের রং সাদা, তাতে লাল তিলের নকশা খচিত। তিনি পান চিবোনো ভয়ঙ্কর অপছন্দ করেন। চিবোনো দেখলেই গায়ে জ্বালা ধরে। কপাল গুণে প্রধান শিক্ষকের একানÍ বন্ধু ইংরেজ সাহেবের সুইপার। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত ইংরেজ সাহেবের সব পছন্দ অপছন্দ ফাঁস করে দিয়েছে। তাঁর আর একটা অদ্ভুত স্বভাব হল- ধূমপান করেন , কিন্তু অন্যের মুখের বিড়ির গন্ধ সহ্য করতে পারেন না। কে জানে তার স্ত্রী রাতে ঘুমোনোর আগে দুটো সিগারেট একসাথে টেনে চিমনি ফাটান কিনা । কিন্তু বিপত্তি তো প্রধান শিক্ষকের বেলায় । তাই সকাল সকাল একসাথে দুটো বিড়ি ফুঁকেছেন । তাতে লাভের লাভ টয়লেট হয়েছে দূর্দান্ত । প্রতিদিন সকালের বিড়ি ফুঁকেই টয়লেটে যান; নইলে কাজটা ঠিক মত হয় না,মাঝ পথে আটকে যায়। কিন্তু আজ শুধু বিড়ি আর বিড়ি। বাড়তি কিছু খাওয়া যাবে না- দেখা গেল ভদ্রলোক এসেছেন অমনি সময় বদনা নিয়ে টানাটানি । ছাত্র-শিক্ষক একটাই টয়লেট। ইংরেজ সাহেবের আগমনে আজ তা ঝকঝক করছে। একটু আগে দফতরি ছেলেটা সেখানে সোডা রেখে এসেছে। বিনে মায়নার দফতরি। বিদ্যালয়ের নারিকেল-সুপারি বাগানই ওর ভরষা।
আজ সে কারও কথায় তেমন পাত্তা দিচ্ছে না। দারুণ ব্যস্ত। কে জানে খামোখা বিদ্যালয় আঙ্গিনার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে ঘাম ঝরাচ্ছে কিনা। প্রধান শিক্ষক তীক্ষè দৃষ্টি দিয়ে হরিপদকে দেখছেন। ইচ্ছে হচ্ছে ওর গালে পাঁচটি আঙ্গুলের খাল কেটে তাতে বাইম মাছ চাষ করতে। কিন্তু আজ তা করা যাবে না। শেষে বগলের তলায় রসুন গুঁজে লাপাত্তা। নিজের অজান্তেই শিক্ষকের হাত চলে যায় টেবিলে শুয়ে থাকা বেতের উপর। এক ঘা বসিয়ে দেন টেবিলে। পরক্ষণে বিদ্যুৎ চমকে লাঠি গুজিয়ে ফেলেন টেবিলের তলায়। অস্ফুট স্বরে ডাকেন, ‘হরিপদ’।
অলাভজনক ডাক।
মনে মনে ভাবে - হরিপদ! এরই বা কিসের কাজ । ইংরেজ সাহেবের টয়লেটের দরজা খুলে দেয়া থেকে বদনা টানাটানি পর্যন্ত নিজেই সামলাতে পারবেন। চা-টাও নিজে টানবেন। বড় মানুষ হলে এসব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে । ছোট মানুষ বলে কেউ ইতিহাসে লিখবে না। কেউ দুষ্টমি করে লিখলেও লিখবে- পাঁজি হেডমাষ্টার বনাম দুষ্ট টি বয়। অন্য দুজন শিক্ষককেও এ কাজে লাগান যায়। কিন্তু দুটোই বদের হাড্ডি। ক্লাসে নাক ডেকে ঘুমায়। কে জানে রাতে চুরি ডাকাতি করে কিনা।
মাঠের দক্ষিণ দিকটায় জোড়া নারিকেল গাছ পা ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে আছে। ময়লা অন্ধকারে হরিপদকে দুটো গাছের মাঝে উল্টো বিষ্ময় চিহ্নের মত লাগছে। দিনের আলো ফুটতে এখোনো বাকি। চারিদিকে ছোপছোপ ময়লা অন্ধকার। প্রধান শিক্ষক পানের পিক ফেলার মত কুস্থান খুঁজে বের করার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। চেয়ারটা কড়মড় করে উঠল- ঠিক য়েন হাড় ভাঙা আওয়াজ। এরপরই যেন সতর্ক সুর দ্বিতীয় বার সামলে উঠবেন!
করুণা ভিক্ষার কয়েকটা ফন্দি প্রধান শিক্ষকের মাথায় ঘুরপাক খায়। কক্ষের সামনের দিকের বেড়াটা অত্যন্ত নাজুক। বুড়ো মানুষের দাঁতের মত কাঠগুলো ঝাঁকি খেলেই তলায় পড়বে অবস্থা। ইচ্ছে হচ্ছে একটু ঝাঁকুনি দিয়ে কয়েকটা কাঠের টুকরো ফেলে দিতে। খোকন ফোকলা দাঁতে হাসে স্কুল স্টাবলিস্ট বাই খাই খাই জমিদার।
হরিপদ তার হাফহাতা গেঞ্জিটাকে যথাসম্ভব ধবধবে করেছে। ওর গায়ে পানের পিক ফেলা যায়। দেখুন স্যার আপনার অনুগত বাহিনীর কি নোংরা অবস্থা। খাবার আছে তো কাপড় ধোবার পয়সা নেই। এর চেয়েও ভালো হয় ওর বগলের তলার ফুটোটায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে হ্যাচকা টান মাড়া। দেখুন স্যার “বিদ্যালয়ের বেড়ার মতই গেঞ্জি। থালায় দু-চার আনা বেশী পড়াই আসল কথা। তবে হরিপদ এসবে রাজি হবে না। মাথার মধ্যখানে সিঁথি কেটেছে। সে নালা দিয়ে তেল চুইয়ে পড়ছে। একটা নতুন গেঞ্জির লোভ দেখালেও লাভ হবে না।
মুখের বিড়ির গন্ধটাও পরীক্ষা করা দরকার। তাকে দেখেই হয়ত হরিপদ সটকে পড়ল । চারদিক শান্ত-স্তব্ধ। গাছে গাছে দু-একটা পাখির আনাগোনা, পাখা ঝাপটানোর শব্দ। হঠাৎ উপর থেকে শিশিরের মত কোন কিছু চুইয়ে পড়ল বাম কাঁধের উপর।
সর্বনাশ!
পাজি কাক!
বললেন, ”যার বাগানে থাকিস তার গায়েই মলত্যাগ !”
একটাই পাঞ্জাবী পাঁচ বছরের প্রচেষ্টায় গত দু বছর আগে কিনেছেন। যেখানে সেখানে পড়া হয় না। একবার শুধু পড়েছেন জমিদারের নাতনির বিয়েতে। এজন্য কথাও শুনতে হয়েছে। জমিদার স্বয়ং বলেছেন “মশাই তো গায়ে গতরে মাশাল্লাহ্ ভালই আছ , হালের সেরা বলদটার থেকেও দেখছি বেশি গোশত , বেশী তেল হয়েছে।” নিজের ফুল বাগানে যেন অন্যের মূত্র বর্ষণ। সেই থেকে পাঞ্জাবীটার দিকে তাকালে মনে হত- সেরা বলদটার গোবর। মন্দ ভাগ্য পাঞ্জাবীটার। এখন মনে হচ্ছে এটাকে বনের পাখিও সহ্য করতে পারে না।
একটা মেইল ট্রেন এসে দুটো দু:সংবাদ দিয়ে চলে যায়। খোলা পাঞ্জাবীটা এখনও কাঠের উপর ঝুলছে। হাওয়া লাগেনি স্যাৎস্যাতে জায়গাটাতে। দুষ্ট তেলাপোকা গায়ের গেঞ্জিটার নিপলের উপর কেটে দিয়েছে। পিছনের দিকটায়ও একটা আছে। তবে তা উপহাস যোগ্য নয়। শিক্ষক সেভাবেই বেড়িয়ে পড়লেন।
মানিক চাঁদ অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের। রাগলে তা গভীর রূপ লাভ করে। জোড়া বছর না খেটে কোন ক্লাসের চৌকাঠ পেড়–তে পারে নি। প্রতি দুবছর অন্তর লাফ দেয় এবং প্রথম হয়। পঞ্চম শ্রেণিতে তার দু-বছর চলছে - সে প্রবীণ এবং লাফ দিতে প্রস্তুত। গতরাতে শ্বশুর বাড়ি উঠেছে। আগেভাগে সব জানানো ছিল। তার উপস্থিতি ধরা হয়েছিল অবসম্ভাবী।
মানিক চাঁদ তার শ্বশুর বাড়ির ঘাটলার সিড়িতে আরাম করে পা দোলাচ্ছে। সাদা লুঙ্গি, গেঞ্জিটাও বেশ ধবধবে। বোঝাই যায় গত ঈদের। চাঁদ দেখার পরদিন আর আজকে পড়েছে।
বলল,“স্যার মিষ্টি কোথায়? কই, হাড়ি তো দেখছি না।” ডান হাত বাম হাতের দিকে চোখ ঘুরিয়ে শান্ত স্বরে বলল ,“আচ্ছা ঠিক আছে। মিষ্টি লাগবে না। ভিতরে বসুন, আরাম করুন। আমি কচি ডাব পেড়ে নিয়ে আসছি।” সেই শেষ সংলাপ। এরপর মানিক চাঁদের দেখা মেলেনি। ডাবের সাথে সেও উধাও হয়েছে।
বাড়ির ভিতরটা মেয়ে মানুষের আনাগোনায় মুখরিত। নিজেকে মনে হয় ঘাস ফড়িং। যেন লাফাতে লাফাতে ভুল ক্ষেতে এসে পড়েছে। হারাধন- মানিকের জোড়া পুত্র সন্তান হয়েছে। এ সংবাদ শিক্ষকের জানা ছিল না। জানার কথাও নয়। তার থাকবে বিদ্যালয়ের খবর। ঘরের মধ্যে কোন ছাত্র কি কান্ড ঘটায় কে জানে। মেয়ে হলে একটা কথা ছিল। হাড়ি নিয়ে বিদ্যালয়ে না এলেও বাড়ির খবর ঠিকই পাওয়া যেত।
বাড়ির প্রধান ব্যক্তিটি নামকরা ব্যবসায়ী। আশেপাশে চারটি হাটে তার খুচরা –পাইকারী দোকান। শিক্ষক তাকে খুটিনাটি সব ব্যাখ্যা করলেন।“জামাই বলে কথা। তার উপর জোর চলে না।” পানসে উত্তর।
তবে শিক্ষকের কাছে তাকে অত্যন্ত বিনয়ী মনে হল। কথা বার্তায় কামলাদের উপর চড়ে বসার লোক বলেও কল্পনা করা যায় না। দরজার পর্দার আড়াল থেকে একটা শিশু উঁকি দেয় “গুড মর্নিং স্যার।” আবার চলে যায়। কর্তা বললেন ,“আমার ছেলে। কৌটা ভর্তি বারুদ। তবে কখনও স্কুলে পাঠাইনি। তাই রানীর নাম জপ করতে শেখেনি। চলবে? আর আপনারা মশাই যাদের ভয়ে গরু গোছল করান তারা তো কখনও গো-চনার বেশি কিছু দেয়নি আপনাদের। দুধটা ঠিকই তাদের। কে জানে অন্যের শুকনো জমিতে জল ঢালতে গিয়ে নিজের পুকুরে জলোচ্ছ্বাস ঘটে কিনা। ”
শিক্ষক বিড়বিড় করে বললেন ,”ভু-খন্ড তো একটাই।” বড় করে বললেন,“ চলবে।”

শিশুটিকে নিয়ে ফেরার পথে শিক্ষক যেন তার বারুদের কিছুটা ফুলকি আঁচ করলেন। তার থেকে কিঞ্চিৎ কম বয়সী অন্য একটি মেয়েকে দেখে বলল,“ কি হে তারা , তুই তো হিন্দুরে, হিন্দু গলি ছেড়ে আজও আবার গীর্জায় এলি!” মেয়েটির কাঁদো কাঁদো উত্তর,“ কাউকে বলিস নারে, মাত্র তিনবার যীশু নাম করে বাইরে এসে রাম রাম করেছি। দেখ, তিনটা বিস্কুট একটা সন্দেশ।” শিশুটি তার হাত মেলে ধরল। “ তা অনেক পেলি। রাম রাম ডাকলে তো কিছুই দেয় না।” শিক্ষক ফিরে দেখলেন বামপাশের গীর্জাটা। গেটে একটা সাইনবোর্ড ঝুলানো। তাতে লেখা ,“ সেবাই ধর্ম।”শিশুটি যেন তা খেয়াল করল। “রাম রাম করলে বিস্কুট দেয় না। তবে ফাদার! উহু , আমার আব্বা নন, গীর্জার হুজুর খুব ভালো মানুষ। কিন্তু তাকেও তো কারও কথা শুনতে হয়।”
শিক্ষক মুগ্ধ এবং বিস্মিত। “কে শিখিয়েছে? বাবা?”
শিশুটি কোন উত্তর দেয় না। শিক্ষক মনে মনে উৎফুল্ল হয়। বিদ্যালয়ের মান নিয়ে ইংরেজ সাহেব বিরাগ ভাজন হবেন না। তাদের আজ্ঞাবহ শ্রেণি তৈরির মেশিন বেশ সচল! ক্ষণিক সময়ে বিরূপ জলবায়ু টের পাওয়া যায় না।
তিন মাইল পথ কখন যে এলাম গেলাম হয়ে গেল টের পাওয়া যায় নি। সমস্যার সমাধান হয়েছে দ্রুত, অনেকটা অপ্রত্যাশিত অকল্পনীয় পথে।
মোটামুটি সরু খালের উপর সাঁকো। তা পেরুলেই বিদ্যালয়ের আঙ্গিনা। হরিপদ সাঁকোর উপর গালে হাত দিয়ে পা দোলাচ্ছে। হেড মাস্টারকে দেখে হাসি মুখে উঠে দাঁড়াল, যেন মস্ত বড় বোঝা এই মাত্র তার ঘাঁড় থেকে সড়ান হয়েছে।
ক’ টা বাজে হে?
হরিপদ সূর্যের দিকে তাকায়।
সাড়ে সাতটা।
এবার বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন “ঝুনা নারিকেলের বাগানে কচি ডাবটা কই পাইলেন স্যার?
এর নাম মানিক চাঁদ পঞ্চম শ্রেণি। রোল নং-১।
শিশুটি যেন ঠিক বুঝতে পারল, হাজিরা খাতায় ঘষা মাজা করা যাবে না। তাই মানিক চাঁদ ঠিক থাকবে। কিন্তু পিতার নাম জিজ্ঞেস করলে কি বলবে এই প্রশ্নে দু জন বয়স্ক মানুষ একে অন্যের দিকে তাকাল।“ তুমি তোমার বাবার নাম বলবে।” শিক্ষক বললেন।
বকফুল দ্বিতীয় শ্রেণি। রোল নং এক। প্রতি পরীক্ষা দেন শিক্ষক কামরায়। বই দেখে লেখার বন্দোবস্ত আছে। তাতে না বুঝলে কোন উদার শিক্ষক মহানুভবতা দেখান। এরপরও মাঝেমধ্যে বানান ভুল করে। তবে তার একটা বিশেষত্ব আছে। বিদ্যালয়ে সে একমাত্র ছাত্রী। শিক্ষা গোল্লায় গেলেও তাকে দেখে অন্য মেয়েদের বিদ্যালয়ের ঘাট ধরানো শিক্ষকদের উদ্দেশ্য। তাই এলাকায় তার গুণগান প্রচারে শিক্ষকগণ সদাব্যস্ত।
বাড়িময় আনন্দ কলকল করছে। পাত্র পক্ষের পাত্রি পছন্দ হয়েছে। বকফুল তার প্রিয় হেড স্যারকে পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। দরজার আড়াল থেকে বলল, “স্যার, আমি বেজায় খুশি, তেনাকে নিয়ে যান। উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। ক্লাস ফাইভ পাশ।”
হবু জামাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে দাঁড়াল। “ইজ্জতের ব্যাপার। বাদ জহুর বিয়ে। না করতে পারি না। শ্বশুর বাড়ির ব্যাপার। যাত্রার শুরুতেই বেয়াদব না ভাবে।” আরও স্পষ্ট করে বলল,“ স্যার , উত্তর না পারলে মারধরের ব্যবস্থা আছে!”
প্রধান শিক্ষক ভাবে কে জানে এর কতটা ডিমোশন দিতে হবে। এমনকি বকফুল, দ্বিতীয় শ্রেণি হতে পারে। নামের ছেলেমেয়ে কি? নাম তো নামই।
খালের উপর সাঁকো উধাও। মাঝখানে বাঁশের এক্স চিহ্নের ফ্রেমটা পড়ে আছে। হরিপদ ওপরটায় বসে আছে। সাথে অন্য একজন শিক্ষক। “কি ব্যাপার মেইল ট্রেন। তোর রেল লাইন কই?” প্রধান শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন। “সর্বনাশ স্যার, উনি এসে গেছেন।” মুখে কৌতুকের হাসি।
প্রধান শিক্ষকের বিলম্ব দেখে আগাম ব্যবস্থা নেয়া ছিল। বাঁশের বাঁধন আলগা করা, হাতলটাকে ফিতের মত দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা এসব। রাস্তার মাথায় অন্য শিক্ষক ছিলেন পাহারায়। দূর থেকে যখন ছয় ফুট মানুষটাকে দেখতে পেলেন , সবাই মিলে সাঁকোটাকে উধাও করে দিল। বাধ্য হয়ে দু মাইল বাড়তি হেটে বিদ্যালয়ে আসতে হবে। ইংরেজ তো আর মালকোচা দিয়ে বাঙ্গালীর মত হুটহাট জলে নামবে না। অদ্ভুত বুদ্ধিটা হরিপদ কোম্পানির।
প্রধান শিক্ষকের প্রিয় ঝাড়ুদার বন্ধু বিশেষ তদবিরে সাথে এসেছেন। প্যান্ট, শার্ট, বুট সবই আছে। নিজ এলাকায় দাম একেবারে উপচে পড়ছে। আরও একজন এসেছেন। বাঙ্গালী এবং অপরিচিত।
ছাত্র-শিক্ষক তিনটে কক্ষ। তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সকলকে রাখা হয়েছে বৃদ্ধ আমগাছটার তলায়। গাছের সাথে একটা বোর্ড ঝুলানো। তাতে স্পষ্ট হাতে লেখা - শ্রেণি প্রথম হাইফেন(-) তৃতীয়। দ্বিতীয় প্রথম তৃতীয়র হাইফেনে অলিখিত ভাবে উপস্থিত। উইটেনবার্গ কক্ষের ভগ্ন দশা দেখে আবেগ তাড়িত। জমিদারের গোষ্ঠী উদ্ধার করলেন বাংলা ইংরেজিতে।
প্রথমে ঢুকলেন চতুর্থ শ্রেণিতে। হবু বর সেখানে বন্দি। ডিমোশন বলে মুখ গোমরা করে রেখেছে। নাম রাখা হয়েছে জগলুল। নাম্বার তিন। মূলটাকে সবাই জগা বলে ডাকত। জগার অনুপস্থিতি সে ভালোভাবেই পূর্ণ করল। “ন” দিয়ে তিনটি শব্দ লিখতে বললেন ইংরেজ সাহেব। জগলুল ফার্স্ট হল। লিখল “ নানা, নানি, নুনু।” উইটেনবার্গ বাংলা পড়তে জানেন। “নানা, নানি বুঝলাম; কিন্তু নুনুটা কি?” একজন ছাত্র দাড়িয়ে বলল, “ স্যার, যা দিয়ে আপনি মুতেন।” সমস্ত ক্লাস হা হা শব্দে ফেটে পড়ল। উইটেনবার্গের কানে কানে সঙ্গী বাঙালী ভদ্রলোক কিছু বললেন। শুনে তিনি বললেন,“ ভেরী গুড, শব্দই তো।” প্রধান শিক্ষক এরপরও খানিকটা বিব্রত। মনে মনে বললেন,“পরের উ-কার টা না দিলে তোর ইয়েটা কাটা পড়ত, হারামজাদা!”
কিন্তু উইটেনবার্গ বেশ উৎফুল্ল এবং মুগ্ধ। জমিদার বাড়িতে দুপুরের নিমন্ত্রণের পথে এখানে এসে মন্দ হয়নি। অর্কেস্টার মত আনন্দ দিচ্ছে বিদ্যালয়টি। ফাইভ ক্লাসে ঢুকলেন।“ ফার্স্ট বয় কোথায় আছেন?” সে উঠে দাঁড়াল। উইটেনবার্গ নাম জিজ্ঞেস করলেন। উত্তর এল “মানিক চাঁদ।” বিড়বিড় করে বলল, “অসতাক ফিরুল্লা রাব্বি----।” সমস্ত ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ল। প্রধান শিক্ষক এর মর্মার্থ বুঝলেন। মিথ্যে বলে বালকটি এখন নিজেকে শুদ্ধ করে নিচ্ছে। উইটেনবার্গ তাকে “ঋ দিয়ে তিনটি শব্দ লিখতে বললেন। আর এতেই রচিত হল বিদ্যালয় এবং তার পরিবারের নির্মম ভাগ্য। কথিত মানিক চাঁদ দ্রুত লিখল :-
১.Fight
২.For
৩.Freedom
উইটেনবার্গ মৃদু হাসলেন। বললেন,“ ভেরি গুড।” সব ভেরি গুড যে শুভ বার্তা বহন করে না তা এদেশের নিষ্পেষিত মানুষগুলো ঠিকই জানে। তাই শিক্ষকের কপাল ঘামছে। প্রধান শিক্ষক নিশ্চিত বিপদের ঘন্টা ধ্বনি শুনলেন তিনবার- ঢং ঢং ঢং।
প্রধান শিক্ষক সারা বিকেল জমিদারের অপেক্ষায় থেকেও দেখা পাননি। একটায় বেরোনো উইটেনবার্গ সেখানে নিমন্ত্রণে আসেন নি। বিপ্লবী গুঞ্জন চলছে জমিদারের বাড়িময়। তা থেকে ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। উইটেনবার্গের বাংলোয় গিয়ে লাভ হয় নি। হরিপদও নাকি জমিদারের সাথে এসে ছিল সেখানে, জানিয়েছেন ঝারুদার বন্ধু। এক ধরনের শঙ্কা থেকেই কথিত মানিক চাঁদের বাড়িতে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালেন। রাত্রি নেমে এসেছে। অন্ধকার রাস্তায় একা চলতে ভয় লাগে। মনে হয় পিছন পিছন পিছন কে আসছে। সত্যি সত্যি এক সময় হরিপদ সামনে আসল। “গিয়ে লাভ নেই স্যার। মানিক চাঁদের পিতা খুন হয়েছেন।” শুনে সমস্ত শরীর অসাড় হয়ে আসে। পথের মাঝখানটায় বসে পড়ে। ঠিক পরপরই চারিদিক থেকে অসংখ্য শব্দ ছুটে আসে বিদ্যালয়ের দিকে। স্কুলের উপরের আকাশটায় লালচে আলোর আভা দেখতে পান শিক্ষক। হরিপদকে উদ্দেশ্য করে বললেন,“ শেষ রক্ষা হল ট্রেইটঁর!” হরিপদ উত্তর দেয় না। অজানা এক শিশু কণ্ঠে উত্তর আসে ঋরৎব ঋড়ৎ ঋৎববফড়স. শিক্ষক চেয়ে দেখেন উপরের আকাশটা আরও গভীর ঘন রক্তিমতায় ছেয়ে গেছে ।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement