লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ এপ্রিল ১৯৭১
গল্প/কবিতা: ১৩টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবাংলা আমার চেতনা (ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

রূপসী
বাংলা আমার চেতনা

সংখ্যা

মোহাম্মদ আবুল হোসেন

comment ০  favorite ০  import_contacts ২৮৮
হায়রে আমার মন মাতানো দেশ
হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি
রূপ দেখে তোর...........
পদ্মার ঢেউয়ের সঙ্গে যেন সুর উঠেছে নামছে। দূর থেকে ভেসে আসছে এই গানের সুর। লঞ্চের কেবিনে বসে সে গান শুনতে শুনতে আনমনা হয়ে যায় রূপসী। সে ফরিদপুরের এক গাঁয়ের মেয়ে। তার পিতা ঢাকায় চাকরি করেন। সেই সুবাদে ঢাকায়ই তার জন্ম, ঢাকায়ই পড়াশোনা, ঢাকায়ই থাকা। ছুটি পেলেই সবাই মিলে বাড়ি চলে যায় বেড়াতে। সেখানে আদিগন্ত ফসলের মাঠ। সবুজের ঢেউ। কোন এক গীতিকবি হয়তো এমনই রূপ দেখে লিখেছিলেন ওই গান। একটি গানই বাংলার প্রকৃতিকে ফুটিয়ে তোলে। এমন বিবরণ আর কোথায় আছে! এমন একটি দেশ পৃথিবীর বুকে আর কোথায় আছে! ওই গান শুনেই রূপসীর চোখের ওপর আবার ভেসে ওঠে তার দাদুবাড়ির কথা। সেই যে সেদিন মটরশুঁটির ক্ষেতে গিয়েছিল বিকালে, পাশের বাড়ির আলেয়ার সঙ্গে, সন্ধ্যার আগে কুয়াশা যখন ঝির ঝির করে ঝরা শুরু করেছে তখন তারা সবাই মিলে মটুরশুঁটির ক্ষেতে গড়াগড়ি খেয়েছে। এ সময় মটরশুঁটির ক্ষেতকে একেবারে মখমলের মতো মনে হয়। কোমল পরশ পাওয়া যায়। তাজা সবুজ ঘ্রাণ মন কেড়ে নেয়। সে কথা কিছুতেই ভুলতে পারে না রূপসী। মনে পড়ে চাচা হারুনের ক্ষেতে ছোলায় পাক ধরেছে। থোকা থোকা ছোলা ঝুলছে গাছে। সে দৃশ্য যে দু’চোখে না দেখেছে তার অন্ধ হয়ে থাকা ভাল। শুধু কি তা-ই পাশেই গমের ক্ষেতে সোনারঙা গম। এক সমান উঁচু গাছের মাথায় গমের শীষ। বেশ ভাল ফলন হয়েছে এবার। তাই কৃষকের মুখে হাসি। এক দুপুরে মাঠের মাঝখানে আগুন জ্বলা দেখতে পেয়েছে সে। অমনি দলবল নিয়ে ছুটে গিয়েছে সেখানে। গিয়ে দেখে পাশের বাড়ির কয়েকটা ছেলেমেয়ে মিলে ছোলার গাছ তুলে এনে ফুট দিয়েছে।
ফুট দেয়া মানে কতগুলো নাড়ায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাতে কাঁচা ছোলার গাছ ধরা। আগুনের তাপ পেয়ে ছোলার গাছ থেকে ছোলা ঝরে পড়ে আগুনে। যখন সব ছোলা ঝরে পরে তখন আগুন নিভিয়ে দেয়া হয়। এরপর সবাই মিলে সেই আগুন বা ছাইয়ের ভিতর থেকে ছোলা খুঁজে খুঁজে বের করে, খায়। একেই ওরা ফুট বলে। গ্রামে না গেলে এ মজা পেতই না রূপসী।
ফুট খেয়েই গোসল করতে গিয়েছে নদীতে। গ্রামের একপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কুমার নদ। তাতে এখন অনেক কম পানি। সেই পানিতে মাছ নেই বললেই চলে। তবু গ্রামের কতগুলো ন্যাংটো ছেলে গামছা পেতে মাছ ধরার চেষ্টা করছে। তারা বড় কোন মাছ পায় নি। পেয়েছে কতগুলো ছোট চিংড়ি। কয়েকটা তিতপুঁটি। খয়রা মাছের পোনা। দু’একটা বড় খয়রা। এমন মাছ ধরার ছবি শহরে আর্টে দেখেছে রূপসী। এমন ছবি অনেক টাকায় বিক্রি হয়। তা ঘরে টানিয়ে কত মজা পায় শহরের বড়লোকরা। তাদের সঙ্গে এ দৃশ্যের কোন মিল থাকে না। তারা ছুটি পেলে বেড়াতে যায় বিদেশে। নিজের দেশের এত রূ বাদ রেখে তারা ছুটে যায় ব্যাংকক, মালয়েশিয়া, লন্ডন, ভারত, আমেরিকা, কানাডা আরও কত্ত দেশে। নিজের ঘরের ভিতর এত রূপ, সৌন্দয্য তাদের আকৃষ্ট করতে পারে না। এটা ভাবতেই খারাপ লাগে রূপসীর।
পদ্মায় ওই গান শুনতে শুনতে এতসব স্মৃতি তর তর করে উড়ে যায় রূপসীর কল্পলোকের চোখে। প্রচণ্ড ঢেউ উঠেছে পদ্মায়। লঞ্চ দুলছে কলার খোসার মতো। সবাই ভয়ে জড়োসড়ো। রূপসীও কিছুটা ভয় পেল। শক্ত করে বসে আল্লাহ আল্লাহ করতে থাকে সে। কিন্তু ভয় নেই লঞ্চের সারেংদের। তারা লঞ্চের স্পিকারে বাজছে-
পদ্মার ঢেউরে আমার শুন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা যারে
এই পদ্মে ছিল রে যার রাঙা পা আমি হারিয়েছি তারে রে
পদ্মার ঢেউরে.....
এক্কেবারে সময় উপযোগী গান। গানের সুরের সঙ্গে লঞ্চ উঠছে আর নামছে। প্রথমে ভয় করলেও এখন আর তা নেই রূপসীর। দারুণ এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। যেমন গান, তেমন পদ্মার রুদ্রমুর্তি! আহা এক উপভোগ্য দৃশ্য। দূরের কোন সাগরে পা ভিজিয়ে হাতে শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে মাতলামি করার চেয়ে এটা কি ঢেড় ভাল নয়! নিজের মনে নিজেই বলতে থাকে রূপসী।
২.
রূপসী ঢাকায় একটি কলেজে সম্মান শ্রেণীতে পড়ছে। পিতামাতার চোখে মেয়ের বয়স হয়ে গেছে অনেক। এখন বিয়ে দিতে হবে উপযুক্ত পাত্র দেখে। সে আয়োজনও শুরু হয়ে গেল। একের পর এক পাত্র আসতে থাকে। রূপসীর পছন্দ হয় না। নিজেই পাত্রকে প্রশ্ন করে- আপনি গ্রাম পছন্দ করেন নাকি শহর?
এ যাবত যত ছেলে এসেছে তারা চাকরিজীবি। বেশির ভাগেরই ঢাকায় বাড়ি আছে। তারা তার প্রশ্ন শুনে বলেছে- গ্রাম? কি সব বলছেন। গ্রামে মানুষ থাকে নাকি। সন্ধ্যা হলেই অন্ধকার। কোন ভাল স্কুল নেই। হাসপাতালে নেই। ভাল ডাক্তার নেই।
তাদের কথার কোন প্রত্যুত্তর দেয় না রূপসী। একবার এক পাত্র এলো তাকে দেখতে। ছেলে বিদেশী বড় কোম্পানিতে চাকরি করে। থাকে ইতালিতে। বিয়ের পর বউ নিয়ে যেতে চায় সেখানে। এ কথা শুনে তো রূপসীর পিতা আলতাফ ও মা আমেনা বেগম খুশিতে আটখানা। এমন পাত্রই তো চাই। মেয়ের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।

পাত্র যখন রূপসীকে দেখতে এল তখন রূপসীর ওই এক প্রশ্ন- গ্রাম না শহর?
অবশ্যই শহর। শহুরে মানুষ কি করে গ্রামের কথা ভাববো।
ধন্যবাদ। আপনি এখন আসতে পারেন। রাগত স্বরে বলল রূপসী।
তাতে তার পিতামাতা ভীষণ রেগে গেলেন। মেয়ে এটা কি করল। ঘটক বলেছে- মেয়ের পছন্দ হলে আজই বিয়ের তারিখ দিয়ে দেবেন তারা। কিন্তু মেয়ে তো তাদের একেবারে ডুবিয়ে দিল। রূপসী তার মাকে বোঝালো- মা, আমি এই বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও যেতে পারবো না। অর্থের লোভ দেখাচ্ছো? তাতে আমার কোন লোভ নেই। এই বাংলায় চোখ মেলে দু’দিন না খেয়ে বাঁচা যায়। সবুজ মাঠের ভিতর গিয়ে দশ মিনিট বসে থাকলে তোমার ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না। সবুজ মাঠ থেকে টাটকা অক্সিজেন বের হয়। সেই অক্সিজেন গ্রামের কৃষক সরাসরি গ্রহণ করতে পারে বলে তাদের কোন রোগ ব্যাধি হয় না। আমি কি করে এই বাংলা, এই বাংলাদেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে থাকব। আমি তা পারবো না মা।
পারতে তোমাকে হবেই। টাকার ওপরে আর কিছুই নেই। টাকা আছে তো সব আছে। ওই যে অক্সিজেনের কথা বললে ওটা হাসপাতালে কিনতে পাওয়া যায়। সিলিন্ডারে ভরে আজকাল অক্সিজেন বিক্রি হয়। বলতে থাকেন আমেনা বেগম।
তা তুমি ঠিক বলেছ মা। কিন্তু সেটা ল্যাবরেটরিতে বানানো। তার সঙ্গে প্রাকৃতিক অক্সিজেনের তুলনা হয় মা! তুমি না শিক্ষিত মেয়ে! তোমার মুখে এ কথা মানায়!
তুমি যা-ই বল এ বিয়ে তোমাকে করতেই হবে।
আর কথা বাড়ায় না রূপসী। সিদ্ধান্ত নেয় পরের দিন আবার সে গ্রামে ফিরে যাবে। ঠিকই পরের দিন একটা চিরকুট লিখে টেবিলে রেখে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। তাতে লিখল- মা, আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না। আমি এক সপ্তাহের জন্য গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। মনটা ভাল নেই। কয়েকদিন গ্রামে ঘুরব। মনটা ভাল হলেই চলে আসবো।
মহরকান্দি গ্রাম। এখানে এসেই এক তরুণের সঙ্গে রূপসীর পরিচয়। গ্রামের সম্পর্কে তার চাচাতো ভাই। নাম আহমদ। বাংলায় স্নাতক পাস। চাকরির কোন চেষ্টাই করে নি। পড়া শেষ করে গ্রামে ফিরে এসেছে। এসেই একটি খামার দিয়েছে। মুরগির খামার। পুকুরের ওপরে খামার। পানিতে মাছের চাষ। বাড়ির চারপাশে খালি জায়গায় লাগিয়েছে নানা রকম ফলজ গাছ। তাতে বেশ আয় হয় তার। তাকে নিয়ে পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। বলা হয়েছে, গ্রামের অন্য আরো যুবক-যুবতীর জন্য উদাহরণ সে। তাকে অনুকরণ করে অনেক যুবক-যুবতী এখন স্বাবলম্বী। কোন অহমিকা নেই আহমদের। একেবারে মাটির মানুষ। সবার সঙ্গে সমান কথা বলে। কারো বিরুদ্ধে তার কোন নালিশ নেই।
রূপসীর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে তাদের ভাব জমে। কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের সেই পরিচয় প্রেমে রূপ নেয়। একদিন রূপসী তার জীবনের সমস্ত কাহিনী খুলে বলে আহমদকে। আহমদ অবাক হয় একজন পরিপূর্ণ মেয়েকে জোর করে শহরেও বিয়ে দেয়া হয়।
রূপসী বলল- আহমদ আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
কি, কি বলছ তুমি? তুমি শহরের মেয়ে। আমাকে বিয়ে করলে তো গ্রামে থাকতে হবে।
আমি তাই রাজি। আমি গ্রামের সঙ্গে মিশে থাকতে চাই। গ্রামই আমার আপন।
তিুমি সত্যি বলছ?
হা, সত্যি। আমি তোমার খামারের দেখাশোনা করবো তোমার সঙ্গে। এর মাঝেই জীবন খুঁজে নিতে চাই। এভাবেই আমাদেরকে গ্রামে ফিরতে হবে। তা নাহলে এ দেশতো একদিন শহর হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে এই গ্রাম। তাই বাঁচাতে হবে গ্রামকে।
তুমি পারবে আমার হাতে হাত রেখে বাকি জীবন এখানে কাটিয়ে দিতে?
পারবো। বহুত পারবো। চলো আমরা কালই বিয়ে করে ফেলি। তোমার মা আমাকে ভীষণ পছন্দ করেন। তোমাদের বাড়িতেই বিয়ে হবে। কাজী ডাকতে হবে।
সত্যি সত্যি পাঁচ’দিন পরেই আয়োজন হলো বিয়ের। হারুন চাচা রূপসীর পিতা মাতাকে খবর পাঠালেনে- তোমাদের মেয়ের ভীষণ অসুখ। সবাইকে নিয়ে বাড়ি আসতে হবে অনতিবিলম্বে।
খবর পেয়ে আলতাফ সাহেব ও আমেনা বেগম একমাত্র ছেলে সোহমকে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এলেন বাড়ি। বাড়ি ফিরেই তো চোখ চড়ক গাছ। মেয়ের বিয়ে। আহমদের সঙ্গে। পুরো গ্রামে বিয়ের আমেজ। তারা আর ফিরে যেতে পারলেন না। সেই আয়োজনে যোগ দিলেন বাধ্য হয়ে। রূপসী-আহমদের দু’হাত এক করে দিলেন।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

    advertisement