পূর্ণিমা রাতের কেমন যেন আলাদা একটা অনুভূতি আছে। এখন আবার শরতকাল, চারদিক থেকে মাদকতা পূর্ণ একটা আবেশ আসে। সবাই খোলা আকাশের নিচে আড্ডা দিচ্ছে, একসাথে গান ধরছে, মাঝেমাঝে উচ্চ স্বরে হাসির আওয়াজ আসতেছে। কিন্তু আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আজব সব চিন্তা করতেছি। "আচ্ছা আমি ওদের মত নয় কেন?" জারিফ চিন্তা করে।
জারিফ প্রকিতিগত ভাবে অন্যদের থেকে একটু ভিন্ন। সব সময় চুপচাপ থাকে। চুপচাপ থাকাটা অবশ্য ইচ্ছাকৃত না, পরিবেশের প্রভাব তার ভিতরের মানুষ টাকে আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় করে ফেলছে।
বাড়ির কথা মনে পড়ে জারিফের। একান্নবর্তী পরিবার,সব সময় আনন্দ উৎসব লেগে থাকে। ভাইয়া-আপুরা কত মজা করে। কিন্তু জারিফ সব উৎসব থেকে দূরে থকতে চেষ্টা করে। ওখানে থাকলে মজা করতে করতে সব সময় সে মজার বিষয়বস্তু হয়ে যায়।
"আচ্ছা আমি ওদের মত মেধাবী নয় কেন? ওরা কত সুন্দর করে কথা বলে, আমার কথা গুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়" জারিফ ভাবে।
আব্বু-আম্মুর কথা মনে পড়ে জারিফের, তারা কি ভাইয়া-আপুদের কে বেশি পছন্দ করে? উত্তর জানে না আবিদ। তবে জানে সবাই কেন যেন তাকে করুণা করতে চাই। হয়তো পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার প্রকাশ করার ধরন টা ওর পছন্দ না।
বন্ধুদের দিকে তাকায় জারিফ, এখনো সবাই আড্ডায় মত্ত।ওর দিকে কারো কোন মনযোগ নেই। অবশ্য ওদের কোন দোষ দেয়া যায় না, জারিফ ওদের আড্ডায় কখনো প্রানের সঞ্চার করতে পারেনি। আসলে চিন্তা ভাবনায় মিল না থাকলে কিছুই হয় না। তারপরও ওরা জারিফের বন্ধু, ওকে নিয়ে কবিতা না লিখুক মাঝেমাঝে কৌতুক লিখে। জারিফ অবাক হয়, আচ্ছা মানুষ আরেকজন মানুষকে এত হেয় করে কিভাবে!
ইংলিশের স্যার একদিন ক্লাসে বলে জারিফ তুই ইংলিশ পড়ে কি করবি, এখনো বাংলাই উচ্চারণ ঠিক করতে পারলি না। সবাই হো হো করে হাসা শুরু করলো। জারিফের ওইদিন আত্মহত্যা করতে ইচ্ছা করতেছিল, কিন্তু পারে নাই। ওই দিন জারিফ একটা নতুন জিনিশ বুঝলো, আত্মহত্যা করতে সাহসের দরকার হয়।
অনেকদিন আগে শুভ একদিন ওকে বলছিল ও নাকি অটিস্টিক। জারিফ বাসায় গিয়ে আম্মু কে জিজ্ঞেস করে,আম্মু কিছু বলে নায়। তবে জারিফ আম্মু কে মুখ লুকিয়ে কান্না করতে দেখেছে।
অরিনের কথা মনে হয় জারিফের, মেয়েটা কেন যেন ওকে খুব পছন্দ করে। ও অন্য সবার মত জারিফ কে নিয়ে মজা করে না।সবসময় জারিফকে সাহায্য করার চেষ্টা করে।আকাশের চাঁদের দিকে তাকায় জারিফ, অনেক রাত হয়ে গেছে।চাঁদ টা কেন যেন অনেক জীবন্ত মনে হয় ওর, হঠাৎ মনে হয় ও অরিনের দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জায় মুখ নামিয়ে নেয় জারিফ। আচ্ছা অরিন কে একটা কল দিবে, জারিফ ভাবে। অরিন কি জানে জারিফের ব্যাপার টা, না থাক কল দিবে না।
আরিন কে কোনভাবে জানানো যাবে না।জারিফ অটিস্টিক, একজন অসম্পূর্ণ মানব, অটিস্টিক দের ভালোবাসতে নেই।অরিন ওর মনের কথা জানলে অরিনও ওকে ছেড়ে চলে যাবে।বুকের ভিতর কেমন একটা ব্যাথা করে উঠে জারিফের আর মনের ভিতর একটা ঘুমোট ভাব।