এক
ভোর রাত থেকে একটানা বৃষ্টি। তুমুল মুষলধারে। আকাশ ফুটা হয়ে গেছে মনে হয়। ঝম ঝম ঝম ঝম। সেই সংগে কান ফাটানো শব্দে বজ্রপাত। চৈত্রের মাঝামাঝি। দিনের বেলায় কাঠফাটা রোদে জীবন অতিষ্ট। মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির। জমিতে ধান লাগিয়ে গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন কাটে কৃষকের। আগে বছরে নির্দিষ্ট সময়ে ধান চাষ করা হত। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ধান কেটে গোলায় তুলে দীর্ঘসময় আর ধান চাষ করা হত না। এখন নূতন নূতন কত জাতের ধান আবিষ্কার হয়েছে। ধান চাষীদের আর বসে থাকার ফুরসত নেই। বছরের বার মাস ব্যস্ত সময় পার করে কৃষক। ফলনও বেড়েছে বহূগূণ। বৃষ্টির আশায় চাতক পাখীর মত দিন কাটছিল কৃষকের। সেই বৃষ্টি নামলো, কিন্তু এমন মুষলধারায়? হিতে না বিপরীত হয়!
বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছিল রমিজা খাতুন। কাঁথাটা ভালোমত শরীরে জড়ায়ে জবুথবু হয়ে শুয়ে থাকে। মাটির ঘর এমনিতেই ঠাণ্ডা। বৃষ্টি-বাদলা নামলে আর কথা নাই। ঘর একেবারে শীতল পাটির মত ঠাণ্ডা হয়ে যায়।
বাঁশ দিয়ে বানানো পাতলা ফালি মাটির খোপে ঢুকিয়ে বানানো জানালা। বৃষ্টির ছাঁট থেকে রক্ষার জন্য বাঁশের আলাদা একটা ঝাঁপ বানানো আছে। সেই ঝাঁপ খুলে রাখা হয়, বৃষ্টি আসলে জানালার সাথে আলগা করে লাগানো হয়। ঝাঁপ টা লাগানো দরকার। বৃষ্টির ছাঁট এসে বিছানা ভিজে যাচ্ছে। উঠতে ইচ্ছা করছে না। ষাটোর্দ্ধ শরীরে আগের মত জোর কই? খালি শুয়ে বসে থাকতে ইচ্ছা করে। রমিজা খাতুন গলা উঁচু করে ছোট ছেলে মনোয়ারকে ডাকে।
'মনো ও মনো। জানলার ঝাঁপিটা এনা লাগায় দে না বাপ। বৃষ্টির পানিত্‌ তো বিছ্‌না বালিশ সব ভিজ্যা গ্যালো। ও মনো।'
পাশের ঘরটাতে ছোট ছেলে মনোয়ার শুয়ে আছে। মা'র ডাক শুনে উঠে পড়ে। জানালার ঝাঁপি লাগায়ে দেয়। বিছানার চাদর বেশী ভিজে গেছে কিনা হাত লাগায়ে দেখে।
'এঃ হে। চাদর তো দেখি এক্কেরে ভিজ্যা গ্যাছে। হামাক আগে ডাকবার পারো নাই?'
মনোয়ার যত্ন করে চাদরের ভিজা জায়গাটা গুটায়ে ফেলে মাকে দেয়ালের পাশে সরে শোওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়।
'সক্কাল হতে ম্যালা দেরী। ঘুমায় থাকো।'
রমিজা খাতুনের ঘুম আসে না। এই বয়সে এমনিতেই ঘুম কমে যায়। তার মধ্যে একবার ঘুম ভেংগে গেলে সহজে আর আসতে চায় না। দুনিয়ার হাজার চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। ঠিক-ঠিকানা নাই সেই সব চিন্তার। ফেলে আসা দিনের কথা, বর্তমান সময়ের কথা, আগামী দিনগুলোর কথা, ছেলেদের কথা, বাঁচার কথা, মরার কথা। কিছুই বাদ যায় না। চিন্তা করতে করতে চিন্তার ভিতর গিট্টু পাকায়ে যায়। তবু চিন্তা ছুটে না।
বৃষ্টি-বাদলার দিনে বড় ছেলে আনোয়ারের কথা খুব মনে পড়ে। ছটফটে চঞ্চল সাত-আট বছরের ছেলেটা তার। পানির পোকা ছিল একটা। পুকুরে একবার নামলে আর উঠানো যেত না। বৃষ্টি নামলে ঘরে আনা যেত না। পানি আর পানি। পানিই ছিল তার জীবন। সেই পানিই কেড়ে নিল তার জীবন। পানির সাথে নিত্য সখ্য যার, সে একদিন পানিতে নেমে আর উঠলো না। মাঝ পুকুরে ভেসে উঠলো তার ছোট্ট শরীরটা।
প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা। আজো মনে পড়লে কলিজার মধ্যে মোচড় দেয় রমিজা খাতুনের। নাড়ি ছেড়া বুকের ধন। হাজার বছর কেটে গেলেও এই জ্বালা জুড়াবে না। ছানি পড়া চোখ দুটোতে এখনো ঝরঝর করে পানি পড়ে।
দুই
রমিজা খাতুনের বাপের বাড়ি ছিল মোতাপুর গ্রামে। দেশের উত্তরাঞ্চলের এক জেলার কোন এক প্রত্যন্ত গ্রাম। তিন ভাইয়ের সংসারে রমিজা খাতুন ছিল একমাত্র বোন। বাবা হাফিজ মণ্ডল মোতাপুর গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থ। প্রায় বিশ-পঁচিশ বিঘা ধানি জমি ছিল তার। গ্রামের অনেক সাধারণ কৃষক হাফিজ মন্ডলের জমিতে বর্গা চাষ করতো। দিল-দরিয়া মানুষ ছিলেন রমিজা খাতুনের বাবা হাফিজ মণ্ডল। গ্রামের গরীব-দুঃখী মানুষের জন্য তার ঘরের দুয়ার ছিল সবসময় খোলা। কারো মেয়ের বিয়ে, হাতে টাকা নাই-হাফিজ মণ্ডল টাকার জোগানদার। কারো বা চিকিৎসার দরকার, ঘরের চালা ঠিক করতে হবে-সবাই দ্বারস্থ হতো তার। কাউকেই খালি হাতে ফেরাতেন না তার বাবা। যাকে যা পারতেন দান করতেন।
এই হাফিজ মণ্ডলের একমাত্র মেয়ে ছিল রমিজা খাতুন। তিন ছেলের পরে হওয়া এই মেয়েকে তিনি মাথায় তুলে রাখতেন। মেয়ের মুখের কথা মাটিতে পড়ার আগেই তা পূরণ হওয়া সারা। রমিজা খাতুনের মা মেয়েকে নিয়ে স্বামীর এই আদিখ্যেতায় মোটেও খুশী ছিলেন না। এই নিয়ে প্রায়ই স্বামীর সাথে ক্যাচাল বাঁধাতেন তিনি।
'মাথায় তুইল্যা বেটির সব্বোনাশ না করা অব্‌দি শান্তি নাই তুমার। হামাক(আমাকে) দেখিছো অত আল্লাদ কর্‌বার? বেটি ছোলেক(মেয়ে বাচ্চাকে) অত লাই দেওয়া ঠিক লয়। পরে বুঝা পারবিন।'
হাফিজ মণ্ডল কানেও তুলতেন না স্ত্রীর কথা। মেয়ে লোকের সব কথা শুনতে নাই। এরা কথা একটু বেশীই বলে। কিন্তু মেয়েকে নিয়ে তারও যে চিন্তা হত না তা নয়। এত আদরের কণ্যা তার, না জানি কার হাতে পড়ে!
মেয়েকে লাগাম ছাড়া আদর দিলে কী হবে, মেয়ে তার সুলক্ষী। রূপে-গূণে, কাজে-কর্মে কমতি নাই কোন দিকে। ভালো একটা ছেলের সন্ধানে তিনি এদিক-ওদিক লোক পাঠান। অনেক লোকের সাথে ওঠা বসা তার। তাছাড়া কত লোকের তিনি উপকার করেছেন, তার মেয়ের জন্য ভালো ছেলের সন্ধান দিতে কেউ পিছ পা হয় না। আট ক্রোশ দূরের গ্রাম 'রনাহার' এ এক ছেলের খোঁজ পান তিনি। ছেলের বাপের অবস্থা সাধারণ। সামান্য কিছু ধানী জমি আছে, তা ই আবাদ করে খায়। ছোটখাট গৃহস্থ। হাফিজ মণ্ডলের তাতে সমস্যা নাই। আল্লাহ্‌ তাকে অনেক দিয়েছেন। মেয়েকে যথাসম্ভব সাজিয়ে গুজিয়ে বিদায় করবেন তিনি। ভালো একটা ছেলে পেলে তিনি আর কিছু দেখবেন না। হাফিজ মণ্ডল খবর পান, ছেলের প্রশংসায় সবাই পঞ্চমুখ। আচার-আচরণ, কথা-বার্তায় এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় না। ম্যাট্রিক পর্যন্ত পড়াশুনাও করেছে। এখন বাবার জমি জিরাত দেখাশুনা করে। নির্ঝনঞাট পরিবার। মা-বাবা আর ছেলে। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, তারা যার যার শ্বশুড়বাড়ীতে থাকে।
ভালমত খবরাখবর নিয়ে ঘটক পাঠান হাফিজ মণ্ডল। ছেলের বাবা মহাখুশী। হাফিজ মণ্ডলকে দু চার গ্রামের অনেকেই চেনে। তার মেয়ের সাথে বিয়ের পয়গাম আসা মানে বিশাল ব্যাপার। ভালোয় ভালোয় ঠিকও হয়ে যায় সবকিছু। অগ্রহায়ণ মাসের মাঝামাঝি এক সময়ে নূতন ধান ঘরে আসার পরপরই হাফিজ মণ্ডল তার আদরের কণ্যাকে নূতন ঘরে পাঠান।
স্বামীর ঘরে এসে প্রথম প্রথম খালি খালি লাগতো রমিজা খাতুনের। তার বাপের বড় বাড়ি,উঠোন জোড়া বড় গোলাঘর, বিশাল জোড়া পুকুর, পুকুর ভরা মাছ। এত এত শান-শওকত দেখে বড় হয়েছে সে। তার শ্বশুড় ছোটখাট গৃহস্থ, অবস্থাপন্ন কৃষকও বলা চলে। রমিজা খাতুনের মনটা ছিল দীঘির মত গভীর। ধনী বাবার বাড়িতে বড় হয়েও সে ধনের গর্ব করতে শিখেনি। বাবা তার বিদায়ের সময় মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন,
'তুমার স্বামীর যা আছে আইজক্যা থিক্যা তাই তুমার নিজের। দুনিয়ার বেবাক কিছুর থন ওডাই বেশী দ্যামী।'
তবু বাস্তবতার কামড় এত সহজ ছিল না। সোনার কাঁকন পড়ে যার জন্ম, সে কি চাইলেই এত সহজে তা হাত থেকে খুলে নিতে পারে? কিন্তু তার শ্বশুড়-শাশুড়ি ছিলেন বড় ভাল মানুষ। পনের বছরের রমিজা খাতুনকে বুকে টেনে নেন তারা। এতটুকু অযত্ন যাতে তার না হয়, সেদিকে ছিল তাদের সজাগ নজর। আর স্বামী? সে ছিল এক মাটির মানুষ। রমিজা খাতুনকে সে কই তুলে রাখবে, তাই যেন বুঝে উঠতে পারতো না। স্ত্রীর আবদার মেটানোই যেন ছিল তার একমাত্র কাজ। রমিজা খাতুন আজ এতবছর পরে ভেবেও কোন কূল-কিনারা পায় না কোন গূণে স্বামীর এত ভালোবাসা তার কপালে জুটেছিল। স্বামী এত ভালোবেসেছিল বলেই বোধহয়, তার পরিবারকে আপন করে নিতে কোন সমস্যা হয় নি রমিজা খাতুনের। যতদিন তার স্বামী বেঁচে ছিল, কোন দুঃখই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বড় ছেলে আনোয়ারের জন্ম।
ভর-ভরান্তি সুখের দিন তখন।

তিন
আনোয়ারের মৃত্যু প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়ে যায় রমিজা খাতুনের জীবনটা। হাসিখুশী, সদাচঞ্চল রমিজা খাতুন এক ধাক্কাতেই যেন অনেকটা বয়স্ক ও পরিণত মানুষে পরিণত হয়। মেজ ছেলে মতিয়ারের বয়স তখন সবে তিন বছর। অবুঝ মতিয়ারের পানে তাকিয়ে আবারো সচল করতে হয় জীবনের চাকা। তারপর একে একে আরো দুই ছেলের জননী হয় রমিজা খাতুন। তৃতীয় ছেলে সানোয়ার আর ছোট ছেলে মনোয়ার। মনোয়ারের জন্ম তার অনেকটা বেশী বয়সে। মনোয়ার পেটে থাকতে এক্লামশিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মর মর অবস্থা হয় তার। তার স্বামীর শরীরটাও তখন অনেক ভেঙ্গে পড়েছে। রমিজা খাতুনকে বুঝতে না দিলেও সে জানে, আনোয়ারের মৃত্যুর পর থেকেই তার শরীরে ভাঙ্গন ধরেছে। মনোয়ারের বয়স যখন দুই বছর, তখন মাত্র তিন দিনের জ্বরে রমিজা খাতুনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সাথিটি তাকে ছেড়ে পাড়ি জমায় অন্য দুনিয়ায়। শাশুড়ি তখনো বেঁচে ছিলেন।
এরপর তিন ছেলে আর শাশুড়িকে নিয়ে শুরু হয় রমিজা খাতুনের জীবন সংগ্রাম। যে হাতে পানি ভর্তি কলস ছিল সর্বোচ্চ ভার, সে হাতে লাঙ্গলের ফলাও তুলে নিতে হয় তাকে। মতিয়ার তখন সংসারের হাল ধরতে যথেষ্ট সক্ষম। কিন্তু তার একার পরিশ্রমে সংসারের চাকা ঘোরে না। জমি জমার ফসল আবাদ কমে যায়। রমিজা খাতুনের বিয়ের সময় তার বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু গয়নাগাঁটি ছিল। ছেলেদের বিয়ের সময় কাজে লাগবে বলে রেখে দিয়েছিল। সেই গয়নাতেও হাত দিতে হয় একসময়। রমিজা খাতুনের বাবা মা মারা যাওয়ার পরে বাপের বাড়ির সাথেও আর কোনরকম যোগাযোগ ছিল না। বহূদিন পরে ভাইদের সাথে দেখা করতে বাপের বাড়ি গিয়ে টের পায়, কোনকিছুই আর আগের মত নেই। বোনের এই হঠাৎ আগমনে ভাই ভাবীরা ভেতর ভেতর সচকিত হয়। অন্য কিছুর আশংকা করে।
অন্যের দ্বারস্থ হয়না রমিজা খাতুন। শত ঝড় ঝাপ্টাকে সামাল দিয়ে শাশুড়ি আর ছেলেদের নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। কিন্তু এই সময় মেজ ছেলে মতিয়ার সংসারের হাল ফেরাতে শহরে যাওয়ার জন্য মায়ের কাছে প্রস্তাব করে বসে।
'কেবল হালচাষ কর্যাা তো কিছুই করা পারিচ্ছি না। গাঁও থিক্যা ত মেলা মাইনষ্যে শহরত যায়।'
'শহরত গিয়্যা তুই কী করবু? রিক্সা ভ্যান চালাবার পারবু?'
'চিষ্টা কর্যাগ দেখবার ত কুন ক্ষতি নাই। কী কও তুমি?'
'হামাগের জমি গুলানের কী হব সিট্যা ভাবিছিস?'
'ও তুমি এডা বরগা ঠিক কর্যা লিও। মুই যামুই শহরত।'
ছেলের ঢাকা শহরে যাওয়া ঠেকাতে পারে না রমিজা খাতুন। ছেলে তার যাবেই যাবে পণ করেছে। আজ ভাবলে রমিজা খাতুনের মনে হয় সংসারের হাল ফেরাতে না, সে আসলে চেয়েছিল সংসারের পড়ে যাওয়া হাল থেকে নিজের মুখ ফেরাতে। শহরে গিয়ে প্রথম প্রথম বাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতো। একমাস পর থেকে মাসে মাসে কিছু টাকাও পাঠাতো। আস্তে আস্তে যোগাযোগ কমতে থাকে। টাকা পাঠানোও বন্ধ হয়ে যায় এক সময়। এর ওর কাছে উড়া উড়া খবর পায় রমিজা খাতুন, মতিয়ারের অবস্থা নাকি আগের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। রাজমিস্ত্রীর কাজ শিখেছে, আয় রোজগার ভালো। বিয়েও নাকি করেছে।
সেজ ছেলে সানোয়ার ছোটবেলা থেকেই খুব হিসেবী আর পরিশ্রমী। নিজের কাজের জন্য সে কখনোই কারো মুখাপেক্ষী হত না। ছোটবেলা থেকেই চুপচাপ শান্ত স্বভাবের সানোয়ার শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরে। সারাদিন মাঠেই পরে থাকতো সে। তার কঠোর পরিশ্রমের সুফল আসে এক সময়। ফসল পাতি ভালো হয়। ধার দেনা ছিল কিছু, আস্তে আস্তে সব শোধ করে অনেকটা আগের সচ্ছলতা ফিরে আনতে সক্ষম হয় সে। ছোট ভাইয়ের সাথে তার বয়সের ব্যবধান প্রায় দশ বছর। সানোয়ার যখন সংসারের হাল ফেরাতে ব্যস্ত, ছোট ছেলে মনোয়ার তখন ব্যস্ত তার মাকে নিয়ে। মায়ের আঁচলের খুট সে ছাড়তো না কোন সময়। উঠতে মা, বসতে মা। ছোট সন্তানের প্রতি সব বাবা-মায়েরই নাকি আলাদা একটা টান থাকে। মনোয়ার ছিল তার শেষ বয়সের ছোট সন্তান, তাই তার প্রতি রমিজা খাতুনেরও ছিল দু-কূল ছাপানো মমত্ব। মায়ের মুখে গল্প শোনার প্রতি তার ছিল অসীম আগ্রহ। দাওয়ায় বসে নাকফুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রমিজা খাতুন তাকে কত কেচ্ছা কাহিনী শোনাতো। নানাবাড়ির শান শওকতের গল্প শুনে চোখ আকাশে তুলতো মনোয়ার, অবিশ্বাসী চোখে মাকে জিজ্ঞেস করতো, 'তুমি বানায়ে কচ্ছিন, তাই না?'
বাপের মমতাবঞ্চিত মনোয়ারের কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিল বাবার গল্প শোনা। তার মার কাছেও সেই গল্প বলা ছিল সবচেয়ে বেশী প্রিয়। পরম মমতায় রমিজা খাতুন তার গল্পের ঝাঁপি খুলতো।
'তর বাপে আছিল এই দুনিয়ার বাইর। দিন-দুনিয়ার কুন হিসাব-নিক্যাশই হেই ধইরবার পাইরতো না, এমুন সুজা (সোজা) আছিল। মাইনষ্যে ঠকায়্যা ভূত বানায়্যা দিত। পাঁচ টাকার জিনিস কিন্যা আনতো পঞ্চাশ টাকায়। হামার বাপের লাগান হামাক মাথায় তুল্যা থুতো। একবার হছে কী(একবার কী হয়েছে), হামাগের বিয়্যার পরপর, হামি হের কাছে একখান নুপুর চাইয়্যা বসি। জমিত অসুম বীছন লাগাবার কাম চলিচ্ছে। বেবাক কাম কাজ থুইয়্যা হেই দিনমান বইস্যা থাকলো নুপুরের কারিগরের ওটি...।'
বলতে বলতে চিক চিক করে ওঠে রমিজা খাতুনের চোখ। স্বামী গর্বে গরবিনী রমিজা খাতুন অনেকদিন পরে আবার অনুধাবন করতে পারে, মেয়েদের আসল ধন তার স্বামী। স্বামী যার আপন, সে ই আসল ধনবান এই দুনিয়ায়।

চার
সংসারের অবস্থা কিছুটা ফিরল। রমিজা খাতুন এবার ছেলে সানোয়ারের বিয়ে দেওয়ার জোগাড়যন্ত্র শুরু করে। পাশের গ্রামের একটা মেয়েকে তার বেশ মনে ধরে। ছোটখাট, শ্যামলা একহারা গড়নের মেয়েটিকে খুব পছন্দ হয় রমিজা খাতুনের। সানোয়ারকে বলতে সে জানায়,
'ও তুমার যা মনে চায় ঠিক কর। হামাক জিগাস করার কী আছে?'
রমিজা খাতুন খুব খুশী হয় মনে মনে। ছেলে এখনো মায়ের সিদ্ধান্তকে খুশীমনে মেনে নিচ্ছে। তার বয়স হয়েছে। বাড়ির কাজকর্ম ঠিকঠাক মত করতে পারেনা। মনোয়ার মায়ের সাথে থেকে তাকে টুকটাক বাড়ির কাজে সাহায্য করে। কিন্তু ছোটখাট হলেও একটা গৃহস্থ বাড়িতে কাজ কি কম? হালের বলদ গুলো দেখাশুনা করাই তো একটা বড় কাজ। বাড়িতে বউ আসলে আর চিন্তা থাকবেনা। গ্রাম অঞ্চলের মেয়েরা এমনিতেই কাজে কর্মে নিপুণা হয়। শহরের মেয়েদের মত তো এরা চাকরি বাকরি করে না। সংসার করাই এদের একমাত্র কাজ। নিজের সিদ্ধান্তে অল্প কিছু খোঁজখবর নিয়েই রমিজা খাতুন ছেলে সানোয়ারের বিয়ে দিয়ে দেয়।
কিন্তু মাস না ঘুরতেই রমিজা খাতুন টের পায়, মস্ত ভুল হয়ে গেছে তার। ছেলের বউয়ের জবানে যেন মরিচের গুঁড়া মেশানো। ঝাঁজ ছাড়া কথা বলতে পারেনা। অল্প দিনেই সে বুঝে ফেলে, তার স্বামীই হচ্ছে এ বাড়ির আসল মেজবান। রাগটা বেশী গিয়ে পড়ে অকর্মার ঢেঁকি দেবরের উপর। সারাদিন কাজ কর্ম বাদ দিয়ে খালি মা মা। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে সমানে কথা শোনায় সে।
' জোয়ান বয়সত কাম কাজ না কইর্যাা বস্যা থাহা, এমুনডা জম্মে দেহি নাই। আঁচলের গিঁটত বান্ধ্যা থুলি আর কাম করবো কিসক(কি জন্য)?'
শেষের বাক্যটি শাশুড়ির উদ্দেশ্যে। রমিজা খাতুন ভেবেছিল সানোয়ার কিছুতেই বউয়ের এই দুর্ব্যবহার সহ্য করবে না। মায়ের প্রতি কটূক্তি কি কোন ছেলে সহ্য করে? কিন্তু বড় চতুর সানোয়ারের বউ। স্বামী সামনে থাকলে তার মুখে মধুর চাঁড়। পুরাই অন্য সুর। সানোয়ারকে ঢং ঢাং করে কত কথা যে বলে তখন।
'মনোয়ারের লাহান তুমিও তো মার কাছে বইয়্যা থাকবার প্যারো। মার কত ভালা লাগে।'
রমিজা খাতুন সানোয়ারের বউএর চাতুরীর ধার ধরতে পারে না। নারীত্বের যাবতীয় ছলাকলায় সে সানোয়ারকে বশ করে ফেলে। সানোয়ার যেন পুরাই তার হাতের পুতুল। এরপর সংসার বিষয়ক নানা পরামর্শও সে স্বামীকে দিতে শুরু করে। মনোয়ার যে কোন কাজ কর্ম না করে শুধু শুধু অন্ন ধ্বংস করছে, এই কথা সে উঠতে বসতে শোনাতে শুরু করলো। এক পর্যায়ে সানোয়ারও সুর মিলাতে শুরু করলো।
মনোয়ার অতিষ্ট হয়ে একদিন মাঠে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। রমিজা খাতুনও সেটাই যুক্তিযুক্ত মনে করে। এতে যদি সংসারের অশান্তি কিছুটা কমে। কিন্তু কিসের কী! রমিজা খাতুনকে একা পেয়ে সানোয়ারের বউ এবার আরো মুখিয়ে উঠে। আগে মনোয়ারের জন্য সে শাশুড়িকে কিছু বলতে পারতো না। তার স্বামীর একার পরিশ্রমে সংসারে সবাই খেয়ে পরে বেঁচে আছে, এ কথা সে উঠতে বসতে শাশুড়িকে শোনাতে লাগলো। বাড়ির কাজ কর্ম সামাল দিতে গিয়েও সে বেসামাল হয়ে ওঠে।
রমিজা খাতুন আর আগের মত কাজ করতে পারে না। তার নিজেরই অনেক কাজের জন্য এখন মনোয়ারের শরণাপন্ন হতে হয়। অবস্থাদৃষ্টে একদিন মনোয়ারকে বিয়ে করতে বলে রমিজা খাতুন। এতে যদি বউয়ের কাজ কিছুটা কমে। তাহলে হয়তো মেজাজ কিছুটা ঠাণ্ডা হবে। বিয়ের কথা শুনেই ঝাঁঝিয়ে উঠে মনোয়ার।
' হ, আরেকখান খাণ্ডারনীরে ঘরে আনবার কও। একডারে দিয়্যা সুখ হছ্যে না তুমার?'
কষ্টের মধ্যেও হাসি পায় রমিজা খাতুনের।
দিন,মাস,বছর ঘুরে। দিনে দিনে তিক্ততা আকাশ ছাড়ায়। জমি জিরাতের কাজে বেশী সুবিধা করতে পারে না মনোয়ার। ছোটবেলা থেকেই সে কিছুটা নাদুসনুদুস। অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠে। ভাইয়ের বউয়ের খোঁটায় বাড়িতে বাস করাও দুরূহ হয়ে ওঠে। সানোয়ার এ ব্যাপারে একেবারেই নির্বিকার। যেন কোন কিছুতেই কিছু যায় আসে না তার। চোখ ফেটে জল আসে রমিজা খাতুনের। প্রথমে মতিয়ার, পরে সানোয়ার। সব দোষই কি তার এই পেটের?
মনোয়ারকে দেখে দুঃখ চলে যায় রমিজা খাতুনের। মায়েরে নিয়ে তার চিন্তার যেন শেষ নেই। মার শরীরটা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভালোমন্দ খাওয়ানো দরকার। চোখের ছানির জন্য এখন ঠিকমত দেখতেও পারে না। হাঁটতে গেলে শরীর কাঁপে। ভাতের গ্রাস মুখে তোলার সময় হাত কাঁপে। মনোয়ারের চোখ পানিতে ভরে আসে। বাবার স্নেহ কাকে বলে সে জানে না। দুটি ভাই থেকেও নাই। মা না থাকলে কিভাবে বাঁচবে সে? মনোয়ার মুখে তুলে মাকে খাইয়ে দেয়। রমিজা খাতুনের তার বাবার কথা মনে পড়ে। বাবা ছোটবেলায় মাঝে মাঝে মুখে তুলে খাইয়ে দিত তাকে। তার মরা বাপই যেন মনোয়ার হয়ে তার কাছে ফিরে এসেছে।
মায়ের চোখের চিকিৎসা করা দরকার। অপারেশন করলে ছানি ভালো হয়ে যায়। একদিন ভাইয়ের কাছে কথাটা পাড়তে যায় সে। দজ্জাল ভাবী কথা আগাতেই দেয় না।
'এই বয়সত চোখ কাটলিই কি দেখ্যা পারব? আজাইরা গুরাদু(অনেক গুলো)পয়সা খরচ হব্যো।'
মনোয়ার ভেবে পায় না কী করা যায়। শেষে একদিন মার কাছে গিয়ে বলে যে সে শহরে যেতে চায়। শহরে কত রকম কাম কাজ। দুইটা টাকা জমাতে পারলেই ফিরে আসবে সে।
আঁতকে উঠে রমিজা খাতুন। অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে তার। স্বামী, সন্তান, সময় সব হারিয়ে আজ সে এক নিঃস্ব অসহায় বৃদ্ধা। বেঁচে থাকার সম্বল বলতে তার এই বুকের মানিক, সাঁঝের পিদিম। এই পিদিম ঘরে জ্বালিয়ে রেখে সে পরপারে পাড়ি জমাতে চায়।
মনোয়ারের এই কথায় কলিজা নিংড়ে আসা আর্তনাদ করে ওঠে রমিজা খাতুন। হাহাকারের মত শোনায় যেন,
'ও বাপ, ও কইলজ্যা হামার। হামার কুন্যো চিকিসসা লাগবো না বাপ। হামার বেবাক অসুখ ভাল হয়্যা যাব বাপ।তুই হামাক থুইয়্যা কুন্টে যাবু বাপ। হামার চোখ্যের জ্যূতি তুই বাপ। ইমুন কতা তুই কস না বাপ হামার। হামার কইলজ্যাডা ছিড়্যা যায় বাপ, ও বাপ...।'
কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে বসে পড়ে রমিজা খাতুন। মনোয়ার ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে মাকে। পরম মমতায় সে মুছে দেয় মায়ের চোখের পানি।।