মায়ের ভালোবাসা আর মমতার কাছে যেমন সন্তান ঋণী, তেমনি কখনো কখনো সন্তানের কাছেও ঋণে আবদ্ধ হয় মা। সেইসব মায়েরা...যারা সন্তানের গর্বে গরবিনী, সমাজ যাদের স্বীকৃতি দেয় 'রত্নগর্ভা' বলে। কিন্তু কত মা'ই তো আছেন যারা সেই পুরষ্কার পাওয়া তো দূর, তার স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়। কিন্তু স্বপ্ন তো আসে সঙ্গোপনে, মনের অজান্তে। ওদিকে সমাজের কাছে রত্নগর্ভা উপাধিতে ভূষিত সব মা'ই কি প্রকৃত রত্ন ধারণ করেন তার গর্ভে? .................. এই সমীকরণ এত সহজ নয় হয়ত...
-লেখার সাথে বিষয়ের সামঞ্জস্যতা ব্যাখ্যায় লেখকের বক্তব্য

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৬২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগল্প - মা (মে ২০১৯)

রত্নগর্ভা
মা

সংখ্যা

ফাহমিদা বারী

comment ৫  favorite ০  import_contacts ৬২
এক
সকাল থেকেই ব্যস্ততা আজ উপচে পড়ছে ভৈরব সরণীর ৬৫/এ নাম্বারের ‘বৈকুণ্ঠ’ নামের ছায়াঘেরা বাসাটিতে।
বাসাটির মালকিন রোকেয়া রহমানের দম ফেলার ফুরসত নেই আজ। অনুষ্ঠান শুরু হতে আর মাত্র তিন ঘণ্টা বাকি। অথচ তিনি এখনো তৈরি করে নিতে পারেননি নিজেকে।
একটা ছোটখাট বক্তৃতাও নাকি দিতে হবে! জীবনে কোনদিন ওসব বক্তৃতা টকৃতা দেননি তিনি। কীভাবে দিতে হয় তাও জানেন না। তবে তিনি টুকটাক লেখালেখি করতে পারেন। ইচ্ছে ছিল, কিছু একটু কাগজে লিখে নিয়ে কিছুক্ষণ মনে মনে আওড়ে নিবেন। ব্যস, তাতেই যেটুকু কাজ হয় হবে।
যদিও পুরষ্কৃত তিনিই হবেন, কিন্তু তিনি তো আর তার কীর্তির জন্য পুরষ্কৃত হতে যাচ্ছেন না! তিনি পুরষ্কৃত হতে যাচ্ছেন যে রত্নের মতো সন্তানদের তিনি তার গর্ভটিতে ধারণ করেছেন, সেই সন্তানদের জন্য। তারাই তাকে পরিয়ে দিয়েছে বিজয় মুকুট। আজ তাদের কীর্তির মাঝেই তার নিজের সব না পাওয়ার অক্ষমতা ধুয়ে মুছে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
‘রত্নগর্ভা’ পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। জাতীয় পর্যায়ে এই বছর যে কুড়ি জন গরবিনী মা তাদের সন্তানদের জন্য এই গৌরবের ভাগীদার হয়েছেন, তিনিও তাদের মধ্যে একজন।
সকাল থেকেই শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধু আর আত্মীয়দের ভীড়বাট্টায় তিনি তার সামান্য সেই প্রস্তুতিটুকুও নিতে পারেননি। ভেতরে ভেতরে ছটফট করছেন রোকেয়া রহমান। বাসার ভীড়টা একটু কমে গেলেই তিনি কাগজ কলম নিয়ে বসবেন। কিন্তু ভীড় কমা তো দূর, উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে যেন।
গতকাল রাতে পুরষ্কার প্রাপ্তির খবরটা দিয়েছেন সবাইকে। এর আগ পর্যন্ত কিছুটা অনিশ্চয়তা মন থেকে সরছিল না। কী জানি, সব ঠিক থেকেও যদি শেষ মূহুর্তে এসে কিছু হয়ে যায়! বলা তো যায় না! তাহলে আগেভাগে সবাইকে জানালে লজ্জায় পড়তে হবে।
তাই একেবারেই শেষ মূহুর্তেই জানিয়েছেন সবাইকে। আর তার ফল হয়েছে ভয়াবহ।
কেউ কেউ টেলিফোনেই অভিমানে ফেটে পড়েছেন। গভীর অনুযোগের সুরে বলেছেন,
‘এতদিন আমরা তোমার সুখ দুঃখে ঘিরে রইলাম। আজ তোমার সুখের দিনে আমরাই পর হয়ে গেলাম! এত সুখের সংবাদ সবার শেষে জানাচ্ছো!’
তিনি যথাসম্ভব চেষ্টা করে চলেছেন সবার মান ভাঙাতে। সবাইকে খুশি রেখে আজকের এই খুশিটুকু সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিতে। খুব যে পারছেন তা নয়। কোথাও না কোথাও অনাকাঙ্ক্ষিত ঈর্ষার অতি সূক্ষ্ণ সুরটুকুও ধরতে পারছেন।
তিনি সেটাকে পাত্তা দিতে চাইছেন না।
মানুষের মন কত যে বিচিত্র! আজ যারা এই সূক্ষ্ণ ঈর্ষার জালে আটকে পড়তে চাইছে, এদের মধ্যেই অনেকে হয়ত তার দুঃসময়ে সত্যি সত্যিই তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। আবার আজ যারা খুশি আর অভিনন্দনের বাক্যবাণে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছেন, তারাই হয়ত একসময় তার দিকে ফিরেও তাকায়নি।
তাই তিনি কারো প্রতিই আজ কোনো রকম অনুযোগ রাখতে চান না। যে যেভাবে দেখুক, তিনি সবাইকেই নিজের বন্ধু ভাবছেন।
কম তো কষ্ট করেননি এতগুলো বছরে। স্বামীর মৃত্যুর পর প্রায় পঁচিশটি বছর। কত অল্প ছিল তার বয়স তখন! সেই অল্প বয়সে যে কঠিন দুঃসময় তাকে পার করতে হয়েছে আজ ভাবলেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
ছোট সন্তানের জন্মের পরের বছরই তার স্বামীর মৃত্যু হয়। অন্য দু’সন্তানের বয়স তখন তিন আর সাত।
সেই অবুঝ তিনটি সন্তানকে নিয়ে তিনি পাড়ি দিয়েছেন সংসার নামক দুরুহ এক সমুদ্র। সেই সমুদ্রে ক্ষণে ক্ষণে ঝড় উঠেছে, হঠাৎ আসা সুনামীতে ভেসে গেছে আশেপাশের একটুখানি গজিয়ে ওঠা সবুজ প্রান্তর। দমে যাননি তিনি। কিংবা বিধ্বস্ত হয়ে হাল ছেড়ে দেননি। নিশ্ছিদ্র ধৈর্যে শক্ত হাতে হাল ধরে পাড়ে তুলেছেন তার তরী। কাউকে এতখানি ছিটকে পড়তে দেননি।
আজ তার সন্তানরা সফল, সমাজে প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্টিত তিনিও...একজন সফল মা হিসেবে।
মনের খুব গহীন কোণে একটুখানি গর্বের ছায়া কি তার মনেও পড়েনি? বিনয়ে কেন আজ তিনি মাটির কাছাকাছি থাকতে পারছেন না?
আজ এত বছর বাদে একটুখানি পরিতৃপ্তির চোখে যদি তিনি তার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে দেখেন, খুব কি দোষ দেওয়া যায় তাকে? এতটা শ্রম আর নিষ্ঠার বীজকে তিনি পরিপুষ্ট ফলে পরিণত করে তুলেছেন। আজ যদি কিছুটা অহমিকার শ্যাওলাতেই তার পা জড়িয়ে যায়, সেজন্য কি তিনি ক্ষমা পেতে পারেন না?
একে একে সবাইকে বিদায় করে দিয়ে ডাইনিং রুমের দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালেন রোকেয়া রহমান। মাত্র দেড় ঘণ্টা আছে আর। ভেন্যু বাসার খুব কাছে। রিকশায় গেলেও বড়জোর কুড়ি মিনিটের মতো লাগবে। অনুষ্ঠান শুরু হতে হতে হয়ত কিছুটা দেরিও হতে পারে। কাজেই সময়টাকে কাজে লাগাবেন তিনি। ঝটপট কিছু লিখতে বসে গেলেন।
কিন্তু কী যে লেখা যায়! কত কথা ভীড় করে আসছে মনের মাঝে! কীভাবে তাদের ভাষায় রূপ দেবেন তিনি?
ছেলেমেয়েরা তৈরি হয়ে তাড়া দিতে লাগলো তাকে।
মেয়ে সীমা গতবছর এমবিবিএস পাশ করে ইণ্টার্ণী করছে। বড় ছেলে শাহেদ বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিসিএস দিয়ে চাকরিতে ঢুকেছে। আর ছোট ছেলে সাজেদ ঢাকা ভার্সিটি থেকে পাস করে ভার্সিটিতেই জয়েন করেছে।
ঝকঝকে সোনার পাতে মুড়ানো সন্তানেরা তার। মা হয়ে কি আর বেশি কিছু চাইবার আছে?

দুই
লতিফা ঝড়ের গতিতে হাঁটছে।
ডানে বাঁয়ে তাকিয়ে সময় নষ্ট করছে না সে। ইস! কত দেরি হয়ে গেল! খালাম্মা আজ তাকে একটু তাড়াতাড়ি যেতে বলেছিল। আর সে কী না আজই দেরি করে ফেললো!
কীই বা করার ছিল তার! তাকে কি দোষ দেওয়া যায়? এত বড় হয়ে গেল, তবু ছেলেটা এখনো কেমন যেন আচরণ করে!
এই তো এই বছরেই এগারোতে পা দিলো তার মানিক। অথচ হাবেভাবে এখনো কেমন যেন ছেলেমানুষ! আচরণে ওর সমবয়সীদের চেয়ে অনেক অন্যরকম। কারো সাথে ভালোভাবে কথাবার্তাও বলতে পারে না। কেমন যেন গুটিয়ে থাকতে চায় সারাক্ষণ।
লতিফা যে পাড়াতে থাকে, সেখানে বেশিরভাগই স্বল্প আয়ের লোকজন। তাদের কারো ছেলের সাথেই মানিক ভাব জমাতে পারে না। ওরা কতরকম খেলাধুলা করে! মানিককে কখনো সেসব খেলার আকর্ষণে আটকানো যায় না। সে কেমন যেন খেলতেই পারে না। বোঝেই না ঠিকমত কিছু।
সারাক্ষণ কেবল মায়ের আঁচল ধরে ঘুরাঘুরি। একমাত্র বোনটি তার চেয়ে বয়সে দুই বছরের ছোট। অথচ সেই মায়ের অনুপস্থিতিতে ভাইকে আগলে রাখে। এটা সেটা গল্প বলে শান্ত রাখে ভাইকে।
লতিফা তো আর সারাক্ষণ ছেলেকে আগলে বাসায় বসে থাকতে পারে না। তাকে কাজ করে খেতে হয়, তার বাচ্চাদের খাওয়াতে হয়। স্বামী তো পাঁচ বছর আগে দূর্ঘটনায় পা হারিয়ে বসে আছে। এখন আর ঠিকমত কথাবার্তাও বলতে পারে না। তবে নিজের কাজটুকু নিজে করতে পারে, এটাই যা রক্ষা। টাকা বাঁচিয়ে একটা হুইল চেয়ার কিনে দিয়েছে স্বামীকে। সেটার সাহায্যেই সে ঘরের এখানে ওখানে যায়। দরকারি কাজগুলো করে নেয়। ছেলেমেয়ে দুটোকেও চোখে চোখে রাখতে পারে।
খালাম্মার উছিলাতে আল্লাহ্‌ তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
লতিফার মা কাজ করতো উনার বাসায় যাকে সে খালাম্মা বলে ডাকে। মা ই তাকে একদিন তার খালাম্মার কাছে দিয়ে গিয়েছিল। তার স্বামী মোটামোটি আয় রোজগার খারাপ করতো না। কিন্তু হঠাৎ এক সড়ক দূর্ঘটনায় পা হারানোর পর থেকে লতিফা দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে মহা বিপদে পড়ে যায়। খালাম্মার কাছে কাজ শুরু করার পর থেকে সে যেন দিশা খুঁজে পায়।
তার খালাম্মা নিজেও অনেক কষ্ট করে তার সন্তানদের মানুষ করেছেন। কলেজে মাস্টারি করে তিনজন ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করেছেন। এত কামিয়াব করেছেন যে সেই ছেলেমেয়েদের জন্য আজ খালাম্মা অনেক বড় একটা পুরষ্কার পেতে যাচ্ছে। এসব কথা লতিফা তার খালাম্মার কাছ থেকেই শুনেছে।
চোখে মুখে চিকচিকে খুশির ঝিলিক তুলে তার খালাম্মা তাকে বলেছেন,
‘কাল একটু সকাল সকাল এসো লতিফা। বাসায় লোকজন আসতে পারে। তুমি দেরি করে এলে আমি একা সব সামাল দিতে পারবো না।’
লতিফা কথা দিয়েছিল, তার বাসায় যত কাজই থাকুক...আজ কিছুতেই সে দেরি করবে না। কিন্তু সেই কথা রাখতে পারলো কই?
মাঝে মাঝে ছেলেটাকে বেশ দু’ঘা লাগিয়ে দেয় লতিফা। গরীবের ছেলে! কোথায় একটু অল্পবয়সেই বুঝদার হয়ে উঠবে, তা নয়...বড়লোকের ছেলেপুলের মতো মিনমিনে স্বভাব। মাঝে মাঝে এত বিরক্ত করে যে কাজেও নিয়ে আসতে হয়। তাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে লতিফা কাজকর্ম করে।
তার খালাম্মা কেন যেন ছেলেটাকে মেরেছে শুনলে খুব রাগ করে। গম্ভীর হয়ে বলে,
‘ও লতিফা, তোমার এই ছেলেটা আর দশটা ছেলের মতো নয়। ও জন্মগতভাবে একটু অন্যরকম। ওকে মারধোর করলে কিন্তু হিতে বিপরীত হবে।’
এই অন্যরকম শুনেও গা করেনি লতিফা। ভেবেছিল, গরীবের ছেলের আবার অন্যরকম হওয়া কী না হওয়াই বা কী! সে কি আর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে নাকি?
খালাম্মা তখন তাকে বুঝিয়ে বলেছিল,
‘তোমার ছেলেটার মধ্যে একটা লুকানো অসুখ আছে। যেটাকে বলে অটিজম। অসুখ বলতে পারো, নাও বলতে পারো। এটা সেই রকম অসুখ নয়। তবে তোমার ভাগ্য ভালো, তোমার ছেলের মধ্যে এটা তেমন বেশি নয়। ওকে একটু ভালো ব্যবহার, ভালো আদব কায়দা দিয়ে ধীরে ধীরে বড় করতে হবে। তাহলে এটা তেমন কিছু আলাদা জিনিস বলে মনেই হবে না আর।’
লতিফার একটু ভয় লেগেছিল ঠিকই, তবু খালাম্মার আশ্বাসে সে আশ্বস্ত হয়েছে। না জেনে শুনে কিছু বলবে না খালাম্মা। হয়ত আসলেই এটা তেমন ভীষণ কিছু নয়। তবে ওর ছেলেটা একটু অন্যরকম, এটা সে বুঝতে পারে।
তবে তার মেয়েটা খুব কাজের হয়েছে। এই বয়সেই বাসার কাজকর্মে হাত লাগায়। তার অনুপস্থিতিতে সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে।
ছেলেমেয়ে দুটোকে পড়াতে পারে না লতিফা। এই দুঃখ কাঁটার মতো বুকে বিঁধে তার। স্বামী কর্মক্ষম থাকলে আজ নিশ্চয়ই সে তার বাচ্চাদুটোকে এভাবে না পড়িয়ে বসিয়ে রাখতো না।
কিন্তু ভাগ্যেই আছে ফুটো। তার আর কীই বা করার আছে!
থাক, পড়ালেই বা কী এমন হাতি ঘোড়া হবে! সে কি আর খালাম্মার মতো এমন পুরষ্কার পাবে? তার ছেলেমেয়ে একটু খেয়েপরে বেঁচে বর্তে থাকতে পারলেই সে খুশি।

তিন
রোকেয়া রহমান কাগজে খসখস করে কিছু একটু লিখে নিয়েই কাপড় পাল্টাতে বাথরুমে ঢুকে পড়লেন।
মেয়ে সীমা বারবার সামনে এসে বলে যাচ্ছে,
‘মা, প্লিজ এখন অন্তত রেডি হয়ে নাও। আর দেরি করলে তোমাকে তো বাসার শাড়ি পরেই রওয়ানা দিতে হবে!’
রোকেয়া রহমান তবু কিছু একটু লিখে নিয়েছেন। তাকে কিছু একটা বলতে বলা হবে আর তিনি হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকবেন, এটা তার বাসার শাড়ি পরে যাওয়ার থেকে কিছু কম লজ্জাজনক হবে না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলেন, লতিফা ব্যস্ত ভঙ্গিতে ঘর ঝাড়ু দিচ্ছে। মনটা একটু খারাপই হলো। রাগ করেই বললেন,
‘এই তোমার তাড়াতাড়ি আসা!’
লতিফা হড়বড়িয়ে বলে চললো,
‘খালাম্মা আইজ আমার পুলারে এমুন একটা মাইর দিছি! বজ্জাত পুলা! মায়ের শাড়ির খুঁট ধইরা থাকে। এরপর ধরবো বউয়ের আঁচলের খুঁট...’
রোকেয়া রহমান ত্রস্ত ভাবে বলে উঠলেন,
‘আচ্ছা আচ্ছা...ঠিক আছে। পরে শুনবো। তুমি বাসার কাজকর্ম সব সেরে রেখো। রাতের রান্নাটাও আজ করে দিও। আমাদের ফিরতে কিছু দেরি হতে পারে।’
বাসার চাবি লতিফার হাতে দিয়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বের হয়ে গেলেন রোকেয়া রহমান। লতিফাকে তিনি চোখ বুঁজে বিশ্বাস করেন। তার কোনো ক্ষতি লতিফা করবে এটা তিনি কখনোই মনে করেন না।
লতিফা তার প্রতি খালাম্মার এই আস্থাটাকে নষ্ট হতে দেয় না। আস্থাটাকে সে সযত্নে বাঁচিয়ে রাখে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার আগেই খালাম্মারা ফিরে আসে। তিন ছেলেমেয়ের ঝলমলে মুখ আর রোকেয়া রহমানের গর্ব চিকচিকে প্রশান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে বুক ভেদ করে একটা শ্বাস বেরিয়ে আসে লতিফার। মনে মনে বলে,
‘আহা! কী সুখের দিন আজ খালাম্মার! পোলা মাইয়াগো মানুষের মতো মানুষ করবার পারলে আর কিছু লাগে নাকি?’
রোকেয়া রহমান লতিফাকে তখনো কাজ করতে দেখে বলেন,
‘সে কী! এখনো কাজ করছো!’
খালাম্মার হাতে কীসের যেন একটা সোনালি মূর্তি। লতিফা সেটার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘এইডা কি সোনার নাকি গো খালাম্মা?’
ছেলেমেয়েরা হেসে ওঠে। রোকেয়া রহমান বলেন,
‘সোনার না...তবে আমার কাছে সোনার চেয়েও দামি।’
লতিফা তার খালাম্মার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে মূর্তিটা হাতে নিয়ে দেখে। মা’র কোলে জড়িয়ে থাকা একটি শিশুর প্রতিকৃতি। নীচে খোদাই করে কিছু কথা লেখা। লতিফা অল্প একটু আধটু পড়তে শিখেছিল। বানান করে পড়ে সে। ‘র...ত্ন...গ...র...ভা মা... রোকে...য়া...রহমান।‘ অর্থাৎ তার খালাম্মা।

লতিফা খালাম্মার কাছে জিজ্ঞেস করেছিল,
‘রত্নগর্ভা মানে কী গো খালাম্মা?’
‘রত্নগর্ভা মানে হলো যে মা তার গর্ভে রত্ন ধারণ করেন!’
গায়ের রোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছিল লতিফার। কী সম্মানের কথা! ছেলেমেয়েদের জন্য যদি মানুষের কাছ থেকে এমন সম্মান পাওয়া যায়...এর চেয়ে আনন্দের আর কী হতে পারে?
সেদিন বাসায় গিয়ে ছেলেমেয়ে দুটোকে কাছে টেনে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে এই রত্নগর্ভা মায়ের পুরষ্কারের গল্প শুনিয়েছিল লতিফা। চোখ গোল গোল করে তার মেয়ে সুরমা জিজ্ঞেস করেছিল,
‘খালি পড়ালেখা করলেই রত্ন হওন যায় মা?’
লতিফা এই প্রশ্ন শুনে একটু ধাঁধায় পড়ে যায়। সাথে সাথে কোনো উত্তর যোগায় না তার মুখে। একটু ভেবেচিন্তে বলে,
‘তাই হইবো রে মা! লেখাপড়া না জানলে কি আর রতন হওয়ান যায়?
সুরমার মুখটা ছোট হয়ে যায়। মানিক অপলকে চেয়ে থাকে তার মা’র মুখের দিকে। সেও খুব মন দিয়ে শুনছিল তার মায়ের কথা। কিছু না ভেবেই সে ফস করে বলে বসে,
‘তাইলে আমাগো পড়াও নাই ক্যা?’
লতিফার মনটা একটু খারাপ হয়। সে কি অজান্তেই ছেলেমেয়ে দুটোকে কষ্ট দিয়ে ফেললো! তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ পালটিয়ে সে বলে,
‘আমার পোলামাইয়া এমনিতেই রতন। হ্যারা পড়লেই কী না পড়লেই কী! আমার মুখ বেবাক সময়েই ধলা। তগো লাইগা আমার মুখ কালা হইবো না কুনোদিন।
মানিক মায়ের এই কথা শুনে খুব মজা পায়। খিলখিল করে হেসে ওঠে।
সুরমা বুঝদারের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায়। তার ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসির রেখা ফুটে উঠতে গিয়েও মিলিয়ে যায়। মনে মনে সে বলে,
‘মায়ে যে কী কয়!’

চার
রত্নগর্ভা মা হওয়ার পনেরো বছর পার হয়ে গেছে।
রোকেয়া রহমান বয়সের ভারে কিছুটা বিপর্যস্ত। অল্পবয়সেই এত ঝড়ঝাপ্টা সামাল দিতে দিতে কিছুটা ক্লান্তও হয়ে পড়েছেন তিনি। আর তারচেয়েও বড় কথা, মানসিকভাবেও তিনি আজ একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছেন।
যে সন্তানেরা তাকে রত্নগর্ভা মা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল সমাজের কাছে, সেই সন্তানদের অনেক ব্যাপারই তিনি মেনে নিতে পারেননি। মেলাতে পারেননি অনেক হিসাব নিকাশ।
সন্তানেরা আজ সমাজে ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। নাম যশ খ্যাতি হয়েছে তাদের। প্রত্যেকেই তারা পিতা মাতাও হয়েছে। কিন্তু কোথায় যেন মস্ত একটা ফাঁকি থেকে গেছে। দূর থেকে সহজে চোখে পড়ে না। কিন্তু কাছাকাছি থাকলেই সেই ফাঁকি চোখ এড়ায় না। মস্ত বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু কেন? এই ফাঁকি তো থাকার কথা ছিল না!
রোকেয়া রহমান ভেবে পান না, তবে কি তার দেওয়া শিক্ষাতেই ভুল ছিল? তিনি কি কেবল সামাজিকভাবে কীভাবে বড় হওয়া যায়, সেই শিক্ষাটুকুই দিতে পেরেছিলেন তার ছেলেমেয়েকে? মানুষ হিসেবে প্রকৃত সার্থকতা কোথায়, সেটাই তো তার সন্তানেরা জানতে পারেনি!
বড়ছেলে শাহেদকে বিয়ে দিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন রোকেয়া রহমান। মেয়ে সীমার জন্যও পাত্র খুঁজছেন। ছোট ছেলে সাজেদ দেশের বাইরে যাওয়ার জন্য জি আর ই, টোফেল নিয়ে ব্যস্ত। ভালোই কাটছিল সময়।
কিন্তু আস্তে আস্তে সব কেমন পালটে যেতে শুরু করে।
বড় ছেলের সংসারে নতুন সদস্যও চলে এসেছে ততদিনে। তিনি দাদী হয়েছেন। শাহেদ দিনরাত অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তিনি ওদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে খুব বেশি ঢোকেন না। হয়ত কাজের ব্যস্ততা বেশি। ছেলেকে মানুষ করে তুলতে হবে। হয়ত সেজন্যই নিজের অবস্থানকে আরো বেশি মজবুত করতে চায় শাহেদ।
কিন্তু একদিন শাহেদের মোবাইলের একটা মেসেজে একেবারেই ভুলবশত চোখ চলে যায় তার। কীসের যেন টাকা পয়সার লেনদেনের হিসাব। সম্ভবত ঠিকাদার শ্রেনীর কেউ লিখেছে,
‘স্যার, আপনার অংশের পুরোটা আপনার একাউণ্টে ট্রান্সফার করে দিলাম। পুরো পঁচিশ লাখ আছে স্যার।’
মেসেজটা পড়ে চমকে উঠলেন রোকেয়া রহমান। সরকারী চাকরি করে পঁচিশ লাখ টাকার কীসের অংশ পায় শাহেদ?
একদিন হাল্কা চালে শাহেদের কাজ কর্মের একটু খোঁজ নিতে চেষ্টা করলেন রোকেয়া রহমান।
প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইলেও ধীরে ধীরে মায়ের খুঁটিনাটি অনেক প্রশ্নেরই আলটপকা উত্তর দিয়ে ফেলে শাহেদ। অনেক কিছুই জানতে পারেন রোকেয়া রহমান। এমনকি ছেলে যে এই অল্প সময়েই ঢাকা শহরে একটি ফ্ল্যাটের মালিকও হয়ে গেছে তাও জানতে পারলেন তিনি।
হয়ত আরো অনেক কিছুই আছে। কিন্তু আর জানার ইচ্ছে হয় না তার।
ছেলেমেয়ে যখন ছোট থাকে তখন তাদেরকে শাসন করা যায়। প্রয়োজনে গালে এক চড় মেরে বলা যায়,
‘কার জিনিস না বলে এনেছিস? এক্ষুনি দিয়ে আয় তাকে!’
কিন্তু সেই শাসনটাই বড় হয়ে গেলে আর করা যায় না। তখন তারা অনেক দূরের মানুষ হয়ে যায়। অনেক বুঝদার। অবুঝের মতো কথা তখন তারা শুনবে কেন?
মেয়েটাকে নিয়ে অনেক আশা ছিল রোকেয়া রহমানের। ডাক্তারি পেশায় ঢুকেছে। সেবাকে যেন সত্যিকারের মহান ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করতে পারে সেই আদর্শের বীজ মেয়ের মধ্যে ঢোকাতে চেয়েছেন সবসময়।
কিন্তু সেখানেও গলদ পেয়েছেন রোকেয়া রহমান। মেয়ে ক্লিনিক খুলে বসতে চায়। সরকারি চাকরি একটা করতে হয় বলে করা। কিন্তু আসল উন্নতি তো ক্লিনিক থেকেই।
ভাই-বোনের নৈতিকতা বর্জিত আলাপও শুনেছেন তিনি।
‘ওহ ভাইয়া, তোদের তো এক ঠিকাদারই মালদার বানিয়ে দেয় রে! একটা বড় কাজ হাতে পেলে আর কী লাগে?’
শাহেদ বোনকে চুরি শিখিয়ে দেওয়ার সুরে বলেছে,
‘কেন বেশি বেশি টেস্ট করতে দিবি। ডায়াগনোস্টিক সেণ্টারের সাথে ফিক্সড ডিল করে রাখবি। আর যে লাইনে আছিস...চাইলেই গণ্ডায় গণ্ডায় টেস্ট ধরিয়ে দিতে পারবি। রোগীর জীবনের মায়া আছে না? ডাক্তারের কথা ফেলতে পারবে? হা হা হা...’
স্তম্ভিত হয়ে ভাই বোনের আলাপচারিতা শুনেছেন রোকেয়া রহমান। এরা কি তার ছেলেমেয়ে? তার গর্ভে ধারণ করা রত্ন?
বুড়ো বয়সে ছোট ছেলে সাজেদের কাছে বেড়াতে গিয়েছিলেন।
ছেলের দম ফেলার সময় নেই। দিনরাত ব্যস্ত। মাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার ফুরসত তার নেই।
শীতের দেশে অসাবধানে ভালোরকম ঠান্ডা বাঁধিয়ে বসেন তিনি। আগে থেকেই তার ঠান্ডা লাগলে সহজে যেতে চায় না। প্রচণ্ড ভোগায়। এবারও ভোগান্তির চুড়ান্ত হলো। শেষমেষ নিউমোনিয়ার সিম্পটম দেখা দিতে শুরু করলো।
রোকেয়া রহমান ভেবেছিলেন, ছেলে এইবার অন্তত তাকে নিয়ে হাসপাতালে যাবে। অসুস্থ মাকে সময় না দেওয়ার মতো অমানুষ তার ছেলে নয়।
কিন্তু সেই আশাটুকুও একদিন নিভে গেল যেদিন শুনলেন ছেলে পাশের ঘরে তার স্ত্রীকে বলছে,
‘মাকে দেশে পাঠিয়ে দিই, কী বল? এখানে মায়ের নামে তো আর ইন্সুরেন্স করা নেই। অযথা এক গাদা টাকা নষ্ট হবে। তেমন কিছু তো আর হয়নি। সামান্য একটু ঠান্ডা লেগেছে। দেশে গিয়ে একটা এণ্টিবায়োটিকের কোর্স করলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
উত্তরে ছেলের বউ হয়ত কিছু বলেছিল, কিন্তু তা শোনার আর ইচ্ছে হয়নি রোকেয়া রহমানের। তার প্রত্যাশা নিজের ছেলের কাছে, অন্যের মেয়ে কী বলবে সেই আশায় তিনি কেন থাকবেন? সে যদি ভালো কিছুও বলে, তবু তা তাকে কোনো সান্তনা এনে দিতে পারবে না!
পরেরদিন নিজেই অসুস্থ শরীর নিয়ে ব্যাগ গোছাতে শুরু করেছেন রোকেয়া রহমান। ছেলেকে নিজের মুখে কিছু বলার কষ্ট আর দিতে চাননি তিনি। থাক, শুধু শুধু হয়ত তার ছেলেটা লজ্জা পাবে।
ছোটবেলায় একটু কিছু হলেই খুব লজ্জা পেয়ে যেত তার এই ছেলে। লজ্জায় মুখটাকে নামিয়ে আনতো একেবার থুতনীর কাছে। এখনো হয়ত একই অবস্থা হবে।
এয়ারপোর্টে ছেলের দিকে অনেকক্ষণ আনমনে তাকিয়ে ছিলেন রোকেয়া রহমান। মনে মনে ভাবছিলেন, ওর থুতনিটা কি একটু নীচে নেমেছে? দেখতে পাচ্ছেন না কেন?
চোখের ভুল হবে হয়ত। আজকাল চোখেও তেমন একটা ভালো দেখেন না।

পাঁচ
বড়ছেলে শাহেদ মাকে আলাদা বাসায় উঠতে অনেক নিষেধ করেছিল। এই বৃদ্ধ বয়সে মা কেন একা থাকবে?
কথা শোনেননি রোকেয়া রহমান। আর মায়ায় জড়াতে চাননি নিজেকে। প্রত্যাশার বাঁধনের প্যাঁচ বড় ঘোরালো। গায়ে দাগ কেটে বসে যায়। সেই দাগে শরীরে দগদগে ক্ষত হয়ে যায়। তিনি সহ্য করতে পারেন না।
ছোট একটা ফ্ল্যাটে গিয়ে বৃদ্ধা রোকেয়া রহমান উঠেছেন। ছেলের বাসার খুব কাছেই। তবু আলাদা বাস, নিজের মতো করে শেষ সময়ের নিঃশ্বাসগুলো ফেলে যাওয়া।
লতিফা কিন্তু তার খালাম্মাকে ফেলে যায়নি। সেও তার খালাম্মার সাথে সাথে এই বাসায় গিয়ে উঠেছে।
লতিফার স্বামী মারা গেছে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেকেও বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছে লতিফা। ছেলে অবশেষে মায়ের আঁচলের খুঁট ছেড়েছে, এটা ভেবে একরকম নিশ্চিন্তই ছিল লতিফা।
তার মানিক রাজমিস্ত্রির কাজ শিখেছে। রোজগার পাতি একেবারে খারাপ না। মানিকের বউ একদিন একটু ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছিল,
‘এই বাসাখান ছাইড়া দিয়া একটা ছোট বাসা নিলে ভালা হয়। এই বাসার ভাড়া দিতেই ত হাতে আর ট্যাকা থাকে না।’
মানিক তেজের সাথে ঝাঁঝিয়ে উঠেছে,
‘ছোট বাসা নিলে মায়ের কষ্ট হইবো না? মায়ের আলাদা ঘর লাগবো। ছোট বাসায় কষ্ট করবো ক্যা আমার মা? এদ্দিন কাম কইরা আমারে খাওয়াইছে না? ওহনো ত কাম করতাছে! তাও তুমার এত ট্যাকা দিয়া কী হইবো? গাছে ঝুলাই থুইবা নাকি বড়লোকগো লাগান ব্যাংকে থুইবা?’
মানিকের কথার ঝাঁঝে লতিফার মায়াই লাগে ছেলের বউয়ের জন্য। সে ছেলেকে শান্ত করে বলে,
‘বউ ঠিকই কইছে বাজান। দুইটা ট্যাকা বাঁচাইবার পারলে হেইডা খারাপ কিছু না।’
মানিকের তবু এক কথা। ছোট বাসায় তার মা’র কষ্ট হবে। সে ছোট বাসা নিবে না।
লতিফার মেয়ে সুরমা প্রতি সপ্তাহে মাকে দেখতে আসে। সবসময় কিছু না কিছু রান্না করে আনে মায়ের জন্য। মায়ের পছন্দের খাবার নিজে রান্না করে এনে মাকে খাওয়ায়।
লতিফা রাগ করে। বলে,
‘জামাই জানবার পারলে রাগ করবো না? তুই এগুলান আনিস ক্যা?’
মেয়ে সবচ্ছ হাসি দিয়ে বলে,
‘তুমার জামাইয়ের ট্যাকায় কিনি নাকি কিছু? আমি কাম কইরা জমাইয়া রাখি। হেইডা দিয়াই খরচ করছি। তুমি খাও...প্যাচাল বাদ দিয়া।’
এসব গল্প সে হাসতে হাসতে করে রোকেয়া রহমানের কাছে। তিনিও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু জিজ্ঞেস করেন।
‘লতিফা, তোমার ছেলেটা ভালোভাবে কাজ করে তো?’
‘খালাম্মা, কাম না করলে কি পয়সা পাইবো? গরীব মাইনষে কি লেখাপড়া জানে? হ্যাগো তো ভালোমতই কাম কাইজ করতে হইবো!’
রোকেয়া রহমান ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলেন।
‘হুম...তাই তো! লেখাপড়া জানলেই না ফাঁকি দেওয়ার রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়!’
রোকেয়া রহমানের এভাবে একা একা থাকার সিদ্ধান্তে লতিফা অবাক হয়ে গেছে। কত বয়স হয়ে গেছে খালাম্মার! এই বয়সে কেন এভাবে একা একা থাকবে খালাম্মা?
খালাম্মাকে জিজ্ঞেস করলে ভালো করে কিছুই বলে না। খালি হাসে।
খালাম্মার সেই পুরষ্কারের মূর্তিটা লতিফা এখনো নেড়েচেড়ে দেখে। প্রতিদিন যত্ন করে ধুলো ঝাড়ে।
একদিন রোকেয়া রহমান মূর্তিটাকে লতিফার হাতে দিয়ে বলেন,
‘এইটা তোরে দিলাম। তুই রেখে দে। নীচে আমার নাম লেখা আছে। মনে কর, ওটা আমার না...তোর নাম!’
লতিফা কিছুই বোঝে না। খালাম্মা কি ঠাট্টা করছে তার সাথে?
কিন্তু তা কী করে হয়! এমন নিষ্ঠুর ঠাট্টা খালাম্মা কখনো করতেই পারে না! কিন্তু এত আনন্দের পুরষ্কারটা খালাম্মা তাকে দিয়েই বা দেবেন কেন?
লতিফার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে চেয়ে রোকেয়া রহমান ধীরে ধীরে বলেন,
‘এটা আমার চেয়ে তোর কাছেই ভাল থাকবে রে লতিফা। আমি তো লোভী মানুষ...এটা পাওয়ার আশাতেই জীবন কাটিয়ে দিয়েছি। তাই এটা পেয়েছি ঠিকই।
কিন্তু তুই তো আমার মতো লোভী নস। তুই এটাকে যত্ন করে রাখিস, প্রতিদিন এটার ধুলো মুছিস। এটাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখিস। যদিও জানিস এটাকে তুই কোনোদিন পাবি না...তবু তোর স্বপ্ন ফুরোয় না।
আর এই স্বপ্ন শুধু তুই না...তোর ছেলেমেয়েরাও দেখে। তারা তাদের মাকে কখনোই এই পুরষ্কার এনে দিতে পারবে না এটা তারাও জানে। কিন্তু তারা এটাকে ছুঁতে চায়...এর কাছাকাছি যেতে চায়। মাকে এটা পাওয়ার সম্মানটুকু আস্বাদন করাতে চায়।
আমার ছেলেমেয়েরা তো একে ছুঁইয়েই ফেলেছে। তাই ওদের পথ চলা থেমে গেছে। কিন্তু তোর ছেলেমেয়েরা আজো এটাকে পাওয়ার আশায় ছুটে চলেছে।
আর...আমি জানি এখন...ওদের এই চলা কোনদিন থামবে না...’


advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement