লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৬৪টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঅস্থিরতা (জানুয়ারী ২০১৬)

মন মোর মেঘের সঙ্গী
অস্থিরতা

সংখ্যা

ফাহমিদা বারী

comment ৩৩  favorite ৪  import_contacts ২,৩৬৫
এক
সকাল থেকেই আজ আকাশের মুখ গোমড়া। সীমন্তিরও।
আর দু'দিন বাদেই সীমন্তির বিয়ে। আজ ছেলের বাসায় গায়ে হলুদ। পুরো বাড়ি জুড়ে হইচই, চেঁচামেচি আর প্রস্তুতির তোড়জোড়ে কান পাতা দায়।
বাড়ি ভর্তি আত্মীয়স্বজনে। দেশের বাড়ি থেকেই এসেছে প্রায় পনেরো-বিশ জন। দুই চাচা পরিবার নিয়ে গ্রামে থাকেন, দাদীও তাদের সাথে গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। নানা বাড়িও গ্রামে, সেখানে থাকেন এক মামা আর নানা-নানী। পরিবারের জীবিত সদস্যের তৃতীয় জেনারেশনের প্রথম বিয়ে। কারোরই উৎসাহ উদ্দীপনার কোন কমতি নেই। বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে পাঁচদিন আগে থেকেই। তারও পাঁচদিন আগে থেকে সবাই আসতে শুরু করেছে। তিলধারণের ঠাঁই নেই ঘরে। তুমুল ঠাসাঠাসি অবস্থা।
সীমন্তিরা ফ্ল্যাট বাসায় থাকে। ঢাকার লালমাটিয়ায় ২০০০ স্কয়্যার ফিটের বড় ফ্ল্যাট বাসা। সীমন্তির বিয়েতে আত্মীয় স্বজনরা সবাই বাসায় এসে থাকবেন এটা আগে থেকেই জানা। মার প্রস্তুতিও খারাপ ছিল না। নীলক্ষেতে গিয়ে আগেভাগেই এক্সট্রা বালিশ, তোষক আর কম্বলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। ভালোই শীত পড়েছে এই বছর। মেঝেতে গাদাগাদা করে ফ্লোরিং করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সীমন্তির দুই খালা ঢাকায় থাকেন। তারাও এসে সীমন্তিদের বাসায় থাকছেন। তাদের উৎসাহে একবিন্দু ভাটা পড়ছে না। বিয়ের যাবতীয় শপিং, মেয়ে সাজানোর জন্য আগে থেকেই পার্লার বুকিং দেয়া, তত্ত্ব সাজানো...নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নেই কারো। খালাতো বোনদের চেয়ে খালাদের উৎসাহই যেন বেশী। বিয়ের মৌসুম চলছে। অতএব আগে থেকেই পার্লারে বুকিং দিয়ে রাখতে হবে, এই অযুহাতে ঢাকার নামীদামী পার্লার গুলোতে ক'দিন চরকির মত ঘুরেছেন তারা। যারা গ্রাম থেকে এসেছে তাদের তো আর এ ব্যাপারে বক্তব্য দেওয়ার কিছু নেই। অতএব দুই খালা মহানন্দে মাতব্বরী করছেন। আর এই সুযোগে নিজেদের খোলনলচেও যতটা পালটে নেওয়া যায়, সে দিকেও তাদের সজাগ দৃষ্টি।
‘ সীমন্তি...সীমন্তি, মা, একটু দেখ্‌না, আমার চুলের এই নতুন কাটিংটা কেমন লাগছে? তোর খালু বলছিল, আমাকে নাকি আরো বুড়া বুড়া দেখাচ্ছে।’
‘কে বললো খালামণি, তোমার বয়স তো আরো দশ বছর কমে গিয়েছে। দারুণ চয়েস করেছো তো হেয়ার কাটিংটা।’
‘এ্যাই, সত্যি বল্‌ছিস তো? দ্যাখ্‌না তোর খালু শুধু শুধুই আমাকে ডিসহার্টেন্ড করার সুযোগ খোঁজে।’
ছোট খালাকে খুশী করে বিদায় দিতে না দিতেই বড়খালার হাঁকডাক শোনা গেল।
‘এই, তুই এমন পান্‌সে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিস কেন রে? মুখে উপ্‌টন লাগিয়ে বসে থাক্‌। চোখের নীচে বসা কেন? রাতে ঘুমাসনি?’
বড় চাচা গম্ভীরভাবে বাবাকে কিছু বোঝাচ্ছেন। বাবা চুপচাপ হুঁ হাঁ করে যাচ্ছেন। বাবা খুব ভয় পান তার বড় ভাইকে। ছোট চাচা আর মামা গেছেন কমিউনিটি সেন্টা্রে। শেষ মুহূর্তের তদারকি সেরে নিতে।
এত ঝক্কি ঝামেলার মাঝেও মা সীমন্তির ঘরটা ফাঁকা রেখেছিলেন। বিয়ের সময় মেয়েদের মনে যে ঝড় ওঠে তার মোকাবেলা করার জন্য কিছুটা ব্যক্তিগত আড়াল প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নিজের সাথে বোঝাপড়ার জন্যও তো কিছুটা সময় দরকার। সীমন্তি ভীষণ কৃতজ্ঞ বোধ করেছিল মার প্রতি। কিন্তু দাদী এসে প্রথমেই আপত্তি জানালেন সীমন্তির এই একা থাকা নিয়ে। মেয়েদের মনে এই সময় নাকি নানা বদ খেয়াল আসে। একা থাকলে দুষ্ট জীন এর নজরে পড়াও নাকি বিচিত্র কিছু না। অতএব সীমন্তির আর একা থাকা হলো না। মামাতো বোন ইরা এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। তুমুল উৎসাহে সে গেঁড়ে গেল সীমন্তির ঘরে। এত বাচাল মেয়ে সীমন্তি জন্মে দেখেনি। এই কয়দিনে প্যাঁচাল পেড়ে পেড়ে ওর মাথার পোকা বের করে দিয়েছে। তাদের গ্রামে মেয়েদের বিয়ের আগে কী কী অভিজ্ঞতা ঘটে, সেসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। কিছু গল্প আবার আদিরসাত্মকও বটে। সেই সব গল্প কিভাবে যে শুরু হয় আর কোথায় গিয়ে থামে সীমন্তি কূল-কিনারা পায় না কোন। অল্প ক'দিনেই সীমন্তি মাইগ্রেণের রোগী হয়ে গেল।
সীমন্তির ভাল লাগছে না কিছু। তার মনটা খোলা একটু বাতাসের ছোঁয়ার জন্য আঁকুপাঁকু করছে। পাশের ঘর থেকে মা’র ডাক শোনা গেল। মা ডাকছেন। সীমন্তি পাশের ঘরে ঢুকলো। মা বসে আছেন ঘরের এক কোণায়। মা'র মুখটা গম্ভীর, থমথমে। আকাশজোড়া কালো মেঘ যেন জায়গা বদল করে এক্ষুণি এসে ভর করেছে মা'র সারা মুখ জুড়ে।
'দরজাটা বন্ধ করে আয়।'
সীমন্তি চুপচাপ নির্দেশ পালন করে মার পাশে এসে বসল। মা আলগোছে সীমন্তির হাতটা ধরেন। চুপ করে ধরে রাখেন কিছুক্ষণ। মা যেন তার হাতের শুদ্ধতায় সীমন্তির জীবনের পোড়ামাটির দাগটুকু মুছে দিতে চাইছেন। সীমন্তি প্রাণভরে উপভোগ করে মা'র হাতের ছোঁয়া।
'মা, তুমি কি ভয় পাচ্ছো? আমি কিন্তু আগেই বলেছিলাম, আরেকটু ভেবে দেখো। পরে যদি কোন ঝামেলা হয়?!
'এখন পর্যন্ত তো কিছু করে নাই। দেখাই যাক না। তুই মুখটা এমন পাংশু করে রেখেছিস কেন? তোর দাদি এইমাত্র আমাকে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তোর কী হয়েছে। এভাবে থাকলে সবাই তো বুঝে ফেলবে। আজ বাদে কাল তোর বিয়ে। অথচ তোকে দেখে মনে হচ্ছে যেন তোকে আমরা সবাই মিলে পানিতে ফেলে দিচ্ছি।'
'মা, আমি বলি কী, অন্ততঃ বরপক্ষকে যদি আগে থেকে...'
'এসব নিয়ে তোকে একদম ভাবতে হবে না সীমন্তি। আমরা আছি তো! আমি, তোর বাবা...। এতদিন তো অনেক ভয়ে ভয়ে থেকেছি। আমরা কি এভাবেই তোর জীবনটা শেষ হতে দেখবো?'
'মা, আমি যদি আতিকের সাথে একবার একটু কথা বলে নিই?'
'না, সীমন্তি। একদম না। হুজুগের বশে কিচ্ছু করবি না।'
সীমন্তি চুপ করে যায়। ওর মনের ভেতরের ঝড়ো হাওয়া আরো জোরেশোরে বইতে থাকে। এর ঝাপ্টা সইতে পারার ক্ষমতা শেষপর্যন্ত থাকবে তো ওর?

দুই
সীমন্তিকে তার মনের সাথে বোঝাপড়া করার সময়টুকু দেওয়া যাক। আমরা বরং ঘুরে আসি ওর ফেলে আসা অতীতের দিনগুলো থেকে।
বাবা-মার একমাত্র সন্তানদের জীবনটা বুঝি এমনই হয়। বেশি আগ্রহ আর মনোযোগ পেতে পেতে একসময় মনোযোগ থেকেই পালিয়ে বেড়াতে ইচ্ছে করে। কেমন যেন এক আরোপিত নিঃসঙ্গতা পেয়ে বসে তাদের।
পনেরো-ষোল বছর বয়স পর্যন্ত সীমন্তির নিজস্ব ভূবন বলতে কিছুই ছিল না। বাবা-মা'র আদেশ, নিষেধ, অনুযোগ, চোখ রাঙ্গানো আবার একই সাথে অনেক বেশি আদর আর প্রশ্রয়ের ঘেরাটোপে আলগোছেই সীমন্তি হারিয়ে ফেলে তার শৈশব আর কৈশোরের একান্ত ভাবনাগুলোকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নিজের অপূর্ণতাগুলো যেন আসন গেড়ে বসে ওর মনে। সীমন্তি যেন হঠাৎ করেই বুঝতে পারে, ওর সমসাময়িক অন্যদের চেয়ে ও' অনেকটাই পিছিয়ে পড়া। সোজা বাংলায় 'খ্যাত'। সীমন্তির বান্ধবিরা একজন আরেকজনের বাসায় অনেকরাত পর্যন্ত আড্ডা মারে, দলবেঁধে পিকনিক করতে দূরে যায়। অথচ সীমন্তি কখনো বিকেলের পরে বাসার বাইরে থাকতে পারে না। বান্ধবীদের বাসায় একটু বেশি সময় কাটালে মা ফোন করতে করতে অস্থির করে মারে। সীমন্তি বুঝতে পারে, বান্ধবিরা আড়ালে ওকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা করে। সামনাসামনি ইয়ার্কি করতেও শুরু করে একসময়।
'কী রে, সীমন্তি! আজ যে একা এলি? আন্টি এগিয়ে দিলেন না?'
সীমন্তির খুব রাগ লাগে বাবা-মা'র ওপর। কান্না পায়। আচ্ছা, বাবা-মা কী মনে করে ওকে? ও কি এখনো বড় হয়নি?
কেমন যেন এক দূরত্ব চলে আসে বাবা-মা'র সাথে। বান্ধবিদের সাথেও সময় কাটাতে ভাল লাগে না। মনে হয়, সবাই যেন ওকে নিয়ে মজা করছে। অদ্ভূত এক জটিলতায় ভুগতে শুরু করে সীমন্তি। কারো সঙ্গ ভাল লাগে না। কাউকে সহ্য হয়না পর্যন্ত। সীমন্তির বাবা-মা ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। ডাক্তার, সাইকিয়াট্রিস্ট...একসময় তাবিজ-কবজ পর্যন্ত। কিছুই বাদ যায় না। সীমন্তি আস্তে আস্তে অন্যরকম হয়ে যেতে থাকে। হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল মেয়েটা কেমন যেন নির্জীব, ম্রীয়মান হয়ে যায়। সীমন্তির মা দিনরাত কেঁদে ভাসাতে থাকেন। বাবা মনমরা হয়ে ঘুরে বেড়ান। একমাত্র সন্তান তাদের। এমন কেন হয়ে গেল এই প্রশ্ন তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগলো।
ঘরের জানালা দিয়ে সীমন্তি একমনে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কী পরম নিশ্চিন্তে মেঘেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে! সবকিছু ছেড়েছুড়ে যদি ওদের সঙ্গী হওয়া যেত!
ওদের বাসার নীচে কিছু ছেলে রোজ আড্ডা মারে। দেখে মনে হয়, দুনিয়াতে আড্ডা মারা ছাড়া আর কোন কাজ নেই। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের পরে এটাই অন্যতম মৌলিক চাহিদা। সীমন্তিকে দেখে ছেলেগুলো হাঁ করে গিলতে থাকে ওকে। উঃ অসহ্য! আবারো সেই মনোযোগ। সীমন্তি সরে যায় জানালার পাশ থেকে।
এই আড্ডায় কিছুদিন যাবত নতুন একটা ছেলেকে দেখছে সীমন্তি। অন্য ছেলেগুলো যখন হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সীমন্তির দিকে, এই ছেলেটা তখন একেবারে নির্বিকার। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। জানালার পর্দা ফেলে দিয়ে সীমন্তি ফাঁক দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলেটাকে দেখে। ছেলেটা যেন ওরই মত। কোনকিছুর প্রতিই যেন কোন আকর্ষণ নেই। আড্ডাতেও তেমন একটা অংশগ্রহণ করে না। মাঝে মাঝে দু'একটা কথা বলে শুধু। আস্তে আস্তে সীমন্তি কেমন যেন একটা মায়া অনুভব করতে থাকে ছেলেটার প্রতি। আড্ডাবাজ ছেলেগুলো কখন আড্ডা মারতে আসে, সেটা জানে সীমন্তি। চোরা চোখে ছেলেটার উপস্থিতি দেখে নেয় সে। কোনদিন দেখতে না পেলেই কেমন যেন অস্থির লাগতে শুরু করে। একেবারেই নতুন একটা অনুভূতি। এটিই হয়তো সেই বিখ্যাত অনুভূতি, যার জন্য কবি-সাহিত্যিকরা দিস্তা দিস্তা কাগজের অপচয় করেছেন।
সীমন্তির ধীরে ধীরে নতুন করে সবকিছু ভাল লাগতে শুরু করে। গোপনে কবিতা লেখার অপচেষ্টাও করে ফেলে। আয়নায় নিজেকে দেখতে ভাল লাগে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন কোণ থেকে। ওয়ার্ড্রোবে জমিয়ে রাখা দামি জামাগুলোর হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে যায়।
সীমন্তির এই পরিবর্তনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন ওর বাবা-মা। যাক্‌ বাবা, কালোমেঘ সরে গেছে। আর চিন্তা নেই। সীমন্তি আবার স্বাভাবিক আচরণ করছে। সীমন্তির বাবা-মা তাদের নিজেদের আচরণেও কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসেন। অতিরিক্ত নজরদারিই যে সবকিছুর মূলে, সেটা দেরিতে হলেও তারা বুঝতে পেরেছেন।

সীমন্তি বাইরে যেতে চাইলে তারা সানন্দেই সম্মতি দেন, বেশিকিছু জিজ্ঞাসাও করেন না। মাঝে মাঝে ফিরতে একটু বেশিই দেরি হয়ে যায়। অহেতুক জিজ্ঞাসাবাদ করেন না আর। মেয়ের ওপর তারা বিশ্বাস করতে শিখেছেন।
মাস দুয়েক পরে এক সন্ধ্যাবেলায় তারা একটা ফোন পান। অপরিচিত এক নাম্বার থেকে। ফোনটা করেছেন একজন অপরিচিত ভদ্রমহিলা। তিনি যে খবরটা দিলেন, সেটি তাদের সারাজীবনের প্রাপ্তিকে একমুহূর্তেই অপ্রাপ্তিতে বদলে দেয়।
'আপনাদের মেয়ে সীমন্তির কোন খোঁজ-খবর কি আপনারা রাখেন না? সে কোথায় যায়, কী করে? আপনারা কি জানেন, সে যে গোপনে একটা ছেলের সাথে দিনমান ঘুরে বেড়ায়? এমনকি কলেজেও আসে না ঠিকমত? কেমন বাবা-মা আপনারা?!’
সীমন্তি'র মা'র হাত থেকে ফোনটা একটুর জন্য পড়ে যায় না। কোনমতে বলেন,
‘কিন্তু আপনি কে? এসব আপনি কী বলছেন আমার মেয়েকে নিয়ে? কোথা থেকে বলছেন আপনি?’
‘আমার খোঁজ না নিয়ে আপনার মেয়ের খোঁজ নিন। নইলে সারাজীবন পস্তাতে হবে কিন্তু।’
মহিলা ফোনটা রেখে দেন। সীমন্তির মা দিশেহারা হয়ে ফোন করেন ওর বাবাকে। অফিস থেকে বাসায় ছুটে আসেন সীমন্তির বাবা। সীমন্তির মোবাইলে ফোন দিতে থাকেন। ফোন বন্ধ। এই সময় ওর কলেজে থাকার কথা। কলেজে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, আজ দশ-বারোদিন যাবত সীমন্তি কলেজে আসছে না। বাকরূদ্ধ হয়ে বসে থাকেন দু’জন। কিছুই করার নাই। একবার ভাবেন, পুলিশষ্টেশনে যাবেন। কিন্তু মন সায় দেয় না। লোক জানাজানি হবে শুধু। বিকেল পর্যন্ত দেখা যাক।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়, সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত। তাদের অপেক্ষার প্রহর ফুরোয় না। শেষমেষ যখন পুলিশষ্টেশনে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াবেন, এমন সময় বেজে ওঠে ডোরবেল। সীমন্তি নির্বিকার মুখে ঘরে ঢোকে। ওর মুখে দেরিতে ফেরার কোন গ্লানিই নেই। যেন এটাই স্বাভাবিক।
‘কোথায় ছিলে সারাদিন?’ অনেকদিন পরে এই সুরে কথা বলেন সীমন্তির বাবা।
‘কোথায় আবার থাকবো? কলেজে ছিলাম। কলেজ থেকে স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। রাস্তায় জ্যাম ছিল, তাই ফিরতে দেরি হয়েছে।’
স্তম্ভিত মুখে দাঁড়িয়ে থাকেন সীমন্তির বাবা-মা। কী নির্বিকার মুখে মিথ্যে কথা বলছে সীমন্তি, তাদের মেয়ে?! কিছুক্ষণ মুখে কথা সরে না কারো। সীমন্তির বাবাই একসময় নীরবতা ভাঙেন,
‘তুমি কি আজ কলেজে গিয়েছিলে?’
উত্তরটা সীমন্তির ঠোঁটের কাছেই ছিল। কিন্তু বাবা’র মুখের দিকে চেয়ে যা বোঝার বুঝে ফেলে সে। তেজের সাথে বলে ওঠে,
‘ও, তোমরা আমার উপর গোয়েন্দাগিরি করছো! ঠিক আছে। করো যা খুশি! আমি কাল থেকে এই বাসাতেই থাকবো না।’
ধুপধাপ পা ফেলে চলে যায় সীমন্তি; পেছনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকা দুটি মানুষকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে।
এরপর থেকে একেবারেই অবাধ্য হয়ে ওঠে সীমন্তি। আচার-আচরণ, চলন-বলনে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক মেয়েতে পরিণত হয় সে। পড়াশুনার সাথে সম্পর্ক যেন একরকম চুকিয়েই দেয়। দিনরাত সাজ-গোজ আর মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায়। হুটহাট যখন তখন বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। কাউকে কিছু বলে যাওয়ারও আর কোন প্রয়োজন দেখে না সে। বাবা-মাকে সে জানিয়ে রাখে, তার জীবনটা একান্তই তার নিজস্ব। এখানে অন্য কারো মতামতের কোন গুরুত্ব নেই তার কাছে। তার ইচ্ছের পথে যদি বাধা দেওয়া হয়, তাহলে হয় সে বাসা ছেড়ে চলে যাবে নয়তো আত্মহত্যা করবে।
এরপর মেয়েকে কিছু বলার সাহসই হারিয়ে ফেলেন সীমন্তির বাবা-মা। ভবিতব্যের কাছে ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না তাদের।
এই অস্থির সময়ের মাঝেই একদিন এক বিকেলে সীমন্তি কিছুটা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে। সচরাচর এতটা তাড়াতাড়ি ফেরে না সে। নিজের ঘরের দরজা আটকে বসে থাকে। রাতে খেতেও আসে না। সীমন্তির মা অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কাধাক্কি করে শেষে হাল ছেড়ে দেন। রাত প্রায় দশটার দিকে সীমন্তি বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। চোখমুখ শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে, একদিনের মধ্যেই চোখের নীচে কালি জমেছে। কেমন যেন বিভ্রান্তের মত ভাব। সীমন্তি হঠাৎ ওর মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
এতদিনের এত ঝড়-ঝাপ্টা, গোলযোগের মাঝে সীমন্তির বাবা-মা হালই ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারা ধরেই নিয়েছিলেন, তাদের সন্তান আর কোনদিনই তাদের কাছে ফিরে আসবে না। তাদের রাগ, ক্ষোভ, জ্বালা সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল যেন। এই একটিমাত্র আবেগের কান্না তাদের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। নতুন করে তারা উপলব্ধি করলেন, সন্তানের ভুলকে ক্ষমা করে দেওয়াই বাবা-মা’র নিয়তি।
‘কী হয়েছে মা, কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে সোনা?’
‘মা, আমি খুব খারাপ। আমি খুব বাজে মেয়ে। আমার ভুলের কোন ক্ষমা নাই.........’
সীমন্তির মন জুড়ে বসে থাকা আড্ডার সেই নিস্পৃহ মুখের ছেলেটার সাথে সীমন্তি জড়িয়ে যায়। আষ্টেপৃষ্টে। সীমন্তি যা যা ভালোবাসে, ছেলেটা না চাইতেই তা হাজির করে। এত নিখুঁতভাবে কেউ কোনদিনই সীমন্তিকে বোঝেনি। ভালোবাসাময় উত্তাল দিন কাটাতে থাকে দু’জন। একেবারে বাঁধনহারা। সীমন্তির মনের বাঁধ ভেঙ্গে গিয়েছিল অনেক আগেই। তবুও মনের অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকা কিছু একটা যেন টেনে রেখেছিল অতলে হারিয়ে যাওয়া থেকে। সীমন্তি ছেলেটাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিল। কোন কারণই নেই অবিশ্বাস করার। আজকে দুপুরে বাইরে ঘুরতে যাবার নাম করে ছেলেটা তাকে একটা ফাঁকা বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। তারপর হঠাৎই খুলে ফেলেছিল তার মুখোশটা। সীমন্তির শতচেষ্টাও তাকে বাঁচাতে পারেনি নিজের অনেক দামি কিছু হারিয়ে যাওয়া থেকে।
‘এত সতি-সাবিত্রি ভাব দেখানোর কী আছে অ্যাঁ? এতদিন তো আমার টাকায় ঘুরতে, খেতে কোন সমস্যা ছিল না। আমার বাইকে চড়ে আমাকে জড়ায়ে ধরতেও কোন আপত্তি ছিল না। এতদিন ধরে যে এত খরচাপাতি করলাম, তুমি কী ভাবছো, সব এমনি এমনি? মাগনা? আজকের দিনটার জন্যই তো বাজি ধরেছিলাম বন্ধুদের সাথে যে এই মেয়েকে আমার কব্জায় নিয়ে তবে ছাড়বো। ইস্‌, কী ভাব! বড়লোকের মেয়ে কারো দিকে তাকায় না! যাও এখন। আমার মোবাইলে তোমার ভাবের ফাটা ইতিহাস থাকলো। দরকার মত ডাকলে যেন পাওয়া যায়। তা না হলে কী হবে তুমি ভালমতই জানো। ফেসবুকে এইসব ভিডিওক্লিপ দেখতে সবাই খুব পছন্দ করে, বুঝেছো?’
সীমন্তিরা ওদের আগের বাসাটা ছেড়ে অন্য পাড়ায় চলে যায়। মোবাইলের সীম ডিঅ্যাক্টিভেট করে ফেলে। ফেসবুকে্র অ্যাকাউণ্ট বন্ধ করে দেয়। এমনকি পুরনো কলেজটাও ছেড়ে দেয়। পুরনো সব বন্ধু-বান্ধবিদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তবু অস্থিরতা কাটে না সীমন্তির। সারাক্ষণ এক অজানা আতংকে কাটতে থাকে ওর দিনরাত। ফোনের আওয়াজে চমকে চমকে ওঠে। রাতে ঘুমাতে পারে না। ওর সবসময় মনে হতে থাকে, হয়তো ওর ভিডিওক্লিপটা ইন্টারনেটে আছে। কেউ না কেউ দেখছে।
ইন্টারমিডিয়েটে একটা বছর ড্রপ দেয় সীমন্তি। জীবনের খসে যাওয়া একটা বছরে অনেক কিছুই খসে যায় ওর জীবন থেকে। অহংকার, গর্ব, রাগ, জেদ...।
কে জানে! ভালোই হয়েছে হয়তো একদিক থেকে।

তিন
প্রেম ভালোবাসার পথও আর মাড়ায় না সীমন্তি। বাবা-মা'র আদরের সেই ছোট্ট সীমন্তি হয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে ঠিক করে। সময়ের সাথে সাথে সব ক্ষতই শুকিয়ে আসে। ফেলে আসা সাতটি বছরে সীমন্তির ক্ষতও প্রায় মিশে যায়। কিন্তু শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতেও দাগ রয়ে যায়। শত পরিচর্যাতেও যা পুরোপুরি হারায় না।
সীমন্তির বিয়ের এই প্রস্তাবটা আসে আতিকদের বাড়ি থেকেই। সফ্‌টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আতিক লন্ডনে থাকে। বিয়ে করতে তিন মাসের ছুটিতে দেশে এসেছে। সীমন্তিকে আতিকের বোন ভার্সিটিতে দেখেছে। তারপর মেয়েদেখা পর্বশেষে বিয়েতে শুভসমাপ্তি। বাইরে থাকা পাত্রের সাথে বিয়ে দিতে কখনোই ইচ্ছে ছিল না সীমন্তির বাবা-মা'র। একমাত্র মেয়েকে বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে তারা কী নিয়ে বাঁচবেন? কিন্তু মেয়ের ভালো চিন্তা করে তারা এখানেই বিয়ে দেওয়া ঠিক মনে করেন। এপর্যন্ত সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে সীমন্তির এই অস্থিরতা ভালো লাগে না তাদের। সবকিছু গোপন করে তারা কোন ভুল করছেন না তো? কিন্তু কী ই বলবেন তারা? এগুলো কি বলার মত কিছু? কোন পাত্রপক্ষ কি এসব শুনে বিয়েতে রাজি থাকবে যে, মেয়ে বিয়ের আগে একটা ছেলের সাথে...।
'মা, আমি কোন মিথ্যে নিয়ে আমার জীবন শুরু করতে চাই না। যার সাথে সারা জীবন কাটাবো, যে আমার দোষ-গুণ সবকিছুরই সঙ্গী হবে, সে আমার অপরিণত বয়সের একটা দোষ ক্ষমা করতে পারবে না? আমি একটা ভুল করেছিলাম, অনেক বড় ভুল। এই এতগুলো বছর ধরে আমি যার মাশুল গুনে চলেছি। কিন্তু আজ যদি আমি আমার ভেতরের এই অন্ধকারকে আলোর মুখ না দেখাই তাহলে হয়তো কোনদিনই আমার প্রায়শ্চিত্ত শেষ হবে না মা।'
'এগুলো কেউ মেনে নেয় না রে মা! কিছু কিছু দাগ নিজের মাঝেই লুকিয়ে রাখতে হয়। আর এটা জানার পরেও তোকে মেনে নেবে, এমন মানুষ তুই সহজে খুঁজে পাবি না।'
'তাহলে না হয় সেই মানুষকেই খুঁজবো বাকি জীবন।'
সীমন্তির মা অবাক হয়ে তাকান মেয়ের দিকে। সত্যিই তো! এভাবে তো তারা ভাবেননি। মেয়ের সুখের কথা ভেবে আবারো কি কোন ভুল করতে চলেছেন তারা?
অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বকে জয় করে মা সীমন্তির মাথায় হাত রাখেন।
নির্ভার হয় সীমন্তি। কালো মেঘগুলো সরে গিয়ে স্বচ্ছ পালকের মত ভেসে যাওয়া মেঘগুলো আবারো ঠাঁই নেয় মনের কোণে। সেই মেঘগুলোর সঙ্গী হতে আজ সীমন্তির কোন বাধাই আর নেই।।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement