লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৫৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftগভীরতা (সেপ্টেম্বর ২০১৫)

অন্ধকূপ
গভীরতা

সংখ্যা

মোট ভোট ২৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬৮

ফাহমিদা বারী

comment ১৪  favorite ২  import_contacts ২,০৯৯
এক
বাঁশঝাড়ের মাথায় বসে থাকা চড়ুই পাখি দুইটাকে একমনে দেখছিল রেশমা। নিজেদের ভাষায় কী যে কিচিরমিচির করে চলেছে পাখিদুইটা! ঝগড়া করছে না সোহাগ করছে কে জানে!
পাখিদের ভাষা বুঝতে পারলে খুব ভাল হত। আচ্ছা, ওদেরও কি সংসার আছে?
দুপুরবেলার এই সময়টাতে খুব একাকি লাগে তার। সেই কাকডাকা ভোর থেকে দিন শুরু হয়। সংসারের হাজারটা কাজ। শাশুড়ি বুড়ো মানুষ। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানান অসুখ-বিসুখ। বাতের ব্যথা, হাড় ক্ষয়, হাঁপানির টান...এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানারকম বাছ-বিচার। এটা খাওয়া যাবে না, ওটা ধরা যাবে না। ক্লান্ত লাগে রেশমার মাঝে মাঝে। নাওয়া খাওয়া সেরে পাড়ার বউ ঝিরা পাড়া বেড়াতে বেরোয়। প্রথম দিকে রেশমাও যেত তাদের সাথে। এখন আর ভাল্লাগে না। যেখানেই যাও, ঐ এক কথা, ‘ কিগো, তোমার কোল যে এখনো খালিই রইলো গো! আর কদ্দিন মা হবা!’
খুব নিষ্ঠুর মনে হয় সবাইকে। আশেপাশের সব কিছুকে। প্রত্যেকটি মানুষের চোখ শুধু তারই দিকে। যেন সে নিজে চাইছে না বলেই মা হতে পারছে না। ওর চাওয়াটাই যেন একমাত্র বাধা। একটা ছোট্ট শিশু কোল জুড়ে খেলা করবে, এটা ভাঙ্গবে ওটা ধরবে। ব্যতিব্যস্ত করে রাখবে ওকে...এই স্বপ্ন কে দেখে সারাটা দিন? মনের নিঝুম কোণে সবসময়ই সে শুনতে পায় একটা কচি কণ্ঠের ‘মা’ ডাক। আনচান করে ওঠে ভেতরটা।
কিন্তু কিছুই হল না। সেই কবে বউ হয়ে এসেছে এই বাড়িতে! সতের বছর বয়সে মাথায় আধহাত ঘোমটা টেনে ভয়ে ভয়ে যখন এ বাড়ির দুয়ারে পা রেখেছিল, কোন কিছুই ওর আপন ছিল না। স্বামী কম কথা বলার মানুষ। বিয়ের রাতে গুনে গুনে ক’টা কথা বলেছিল মনে আছে ওর। আর শাশড়িকে মনে হয়েছিল যেন অন্য জগতের কেউ। পা থেকে মাথা অব্‌দি জহুরীর চোখ নিয়ে দেখেছিল তাকে। গলায় পড়া সরু একগাছি চেন আর হাতের চিকন দুটো সোনার চুড়ি, কৃষক বাবার এতটুকুই সামর্থ্য ছিল। এটুকু জোগাড় করতেই জমি বন্ধক পড়েছিল মহাজনের কাছে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখেছিল শাশুড়ি। মুখে কিছু না বললেও চেহারার অসন্তোষ চাপা থাকেনি। শরীর স্বাস্থ্য নিয়েও খুব একটা সন্তুষ্টি ছিল না।
‘এত্ত দুবলা শরীর, বাপের বাড়িত কি খাওন ছিল না?’
এই সংসারটাকে আপন করে নিতে পারবে কিনা সন্দেহ ছিল মনের কোণে। বিয়ের দু’দিন বাদে স্বামী আজিজুর হাট থেকে নিয়ে এসেছিল লাল একটা ডুরে শাড়ি। বাসর রাতে গুনে বলা ক’টা কথার মাঝে একটা ছিল, ‘তোমার কি লাল শাড়ি আছে?’
শাড়িটা হাতে নিয়ে মনের মধ্যে আনন্দের ফুলকি ফুটেছিল। স্বামী ভালোবাসে তাকে। আজ এতগুলো বছরে অনেকবার মনে হয়েছে এই কথা। স্বামীর ভালোবাসায় সংসারের পাহাড়সম বাধাকে জয় করে ফেলা যায়। সেদিন ওর মনেও বিশ্বাস জেগেছিল, কোন বাধাকেই সামনে আসতে দেবে না। কিন্তু, কে জানতো ওর নিজের মাঝেই ঘাঁপটি মেরে আছে কত বড় বাধা!
বিয়ের বছর না ঘুরতেই শাশুড়ির এঁকেবেঁকে কথা বলা শুরু হয়ে যায়। অমুক বাড়ির নতুন বউএর কাল মাথা ঘুরে উঠল, তমুকের বউ বছর বছর পোয়াতি হয়...ইত্যাদি। এমনি করে একে একে তিন বছর যখন কেটে গেল, আকার ইঙ্গিত ছেড়ে আসল কথা পাড়লো শাশুড়ি।
‘ কি গা বউ, তুমার কি সমস্যা? আমার পুলা কি বাপ ডাক শুনবো না নি?’
লজ্জায় মাথা হেঁট হয় রেশমার। মুখে কথা জোগায় না। রেশমার স্বামী অনেকবার ওকে বিপদমুক্ত করে। মাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করে। ঘরে এসে মাথায় হাত বুলায় ক্রন্দনরতা স্ত্রীর। দিন চলে যায়। শেষমেষ রেশমা নিজেই একদিন কথাটা পাড়ে স্বামীর কাছে।
‘ চলেন না একদিন সদরে গিয়া ভাল ডাক্তার দেখাই।’
কথাটা ফেলে না আজিজুর। ওর নিজের মনেও এরকম একটা ইচ্ছে যে উঁকি দিচ্ছিল না তা নয়। অল্প-বিস্তর পড়াশুনা জানে সে। তাড়াতাড়ি চিকিৎসা করালে সমস্যা থাকলেও ঠিক হয়ে যায়। একদিন দুপুরের আগে দোকানের বিক্রি বাট্টা শেষ করে বউকে নিয়ে সদরে যায়। মায়ের কাছে গোপন রাখে বিষয়টা। সদর প্রায় কয়েক কিলো দূরের পথ। পুরো পথ একটা কথাও বলে না রেশমা। মনের মধ্যে ঘিরে থাকে হাজারো শঙ্কা, উদ্বেগ। না জানি কি বলে ডাক্তার!
ডাক্তার আপা অনেক সময় নিয়ে রেশমার সাথে কথা বলেন। কিছু পরীক্ষাও দেন। পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আরেকদিন আসতে বলেন। গ্রামে রেশমার স্বামীর একটা চালু মনোহারী দোকান আছে। বেচাকেনা বেশ ভাল। একাই সামলাতে হয় বলে ভালোই ধকল যায়। একদিন পুরোদিন দোকান বন্ধ রেখে রেশমাকে সদরে নিয়ে পরীক্ষাগুলো করিয়ে আনে রেশমার স্বামী। রিপোর্ট ভাল। কোন সমস্যা নেই। মা হতে কোন বাধাই নেই রেশমার। ডাক্তার রেশমাকে বলেন, তার স্বামীরও কিছু পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। কিন্তু এবারে বেঁকে বসে রেশমা। সমস্যা থাকলে তার থাকতে পারে, তার স্বামীর কোন সমস্যা নাই। ডাক্তারের অনেক বোঝানোতেও কাজ হয় না। রেশমা এ ব্যাপারে অনড়। আসলে সে তার ভালমানুষ স্বামীকে কোন আঘাত দিতে রাজি না। তার এক কথাতেই স্বামী তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছে। ওর নিজের না, স্বামীর সমস্যার কারণে বাচ্চা হচ্ছে না এই বাস্তবতা সে কিছুতেই মানতে রাজি না। এবং স্বামীকেও সে এই বাস্তবতার মুখোমুখি করতে চায় না কিছুতেই। তাছাড়া ওর দৃঢ় বিশ্বাস, সমস্যা যদি কিছু থেকে থাকে সেটা ওর নিজেরই।

দুই
ডাক্তার দেখানো হল। সমাধান আসলো না। বিষয়টা গোপনও থাকল না। শাশুড়ি কিভাবে যেন জেনে গেলেন। আসলে রেশমার পেট থেকে কিছু বের করতে তেমন কোন কৌশলই অবলম্বন করতে হয় না। কায়দা করে দু’চারটা কথার মারপ্যাঁচেই পেটের কথা টেনে আনা যায়। ওরা যে সেদিন সিনেমা দেখতে না, ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল সেটা রেশমা নিজেই শাশুড়ির কাছে কবুল করে ফেলল।
শাশুড়ি ধৈর্য্য ধরে আরো একবছর অপেক্ষা করলো। তারপর তার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে গেল। উঠতে বসতে ছেলেকে বিয়ের জন্য তাগাদা দেওয়া শুরু হল। এমনকি রেশমার সামনেই নতুন নতুন মেয়েদের ছবি এনে ছেলেকে দেখাতে লাগল। আজিজুর চুপচাপ কিছুদিন মায়ের এই পাগলামি সহ্য করলো। মার বয়স হয়েছে। একমাত্র ছেলে আজিজুর। ছেলের ঘরের সন্তান দেখার জন্য মার এই আকুলতা সে বুঝতে পারে। কিন্তু দিনকে দিন এই আকুলতা চরম আকার ধারণ করল। রেশমা দিনরাত চোখের পানি ফেলতে লাগল। আজিজুর অসহায় বোধ করে। মাকে সামলায় না বৌকে।
‘মা, ডাক্তার তো দেখাইছি। তুমার বউএর তো কোন দোষ নাই। হেরে আমি ঠকামু ক্যান? তাছাড়া আমারও তো দোষ থাকবার পারে।’
ফুঁসে উঠে শাশুড়ি,...’দ্যাখ আইজুর, বেশি বুঝনের কাম নাই। দুই পাতা এংরেজি পড়ছোস বইলা আমারে দুনিয়া চিনাস না। পুরুষমাইনসের কিসের দোষ? বাঞ্জা মাইয়্যামানুষ নিয়া সংসার করবি কর, আরেকখান বিয়া করতে তো কুনো অসুবিধা নাই।’
রেশমার জগত অন্ধকার হয়ে আসতে থাকে। এতদিন তাও একটা আশা ছিল। আস্তে আস্তে সেটাও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে আসে। কি করবে, কোথায় যাবে। কেমন করে চাইলে আল্লাহ্‌ তাকে একটা সন্তান দেবেন? ভেতরের আকুতিমাখা ফরিয়াদ কি তার কাছে পৌঁছায় না?

দিনে দিনে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেয় রেশমা। একই গৃহে থেকেও তারা তিনজন যেন তিন প্রান্তের মানুষ। কারো সাথেই কারো কোন যোগাযোগ নেই। দিনমান মুখ বন্ধ করে কাজ করে রেশমা। শাশুড়ি আর স্বামীর সকল চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করে। শাশুড়িও মুখ বন্ধ করে বসে থাকে। তার ভেতরের জ্বালা সে কাকে বোঝাবে? আজিজুর তার একমাত্র নাড়ি ছেড়া ধন। কত শখ করে সুন্দরী বউ ঘরে এনেছেন। তার বংশে বাতি জ্বালানোর কেউ থাকবে না? এই দিন দেখার জন্য কি তিনি জীবিত আছেন?
আজিজুরও অনেক বেলা করে ঘরে ফেরে। ঘরে ফিরতে মন চায় না। একটা শিশুর আকুতি যে তার মনেও নেই, তা নয়। কিন্তু সে নিজেকে বোঝাতে পারে। রেশমাকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছে অনেক। আল্লাহ্‌ সবাইকে সব কিছু দেন না। এটাই তার পরীক্ষা। সকলকে তিনি কোন না কোন একদিকে বিপদে ফেলে যাচাই করে নেন। কিন্তু রেশমা বুঝতে চায় না। নিজের চেয়েও স্বামীর কষ্ট যেন তার মনে বেশি করে বাজে। স্বামীকে সে বঞ্চিত করেছে।
‘ আমি একটা কথা কই। আমারে ভুল বুইঝেন না। আপনি আম্মার কথা মাইন্যা নেন। আমি তো আপনারে সন্তান দিবার পারলাম না।’
‘ আল্লাহ্‌ যদি আমার কপালে সন্তান না রাখেন, সেইটা আমারে মাইন্যা নিতে হইবো রেশমা। তুমিও মাইন্যা নাও। হাজার বিছরাইলেও কোন লাভ হইবো না। এইটাই তকদীর।’
রেশমা মানতে চায় না, মানতে পারে না। এত ভালমানুষ একজন স্বামী আল্লাহ্‌ তারে দিছেন, একটা সন্তান কেন তারে দিলেন না?!

তিন
রেশমা নানা দিকে খোঁজ নিতে শুরু করে। পাশের গ্রামের কোন এক হুজুরের দেয়া পানিপড়াতে নাকি বেশ কাজ হয়। গ্রামের দু’চারজন মহিলা নাকি সেই পানিপড়া খেয়ে গর্ভবতী হয়েছে। রেশমা একজনকে দিয়ে সেই পানিপড়া আনায়। তাবিজ,কবজ, ঝাড়ফুঁক কিছুই বাদ দেয় না। যে যা বলে, রেশমা নিয়ে আসে। যদি কোনটাতে কাজ হয়! সব কিছুই সে করে স্বামী আজিজুরের চোখ বাঁচিয়ে। আজিজুরের এসবে একেবারেই বিশ্বাস নাই। জানতে পারলে অনেক রাগ করবে। সবরকম কুসংস্কার থেকে মুক্ত তার স্বামী। সবসময় সে রেশমাকে বোঝায়,
‘রেশমা, আল্লাহ্‌র উপর বিশ্বাস রাখবা। আল্লাহ্‌ চাইলে কেউ ফিরাইয়া নিবার পারে না, আর আল্লাহ্‌ না চাইলে কেউ দিবার পারে না।’
ওদের গ্রামের কলিম শেখের বউ এক পীরের সন্ধান দেয়। পীরের সাথে সাক্ষাৎ করে আসতে হয়। পীর কিছু দোয়া পড়ে ফুঁক দিয়ে দেয়, আরো কিছু আছে যা সাক্ষাতে গেলে জানতে পারবে। একেবারে নাকি অব্যর্থ। এ পর্যন্ত কেউ নিরাশ হয়নি। রেশমা জানতে চায়, যাদের কাজ হয়েছে তারা কারা। তাদের সাথে কথা বলে গেলেই তো ভাল হয়। কলিম শেখের বউ চোখ রাঙ্গানি দিয়ে সাবধান করে দেয়।
‘বেশি জানাজানি করলে কাম হইবো না। এইসব কাম করন লাগে গুপনে।‘
রেশমা আর কথা বাড়ায় না। পীরের আস্তানা আরেক গ্রামে। প্রায় চার মাইল হাঁটা পথ। ভালোমত রাস্তা বুঝে নিয়ে একদিন ভোরে রওয়ানা দেয় সে গন্তব্যে। স্বামী আর শাশুড়িকে জানায় তার বাবা অসুস্থ। ওর বাপের বাড়ির একজন এসে খবর দিয়েছে। দেখা করেই দিনে দিনে ফিরে আসবে। আজিজুর রেশমার সাথে যেতে চায়। রেশমা এটা ওটা বলে স্বামীকে নিরস্ত করে।
পীরের আস্তানা মেলা দূর। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে রেশমা। ভোরে রওয়ানা হওয়াতে একটা সুবিধা হয়েছে। ওর গ্রাম পার হওয়ার সময় পরিচিত লোকের চোখে পড়তে হয় নাই। কাজটায় গোপনীয়তা বজায় না রাখলে ফল লাভ হয় না। পীরের আস্তানায় যখন পৌঁছল, সূর্য মধ্যাকাশে তীর্যক হেলে পড়েছে। রেশমা পথশ্রমে ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত।
পীরের আস্তানা কেমন যেন নিরিবিলি। খুব বেশি লোকজনের আনাগোনা নেই। বাঁশের বেড়া দেওয়া একটা ছাপড়া মত ঘর। উপরে পলিথিনের শীট বেছানো। ঘরের সামনে তিন চার পাটি স্যাণ্ডেল। রেশমা ভয়ে ভয়ে উঁকি দেয় ভেতরে।
চব্বিশ-পঁচিশ বছরের এক যুবক বের হয়ে আসে। জানতে চায় রেশমার আগমনের হেতু। ছেলেটা সব শুনে ভেতরে ঢোকে। বের হয়ে আসে অনেকটা সময় বাদে।
‘আপনি ভেতরে যান। সাথে কি কেউ আছে?’
‘জি না, আমি একা এসেছি।’
‘ভাল করেছেন। বাবা ভেতরে আছেন। আপনার কথা উনাকে বলেছি। যান, গিয়ে দেখা করুন।’
রেশমা ভেতরে ঢোকে। প্রথমে অন্ধকারে কিছুই ঠাহর হয় না। হাতড়ে হাতড়ে এগুতে থাকে সামনে। নাকে এসে লাগে ভীষণ উগ্র একটা গন্ধ। পেছন থেকে একটা হাত এসে ওর নাকে কিছু একটা চাপা দেয়। উগ্র সেই গন্ধের আবেশ স্থবির করে দেয় রেশমার স্নায়বিক অস্তিত্ব।
চার
প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে জেগে উঠে রেশমা। অসাড় হয়ে আছে শরীরের নীচের অংশ। মাথাটা একদম হালকা। সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাপড়-চোপড়। রেশমা হতবুদ্ধির মত এদিক ওদিক তাকায়। একটা ভারী কণ্ঠের আওয়াজে চমকে ওঠে সে,
‘ যাও মাইয়া, বাড়িত যাও। কাম হইয়া যাইবো, চিন্তা কইরো না। না হইলে আবার আইসো। হে হে, স্বামীর চিকিৎসা না করাইয়া সোজা এইখানে আইলে হইবো?...।‘
রেশমার কানে আর কিছু ঢোকে না। কোনমতে আব্রু ঢেকে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ায়। একদলা থুথু চলে আসে মুখে। সামনে কোথায় সেই থুথু ফেলবে বুঝতে পারে না। একবার ইচ্ছে করে নিজের শরীরেই ফেলে থুথু টা।
বাইরের অন্ধকার ভেদ করে রুদ্ধশ্বাসে ছুটতে থাকে রেশমা। কোথায় যাচ্ছে জানে না সে। তার স্বামী তাকে ভাগ্য মেনে নিতে বলেছিল। সে চায়নি মানতে। নিজের হাতে লিখতে চেয়েছিল নিজের ভাগ্য। নিজের গড়া সেই ভাগ্যকে আজ মেনে নিতে বাধা কোথায়?
কতক্ষণ দৌঁড়িয়েছে জানে না সে। ততক্ষণে ফুটতে শুরু করেছে দিনের আলো। সেই আলোতে রেশমা দেখতে পায় সে তার শশুড়বাড়ির গ্রামে চলে এসেছে। ঐ তো সামনেই দেখা যাচ্ছে মরা কূপটা। লোকে বলে ‘কানা কূয়া’। একসময় নাকি খুব গভীর ছিল। বড় পাথর ফেললে অনেকপরে আওয়াজ শোনা যেত। কালের চক্রে সেই কূপের পানি মরে গেছে, কিন্তু গভীরতা কমেনি।
রেশমা গিয়ে দাঁড়ায় সেই কূপের মাথায়। কত গভীর এই কূপ? ওর সন্তান চাওয়ার আকুতির চেয়েও কি বেশি এর গভীরতা?

পাঁচ
সেদিন সকাল বেলা রেশমাদের গ্রামে এক মহা হৈ হৈ শোনা গেল। একজন যুবতী মেয়ে কানাকূপে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। গ্রামের কয়েকজন জোয়ান ছেলে অনেক কষ্টে সেই লাশ উঠাতে পেরেছে। মাথা একেবারে থেঁতলে গেছে। চেহারা চেনার উপায় নেই। কেউ কেউ বলাবলি করছে, আজিজুরের বউ রেশমার সাথে গড়নে অনেক মিল।
আজিজুর সকাল সকাল বেরিয়েছে দোকানের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে লাশ নিয়ে হুলুস্থুল ওর কানেও গেল। রেশমা গতকাল ফেরার কথা বলেও ফেরেনাই। আজিজুরের মনের মধ্যে কিসের যেন কু ডাক দিচ্ছিল।
অজানা আশংকায় আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে সে কানাকূপের দিকে এগিয়ে যায়।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement