লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ২টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবিজয় (ডিসেম্বর ২০১৪)

“বিজয়” কি শুধুই যুদ্ধজয়...?
বিজয়

সংখ্যা

কোয়েল মণ্ডল

comment ১৮  favorite ২  import_contacts ১,০২১
সেই শিশুকাল থেকেই শিশুমনে এর বীজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে, “তোকে জিততেই হবে”। তখন হয়তো তার মনে জেতা কাকে বলে, জিতলে কি হয়, কি পাওয়া যায়; এসব প্রশ্নেরা বাসা বাঁধেনি। সেই অনুভুতিই হয়তো গড়ে ওঠেনি তখন। সরল শিশুমন তখন শুধু চায় একটু নিজের মতো বেড়ে উঠতে, আর সেই তখনই তার স্বাধীনতার হাতটা খপ করে ধ’রে তার নিজের বাবা-মা তার পা দুটোর এগিয়ে চলার দিক নির্বাচন করে ফেলেন। সেটা হয়তো যৌক্তিক দিক থেকে একদম সঠিক; কারণ ছোট বয়সে একটা ছোট বাচ্চার পক্ষে নিজের ভবিষ্যতের দিশা নির্বাচনের কাজটা খুবই কঠিন; যখন সে এই পৃথিবীর একদম নতুন সদস্য। সবেমাত্র সে এই পৃথিবীটাকে চিনছে, জানছে। কিন্তু নতুন একটা গাছ বেড়ে ওঠার পথপ্রদর্শক হাওয়ার নাম করে নিজেদের সখ-আল্লাদকে ওইটুকু একটা বাচ্চার মাথায় বোঝা স্বরূপ চাপানো কি ঠিক? ঠিক-বেঠিক, ভালো-মন্দ...বিষয়গুলো খুবই আপেক্ষিক জিনিস। তাই একটা সীমিত দুরত্ব পর্যন্ত বাচ্চার পাশে থেকে তারপর তার সামনে আসা জিনিসগুলোর ভিতর থেকে কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক; সেটা তাকেই বেছে নিতে দিননা। আপনার কাছে জেতার মানে যা আপনার বাচ্চার কাছে তো সেই একই অর্থ নাও হতে পারে। আপনি যে জায়গায় পৌঁছে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন; মনে করবেন এতদিনের কাঙ্খিত জায়গায় পৌঁছেছেন; সেই জায়গাটা বাচ্চার কাছে তাতোটা আনন্দদায়ক নাও হতে পারে। কিংবা হতে পারে এক্কেবারে মূল্যহীন। তার চেয়ে আপনার বাচ্চার সাথে বসে গল্পের ছলে জেনে নিন না ‘বিজয়’ মানে তার কাছে আসলে কি। কোন পথে হাঁটতে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। সেই পথের ঠিকানা জেনে নিয়ে আপনিই তার হাত ধরে সেই জায়গায় পৌঁছতে সাহায্য করুন না। সেটা করা কি খুব অসম্ভব?
আমার কাছে ‘বিজয়’ মানে কোণও যুদ্ধে জেতা নয়। বরং নিজেকে প্রমাণ করতে চাওয়ার একটা রসদ। ওই চাহিদাটাই তো আসল। আর এইটাই মানুষকে কখনো থামতে দেয়না। বলে “এগিয়ে চল”...“সামনের দিকে এগিয়ে চল”। যেকোনো প্রতিযোগিতায় তো বিজয়ীর স্থান একটাই; আমরা সেই জায়গায় পৌঁছতে পারি আবার নাও পৌঁছতে পারি। কিন্তু আমরা নিজেরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি; সেই জায়গাটাকে সবসময় আমাদের সম্মান দেওয়া উচিৎ। আর যেদিন সেই কাজে আমরা উত্তীর্ণ হব সেদিন আমরা নিজেরাই নিজেদের কাছে হব বিজয়ী। হ্যাঁ, আমি এটা কখনই অস্বীকার করতে পারবনা যে প্রতিযোগিতায় জেতাটাও যথেষ্ট জরুরি। কারণ কোণও জিনিস জেতার পরের অনুভুতিতা বড়ই আবেগপ্রবণ, একটা বিশেষ প্রাপ্তি। সবারই উচিত সেই আবেগটাকে বাঁচিয়ে রাখা। তারবদলে বিজিত ব্যক্তির আনন্দকে আর সকল প্রতিযোগীর মাঝে ভাগ করে দিয়ে সেই ‘বিশেষ’ প্রাপ্তিটাকে ‘সাধারণ’ করে দেওয়ার কোনোরকম মনোবাঞ্ছা আমার নেই। কিন্তু জন্মের পর মুহূর্ত থেকেই সকলকেই একনম্বরে পৌঁছতে হবে আর তবেই সে ‘বিজয়’এর স্বাদ পাবে; এটা এক অদৃশ্য ইঞ্জেক্সান মারফত যেন আমাদের শিরায় শিরায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। সেই জিনিষটা সত্যিই মানা যায়না। একথা তো ঠিক বিজিতের স্থানে বসার যৌক্তিকতা কেবলমাত্র একজনের, যে তার ক্ষমতা আর যোগ্যতার জোরে সেই স্থানটা অর্জন করে নেবে। তাই বলে বাকিরা বাঁচার মানে হারাবে এমনটা ভাবাও কিন্তু নিরর্থক। তারচেয়ে বিজয়ীকে সম্মান জানিয়ে, তার প্রতি কোনরকম নঞর্থক মানসিকতা না রেখে পরের প্রতিযোগিতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করাই কাম্য নয় কি? ‘বিজয়’ লাভে ব্যর্থ হয়েও নিজেকে সাধারণ না ভেবে জেতার ইচ্ছেটাকে ধিকিধিকি করে জ্বলতে দিয়ে উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষা করে দেখাই যাক না আমার চেষ্টা তার উপযুক্ত ফল দিল কিনা। কোন প্রতিযোগিতায় ‘বিজয়’ পাওয়াটাই এক এবং একমাত্র লক্ষ্য হতে পারেনা। ওটা হতে পারে মূল লক্ষ্য। মূল লক্ষ্যের পাশাপাশি আরও কিছু ছোটছোট লক্ষ্যও আছে জীবনে, সেগুলোকেও তো জানতে হবে নাকি! নাহলে যে জীবন-গাড়ির চাকা ‘বারোআনা’ অব্দি চলে আর এগোতেই চাইবেনা, আর বাকি পথ হয়ে যাবে কেমন অবাঞ্ছিত। যেমন...কোন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আমরা আমদের মূল্যায়ন করতে পারি। জানতে পারি যে, আমাদের অবস্থানটা আসলে কোথায়, ‘বিজয়’ থেকে আমরা ঠিক কতটা দূরে আছি। নিজে নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে সবচেয়ে আগে সচেতন হওয়া উচিৎ, আর উচিৎ সেটা যেমনই হোক তাকে তার মতো করে গ্রহণ করা। আমি কিন্তু মোটেও যারা বিজিত হয়নি তাদের কে সান্ত্বনা পুরস্কার দেওয়ার আশায় লিখতে বসিনি। বরং সেই সব মানুসগুলোর ভিতর যদি জেতার স্পৃহাটা কোনভাবে ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে সেই ঘুমন্ত স্পৃহাটাকে জাগিয়ে দেওয়াই আমার উদ্দেশ্য। ‘বিজয়’ প্রাপ্তির নেশা কখনও কাউকে হিংসাত্বক মনভাবাপন্ন করে দিতে পারেনা। ‘কোন কিছুতে জেতা’ তোমার পথপ্রদর্শক হতে পারে মাত্র; কিন্তু সেটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হলে তো খুব মুশকিল হয়ে যাবে। কারণ প্রতিটা মানুষের জীবনে জেতা ছাড়াও তো আরও কিছু মানে থাকে। সেগুলোকে বুঝে, তাদের গুরুত্ব বুঝে; তাদেরকে সাথে নিয়ে চলে জীবনের রাস্তাটা অতিক্রম করা; তবেই না বাঁচার স্বার্থকতা। সবাই সবসময় পয়লা নম্বরকে নিয়েই মাতামাতি করে; সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। সেই জেতার আলো গায়ে ফেলার জন্যই তো এত পরিশ্রম। কিন্তু তা বলে কি সেই সারির দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ স্থানাবলম্বী মানুষগুলোর পরিশ্রম যৎকিঞ্চিত আলো পাবে না? আলবাত পাবে। কোন প্রতিযোগিতার ‘বিজয়’ কিন্তু মানুষের জীবনকে চালনা করতে পারেনা। জীবনে জিত যেমন আছে তেমন হারকে কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারবনা। প্রতিমুহূর্তে যখন কেউ ‘বিজয়’-এর অধিকারী হচ্ছে ঠিক সেই মুহূর্তেই কিন্তু মুদ্রার অন্য পিঠে ‘পরাজয়’ কোন এক ব্যক্তির চোখে কান্না হয়ে ঝরছে; সেটাই পুরদস্তুর বাস্তব। এই দুটো দিককেই আমাদের সমানভাবে গ্রহণ করা উচিৎ। দুই পরিস্থিতির জন্য নিজের মনকে প্রস্তুত রাখাও খুব দরকার। কোন এক মানুষ কেবল জেতার জন্যই পৃথিবীতে এসেছে সেটা ভাবাও যেমন ঠিক নয়; তেমনই কোন এক মানুষের জন্ম হয়েছে শুধু পরাজয় দেখার জন্য এটা মনে করাও অযৌক্তিক। এপৃথিবীতে সবকিছুর অস্তিত্বই আছে। তাই প্রতিটা মানুষের চলার পথ কখনো হয় পর্বতের উঁচু শৃঙ্গ আবার কখনো হয় খাদের গভীরতা; কখনো বা সমতলের পাথর বাঁধানো রাস্তা। সেটাই জীবনের আসল সত্য। সেই উপলব্ধিতেই সে পায় প্রকৃত ‘বিজয়’-এর সন্ধান।

সময়ের টানে ছেলেবেলার স্কুলজীবনের সারল্য মেশানো সংকীর্ণ ঘেরাটোপ থেকে যত বেরিয়ে আসছি জীবন হচ্ছে আরও প্রশস্ত...আর জটিলতা এসে পা জড়িয়ে ধরছে। কিন্তু এই জটিলতার মারফতই জীবনের অনেক না মেলা অংকে মিলছে হিসেব, সামনের কুয়াশা ঢাকা পথে পড়ছে সূর্যের আলো; পথ হয়েছে পরিষ্কার। আর সেই প্রশস্ত পথের জটিলতা যেন জীবনকে আরও সহজ করেছে। সেই জতিলতার ভিড়ে নিজেকে হারিয়ে নিশ্চিন্তে নির্বিঘ্নে নিজের মনের মধ্যে জেতার স্বপনটাকে বাঁচিয়ে রাখাও সহজ হচ্ছে। এখানে আমায় কেউ দেখতে পাবে না, মঞ্চের জোরালো আলোটা এখানে আমার উপর কেউ ফেলতে পারবে না। কেউ হিসেবও রাখবে না আমি কোন প্রতিযোগিতায় জিতলাম আর কোনটায় ‘বিজয়’ এর স্বাদ থেকে হলাম বঞ্চিত। আগে কোথাও জিততে না পারলে অবশ্যই মন খারাপ লাগত; এখনো লাগে, আগামী দিনেও লাগবে। কিন্তু অতীতে আমার চারপাশের সমালোচনা, আমাকে নিয়ে চলতে থাকা চর্চার পাহাড়; আমার দুঃখের দিনগুলোকে করত আরও ‘কালো’। মোটকথা এখন আর কেউ অহেতুক সমালোচনা করে আমার বেড়ে ওঠার স্বতঃস্ফূর্ততাকে পা দিয়ে মাড়াবেনা। আমি স্বাধীনভাবে; খানিকটা হেঁটে, খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে আবার খানিকটা হেঁটে আমার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব। না, এটা কিন্তু মোটেও আমার আত্বজীবনী নয়। ‘বিজয়’ নিয়ে আমাকে লিখতে বলা হয়েছে, তা এবিষয়ে কোন গল্প এই মুহূর্তে ঠিক মাথায় আসছে না। গল্প বানানো যেত হয়তো, কিন্তু সেই গল্পের কাল্পনিকতার সাথে কতটা আত্মস্থ হতে পারতাম জানিনা। তারচেয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর চোখ রাখাই শ্রেয় বলে মনে হল। এই বিষয়টা আমার খুব পছন্দের, খুব কাছের একটা বিষয়। আর আমি যদি ভুল না হই তবে পৃথিবীতে প্রতিটা মানুষকেই এর সাথে মোকাবিলা করতে হয়েছে; কোন না কোন সময়ে। তার মানে বুঝে নিতে হয়েছে, রাতে স্বপ্নের ভিতর তার উঁকিমারা মুখটাকে দেখতে হয়েছে। আরে এই গোটা সমাজটাই তো প্রতিযোগিতায় ভরা। আর সেখানে ‘হার-জিত’ তো থাকবেই। অবাক লাগে এটা ভেবে যে, আমরা কিন্তু বলার সময় ‘জিত’-এর আগে ‘হার’ কে বসাই। কিন্তু জেতার পর কে যে হারল; তার দিকে খেয়ালও করিনা। পিঠ চাপড়ে বলি না...‘এবার নাহয়, পরের বার নিশ্চয়ই পারবে। তুমি শুধু লড়া ছেড়ো না’। কি জানি সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতার দাঁড়িপাল্লাতে মূল্যবিচার করা শেষ হয়েছে। আমরা বিজিতকে পেয়ে গেছি তাহলে পরাজিতের আর কি প্রয়োজন?সেটাই বুঝি সকলের মাথায় থাকে। জিতের মালা গলায় না পরাই; পরাজিতদের প্রতি আর একটু সহানুভূতিশীল কি হতে পারিনা আমরা? এতো প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে; পাশে কাউকে পেল কি পেল তার হিসেব না করে; যে নিজের উপর থেকে বিশ্বাস হারায়না, সে তার মুল্য একদিন ঠিকই পাবে। আমার কাছে সে’ই প্রকৃত জয়ী, আমি ‘বিজয়-মাল্য’ তার গলাতেই পরাতে চাই। জানি, এখনই আপনারা সমস্বরে বলে উঠবেন...(হয়তো মনে মনে), “ওর মালা পরানোয় কে যেন ধার ধারছে”। আরে মশাই আমার সে খেয়াল আছে। আমি যে অত্যন্ত সাধারণ একটা মেয়ে সেটা আমি মোটেও ভুলিনি আর ভুলতেও চাইনা। তবে কি বলুন তো, এই স্বাধীন ভারতে বাক স্বাধিনতা বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও আশা করি ‘চিন্তা করার’ স্বাধীনতা টুকু আছে। সেই স্বাধীন ‘চিন্তা’-র রঙে সাজিয়ে আমার পছন্দের প্রাথীটির গলায় জয়ের মালাটা নাহয় পরালামই। আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি, এখন দেশশুধু সকলে রাজনীতির ভাষা বোঝে, সেই ভাষাতেই কথা বলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। তাই ‘নির্বাচন’ শব্দটি যখন সকলের শিরায় শিরার মিশে গেছে, তখন মনে হল এই প্রসঙ্গের সাহায্য নিলেই হয়তো পাঠক মন বেশি আকৃষ্ট হবে। আসলে ‘বিজয়’ অর্জন করা যেমন পরিশ্রমের কাজ তেমনি ‘বিজয়’ প্রাপ্তির দিনগুলোকে ধরে রাখা তার থেকেও বেশি পরিশ্রমের। সেজন্যেই ‘বিজয়’ প্রাপ্তির আগের এবং পরের দিনগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে মুঠোবন্দী করার কৌশলটা রপ্ত করতে পারলেই পৃথিবীর মাটিতে নিজের অস্তিত্বকে দৃঢ় করার স্বপ্নে আরও বেশ কিছু পথ এগিয়ে যাওয়া যাবে। তখন তুমি ‘বিজয়’-এর হাতে হাত রেখে তোমার স্বপ্নকে বাস্তবের ক্যানভাসে ধরে রেখো। আর তাকে টাঙ্গিয়ো তোমার সামনের দেওয়ালে; দেখবে সারাজীবন সে তোমার কানে অনুপ্রেরণা হয়ে বাজবে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement