রবি ঠাকুরের শেষের কবিতায় লেখা ' কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল। প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দীঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে' এ লাইনটি তনুয়ার আজ বারবার পড়তে ইচ্ছে করছে। হুইল চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে শেষের কবিতা বইটি বুকের উপর রেখে চোখ বুজে লাইনটা আওড়াচ্ছে সে। ঠোটের কোনে ঝুলছে অতীতের ঘটনা মিশ্রিত ঘৃণা মাখা পাথরচাপা কষ্টের টুকরো হাসি। তার প্রাক্তন প্রেমিক বিশিষ্ট আইনজীবী শ্যামল মিত্র দীর্ঘ তিন বছর প্রেম করার পর যখনই জানতে পারলো তনুয়ার চলার শক্তি হুইল চেয়ারের কথা, অমনি হুইল চেয়ারের চাকার নিচে সমস্ত ভালোবাসা ঢেলে দিয়ে বলেছিল শেষের কবিতার সে লাইনটা। কৃত্রিম কান্না মাখা স্বরে কিছু মধুর বুলি; তনু তুমি লাবণ্যের মতো আমার জীবনে দীঘি হয়ে থাকবে আজীবন। তোমার মাঝেই আমার মন সাঁতার দেবে। আর যে আমার হবে, সে হবে কেতকীর মতো ঘড়ায় জল। তাকে প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। শ্যমল মিত্রের এ কথাগুলো কানে মধুর শোনালেও বুকের মধ্যে যে রক্তক্ষরণ হয়েছিল তার মাঝে এমন মিষ্টি কথার হাজারো প্রলেপ মাখালেও উপশম তো হবেইনা বরং কষ্ট আরো বাড়বে। শ্যামলের সেদিনের কথাগুলো কি আদৌ আবেগপূর্ণ ছিল নাকি শুধু অভিনয় ছিল তার প্রমাণ ঠিক একমাস পরেই পেয়েছিল তনুয়া। একসময় সেসব কথা ভেবে দু চোখে নোনাজল গড়াত। তার আজ প্রায় পাঁচ- পাঁচটি বসন্ত অতিক্রম করার পর সে কথা ভেবে মুচকি হাসি দেখা দেয় ঠোটের কোনে। যে চোখ বিরহের জলে ভরত, সে চোখে আজ ঘৃণার প্রচ্ছায়া ভেসে উঠে। তনুয়ার কাছে ভালোবাসাটা খুবই ঠুনকো বিষয়। তার প্রতি শ্যামলের যে অগাধ প্রেম, সীমাহীন ভালোবাসা তা তনুয়ার আজীবন সঙ্গী হুইল চেয়ারের চাকার নিচে নিমিষেই পিষ্ট হয়ে গেল। তনুয়ার অকাট্য যুক্তি; যে ভালোবাসা প্রকৃতির ঝড়- তাণ্ডবের কাছে চিরতরে পরাজিত হয় সেতো ঠুনকোই! ' শ্যামলদের ভালোবাসার চেয়ে আমার হুইল চেয়ার অনেক বড়। মনে মনে ভেবে হাসে তনুয়া। বই রেখে সোজা হয়ে উঠে বসে সে। পরিপূর্ণ দৃষ্টি রাখে তাকে বহনরত হুইল চেয়ারটির দিকে। একটি শারীরিক ভাবে অক্ষম মানুষকে চলার কাজে সাহায্য করছে এই প্রাণহীন চেয়ারটি। প্রায় অচল শরীরটাকে বহন করে দিব্যি চলছে নির্দেশ মতো। আর মানুষ! একজন মানুষের মনকে ও বহন করতে পারেনা! আজ অনেকদিন পর এটা ভেবে বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড়ে উঠল তনুয়ার। শ্যামল একজন শিক্ষিত পরিণত মানুষ হয়ে ও নির্মল সুন্দর মনটাকে একবার ও মূল্যায়ন করলনা! শুধু সচল সুন্দর শরীর দেখেই কী ভালোবাসা হয়? মন না থাকলে ভালোবাসা হয় কীভাবে? অবশ্য শ্যামল এ প্রশ্নের উত্তরগুলো তার আধো আধো উক্তিতে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। কোমল কণ্ঠে বলেছিল, তনু সোনা, একটা কথা কী জানো? মানুষ যা চায় তা সম্ভব হয়না। দেখো আমি তোমাকে আমার মতো চেয়েছিলাম, কিন্তু সেটা হয়তো কখনোই সম্ভব নয়। মধুর কণ্ঠের এ তিক্ত কথাগুলো সেদিন এ পঞ্চদশী কিশোরীর হৃদয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল প্রতিহিংসার দাবানল। অবশ্য এতে কোন অভিশাপের অগ্নি কিংবা কোন কষ্টের নির্মম যাতনা স্পর্শ করেনি আজকের একজন সফল আইনজীবী মি. শ্যামল সাহেবকে। প্রতিনিয়ত ন্যায়_ অন্যায়ের বিচার কার্যে লড়ে খ্যাতির শিখরে অবস্থান তার। এসব ভাবতে অসহ্য লাগে তনুয়ার কাছে। তারপর ও অসহনীয় চিন্তাগুলো উড়ে এসে জুড়ে বসে মনের ভিতরটায়। ঠিক সময় পকেটে রাখা মোবাইলটা চেঁচিয়ে উঠে তনুয়ার। মেজাজটা ভীষণ বিগড়ে গেল। এই যন্ত্রটাকে মহা বিরক্তিকর মনে হয় তার কাছে। অনিচ্ছা সত্ত্বে ও কলটা রিসিভ করে সে। কিছু বলার আগেই ওপাশের কণ্ঠটি বলে উঠে; তনুয়া, আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে। আপনাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি বিশ্বাস করুন! আপনাকে আমি ভালোবাসতে চাই নিজের মতো করে।..... উন্মাদের মতো কথাগুলো বলে ফেলে লোকটা। লোকটার এমন উন্মাদের মতো কথাগুলো শুনে বেশ হতবাক হয় সে। পর্ক্ষনে সব বুঝতে পারে। তাই লোকটার কথায় কোন প্রতি উত্তর দেয়না তনুয়া। মৃদু হেসে নীরবে ফোনের লাইনটা কেটে দেয়। অচেনা লোকটি 'শ্রদ্ধা' শব্দটি উচ্চারণ করতেই ভেসে উঠে আরেকটি ঝাপসা মুখ। একজন বিখ্যাত সাংবাদিক রাফি চৌধুরীর। লোকটা ও না দেখে উন্মাদের মতো ভালোবেসেছিল তনুয়াকে। কিন্তু কি একটা কথা প্রসঙ্গে সে স্পষ্ট ভাবেই বলেছিল, কোন অসম্পূর্ণরা নারীকে আমি কখনোই ভালোবাসার মিথ্যে আশ্বাস দিতে পারবোনা. প্রেমের অভিনয় করতে পারবনা তার সাথে। ভালো ও বাসবনা.... ইত্যাদি ইত্যাদি..। লোকটার এমন স্পষ্টবাদিতা আর আরো কিছু গুন তনুয়ার মনে এনে দিয়েছিল অগাধ শ্রদ্ধা। কিন্তু..! তারপরও সব জেনে শুনে ভালোবেসেছিল লোকটা। হয়তোবা সঠিক মানবতার পরিচয় দিতে গিয়ে নিজের অজান্তে তার প্রতি জমে উঠা তনুয়ার সেই শ্রদ্ধার আঁতে কুড়ালের ঘাঁ মেরেছিল। তাতে অবশ্য রাফিকে এ ব্যাপারে কোনরূপ দোষারোপ করেনা সে। সবকিছুকে নিয়তির পরিহাস এবং আবেগের বশে করে ফেলা অপ্রত্যাশিত ভুল বলেই মেনে নিয়েছে তনুয়া। একসময় মাঝে মাঝে ইচ্ছে হতো সবার মতো একটি সুন্দর সংসার গোছাতে। কাওকে মনে প্রাণে ভালোবাসতে, একান্তে নিবিড় ভাবে সবকিছু তাকে সঁপে দিতে। কিন্তু কারো হাতের পুতুল কিংবা করুণার পাত্রী হতে চায়নি সে। তিল তিল করে কষ্ট সয়েছে। কষ্টে কষ্টে নষ্ট করেছে কাওকে অকৃত্রিম ভাবে ভালোবাসার নির্মল মানসিকতাকে। আর কিছু ভাবেনা তনুয়া। চোখের সামনে মেলে ধরে শেষের কবিতা বইটি। বইটা খুলতেই চোখে পড়ে সেই লাইনটা...। আরেকটিবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে লেখাগুলো। যৌবনের প্রায় নিভু নিভু দ্বার প্রান্তে এসে ও সেই কৈশোরের আবেগগুলো নাড়া দিচ্ছে মনকে। লেখাগুলো যতোই পড়ছে চোখ দুটো কেমন যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে উঠছে। হৃদয় নিংড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে এতদিনের চেপে রাখা বরফ জমাট বেদনাগুলো। শ্যামল, রাফি কারো জন্য আজ তার হৃদয়ে এতোটুকু ভালোবাসা উচ্ছিষ্ট নেই, আছে শুধু ঘৃণা। কিন্তু ঘৃণার যন্ত্রণা ভালোবাসার চেয়ে ও যে কষ্টকর সেটা হাড়ে হাড়ে টের পায় সে। চাওয়া পাওয়ার হিসেব কষলে পাওয়ার পাল্লাটাই ভারী তার জীবনে। কিন্তু অপূর্ণতার গহ্বরে সে পাওয়া কেবলই ছিটেফোঁটা মাত্র। জীবনের এই অপূর্ণতার কারণেই কী অন্য দশটা মেয়ের মতো ঘর বাধা হয়নি তার! নাকি সে চায়নি! কখনোবা একটা যুক্তি এসব প্রশ্নের সন্মুখে দাড় করায় তনুয়ার বিবেকের কাছে। কেউ যদি মনে প্রাণে তোমাকে পেতে চায় সেটা সম্ভব নয়। যুক্তির কাছে থুড়ি মেরে চাঁপা গর্জে উঠে তনুয়া। কেন? ' আজকাল কোন অকৃত্রিম ভালোবাসা নেই তনুয়া! এখন যে সবাই শারীরিক ভালোবাসাতেই বিশ্বাসী। এখন প্রায় প্রত্যেকটি ছেলেই চাইবে একটি মেয়েকে নিয়ে ভালোবাসা নামের নোংরা খেলায় মেতে উঠতে। এমন কাওকে পাবেনা যে সত্যিকারের ভালোবেসে কাছে টানতে জানে। যার কাছে মনটাই বড়, ভালোবাসাটাই বড়। যে সমস্ত বাধা বিপত্তি, পিছুটান ডিঙ্গিয়ে তার প্রিয় মানুষটির কাছে ছুটে আসতে পারে। হৃদয়ের কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনি হয়ে বাজছে তনুয়ার কানে। হঠাৎ মেঘের গর্জনে চমকে উঠে তনুয়া। আচমকা ঝড়ো বাতাসে তনুয়ার হুইল চেয়ারটা দুলে উঠল। মুহূর্তেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। এক অদৃশ্য ভালোলাগার টানে তনুয়া জানালার পাশে চলে আসে। জানালার পরিচ্ছন্ন শার্সি বেয়ে পড়ছে বৃষ্টির জল। বৃষ্টি দেখতে ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে তনুয়ার। দ্রুতগতিতে হুইল চেয়ার চালিয়ে খোলা বেলকনিতে চলে আসে সে। বড় বড় বৃষ্টির ফোটা ভিজিয়ে দিচ্ছে তনুয়াকে। দূর হতে কোথাও চুরুটের বিশ্রী গন্ধ আসছে। ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে গন্ধটা। অসহ্য গন্ধটা খুবই বিরক্ত লাগছে তার। হঠাৎ মনে হল তার কাছাকাছি কোথাও বসে চুরুট টানছে শ্যামল। কোন এক ঝুম বৃষ্টির মুহূর্তে শ্যামল বলেছিল, তনুয়া এই ঝুম বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হবে হয়তো আমাদের অনাগত ভবিষ্যতের......। দুচোখ বুজে কষ্টগুলো দমকা হাওয়ায় উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে সে। চুরুটের গন্ধটা আস্তে আস্তে হালকা হয়ে আসছে। বৃষ্টির ছন্দে হারিয়ে যাচ্ছে শ্যামলের অভিনয়ের প্রতিটি সংলাপ। বৃষ্টি ভেজা দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকায় তনুয়া। মাটির কাদার সাথে মিশে নদীর মোহনায় ছুটছে বারিধারা। সেই সাথে মুছে যাচ্ছে তনুয়ার ভালোবাসা আর জমাট বাঁধা টুকরো ঘৃণার কদর্য যন্ত্রণা.....।