প্রার্থিত প্রজন্ম

কোমল সংখ্যা

মনজুরুল ইসলাম
  • ১৮
  • ১৩
  • ২৭
এক
সময়টি ভরা বসন্তের। ভোরের কুয়াশা কেটে গেছে। সূর্য কেবলই উঠেছে। পাখিরা শব্দে মাতিয়ে রেখেছে প্রকৃতিকে। মাঝে মাঝে দু’একটি কাকও উড়োউড়ি করছে। মূল রাস্তায় কিছু লোককে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি বাড়ীর সামনে দলবদ্ধ ছাগল দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার মাঝেই ছোট বড় মুরগী ছুটোছুটি করছে। ধীরলয়ে দু’একটি কুকুর হাঁটছে, নিয়মিত বিরতিতে ডেকেও উঠছে। একটি দোকানও খোলেনি এখনও। এটিই বটতলা গ্রামের সকাল বেলার পরিচিত দৃশ্য। শুভগাঁ শহরের অদূরেই গ্রামটি। এ গ্রামেই সূর্যদের বাড়ী। বাড়ীটি তিনতলা। দোতলায় থাকে সূর্যরা। বাকী দুই তলায় ভাড়াটে। বাড়ীটির চারপাশ জুড়ে বিস্তৃত বাগান। নানা প্রজাতির পুষ্প দ্বারা আচ্ছাদিত বাগানটি। পরিচর্যা করেন সূর্যের বাবা। শুভগাঁ শহরের নামকরা ব্যবসায়ী। শিক্ষিত। চাকরিও করেছিলেন কিছুদিন, চট্টগ্রাম রেলওয়েতে। বাবামায়ের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত ছাড়তে হয়েছিল চাকরিটি। বিপুল সম্পত্তির মালিক ছিলেন তার বাবা। পরিবারের কেউই বেঁচে নেই আজ। একমাত্র বড়বোনও গত হয়েছেন কিছুদিন পূর্বে। বয়স পঞ্চাশের উর্ধ্বে নয়। মাঝারি, স্থুল, কালো বর্ণের। একটি চুলও পাকে নি। তবে মাথার মাঝখানে একটি ছোট্ট টাক রয়েছে। বাকী অংশটুকু ঘন চুল দ্বারা পরিপূর্ণ। ক্লিন সেভ করেন সবসময়। ভ্রু এবং গোঁফ ভীষণ পুরু। দু’ভ্রুর পাশের মাংসগুলো ফাঁপা। ঠোঁট দুটি অত্যন্ত কালো। বোঝাই যায়, তিনি একজন চেইন স্মোকার। দাঁতগুলি মুক্তোর দানার মতো উজ্জ্বল। হাসলে সেই উজ্জ্বলতা আরো ফুটে উঠে। প্রথম দৃষ্টিতে যে কারুরই তাকে বদমেজাজী মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তিনি তেমনটি নন। উদার হৃদয়ের ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত বটতলা গ্রামে। বিপদে পড়লে কমবেশী সবাই তার শরণাপন্ন হন। তিনিও কাউকে বিমুখ করেন না।
উজ্জ্বল সাদা রঙের ট্রাউজার ও সবুজ টি-শার্ট পড়েছেন। হাতঘড়িটি বেশ মানিয়েছে। ঘড়িটি সাদা ও ভারী। গত বছর শিলিগুড়ি থেকে এনেছিলেন। প্রতি বছরই ইন্ডিয়া যান, ব্যবসার প্রয়োজনে। মাংসল হাতে পাইপ নিয়ে পানি দিচ্ছেন ফুলের গাছে। হাতের রগগুলি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাড়ীভর্তি কাজের লোক, তবুও পানি দেয়ার কাজটি তিনিই করেন। দীর্ঘদিনের অভ্যোস। তাছাড়া এতেই তিনি প্রশান্তি বোধ করেন। ধারাবাহিকভাবে পানি দিতেই থাকলেন। বাগানের প্রস্ফুটিত ফুলগুলি অবলীলায় তার চোখ জুড়িয়ে দিচ্ছে। পানি দেবার এক পর্যায়ে ভবনটির পেছনে এলেন। এসেই থমকে দাঁড়ালেন। দৃষ্টি পড়লো কালো গোলাপের নীচে বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকা কাগজের টুকরোগুলির উপর। কৌতূহলবশত চোখ তুললেন। গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন দোতলার বারান্দায়। কাউকেই দেখতে পেলেন না। পড়ে থাকা কাগজের টুকরোগুলি হাতে নিলেন। যা আশঙ্কা করেছিলেন তাই- কাগজগুলি পড়বার পর নিশ্চিত হলেন। মুহূর্তেই গত রাতের ঘটনা তার স্মৃতিতে ভেসে উঠলো। অস্থিরতা গভীরভাবে আচ্ছন্ন করতে থাকলো তাকে। কপালের রেখাগুলিও দ্রুতই ভাঁজ হয়ে এলো। কখন যে হাত থেকে পাইপটি পড়ে গেছে, লক্ষই করেন নি। পাইপ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়তেই থাকলো। অনবরত পায়চারি করতে থাকলেন তিনি। পায়চারি শেষে মূল ফটক পেরিয়ে রাস্তায় এলেন।
রাস্তাই পাশেই দোকান থেকে সিগারেট নিলেন। দ্রুততার সাথে একটি জ্বালালেন। অনবরত টানতেই থাকলেন। বাড়ীর ভেতর কখনই ধূমপান করেন না তিনি, সন্তানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে এই ভেবে। উত্তেজিত হলেই সিগারেটের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। ইতোমধ্যে একটি শেষ করে আরো একটি ধরিয়েছেন। কিন্তু কোনোভাবেই স্থির রাখতে পারছেন না নিজেকে। শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠছে। হাতঘড়িটির দিকে তাঁকাতেই চমকে উঠলেন। দশটা বাজতে কয়েক মিনিট বাকী। আজ ছেলের প্রথম পরীক্ষা।
দ্রুত মূল গেট পেরিয়ে বাড়ীতে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করেই দেখতে পেলেন ছেলেকে। পাশে তার মা। মধ্যবয়সী, মার্জিত। কালো ফ্রেমের চিকন চশমা সেই মার্জিত ভাবটিকে আরো বৃদ্ধি করেছে। মেরুণ রঙের শাড়ীর সাথে ম্যাচ করে চাদর গায়ে জড়িয়েছেন। ডান হাতের হ্যান্ড ব্যাগটিও একই রঙের। সাথে দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ীর লোকজনসহ ভাড়াটে। সবাই সূর্যকে পরামর্শ দিচ্ছেন পরীক্ষা বিষয়ে। কারো দেখাদেখি করা যাবে না, খাতায় কাটাকাটি করা যাবে না, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে ইত্যাদি। আর অপেক্ষা করছিলেন তার আগমনের প্রতীক্ষায়। নীল রঙের মিনি প্রাইভেট কারটিও প্রস্তুত হয়ে আছে। ড্রাইভার বসে আছেন গাড়ীতেই। একমাত্র সন্তানকে দেখার পর হাঁটার গতি কমে এলো বাবার। ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন তিনি ছেলের কাছে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখতে থাকলেন নিষ্পাপ পুত্রের। এক পর্যায়ে দু’হাত প্রসারিত করে জড়িয়ে ধরলেন তাকে। জড়িয়ে ধরার পরপরই কেঁদে ফেললেন। কাঁদতে থাকলেন অঝোর ধারায়। এমন দৃশ্য অভাবিত। পুত্র ও সন্তানের দিকে নির্নিমেষ তাকালেন সবাই। বিষয়টি অবাক করলো তাদেরকে। সূর্যের মাও অনুমান করতে পারলেন না মূল কারণটি।
দু’হাত দিয়ে সন্তানের মাথায় হাত বুলাতে থাকলেন বাবা। মুখের দিকেও নিমগ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। এদিকে পরীক্ষার সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। বুঝতে পারলেন তিনি। অনেক কষ্টে অশ্রু থামালেন। ছেলেকে আবারও কাছে টেনে নিলেন। চওড়া কপালে একটি চুমু দিলেন। অতঃপর বিদায় জানালেন। ‘নাস্তা করে বিশ্রাম নিও, এসে কথা হবে।’-বলেই গাড়ীতে উঠলেন সূর্যের মা ও সূর্য। মুহূর্তেই দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল মিনি প্রাইভেট কারটি। কিছুক্ষণ অনিমেষ দাঁড়িয়ে রইলেন সূর্যের বাবা, মূল ফটকের সামনেই।

দুই
সূর্য, প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর একটি কিশোর। হালকা পাতলা শরীর। ছোট করে ছাঁটা চুল। উচ্চতায় বাবার মতোই মাঝারি। গোলাকার বড় বড় চোখ, লোমশ ভ্রু। পুরো শরীরের রংটিই কালো। চেহারার মাঝে সহজেই একটি মায়াবী ছাপ খুঁজে পাওয়া যায়। ওর হাঁটার ধরন, কথা বলার ভঙ্গি, আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করে। শুভগাঁ সরকারি কলেজের পরিচিত মুখ। অত্যন্ত মেধাবী। এবারের এইচ. এস. সি পরীক্ষার্থী। আগামীকাল প্রথম পরীক্ষা। সঙ্গত কারণেই ব্যস্ত। সারাদিন রুমেই থাকে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হয় না। রুমটি অত্যন্ত গোছালো। গোছালো থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে সে। দরজার পাশেই একটি সিঙ্গেল খাট। খাটটি আকাশমনি কাঠের- বোঝাই যাচ্ছে। খাটের সাথেই ওয়ারড্রোবটি সাজানো। ওয়ারড্রোবের উপরে একটি ছোট্ট পতাকা। পতাকার পাশেই একটি চার্জার লাইট, একটি টেবিল ল্যাম্প এমনকি কিছু মোমবাতি এবং দেশলাই। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা আইপিএস নষ্ট হলে যাতে পড়াশুনার ব্যাঘাত না ঘটে, তাই এত আয়োজন। ওয়ারড্রোবের পাশে ফাঁকা জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি কাচের লম্বা বাক্র। বাক্রের ভেতর একটি কঙ্কাল। ভবিষ্যতে ডাক্তার হবার স্বপ্ন তার। তাই বাবাই ওকে কিনে দিয়েছেন কঙ্কালটি। নিজেও ইন্টারনেট থেকে চিকিৎসা সম্পর্কিত অজস্র তথ্য এবং চিত্র প্রিন্ট করে দেয়ালে লাগিয়েছে। জানালার পাশেই রিডিং টেবিল। টেবিলে শুধু অ্যাকাডেমিক বই ও খাতাপত্র। টেবিলের পাশেই একটি মাঝারি আকারের বুক সেলফ। দেশী বিদেশী গ্রন্থ দ্বারা পরিপূর্ণ সেলফটি। বেশিরভাগই কিশোর ক্ল্যাসিক। কিছু সায়েন্স ফিকশনও রয়েছে। পাশের কম্পিউটার টেবিলটি ফাঁকা। কম্পিউটার চালালেই পড়াশুনোর ক্ষতি হবে- বুঝতে পারে সে। তাই টেস্ট পরীক্ষার পরই কম্পিউটারটি প্যাকেটবন্দী করেছে।
কঠোরভাবে পড়াশুনা চালিয়ে আসছে টেস্টের পর থেকেই। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সন্তুষ্ট সে। প্রশ্বস্ত বারান্দায় একটি ইজি চেয়ার রয়েছে। আপাতত সেখানে বসেই পড়ছে। সময় যতই অতিক্রান্ত হচ্ছে ততই অস্থির হয়ে উঠছে ও। কলেজের সব স্যারের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠছে তার মননে। বিশেষত সত্য স্যার। অত্যন্ত ¯স্নেহ করেন তাকে। সেও নিজের আদর্শ হিসেবে মানেন প্রিয় স্যারকে। নিজেকে অন্য উচ্চতায় উত্তীর্ণ করতে পেরেছে শুধু তারই কারণে। যখনই, যে সমস্যায় পড়েছে স্যারের সহায়তা পেয়েছে। নিঃসঙ্কোচে সব বিষয় বিনিময় করেছে। মায়ের মুঠোফোনে প্রথমে যোগাযোগ করেছে সত্য স্যারের সাথেই। পরবর্তীতে অন্যান্য স্যারদের সঙ্গেও কথা বলেছে। আর্থিক সচ্ছলতা থাকলেও মোবাইল কেনে নি সূর্য। প্রয়োজনও মনে করে নি কখনো। তাছাড়া মাথা নিচু করে দিনরাত মোবাইল চালানো নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়- উপলব্ধি করতে পারে সে। কারণে অকারণে মোবাইল চালিয়ে নিজের ক্ষতি ডেকে আনতে কোনোভাবেই প্রস্তুত নয় সে। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় সে, ডাক্তার হয়ে সেবা করতে চায় দরিদ্র মানুষের।
ইতোমধ্যে সন্ধ্যে পেরিয়ে গেছে। ফাইনাল রিভিশন শেষ করে খেয়ে নিল সূর্য। দশটার মধ্যেই ঘুমোতে হবে- সত্য স্যারের কড়া নির্দেশ। বিছানাটি ভালো করে ঝাড় দিলো। বালিশটিও সোজা করে রাখলো। মশারি টানবে এমন সময় দরজায় শব্দ হলো। দরজা খুলেই দেখতে পেল বাবাকে। খানিকটা আশ্চর্য হলো। এত তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরেন না তিনি। দরজা বন্ধ করে বিছানার এক প্রান্তে ছেলেকে নিয়ে বসলেন বাবা। অত্যন্ত ব্যস্ত দেখাচ্ছে তাকে। ব্যস্ততার পাশাপাশি কিছুটা তৃপ্ততার ছাপ তার অবয়বজুড়ে। মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। অতঃপর ট্রাউজারের পকেটে ডান হাতটি ঢুকালেন। পকেট থেকে একটি প্রশ্নপত্র বের করলেন, উত্তরপত্র সহ।
‘এই নে, উত্তরগুলো দ্রুত মুখস্থ কর।’ ছেলের হাতে প্রশ্নটি দিয়ে বললেন। প্রশ্নপত্রটি দেখেই চমকে উঠলো সূর্য।
‘ বাবা, আমি তো এভাবে পড়িনি, আমার মতো করেই উত্তর প্রস্তুত করেছি।’
‘ কিন্তু যেগুলো পড়েছিস সেগুলো তো কমন নাও আসতে পারে, আর এই প্রশ্নগুলো অবশ্যই কমন পড়বে।’ দৃঢ়তার সাথে বললেন বাবা।
‘কিন্তু এমন করা তো অন্যায়, বাবা।’ সত্য স্যার বলেছেন।
‘স্যাররা তো সবসময় এমন কথাই বলবেন, স্যারের কাজ স্যার করেছেন, এখন তোর কাজ তুই কর, বুঝলি।’ পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলতে থাকলেন বাবা।
‘কিন্তু বাবা, আমি তো এস.এস.সিতে প্রশ্ন ছাড়াই ভালো রেজাল্ট করেছি।’
‘এটা এস.এস.সি নয়, এইচ.এস.সি। এখানে রেজাল্ট ভালো না করলে মেডিক্যালে ভর্তি হবি কীভাবে, মানুষের সেবা করতে হবে না।’ সূর্যের বাবার কণ্ঠে কর্কশ ভাব লক্ষিত হলো।
‘তাই বলে অন্যায় করবো!’ বাবার কথা শুনে অসহায়ত্বের চরম ভাবের পাশাপাশি একটি বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন প্রতিভাত হলো সূর্যের চোখে মুখে। বাবাও কিছুটা আঁচ করতে পারলেন।
‘মাঝে মাঝে এরকম একটু আধটু করতে হয়, এতে কিছু হয় না, জানিস! কত কষ্ট করে প্রশ্নটি ম্যানেজ করেছি।’
‘ বুঝলাম, কিন্তু বাবা, সত্য স্যার যে বলেছেন-অন্যায় অন্যায়ই, তা ছোট কিংবা বড়, যাই হোক না কেন।’
‘আবার সত্য স্যার। বললাম না, স্যাররা এমনই বলে থাকেন। এখনই এত ন্যায় অন্যায় বুঝে তোর লাভ নেই। আমার কথাগুলো একটু বোঝার চেষ্টা কর, সুযোগকে কাজে লাগাতে হয়।’ এই কথাকটিতে বাবার একটি অব্যক্ত ক্রোধ ফুটে উঠলো বলে মনে হলো সূর্যের। বিষয়টি উপলব্ধি করে প্রথমদিকে উত্তেজিত হলেও পরবর্তীতে গলার স্বর নরম হয়ে এলো সূর্যের বাবার।
রাত্রি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। প্রকৃতিও নিস্তরঙ্গ রূপ ধারণ করেছে। ছেলের এমন মানসিকতা দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন বাবা। কখনো ভাবতেই পারেন নি এমনটি ঘটতে পারে। একজন শিক্ষকের ইতিবাচক প্রভাব যে এতটা গভীর হতে পারে- জানা ছিল না তার। কোনো ভুল করছেন না তো! ভাবতেই চমকে উঠলেন তিনি। কিছুটা নমনীয় ভাব লক্ষিত হলো তার অবয়বজুড়ে। ভুল, ভুল হবে কেন? যারা সুযোগ পাচ্ছে তারাই তো গ্রহণ করছে। সবার ছেলে যখন ভালো রেজাল্ট করবে, মেডিক্যালে পড়বে, তখন আমি কোথায় গিয়ে মুখ লুকোবো? আমার সূর্যের কী হবে? কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ও? যেভাবেই হোক ভালো রেজাল্ট করাতেই হবে। যে কোনো মূল্যে মেডিক্যালে পড়াতেই হবে। আপনাআপনি ভাবনাগুলি তাড়িত করলো তাকে। আবারো উদ্যোগী হলেন তিনি। সূর্যের গা ঘেষে বসলেন। ডান হাতটি পিঠে রাখলেন। সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে বোঝাতে থাকলেন ছেলেকে।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে বাবা। তুমি যাও এখন, আমি দেখছি।’ এক প্রকার বাধ্য হয়েই বলতে হলো সূর্যকে। তার অঙ্গভঙ্গিতে সেটিই স্পষ্ট হলো।
‘যাক বাবা, অবশেষে রাজী করানো গেল।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে নির্ভার হলেন বাবা। স্বস্তির ভাবে ফুটে উঠলো তার চোখে মুখে। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবেই রইলেন। অতঃপর রুম থেকে বের হলেন।

তিন
নীরব বসে আছে সূর্য, বিছানার এক প্রান্তে। প্রশ্নপত্রটি হাতে নিয়ে। কী করবে, বুঝতে পারছে না ও। মনে হচ্ছে ভাববার সকল শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। উদাস দৃষ্টি নিয়ে রুমের চারদিক তাকাতে থাকলো। বুক সেলফ, কঙ্কাল, রিডিং টেবিল, কম্পিউটার টেবিল সবকিছুর দিকেই। সর্বোচ্চ ভালোলাগার জায়গা তার এই রুমটি। কোনো জিনিস সামান্য এলোমেলো হতে দেয় না সে। যে কোনো মূল্যে পরিপাটি রাখে রুমটি। কিন্তু আজ এমন অস্বস্তিতে পড়তে হবে এই রুমেই, ভাবতে পারে নি সে। দরজাটি খোলাই রয়েছে। বাবা চলে যাবার পর লাগানো হয় নি। বিষন্নভাবটি স্পষ্ট হয়েছে তার অবয়ব জুড়ে। চোখ দুটিও ক্লান্ত হয়ে এসেছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ক্লান্ত দেহে দরজাটি বন্ধ করলো। বসে পড়লো রিডিং টেবিলে। বাবার দেয়া প্রশ্নপত্রটি দেখতে শুরু করলো। কয়েকটি প্রশ্ন এবং উত্তর দেখেও ফেললো। কিন্তু এক একটি শব্দ যেন তার বক্ষ বিদীর্ণ করছে -অনুভব করতে পারলো সে। উত্তেজনা ও অস্থিরতায় দ্রুতই ঘামতে শুরু করলো। কী করবে- বুঝতে পারছে না সে। দু’হাত দিয়ে মাথার দু’পাশ চেপে ধরলো। কোনোভাবেই শান্ত হতে পারলো না। টেবিল ছেড়ে লাইট বন্ধ করলো। অন্ধকারের মাঝেই টেবিলে মাথা রেখে কিছুক্ষণ বসে রইলো। অতঃপর টেবিল থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে পড়লো। প্রশ্নটি টেবিলের উপরই রইলো। কে যেন তার গলা টিপে ধরছে- বিছানায় শুয়েই অনুভব করলো। তবু বিছানা ছেড়ে উঠলো না। শুয়েই থাকলো। বারবার এপাশ ওপাশ করতে থাকলো। কিন্তু ঘুমোতে পারলো না। হালকা ঠান্ডা ভাব অনুভূত হলো শরীরে। পায়ের কাছে থাকা কম্বলটি গায়ে জড়িয়ে নিয়ে উপুড় হয়ে শুইলো। মাথা এবং কপালজুড়ে প্রচ- ব্যথা অনুভব করতে থাকলো। প্রবল যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে থাকলো তার অন্তর্করণ। ‘আর পারছি না, কে আছো আমাকে উদ্ধার করো এই যন্ত্রণা থেকে।’ - ক্লান্তির সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে অনুভব করতে থাকলো সূর্য। শরীরের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে থাকলো।
‘সূর্য-----, এত ভাবছো কেন? ওঠো, প্রশ্নপত্রটি হাতে নাও, টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেল। আলো জ্বালাও, তুমি না সূর্য, তুমি কেন আঁধারে থাকবে। ওঠো বলছি, আলো জ্বালাও, অসীম অনিঃশেষ আলো। পতাকাটি হাতে নাও, বুকে হাত রাখো, শপথ করো তোমার দেশের পক্ষে, তোমার জাতির কাছে, নিঃশ্বাস থাকতে অন্যায় করবে না। ওঠো, ওঠো বলছি, ওঠো।’ সত্য স্যারের মতো কে যেন তার অবচেতনাতেই কথাগুলি বললেন। এবং মুহূর্তেই চলে গেলেন। ক্ষিপ্র গতিতে কথাগুলি শুনলেও ভয় পেল না সূর্য। বরং একটু ভালো লাগা বোধ হলো। সত্য স্যারের প্রতিমূর্তিটি আপনা আপনি তার মনের মনিকোঠায় ভেসে উঠলো। মাথার ভেতর যন্ত্রণার ভাবটিও কাটতে শুরু করলো। কথাগুলি শোনার পর পুরো শরীরে অতিরিক্ত শক্তি পেয়ে গেলো ও।
এবার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। লাইটের সুইচ অন করলো। চার্জার লাইট, টেবিল ল্যাম্প, ডিমলাইট, মোমবাতি সবই জ্বালালো। রুমটিকে আলোময় করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাটি করলো। কিন্তু আলোগুলি পর্যাপ্ত মনে হলো না তার কাছে। উত্তরসহ প্রশ্নপত্রটি হাতে নিয়ে বারান্দায় এলো সে। টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেললো। ছেড়া টুকরোগুলি দু’হাত প্রসারিত করে ছুড়ে ফেললো। এক একটি টুকরো ছন্দোবদ্ধভাবে নীচের দিকে পড়তে থাকলো। টুকরোগুলির দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকলো সূর্য। দৃশ্যটি ভীষণভাবে পুলকিত করলো তাকে। অতঃপর আবারো রুমে প্রবেশ করলো। ওয়ারড্রোবের উপরে রাখা পতাকাটি হাতে নিয়ে বারান্দায় আসলো। এসেই পতাকাসহ দাঁড়িয়ে পড়লো। দাঁড়ানোর পরপরই অসীম শক্তি অনুভব করলো ও। পূর্ণ চাঁদের দিকে তাকাতেই অবাক হয়ে গেল। অসংখ্য তারকারাজি হতে প্রক্ষিপ্ত আলোর মেলায় বিপুলভাবে উচ্ছ্বসিত হলো। এই বিপুল আলোকরাশির নীচে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলো- স্যার, স্যার, আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, কোনোদিনই অন্ধকারের পথে পা বাড়ানো না, এতটুকু শ্বাস থাকতেও অন্যায় করবো না, ন্যায়ের পথে থাকবো, দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করবো।



আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
খন্দকার আনিসুর রহমান জ্যোতি সময়টি ভরা বসন্তের। ভোরের কুয়াশা কেটে গেছে। সূর্য কেবলই উঠেছে। পাখিরা শব্দে মাতিয়ে রেখেছে প্রকৃতিকে ......// সময় ও শব্দের সাথে অসজ্ঞতি দেখে প্রথমেই হোচট খেলাম ...শুভ কামনা রইলো......
মনজুরুল ইসলাম Thanks for your comment after reading the story.Stay fine forever.
কাজী জাহাঙ্গীর বিষয়টি যে সময়োচিত সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না যদিও আসবাবের বর্ণনায় খনিকটা বিরক্তির উদ্রেকা হয়েছিল এবং শেষ দিকে এসে তার পরিত্রানও ঘঠেছে। অনেক শুভকামনা আর ভোট রইল।
সুমন আফ্রী প্রতিটি জিনিসেরই খুটিনাটি বর্ণনা বেশ লেগেছে। সমসাময়িক বিষয়বস্তুর নান্দনিক উপস্থাপন। শুভকামনা...
মনজুরুল ইসলাম onisshes valo laga roilo golpoti porbar jonno.valo thakben nirontor.
বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত গল্পের বিষয়টি ভাল লাগল । ভোট সহ শুভেচ্ছা রইল ।
সালসাবিলা নকি খুব ভালো লিখেছেন। প্রশংসার ভাষা নেই আমার। একটাই প্রার্থনা সূর্যের মতো সন্তান ঘরে ঘরে জন্ম নিক। বর্তমান সময়ের অন্যতম সমস্যা এবং তার সমাধান এভাবে গল্পাকারে তুলে ধরেছেন আপনি। অসংখ্য ধন্যবাদ এবং শ্রদ্ধা আপনার জন্য।
মনজুরুল ইসলাম bishes kritoggota. apnar ai montrobbo sotti praronadaok. asa kori sobai surjer moto hobe.onek dhonnobad apnake.
Sardar Razzak বতমানের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি চরম সঙ্কটাকাকীণ অধ্যায় পাবলিক পরীক্ষা সমূহে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্নপত্র ৺ফাসের লজ্জাজনক কলঙ্ক। এ বিষয়টির ওপর রচিত গল্প প্রাথিত প্রজন্ম নিঃসন্দেহে একটি মাইল ফলক। গল্পটি সাধারণত্বের পরিধি পেরিয়ে অসাধারণত্বের পরিমণ্ডলে নিজের স্থান করে নিয়েছে। লেখককে অফুরন্ত অভিবাদন।
মনজুরুল ইসলাম ki bolbo, oshadharon. sotti apnar amon mullayon amar jonno bishes prarona hoe thakbe.onek valobasha roilo apnar jonno.
মাইনুল ইসলাম আলিফ শিক্ষণীয় গল্প।শুভ কামনা ভাই।
মনজুরুল ইসলাম thanks for your inquisitive comment.a lot wish for you also.good luck.
ইমরানুল হক বেলাল অন্যতম গল্প, হৃদয় ছুঁয়ে গেল পাঠে। লেখার ধারাবাহিকতা অনেক গভীর ও সমুজ্জ্বল! ভোট এবং মুগ্ধতা রইল।
মনজুরুল ইসলাম many many thanks to you for your valuable comment.stay fine forever.

২৯ অক্টোবর - ২০১৪ গল্প/কবিতা: ১ টি

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।

প্রতি মাসেই পুরস্কার

বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।

লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন

  • প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
  • তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।

আগামী সংখ্যার বিষয়

গল্পের বিষয় "উষ্ণতা”
কবিতার বিষয় "উষ্ণতা”
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ডিসেম্বর,২০২১