শিহাব এখন স্বরচিত ব্যথার পাহাড়ের চুড়ায দাঁড়িয়ে যবনিকার চুড়ান্ত প্রহরের অপেক্ষায় ! জীবন যে উত্থান আর পতনের সমন্বিত রূপ শিহাবের জীবন ই তার উৎকৃষ্ট এবং নিকৃষ্ট উদাহরণ ! বলে রাখা ভাল, শিহাব কিন্তু যেমন তেমন পরিবারের উপেক্ষিত কোন সন্তান নয় ।শহরে ওদের পরিবারের একটা নাম ডাক ছিল । যদিও শিহাব শৈশবেই ওর বাবাকে হারিয়েছিল কিন্তু বুদ্ধি হবার পর থেকেই জেনে এসেছে, শহরের পৌর এলাকায় ওর বাবার নামে একটা সড়কের নাম করণ করা হয়েছে ।ওর বাবা পাকিস্তান আমলে পৌর কমিশনার ছিলেন, তাঁর জন দরদী মনটাই তাঁকে সবার কাছে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুলেছিল । তিনি সবার কাছেই ভীষণ প্রিয়পাত্র ছিলেন । সেই সুবাদেই শিহাবও সমাজের অনেকেরই সুনজরে ছিল তবে ওর মেধা এবং চেষ্টাও ওর কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণ কে কম আলোচিত বা আলোকিত করে নাই । একটু বাঁকা গড়নের হালকা পাতলা স্বাস্থের অধিকারী শিহাবের হাঁটা, কথা বলার ঢঙের মাঝে আভিজাত্যের একটা স্পষ্ট ছাপ ছিল, যদিও ওরা ছিল একটা জেলা শহরের বাসিন্দা । সেই সাথে ওর মাঝে ছিল একজন উঠতি খেলোয়ারের সমস্ত গুনাবলী । মোট কথা, শিহাব ছিল একজন আদর্শ তরুণের সফল প্রতিকৃতি । অল্প বয়সেই খেলার মাঠে সে নিজের একটা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল । যদিও শিহাব নিজেকে একজন সফল উইংগার হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছিল তারপরও মাঝে মধ্যেই ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে গোল করার চমকপ্রদ কৌশল গুলো ওকে একজন গুনী খেলোয়ার হিসেবেই সবার কাছে ভীষণ জনপ্রিয় করে তুলেছিল । প্রতিকুল অবস্থায়ও সকল বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করার সামর্থও ওর মাঝে ভালই ছিল । ক্রিকেটের মাঠেও ওর বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মত । সব মিলিয়ে ওর জীবনের শুরুটা ছিল সবার কাছেই ভীষণ প্রশংশিত আবার কারো কারো কাছে ইর্শনীয়ও বটে !
খেলাধুলা ছাড়া অন্য কোন কিছুর প্রতি ওর তেমন একটা আসক্তি ছিল না, তবে জেলা ক্রিড়া সংস্থার সাহায্যার্থে পরিচালিত হাউজি খেলার আসরে মাঝে মধ্যেই ওর আনাগোনা ছিল । সেই কারণটাই যে ওর জীবনের কাল হয়ে যাবে, কেউ কোন দিন সেটা ঘুর্ণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি । স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ও এই শহরেই হাতে গোনা দুই-চারটে পরিবার ধনী বলে বিবেচিত হ’তো । কিন্তু স্বাধীনতার পর পরই কিছু কিছু ব্যক্তির মাঝে সম্পদ আহরণের চেষ্টা এমন এক সর্বনাশা মাত্রা অতিক্রম করতে থাকে, যার বিরুপ প্রভাব সমাজকে দুঃশ্চিন্তায় ফেলে দেয় । শুরু হয় অপরাধী চক্র সৃষ্টির দৃষ্টি কটু প্রতিযোগিতা । বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সংগঠিত হতে থাকে সমাজ বিধ্বংসী এ সমস্ত জাতীয় শত্রুরা ! আবার চাকরির পাশাপাশি বাড়তি নগদ নারায়ণের অতি লোভে সরকারী কোন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তাদের সংঘবদ্ধ করার পিছনে অবদান রাখতে এগিয়ে আসে ! নব্য একটা ধনিক শ্রেণী সৃষ্টির উন্মাদনায় বেসামাল হতে থাকে মূল্যবোধের লালিত অহংকার ! খরস্রোতা নদীর আগ্রাসন রোধ কল্পে নির্মিত বাঁধে ফাটল দেখা দিলে যে ভাবে প্রথমতঃ ঘোলা আর নোংরা পানি চুইয়ে চুইয়ে প্রবেশ করতে থাকে তেমনি করেই মূল্যবোধ পরিবেষ্টিত সমাজে সৃষ্টি হয় অবক্ষয়ের ফাটল, যে ফাটল দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে প্রবেশ করতে থাকে অপরাধ প্রবনতা ! শুরু হয় হেরোইন, সোনা, চিনি সহ অন্যান্য পণ্য সামগ্রীর অবৈধ চোরাচালান, হুন্ডির মাধ্যমে অবৈধ ভাবে অর্থ পাচার ! অবাঞ্ছিত উচ্চাভিলাসী প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় তাদেরই নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা চিহ্নিত অপরাধীদের সহযোগে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দেয় চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারী সহ ইত্যকার ক্ষতিকর সমাজ বিধ্বংসী উপাদান ! এই পথ বেয়েই কিশোর, তরুণ, যুব সমাজের হাতে হাতে পৌঁছে যায় জীবন ঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র এমনকি নেশা দ্রব্য হেরোইন পর্যন্ত ! তখন মানুষ জানতোই না যে এই নেশা দ্রব্য হেরোইনই মরণ নেশা হয়ে মানব সন্তানদের কৈশোর, তারুণ্য আর যৌবনকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেয়ে কাঠের ঘুনের মত ভস্ম করে দেবে !
তেমনই একটা চক্রের খপ্পরে পড়ে যায় শিহাবের মত একটা উজ্জল নক্ষত্র ! সেই থেকেই সে ক্রমেই নিষ্প্রভ হতে থাকে সবার অগোচরে ! স্বাভাবিক ভাবেই অন্যেরা বুঝে ওঠার আগেই বুঝতে পারে পরিবারের সদস্যগণ ।কারো কাছেই পরিস্থিতির চুড়ান্ত পরিণতির পূর্বাভাস স্পষ্ট ছিল না । তাই সন্তান কে পরিশুদ্ধ করে ঘরমুখো করার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে চলতে থাকে নিরন্তর প্রচেষ্টা । পরিবারের সুনাম রক্ষার্থে শেষ পর্যন্ত খেলার মাঠ থেকে শিহাবকে সরিয়ে এনে পর্যায়ক্রমে কয়েকবার করে বিভিন্ন স্থানে চাকরির ব্যবস্থাও করা হয় ওকে পুণর্বাসনের আশায়, কিন্তু সকল প্রচেষ্টাই যখন ব্যর্থ হয় তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে অভিভাবকগণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয় ! অবশ্য বাংলাদেশের মানুষের জন্য তখন এমন পরিস্থিতি ছিল একটা নুতুন অভিজ্ঞতা ! তাই তাদের পক্ষে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল একটা পরীক্ষা মাত্র ! তা ছাড়া পরিবারের বাইরের মানুষ তখনও জানতেই পারে নাই শিহাবের এমন অধপতনের খবরা খবর । হায়রে মানুষ ! লোভ লালসা মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে ! এতদিনও শিহাবের মানষিক পরিবর্তন টা সবার কাছে একটা প্রশ্নের জন্ম দিলেও ক্রমেই ওর অস্বাভাবিক এই আচরণ টা সবাইকে মর্মাহত করতে থাকে । কারণ ইতোমধ্যেই ক্রিড়াঙ্গন থেকে ওর উপার্জনটা বন্ধ হয়ে গেছে, উপরন্তু কোন চাকরিই ওর পরিবর্তিত খারাপ স্বভাবের জন্য না টিকে থাকায় এবং বাড়ী থেকেও অর্থ যোগানোর সামর্থ লোপ পাওয়ায় আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-প্রতিবেশীদের উত্তক্ত করার শেষে পরিস্থিতি চুরি চামারী পর্যন্ত গিয়ে শিহাবের অধোগতি সর্বনাশের চুড়ান্তে যখন পৌঁছাল তখন আর পরিবারের পক্ষ থেকে রাখ ঢাকের সকল চেষ্টাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হ’লো ।
ততদিনে শিহাবের একমাত্র সন্তান সোহান ওর মায়ের দুঃখ কে কিছুটা আঁচ করতে পারছে । কিন্তু তার ব্যথাকে ভাগ করে নেবার মত বয়স না হওয়ায় নিরব দর্শকের মত ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না । বিয়ের পর থেকে রেশমার ভাগ্যাকাশে রঙধনুর বর্ণচ্ছটা কখনও তাকে আপ্লুত করেনি, বরং ইদানীং ওর স্বপ্ন দেখার শক্তিটুকুও কুন্ডলী পাকানো কালো মেঘের গহীনে অস্তিত্বহীন হতে চলেছে । হিমাঙ্কের নীচ থেকে শিহাবকে টেনে তুলে আনবার মত কোন উর্বর প্রযুক্তিগত জ্ঞান রেশমার ইচ্ছাধীন না থাকায় শুধুই হতাশার কাছে পড়ে পড়ে মার খাওয়াই এখন ওর জন্য যেন নির্দ্ধারিত সমাধান ! এর বাইরে রেশমার আর কোন জীবন নেই ! অতৃপ্তি আর বঞ্চনার উপহাস রেশমার সমস্ত আকাঙ্খা গুলোকে তিলে তিলে নিঃশ্বেষ করে দিয়েছে ! উপরন্তু শিহাবের চাহিদা মেটাতে গিয়ে একে একে সংসারের সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখিরি হয়ে শুধু মানুষের দ্বারে দ্বারে হাত পাতার চুড়ান্ত পর্বটা বাকী ! বাবা শুণ্য মায়ের সংসারটাও রেশমার জন্য আরাম দায়ক কোন আশ্রয়স্থল নয় ভেবে সে আরও উদ্গিগ্ন । এমনই এক দিনে শিহাবের ভয়ার্ত মুর্তি দেখে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে, ওর মুখ মন্ডল ফোলা ফোলা, ছল্ ছল্ দৃষ্টি, চোখ দু’টো কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম, ভীষণ ভয়ঙ্কর রূপে তারই সামনে দন্ডায়মান ! কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই রেশমার গলা থেকে তার শেষ সম্বল সোনার চেইন টা ছিনিয়ে নিয়ে ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে যেতে উদ্যত, তখনই রেশমার ডুকরে কেঁদে ওটার দৃশ্যটা সোহান সহ্য করতে না পেরে শিহাব কে জাপটে ধরে কান্না জড়িত কন্ঠে বলে উঠল, “বাবা, তুমি এমন কেন ? আর সবার বাবার মত নও কেন ? তুমি আমার আম্মুকে এত কষ্ট দাও কেন ?” কী সেই দৃশ্য ! যে কারো কঠিন হৃদয়ও মোমের মত গলে যেতে বাধ্য অথচ মাদকাসক্ত শিহাবের মৃত হৃদয়ে তারই প্রাণপ্রিয় সন্তান সোহানের কোন কাকুতি মিনতিই এতটুকু প্রভাব ফেলেছে বলে মনে হ’লো না ! উপরন্তু নিষ্ঠুর এক ছিনতাই কারীর মতই সবেগে সোহানের কচি কচি হাত দু’খানাকে মুক্ত করে ঘর থেকে বেড়িয়ে গেল ! আচমকা এমন দূর্ঘটনার প্রচন্ডতায় হতভম্ব রেশমা কিছুক্ষণ শিহাবের বেড়িয়ে যাবার পথে নির্বিকার তাকিয়ে থেকে হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য সোহানকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠেই সোহান কে মেঝের উপর ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠল, “তুইতো শিহবেরই সন্তান ! তোর মাঝেও আমি শিহাবেরই বিমূর্ত ছায়া দেখতে পাচ্ছি, তুইও চলে যা আমার কাছ থেকে । আমার আর কাউকেই প্রয়োজন নেই ! আমার কেউ নেই, আমি নিঃস্ব, পৃথিবীর জঞ্জাল, আমার বেঁচে থেকে লাভ নেই !” বলেই সে এক দৌড়ে দো’তলার ছাদে উঠে গেল । কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ল নীচে ! সঙ্গে সঙ্গে সোহানের চীৎকারে এবং ঘটনার আকস্মিকতায় চারিদিকে হৈ চৈ পড়ে গেল ! সবাই দৌড়া দৌড়ি করে ছুটে এলো । শিহাবেরই বড় ভাই ডাঃ পলাশ রেশমার নাড়ি পরীক্ষা করে সবার জন্য হতাশা ছড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, “রেশমা সমস্ত কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে গেছে, তবে রেখে গেছে শিহাব আর সোহানের জন্য ব্যথার পাহাড় !”
০৭ সেপ্টেম্বর - ২০১৪
গল্প/কবিতা:
৩২ টি
বিজ্ঞপ্তি
এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের আংশিক অথবা কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী থাকবে না। লেখকই সব দায়ভার বহন করতে বাধ্য থাকবে।
প্রতি মাসেই পুরস্কার
বিচারক ও পাঠকদের ভোটে সেরা ৩টি গল্প ও ৩টি কবিতা পুরস্কার পাবে।
লেখা প্রতিযোগিতায় আপনিও লিখুন
-
প্রথম পুরস্কার ১৫০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
দ্বিতীয় পুরস্কার ১০০০ টাকার
প্রাইজ বন্ড এবং সনদপত্র।
-
তৃতীয় পুরস্কার সনদপত্র।
আগামী সংখ্যার বিষয়
লেখা জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ২৫ ডিসেম্বর,২০২৪