লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৮ আগস্ট ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ১৭টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftঘৃনা (আগস্ট ২০১৫)

সাঁকো
ঘৃনা

সংখ্যা

রবিন রহমান

comment ১  favorite ০  import_contacts ৯২৪
সাঁকো

রাত তখন মধ্য হবে। রাহাত নিজের বাইকের হ্যান্ডেলটা শক্ত করে ধরে। বাইকে ওর পেছনে বসে থাকা রিয়াদকে ভালোহয়ে বসতে বলে। দুজনেই পূর্ন বয়স্ক যুবোক, রাত করে বাড়ি ফিরছিলো। রিয়াদের বাড়ি অন্য এক গ্রামে, রাহাত সম্পর্কে ওর খালাতো ভাই। মাঝে মাঝে রিয়াদ বেড়াতে আসে রাহাতদের বাড়িতে। দুজনের সম্পর্ক বন্ধুর চেয়ে ভালো। জোনাক পুরের নামকরা যাত্রাপালা। প্রতি বছর এই সময় জোনাকপুরের মিয়া বাড়ির বাহিরে খোলা মাঠে এই যাত্রাপালা হয়। যাত্রাপালার পাশাপাশি মেলায় নানা রকমের খাবার দোকান থেকে বাহারি পণ্যের দোকান থাকে। হঠাৎ এভাবে সাবধান হতে বলার কারন জানতে চায় রিয়াদ রাহাতের কাছে। উত্তরে রাহাত বলে :

একটু পরেই দেখতে পাবি কারন। রাত যখন মধ্য হয়েছে আর আজ যেহেতু আমাবস্যা, অবশ্যই দেখা হবে। তবে ভয় পাবি না একটুও। মনে সাহস রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকবি।

কিছু সময়ের মধ্যে ওরা জোনাকপুরের এলাকা পেরিয়ে একটা বাগান মত জঙ্গল পার হতে থাকে। জঙ্গলটা পার হলেই নদীর উপর একটা ব্রীজ, ব্রীজের ওপাশে কামালপুর। রাহাদের বাড়ি কামাল পুরে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আগাতে হঠাৎ বাইকের হেডলাইটের আলো কমে আসে। সেই সাথে শুরু হয় শোঁ শোঁ আওয়াজ। প্রচন্ড বাতাস মনে হচ্ছে সেখানে। রিয়াদ রাহাদ কে ভয়ে জড়িয়ে ধরেছে। রাহাদ কিছুতেই বাইকের স্পিড কমাচ্ছে না। দেখতে দেখতে ব্রীজের উপর উঠে আসে ওরা। ব্রীজের নিচে বর্ষায় উপচে ওঠা বৃষ্টির পানির সচল চলা। অগভীর নদীর পানি থাকে একদম শান্ত কিন্তু এ নদীর পানিতে মনে হচ্ছে ঝড় শুরু হয়েছে নদীর নিচ থেকে উপরের দিকে। উল্টা ঝড়, ঝড়ের দাপটে শীতল বাতাসের সাথে জেনো পানির অসংখ্য ছিটা গায়ে কাপন ধরিয়ে দেয়। সাথে কেউ জেনো ডাকতে থাকে ওদেও, বলতে থাকে আমাকে বাঁচা, আমাকে তোল তোরা। যাবিনা এ পথ ধরে তোরা, ঘার মটকে দেবো। সুজোগ পেলেই ঘার মটকে দেবো। হঠাৎ রিয়াদের চোখ যায় ব্রীজের মাঝে, দেখে একটা বস্তা বন্দি কিছু পড়ে আছে সেখানে। মনে হচ্ছে একটা বিশাল দেহি মানুষ, কেউ,যেনো তাকে বস্তায় বেঁধে ফেলে রেখেছে। কান ফাটানো চিৎকার কানে আসতে থাকে। রাহাদ বাইকের স্পিড আরো বাড়িয়ে দেয়। রিয়াদ ওর কানের কাছে ফিস ফিসিয়ে বলে :
লোকটাকে বাঁচানো উচিত না আমাদের। কি করবি এখন।
রাহাত রিয়াদকে ধমকের শুরে বলে ওঠে : আমি তোকে যা বলেছি তাই কর। আমাকে শক্ত করে ধরে থাক। ভয় লাগলে চোখ বন্ধ করে রাখ। যা করার আমি করছি।
রিয়াদ সত্যি চোখ বন্ধ করে রাহাদের ঘারে মুখ লুকিয়ে থাকে, ভয়ে। চোখ বন্ধ অবস্থাতে কখন যেনো ওর মনে হয় সব থেমে গেছে, এখন আর আগের মতো শব্দ নেই। শান্ত সব কিছু, চোখ খুলে দেখে বাইকের হেড লাইটের আলো আগের মতো হয়ে গেছে। বাইক নিয়ে ব্রীজ পার হয়ে কামালপুরের বড় রাস্তায় ছুটে চলছে ওরা। ভয় দূরহতে সাহসি ছেলের মতো রিয়াদ রাহাত কে হুকুম করে বলে ওঠে :
এসব কি হলো, বলতো। কিছুইতো বুঝলাম না। মনে হলো তুই ঘটনাটার সাথে আগে থেকে পরিচিতো ছিলি। কি ভয়ংকর ভুতুরে ব্যাপার।
হ্যাঁ, এ রাস্তায় আসতে রাত একটু বেশি হলেই লোকে নাকি এমন সমস্যার মুখোমুখি হয়। আগে যখন এই ব্রীজ ছিলো না। তখন তো নদিতে সাতরে ওপারে গিয়েছি, কোনদিন কোন সমস্যা হয়নি। কিন্তু এই ব্রীজ হবার পর থেকে এমন হয়েছে। তবে এর একটা কারন অবশ্য আছে, লোকের মুখে শুনেছি। ঘটনাটা দেখেতো বিশ্বাস না করেও উপায় নেই। নিজের চোখেই তো আজ দেখলাম।
বল শুনি ঘটনাটা কি।
সে নাকি অনেক দিন আগের কথা। আমরা যে মিয়া বাড়িতে যাত্রা দেখতে গিয়েছিলাম সেই মিয়া বাড়ির বড়ো মিয়া রকমত মিয়া তখন জোনাক পুরের প্রধান ছিলেন। এখনতো তিনি বুড়ো হয়ে গেছেন, তার মেজো ভাই শকমত মিয়া এখন গ্রাম প্রধান। আমরা যে ব্রীজ পাবার আগে একটা বাগান মতো জঙ্গল পার হলাম সেই জঙ্গলের যে রাস্তা সে রাস্তার নিচে নাকি একটা কবরস্থান পড়েছে। রাস্তার পাশে একটা কবরের কিছু জায়গা দেয়াল মতো এখনো আছে। তারথেকে একটু দূরে একটা কাঁচাপাকা বাড়ি। বাড়িতে যে থাকতো সেই ছিলো জায়গাটার প্রকৃত মালিক। কবরস্থানটার সকল কবরস্থ ব্যাক্তি ছিলো তার বংশের উত্তরশুরি দের। লোকটার নাম ছিলো গহোর। বনে জঙ্গলে হলুদ চাষ করতো। আর সেই হলুদ পরিষ্কার থেকে শুরু করে গুড়ো করতে আমাদের গ্রামে যেতে হতো তাকে। এদিকে দু এক গ্রামে কোন হলুদ গুড়া করবার মিল নেই। এমনকি ধানেরো মিল নেই। মিয়াবাড়ির ধান গাড়িতে করে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে অন্য এলাকা দিয়ে ঘুরিয়ে আমাদের গ্রামে মিলে নিতো গুড়া করবার জন্য। কিন্তু গহোরের চাষ করা হলুদ এতো বেশি ছিলোনা যে গাড়িতে নিতে হবে। তাই কলা গাছের ভেলা বা কখনো কখনো সাতরে নদী পার হয়ে হলুদ নিয়ে কামালপুর যেতো গহোর। তাছাড়া নানা প্রয়োজনে বাজারে যেতে গহোর আমাদের গ্রামেই আসতো। কারন, নদী পার হলেই যে আমাদের বাজার। যেখানে ওদিকের বাজারে যেতে কয়েক মাইল পায়ে হাঁটতে হতো। নদী সহজে পার হবার জন্য গহোর সিদ্ধান্ত নেই জঙ্গলের বাঁশকেটে তা দিয়ে সে একটা সাঁকো বানাবে। বারো তেরো বছরের ছেলে গোবা আর পাশের বাড়ির কয়েক জনকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় সাঁকো বানানোর কাজ। কয়েক দিনের মধ্যে একটা সুন্দর সাঁকো তৈরি হয়ে যায়। কথাটা গ্রামের সকলের কানে পৌঁছে যায়। দেখতে দেখতে গ্রামের অনেকে দূরের বাজারে না গিয়ে সাঁকো পেরিয়ে কামালপুর বাজারে যেতে শুরু করে। জঙ্গল আর বনের মধ্যে একটা মানুষ চলা রাস্তা হয়ে যায়। গহোর খুব চিন্তায় পড়ে যায়। রাস্তা যেভাবে বড়ো হতে থাকে তাতে বাবা মায়ের কবর মানুষের পায়ে চলা রাস্তার খুব নিকটে চলে আসে। মৌলভিদের কাছে শুনেছে কবর নাকি মানুষের কোলাহল থেকে সব সময় দূরে রাখতে হয়। কিন্তু ও একি করলো, নিজে হাতে বাবা মায়ের কবর কে অস্থির মানুষের অশান্ত কর্মকান্ডের মাঝে বিলিয়ে দিলো। গহোর কি করে কবরস্থান টাকে নিরাপদ করা যায় ভাবতে থাকে। ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নেই এই সাঁকো ভেঙে আগামি বছর যখন নতুন সাঁকো তৈরি করবে। নতুন সাঁকো তৈরি করবার সময় কবর থেকে সোজা এই রাস্তার থেকে একটু দূরে সাঁকোটা বসালেই সমস্যার সমাধান। এদিকে বড়ো মিয়ার কানে যায় কামালপুরের এই সর্টকাট রাস্তার কথা। বড়ো মিয়া সাঁকোটা দেখতে এসে গহোরকে ডাক দেয় বাড়ি থেকে। গহোর কে ডেকে সাঁকো দেখতে নদীর পারে যায়। সাঁকোটা দেখিয়ে বলে ওঠে :

তাহলে সাঁকোর জায়গায় একটা ব্রীজ হলে কেমন হয় গহোর। লোকে সহজে পারাপার করতে পারবে। এলাকার উপকার করা আমার কাজ। ইউনিয়ন পরিষদে বলে তাহলে একটা ব্রীজের ব্যাবস্থা করে ফেলি। আর আমার ধান মারাই করার দায়িত্ব তোকে দেবো ভাবছি। তোর একটা চাকুরিও হলো। অবশ্য একটা পাকা রাস্তাও করতে হবে। রাস্তার কথা উঠতে গহোরের বাবা মায়ের কবরের কথা মনে পড়ে যায়। মনকে শক্ত করে বড়ো মিয়ার সামনে দাঁড়ায় গহোর। বড়ো মিয়ার কথা ফেলবার মতো সাহস এ গ্রামে কেউ দেখায় না। কিন্তু খাল কেটে কুমির যখন এনেছে গহোর, কুমিরের কামড় থেকে বাঁচতে শক্ত তাকে হতেই হয়।
বড়ো মিয়া, সেটা আমি হতে দিতে পারবো না। বাবা মায়ের কবর তাহলে রাস্তায় মিলিয়ে যাবে। সেটা আমি হতে দিতে পারবো না।
কিন্তু তা বললে কি হবে। যে রাস্তা একবার করে দিয়েছো সেটাতো আর একার এখন তোমার নেই। এখন এটা ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তা হয়ে গেছে। পরিষদ যে সিদ্ধান্ত দেবে তোমাকে তা মেনে নিতেই হবে।
তাহলে সাঁকো আমি ভেঙে ফেলবো বড়ো মিয়া। তবুও এ কাজ আমি হতে দেবো না।
তুমিতো জানো আমার কথার অবাধ্য হবার ফলাফল কি হতে পারে। আমার চোখ যেখানে ব্রীজ দেখেছে সেখানে ব্রীজ হবে। সেটা করবার জন্য যে কোন সিদ্ধান্ত আমি নিতে পিছপা হবো না।
আমিও আমার জীবন থাকতে একাজ হতে দেবো না বড়ো মিয়া।
শক্ত ভাষায় উত্তর দেয় গহোর। বড়ো মিয়ার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা তার পোষা লাঠিয়াল ময়েন বড়োবড়ো চোখ করে তাকিয়ে হুঙ্কার দিয়ে ওঠে গহোরের প্রতি। গহোর সাহস টা একটু বেশি দেখানো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
কথাটা বলেই বড়ো মিয়ার পিছু পিছু দৈত্যের মতো পা ফেলে চলতে থাকে ময়েন। গহোরও কম যায় না। সে কি বড়ো মিয়ার খায় না পড়ে। তার সব কথা রাখতে হবে, এমন কোন নিয়ম আছে। মনে মনে বড়োমিয়ার হিংস্র স্বভাবের জবাব দেয় গালিতে। সাপের মতো বুকফুলিয়ে বড়োবড়ো নি:শ্বাস নিতে নিতে বাড়িতে ঢোকে গহোর। স্ত্রীকে বলে :
অনেক বড়ো সর্বনাশ হয়ে গেছেরে আয়না। বড়ো মিয়ার চোখ পড়ছে সাঁকোর উপর। সেখানে নাকি সে ব্রীজ বানাবো। নতুন রাস্তা করবো, বাবা মায়ের কবরের উপর দিয়ে রাস্তা হলে হূজুর যে বলছে কবরের উপর বেশি কোলাহল বা হাঁটাচলা হলে মরা মানুষের অত্মা কষ্ট পায় কবরে। সেখানে মানুষের পায়ের জায়গায় যদি বড়ো বড়ো গাড়ি কবরের উপর দিয়ে যায় কি হবে চিন্তা করতে পারস। আমিও যে অনেক বড়ো পাপি হইয়া যাবো।
তাই বলে বড়ো মিয়ার কথার অবাধ্য হবেন আপনি। সে কি আপনা কে বাঁচতে দেবে।
জানি না কি হবে, তবে আমি বেঁচে থাকতে এটা হতে দেবোনা।
সেদিনো প্রতিদিনের মতো ময়েন রাতের খাবার শেষ করে বারান্দার চকিতে শুয়ে ছিলো। কিছুতেই যেনো ঘুম আসছিলো না। গরমের আচ থেকে বাঁচতে গায়ের গামছা ঘুরিয়ে আঁধারে বাতাস করছিলো নিজের গায়ে। ঘরে সকলে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। রাত তখন অনেক, গহরের কিছুতেই ঘুম আসতে চায়না। কি করবে ভেবে পায়না সে। হঠাৎ মনে হয় বাড়ির পেছনে কেউ কিছু ভাঙছে। মনে হচ্ছে কেউ বাবা মায়ের কবরের যে জায়গাটা ঘেরা সেই জায়গাটা ভেঙে ফেলছে। আর বসে থাকতে পারে না গহোর। ক্ষতি হতে পারে জেনেও হারিকেন টার আলো বারিয়ে গহোর বাড়ির পেছনের দিকে চলে আসে। পেছনে আসতে হঠাৎ কিছু লোক কিছু বুঝে উঠবার আগেই গহোর কে জাপটে ধরে। একটা গামছা মুখে বেঁধে একটা বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয় তাকে। হাত পা বাঁধা থাকায় শুধু অসহায়ের মতো নড়াচড়া করা ছারা কিছুই করবার থাকে না গহরের। ওর কানে ভেসে আসে সাঁকোর উপর দিয়ে হেঁটে যাবার সময় চির চেনা সেই বাঁশের ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ। তবে বেশি সময়ধরে শব্দটা শুনতে পায় না গহোর। রাতের আঁধার গহোরের কাছে তখন আরো গভির মনে হয়। একটা শব্দ কানে ভেসে আসে, ঢুপ, প্রথমে বুঝতে পারেনা শব্দটা ওর নিজের শরীরের। যখন শরীর পানিতে ভিজে ডুবতে থাকে তখন সে বুঝতে পারে
বস্তাবন্দি নিজের শরীর পানিতে পরবার শব্দ ছিলো ওটা। রাতের আঁধারে পানিতে প্রায় নগ্ন হয়ে চাঁদের চোখে চেয়ে কতো সাঁতরে নদী পেরিয়েছে গহোর। কিন্তু আজ, নিজের শরীর টাকে নিজের কাছে বোঝা মনে হচ্ছে। কিন্তু এখনো সেই পানি, সেই শরীর পার্থক্য শুধু মুক্তির।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement