লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৩২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭

বিচারক স্কোরঃ ১.৭৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftশ্রম (মে ২০১৫)

কতটা অর্জন আর কতটা বিসর্জন!
শ্রম

সংখ্যা

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭

নাসরিন চৌধুরী

comment ১৪  favorite ০  import_contacts ১,১৪৬
হৃদিলা'র গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছেনা। চোখদুটো বড় বড় করে সে প্রাণপনে চিৎকার করার চেষ্টা করছে কিন্তু তার নরম গলা দু'হাত দিয়ে চেপে ধরে আছে লোকটা। বাসাটা আজ ফাঁকা। এমন অবস্থায় তাকে যদি এই লোকটি খুন করে ফেলে চলে যায় তাহলে হয়ত কেউ জানতেও পারবেনা!
সেদিন বাসার গেইটে যখন কেউ কলিংবেল চাপল, হৃদিলা দেখল পরিপাটি একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছে। সে জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাই?”
লোকটি বলল, “ আমি এডভোকেট শায়লা'র কাছে এসেছি। ওনি কি বাসায় আছেন? আমার কিছু জরুরী কাগজ ওনাকে জমা দিতে হবে।”
হৃদিলা বলল, “না মা বাসায় নাই। আসতে হয়ত আরও ঘন্টা খানেক লাগবে। আপনি বিকেলের দিকে আসুন।”
লোকটি বলল, “ আমাকে একটি জরুরী কনফারেন্সে চট্রগ্রাম যেতে হবে। সেজন্য বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি যদি অনুমতি দেন আমি আপনাকে আমার কাগজগুলো বুঝিয়ে দিয়ে যাই। আপনার মা বাসায় এলে আপনি ওনাকে দিয়ে দেবেন। ওনি কাগজ দেখলেই সব বুঝতে পারবেন।”

হৃদিলা সেদিন লোকটিকে বাসার ভেতরে এনে কাগজগুলো জমা রেখেছিল। তাকে চা বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করেছিল। তার মা বাসায় আসার পর মাকে কাগজের প্যাকেটটি ধরিয়ে দিয়ে বলল, “মা কেউ একজন এসেছিল আর কাগজগুলো তোমাকে দিতে বলল।” শায়লা মেয়েকে বললেন, “আমি না তোমাকে বলেছি যে, আমি বাসায় না থাকলে তুমি অপরিচিত কাউকে বাসায় ঢুকাবেনা?” শায়লা বলল, “মা লোকটা খুব ভদ্র ছিল এবং তার হাতে সময় ছিলনা কিন্তু কাগজগুলো তোমাকে দেয়াটা ওনার জরুরী ছিল।” শায়লা বলল, “ঠিক আছে কিন্তু ভবিষ্যতে এমনটি কখনও করবেনা।”

শায়লা'র কেন জানি প্যাকেটটি খুলতেই ইচ্ছা করছেনা। সারাদিনের ক্লান্তিতে তার চোখদুটি বুজে আসছে। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে পানির ঝাঁপটা দিল। সারাদিন মক্কেলদের সাথেই তার কাজ। কতজন আসে কতজন যায় এনিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই তার। কিন্তু চিন্তা হচ্ছে মেয়েটাকে নিয়ে। চোখের সামনেই বড় হয়ে গেল মেয়েটা। সতের বছর পূর্ণ হতে চলেছে। পাড়ার বখাটে ছেলেগুলো আজকাল বাসার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। মেয়েটাকে দিনরাত বোঝায় যেন সে কোন ভুল না করে। মেয়েকে নাহয় বোঝাতে পারে কিন্তু বাইরের ছেলেপেলেগুলোকে কিভাবে বোঝাবে! যদিও এডভোকেটের মেয়ে সে ভয়ে অনেকেই হৃদিলাকে কিছু বলতে সাহস পায়না বা সমীহ করে। কিন্তু মা হিসেবে অজানা আতঙ্কে মনটা সবসময় অস্থির হয়ে থাকে!

বিছানায় বসে শায়লা আস্তে আস্তে প্যাকেটটা খুলল। কেমন জানি একটা পরিচিত গন্ধ! মনের গহীনের শক্ত সুতোটায় কেমন জানি একটা হ্যাঁচকা টান পড়েছে। প্যাকেটের কাগজগুলো হাতে দেখছে শায়লা এমন সময় হৃদিলা দরজায় নক করল। শায়লা অন্য সময় হলে কাগজগুলো লুকোবার চেষ্টা করত কিন্তু আজ তা করলনা। হৃদিলা দেখতে পেল মায়ের চোখ দিয়ে অনবরত জল ঝরছে। মায়ের কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরে জানতে চাইল, “কি হয়েছে মা? জীবনের এতগুলো বছর কোনদিন তোমাকে কাঁদতে দেখিনি! আজ ওই লোকটা কি দিয়ে গেল যা হাতে নিয়ে তুমি এভাবে কাঁদছ?”
শায়লা প্যাকেটটা এগিয়ে দিল। হৃদিলা দেখতে পেল কিছু ছবি, সাথে কিছু কাগজ এবং একটা চিরকুট। ছবিগুলো মায়ের সাথে একজন লোকের। বুঝতে অসুবিধা হলনা তার যে এটাই তার বাবা। চিরকুটটা পড়ল সে তাতে লেখা আছে, “আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দেবার সময় হয়েছে তোমার। তৈরি করে রেখো আমি এসে নিয়ে যাব আর যদি তাতে আপত্তি কর তাহলে আমি আদালতে যাব কিন্তু! আমার সন্তান আমি নিয়ে যাবই যাব।”

হৃদিলা হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিয়েছে ভয়ে। শায়লা তাকে জড়িয়ে ধরে অভয় দিয়ে বলল, “কিছুই হবেনা তুমি শান্ত হও। তুমি তোমার বাবার গল্প শুনতে চেয়েছিলেনা?” হৃদিলা মা'কে জাপটে ধরে কাঁদছে। কোন মতেই সে কান্না থামাতে পারছেনা। মাকে বলল, “মা আমি শুধু তোমার সন্তান। তোমাকে ফেলে আমি কোথাও যাবনা।”

নিজের জীবনের কত অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে গেল তাই এখন আর কোন কিছুতেই ইতিবাচক চিন্তা করতে পারেনা সে। নিজেকে নিয়ে সবসময়ই নিজের কেমন জানি গর্ব হত শায়লা'র। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মাঝে মাঝে অবাক হত! সৃষ্টিকর্তা মানুষকে এত নিখুঁতভাবে তৈরি পারেন সেটা নিজেকে দেখেই কেমন জানি শিহরিত হত! আজ কতগুলো বছর সে আয়নায় নিজেকে আর ওভাবে দেখেনা। এডভোকেট শায়লাকে বিয়ে করার জন্য হাজারো যুবকের লাইন লেগে থাকত। কিন্তু কাউকেই শায়লা মনে ধরাতে পারেনি। অবশেষে বাবা মা'র পছন্দ করা পাত্রটিকে বিয়ে করার জন্য রাজী হয়ে যায়। পাত্র বাবা মা'র একমাত্র সন্তান, বিদেশী একটি এনজিওতে চাকুরী করে। ভাল বেতন সাথে গাড়ীও আছে। দেখতেও খুব স্মার্ট।

“বাসর রাত” নিয়ে যেকোন মেয়েই কত স্বপ্নের বাগান সাজায়! শায়লাও তেমনি একটি বাগান সাজিয়েছে মনের গহীনে। অজানা ভয় আর আবেগী শিহরণে শায়লা'র নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে এসেছিল। কিন্তু স্বপ্নের সাজানো বাগান কত সহজেইনা ভেঙ্গে যায়! মিনহাজ কি অবলীলায় বলে দিল সে শায়লাকে তার বাবা মা'র পছন্দে বিয়ে করেছে। এবিয়েতে তার তেমন মত ছিলনা। সে অন্য একটা মেয়েকে ভালবাসে। শায়লার মাথায় তখন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল! তবুও নিজেকে সে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করল। শায়লা বলল, “একথাটা তুমি আমাকে বিয়ের আগে বলনি কেন? আর যাকে ভালবাস তাকেইবা বিয়ে করনি কেন?” মিনহাজ বলল, “যাকে ভালবাসতাম তার চার বছর আগে বিয়ে হয়ে গেছে। তার দুটো বাচ্চাও আছে।” কথাটি শুনে যেন শায়লার গলা থেকে যন্ত্রণাময় কাঁটাটি নেমে গেল। শায়লা বলল, “কি ভয়ইনা পাইয়ে দিয়েছিলে! এক জীবনে একটা মানুষের অনেক অতীত থাকে যেগুলো মানুষের জীবনে হয়ত অনেক গুরুত্ববহন করে কিন্তু সেসব অতীত নিয়ে বর্তমানে মাতামাতি করার পক্ষপাতি আমি নই। তোমার সে অতীতের ছায়া যদি বর্তমানে না পড়ে তাহলে আমার কোন সমস্যা নেই।”

আস্তে আস্তে শায়লা পরিবেশটাকে খুব স্বাভাবিক করে নিল। সে চায়না জীবনের এই ধ্রুপদী সময়টুকু এমন হেলায় হেলায় কেটে যাক! সেদিন আকাশে অনেক পূর্ণিমা ছিল। জানালার কাঁচ গলে মায়াবী জ্যোৎস্না ভিজেয়ে দিচ্ছিল একজোড়া কপোত-কপোতীকে। আস্তে আস্তে কেমন যেন একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এল! পরম নির্ভরতায় মিনহাজের বুকে মাথা রেখে কাটিয়ে দিল সে রাত। মনে হয়নি একটুও যে ওরা কেউ কাউকে ভালবাসতে পারবেনা! পরদিন স্বাভাবিকভাবেই ওরা দিন শুরু করল। আত্মীয় স্বজনরা নতুন বউ দেখতে আসছে। সবাই বউ দেখে প্রশংসার বৃষ্টি বর্ষিত করছে। শায়লা নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা শুরু করে দিল।

দিন যতই যাচ্ছে কিন্তু মিনহাজকে শায়লা সেরকম স্বাভাবিক দেখছেনা। শায়লা কোর্টে চলে যায় সকালে
ফেরে বিকেলে। আর মিনহাজ ফেরে রাত দশটা এগারটায়। বাসায় থাকেন মিনহাজের মা- বাবা। একদিন বাসায় ফিরে নিজের রুমে ঢুকে পার্সটা বিছানায় রেখে বাথরুমে ঢোকে। হঠাৎ বাথরুমের দরজা খুলেই দেখে শ্বাশুড়ি তার পার্স খুলে কি যেন দেখছে! শায়লাকে দেখেই তিনি কেমন জানি চমকে উঠলেন এবং বললেন, “রিক্সা ভাড়া দেবো কিন্তু আমার কাছে খুচরো পয়সা নেই। ভাবলাম তোমার কাছে থেকে নেবো কিন্তু দেখলাম তুমি বাথরুমে তাই আমি---!”
শায়লা বলল, ঠিক আছে আম্মা কিন্তু এতে আপনি এত বিব্রত হচ্ছেন কেন? মেয়ের পার্স কি মা খুলতে পারেনা?”

শায়লা জানে কোন সাধারণ উদ্দেশ্য নিয়ে তার পার্স চেক করা হয়নি। কোথাও না কোথাও কোন ঘাপলা আছে। কিন্তু সেটা কি তাকে বের করতে হবে। বিয়ের আজ তিনমাস হতে চলল। মিনহাজ এই পর্যন্ত তাকে জিজ্ঞাসা করেনি তার হাতে টাকা পয়সা আছে কিনা বা তার টাকা লাগবে কিনা! কোথাও কোন শপিংএ গেলে মিনহাজ অপেক্ষায় থাকে বা অজুহাতে একটু দূরে সরে থাকে যাতে শায়লা নিজের কাছ থেকেই বিল পরিশোধ করে। ব্যপারগুলো কেমন জানি অদ্ভূত ঠেকে! কিন্তু নতুন বউ তাই কিছু বলতে তার কেমন জানি লজ্জা লাগে! কোথাও দু'জন মিলে খেতে গেলে কদাচিৎ বিল দেয় মিনহাজ কিন্তু বেশিরভাগই শায়লাকে দেয়া লাগে। পার্স চেক করার ঘটনার একসপ্তাহ পর শ্বাশুড়ি বললেন, “মা গত মাসের বাসা ভাড়াটা দেয়া হয়নি। মিনহাজকে তুমি বলো যেন বাড়ি ভাড়াটা দিয়ে যায়।” শায়লা বলল, “মা আপনিই বলুননা আপনার ছেলেকে। আমি বললে কি মনে করে আবার!” পরক্ষণেই আবার বলে, “আচ্ছা ঠিক আছে আম্মা আমি বলব।”


রাতে শায়লা কথাটা মিনহাজকে বলে কিন্তু যেই শোনা মাত্রই মিনহাজ তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল এবং বলল, “কেন তোমার কাছে বুঝি টাকা নেই! এই পর্যন্ত আমিই দিয়ে আসছি সব। এই মাসে তুমি দিলে কি সমস্যা? রাত বার'টায় বাড়ি ভাড়া ছাড়া কথা বলার কি আর কোন সাবজেক্ট নাই?”
শায়লা বলল, “এসব কি হচ্ছে মিনহাজ? সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে এমন উত্তেজিত হবার কি হল! বিয়ের পর এই পর্যন্ত কি তুমি আমার জন্য পাঁচটি টাকা খরচ করেছো? সেটা নিয়ে আমি কোন অভিযোগ করিনি তাহলে তুমি তোমার বাসা ভাড়া আমার উপর চাপাচ্ছো কেন? তোমার বেতন কোথায় যায়?”
মিনহাজ শায়লাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমার ব্যাপারে নাক গলাবেনা। এই বাসায় থাকতে হলে এই বাসার সবকিছুর দিকে তোমারও খেয়াল রাখতে হবে। তোমার আয় কিন্তু বেশ সেটা আমি জানি।”

সেদিনের মত শায়লা চুপ করে গিয়েছিল। অপমানে, ঘৃণায় তার মুখ থেকে এক দলা থুতু বেরিয়ে এল। কিন্তু সে এর শেষটা দেখতে চায়। পরদিন সকালে অফিস যাবার আগে শ্বাশুড়ির দরজায় নক করতে যাবে এমন সময় শুনতে পায় মিনহাজ ও তার মা কি যেন বলছে! ভাল করে কান পেতে শোনে ওর মা ওকে বলছে, “ঠিকমত বলেছিস তোর বউকে? ভাড়া দিবেত? দেখিস আবার বৌ তার বাপের বাড়িতে না তার সমস্ত উপার্জন পাঠিয়ে দেয়!”
মিনহাজ বলল, “না মা তা করবেনা। সে সুযোগ দিলেইত! তুমিও ওকে চোখে চোখে রেখো।”

শায়লা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারেনা। ওরা সবাই মিলেই তাহলে এমন ষড়যন্ত্র করছে! সে কি বাবা মাকে ফোন করে জানাবে? না তা করা যাবেনা তাহলে বাবা মা অনেক কষ্ট পাবেন। হঠাৎ কেমন জানি তার মাথাটায় চক্কর এল। এর পর কি হল তার মনে নেই। চোখ খুলে দেখে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়া হয়েছে এবং চারপাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। ডাক্তার তাকে দেখছে। শেষে ডাক্তার বললেন, “ভয়ের কিছু নাই আপনি মা হতে যাচ্ছেন।” শায়লা'র মুখের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। মিনহাজ ও তার মা মনে হল জোর করে একটু হাসলেন!

শায়লা তার নিজের ভেতরের প্রাণটিকে অনুভব করতে পারছে। কিন্তু সে এভাবে তাকে পৃথিবীতে আনতে চায়নি। বার বার নিজের মনকে বোঝাচ্ছে পরিবারে নতুন সদস্যটি এলে হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে! ততদিন তাকে কষ্ট করে যেতে হবে। বাসা ভাড়াটা এখন শায়লাই দেয়। নিজের প্রয়োজন নিজের টাকাতেই মেটায় কিন্তু আস্তে আস্তে শরীর ভারী হয়ে আসছে। এবার তার বিশ্রাম প্রয়োজন। ডেলিভারি'র আর তিন মাস বাকি- বাচ্চার জিনিসপত্র কেনা প্রয়োজন। এর মধ্যেই শায়লা'র বাবা মা এসে সব কিনে দিয়ে গেছেন। ইদানিং মিনহাজ ঠিক সময়ে বাসায় ফিরছেনা। কখনও রাত একটা বা দুটো বেজে যাচ্ছে বা কখনও সকাল হয়ে যাচ্ছে। এসব নিয়ে কোন কথাও বলা যাচ্ছেনা এই শরীরে।

এভাবেই একদিন ভোরবেলায় হৃদিলা'র জন্ম হল। শায়লা তার সব কষ্ট ভুলে গেল। কিন্তু মিনহাজের সময়ই হয়না যে মেয়েকে পাশে বসে একটু দেখার। তার অজুহাতের শেষ নাই। শায়লা এখন কোর্টে যেতে পারেনা তাই তার কাছে তেমন টাকা পয়সাও নেই। বাচ্চার জন্য কত খরচ দরকার কিন্তু অন্যসব খরচ দূরে থাক বাচ্চা'র দুধ কেনার টাকাটা পর্যন্ত মিনহাজ দেয়না। এই নিয়ে শায়লা চুপ থাকতে চায়না। নিজের জন্য সে উদাসীন থেকেছে, নিজের মাসের উপার্জন সে এই পরিবারের পেছনে ঢেলে দিয়েছে। আজ তার সন্তানের দুধ কেনার জন্য যে বাবা পয়সা দেয়না সেখানে সে আপোষ করবেনা। মিনহাজের সাথে এই নিয়ে কথা বলল কিন্তু মিনহাজ বলল, “থাকলে এভাবেই থাক আর না পোষালে চলে যাও।”

খুব কষ্ট পেয়েছিল সেদিন শায়লা। বাসার জামা পরেই হৃদিলাকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল। বাবা'র বাসায় এসে সব খুলে বলেছিল। মেয়ের এমন খবরে তিনমাসের মধ্যেই বাবা স্ট্রোক করে মারা গেল। খবর পেয়ে ওই পরিবারের একজন সদস্যও দেখতে আসেনি। প্রায় ছ'মাস পর শায়লা ভাবল, সে মিনহাজের মুখোমুখি হবে। তাকে কিছু কথা সরাসরি বলবে। এই ভেবে হৃদিলাকে মায়ের কাছে রেখে মিনহাজের বাসায় আসে। দরজা খুলে যে দৃশ্য দেখল তাতে সে আর স্থির থাকতে পারলনা। তারই বিছানায় মিনহাজ অন্য একজন নারী নিয়ে---! শায়লা জিজ্ঞেস করল, “এসব কি হচ্ছে? আম্মা, আব্বা কোথায়?”
মিনহাজ বলল, “বাবা মা গত মাসে আমেরিকায় চলে গেছেন বড় আপার ওখানে। তিন মাস থাকবেন।”
শায়লা বলল, “বাহ এই সুযোগে তুমি--ছিঃ!”
মিনহাজ বলল, “দেখ তোমার আর আমার কোন সম্পর্ক নাই। তুমি কেন এসেছো এখানে? আর এই মেয়েটি কে জান? সে হচ্ছে সেই মেয়েটি যাকে আমি ভালবাসতাম। সে আমার ভালবাসাকে দূরে সরিয়ে থাকতে পারেনি।”
শায়লা মহিলাটির দিকে তাকাল এবং জিজ্ঞাসা করল, “আপনার না দুটো বাচ্চা আছে? আপনি তাদের ফেলে চলে এসেছেন? আপনার স্বামীকে ফেলে চলে এসেছেন? আপনারা দুটো মানুষ ভাল থাকবেন বলে পাঁচটি মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন? একেমন ভালবাসা আপনাদের! আপনি কি আপনার সন্তানগুলোকেও ভালবাসেন না? আপনি কি একজন মা?” শায়লা আর স্থির থাকতে পারলনা।
মিনহাজকে বলল, “আমি ডিভোর্স লেটার পাঠাচ্ছি সেটাতে সাইন করে দিও। ভাল থেকো এই কথাটি বলতে পারলামনা সেজন্য দুঃখিত।”

সেদিনের পর থেকে শায়লা কোনদিন জানতে চায়নি মিনহাজ কেমন আছে! তাদের ডিভোর্স হয়ে যায়। হৃদিলা'র ভরণ পোষণের জন্যও শায়লা মিনহাজকে চাপ দেয়নি। মা, মেয়ে আছে বেশ ভালই। হৃদিলা এখন বড় হয়েছে সে তার বাবা সম্পর্কে জানতে চায় কিন্তু আর কত লুকিয়ে রাখবেন! হৃদিলাকে সব বলে কেমন জানি হালকাবোধ করতে লাগল শায়লা, কিন্তু হৃদিলা'র মনটা কেমন জানি ভারী হয়ে থাকে এসব জানার পর।


মন খারাপ নিয়েই দিনগুলো কাটছিল। শায়লাকে কোর্টে যেতেই হবে। আর কদিন কাজে না যেয়ে থাকবে। ভয়কে যতই প্রশ্রয় দেবে ভয় ততই চেপে বসবে! আস্তে আস্তে সব কিছুকে আবার সে মোকাবেলা করতে চায়। হৃদিলাকে আজও বলে গিয়েছিল বাসায় কেউ এলে যেন দরজা না খোলে, পরিচিত হলেওনা। কিন্তু হৃদিলা আজ মায়ের আদেশ ইচ্ছা করেই অমান্য করেছে। লোকটিকে দেখা মাত্রই তার ভেতরে আগুন ধরে গেল। সে দরজা খুলে তাকে বাসায় এনে বসাল। লোকটকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি সেদিনও এলেন যখন মা বাসায় থাকেনা, আজও এলেন কিন্তু মা বাসায় নাই। তার মানে আপনি জেনেই আসেন তাইত?” মিনহাজ বলল, “তোমার মা কিছু বলেনি?”
হৃদিলা বলল, “বলেছে সব বলেছে। আপনি আর কোনদিন এখানে আসবেননা কোন কিছুর দাবী নিয়ে। আমি আমার মাকে নিয়ে খুব ভাল আছি।”
মিনহাজ বলল, “তোমার মা তোমাকে হয়ত ভুল বুঝিয়েছে কিন্তু আমি তোমাকে নিতে এসেছি। চল আমার সাথে আমি তোমাকে সব খুলে বলব।”

হৃদিলা বলল, “না কক্ষনোনা। আপনি যান নইলে আমি পুলিশ ডাকবো।”
মিনহাজ অনেক ভাবে চেষ্টা করলো কিন্তু হৃদিলাকে একচুলও বোঝাতে পারলনা। এক পর্যায়ে রেগে গিয়ে হৃদিলার গলা চেপে ধরল। হৃদিলা চিৎকার দেবার অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা।

এর মধ্যেই শায়লা গেইট খুলে বাসায় এসে কেমন জানি ভড়কে গেল। হৃদিলাকে ডাকল কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছেনা। হৃদিলা'র রুমের দরজা বন্ধ। বাহিরে অপরিচিত একজোড়া জুতা দেখে শায়লা'র সন্দেহ আরও গাঢ় হতে থাকল! সে চিৎকার করে মেয়ের রুমের দরজা ধাক্কাছে আর ডাকছে, হৃদিলা- হৃদিলা দরজা খোল মা! প্রায় দশ মিনিট পর হৃদিলা দরজা খুলে বেরিয়ে এল। শায়লা দেখল রক্তে লাল হয়ে আছে মেয়ের পুরো শরীর। ঘরের মেঝেতে উপুড় হয়ে পড়ে আছে মিনহাজ! শায়লা কি জিজ্ঞাসা করবে কি বলবে কিছুই বুঝতে পারছেনা। হৃদিলাকে জড়িয়ে ধরতেই সে বলল, “ বলতে পার মা এই জীবনে কতটা ছিল তোমার অর্জন আর কতটা ছিল বিসর্জন?”
শায়লা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছু জানেনা সে, জানতে চায়না। হৃদিলাকে বুকের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “তুই আমার এখানটাতেই মিশে থাক। আমি জীবনের হিসেব কষতে চাইনে!” শায়লা মেয়ের মাথাটি কোলে নিয়ে বারান্দায় বসে আছে। আকাশে ভরা পূর্ণিমা আজ। এমন এক পূর্ণিমায় শায়লা পরম নির্ভরতায় মিনহাজের বুকে মাথা রেখেছিল! আজ হৃদিলা তার বুকে সেই নির্ভরতায় মাথা রেখে শুয়ে আছে। এভাবে কতক্ষণ কেটে গেল কেউ জানেনা---রাত বাড়ছে সাথে সাথে শায়লা'র বুকের ভেতরটাও কেমন জানি মোচড় দিয়ে উঠছে, ভাবছে আগামীকাল সকালে সূর্যের রঙটা কি কালো মেঘে ঢেকে যাবে!

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement