লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৪ অক্টোবর ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৬.১৮

বিচারক স্কোরঃ ৪.০৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftবিজয় (ডিসেম্বর ২০১৪)

জয়া
বিজয়

সংখ্যা

মোট ভোট ৪২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.১৮

আখতারুজ্জামান সোহাগ

comment ৩৫  favorite ৩  import_contacts ১,৭৭৫
এক
অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মমকে। বাইরে পৌষের সকাল, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা। ভিতরে এসি চলছে ফিসফিস শব্দে। তবুও ঘামছে মম। ওর নাকের ডগায় ক’ফোঁটা ঘাম। অপারেশন থিয়েটারের বাড়তি আলোয় ঝলমল করছে।
সংবাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও ডাক্তার ম্যাম এসে পৌঁছাননি। কাছে-পিঠে আর একটা হাসপাতাল রয়েছে। এই মুহূর্তে সেখানে তিনি একটা অপারেশন করছেন। সেটা শেষ করে সোজা এখানে চলে আসবেন।
ধবধবে সাদা বিছানায় টানটান শুয়ে আছে মম। ওর পুরো শরীরটা একটা নরম কাপড়ে ঢাকা। স্যাভলনের গন্ধ তাতে। চোখের সামনে চুনকাম করা ঝকঝকে সিলিং। কষ্টের মধ্যেও চিকন একটা হাসির রেখা ফুটল মমর ঠোঁটের কোণে। তার যুদ্ধ আজ শেষ হতে চলেছে।
শব্দ করে কারো মোবাইল ভাইব্রেট করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে নার্সকে মোবাইল রিসিভ করতে দেখল মম। ‘জ্বি ম্যাডাম। রেডি। জ্বি, এনেসথেসিয়া দিয়ে দিচ্ছি।’
নার্সদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। একজন নিচু স্বরে বললো, ‘ম্যাডাম চলে এসেছেন। আমরা এখন আপনাকে রেডি করব।’
মা’র মুখটা ভেসে উঠল একবার মমর চোখের সামনে। তারপর বাবার। তারপর ইকবালের।
এনেসথেসিয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে বোধ হয়। তলপেটের দিকটাতে এখন আর কোন সাড়া নেই। ‘কি চাও তুমি? তোমার মতো আমিও চাকরিটা হারাই?’ অনেক দূর থেকে কেউ যেন মমকে উদ্দেশ্য করে বলছে কথাগুলো। ইথারে ভেসে আসছে তা মমর কানে।
মম চোখ বুজল। দু’চোখ উপছে জল গড়িয়ে নামল কানের পাশ দিয়ে।

দুই
চৈত্রের মাঝামাঝি তখন। খুব গরম পড়ছিল সেই ক’দিন।
বাড্ডায় মমরা যে বাসাটায় ভাড়া থাকে সেটা ছয় তলা। মমরা বলতে মম আর ইকবাল, স্বামী-স্ত্রীতে মিলে দু’টো মাত্র প্রাণী। পাঁচতলায় দক্ষিণের ইউনিটের আড়াই রুমের এপার্টমেন্টটা নিয়ে ওরা রয়েছে বছর দুয়েক। ওদের দাম্পত্য জীবনের বয়সও ওই দুই বছর। বিয়ে করে মমকে এনে তুলেছিল ঐ বাসায়। ইকবালের অফিস মালিবাগে, মমর গুলশানে। বাসাটা তাই মোটামুটি মাঝামাঝি জায়গায় নেওয়া, যাতে দু’জনেরই যাতায়াতের সুবিধা হয়।
মমদের বাসার দক্ষিণের পাশটা এখনও ফাঁকা। কোন একটা ডেভলপার জায়গাটা নিয়েছে, বড়-সড় একটা বিলবোর্ড লাগিয়েছে, কিন্তু এখনও কনস্ট্রাকশনের কাজ শুরু করেনি। গরমের দিনে দক্ষিণের বারান্দাটায় এসে বসে মমরা। যখন লোডশেডিং মাত্রা ছাড়ায় তখন রাত্রিবেলা দক্ষিণের জানালাদু’টো খোলা রেখেই ঘুমোয়।
সেদিন একটু আগে ভাগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ইকবাল। সব কাজ গুছিয়ে মমর শুতে শুতে প্রায় এগারোটা। হঠাৎ মাঝরাতে ঝড় উঠল। সেটাই ছিল বছরের প্রথম কালবৈশাখী ঝড়। সেদিনের সেই কালবৈশাখী ঝড়টা যেন একটা রূপক! সেই ঝড়ের রাতেই প্রথম মম শুনতে পেয়েছিল একটা ঝড়ো বাতাসের আগমন ধ্বনি, তার দু’বছরের সংসার জীবনে।
ঝড়ে ধুলো উড়ছিল বাতাসে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আকাশের বুক ফালি ফালি করে, দু-একফোঁটা বৃষ্টিও পড়ছিল। ওপাশের ঘরের জানালা-দরজা আটকে দিয়ে এসে মশারি গুঁজে ইকবালের পাশে শুতে যাবে তখনই কথাটা মনে পড়ল মমর। ইকবাল তখনও দিব্যি ঘুমোচ্ছে, বাইরের ঝড়-বৃষ্টিতে তার রা নেই। মম কনুই দিয়ে আলতো করে গুঁতো দিল, ‘কই শুনছো?’
তবুও ইকবালের কোন সাড়া নেই। ওর-ই বা কী দোষ! সারাদিন অফিসে গাধার খাঁটুনি। আবার তো উঠতে হবে কাল কাক-ডাকা ভোরে!
‘কই, শুনছো?’ ইকবালের চুলে আঙুল দিয়ে বিলি কাটতে কাটতে আবার বললো মম।
‘হুম।’ এবার ছোট্ট সাড়া দিল ইকবাল।
‘আমার তো ডেট ছিল গত সোমবার। আটদিন হয়ে গেল, কিন্তু এখনও তো হলো না।’
‘কিসের ডেটের কথা বলছো?’ ইকবালের কণ্ঠে জড়ানো ঘুম।
‘কিসের আবার? আমার পিরিয়ডের।’ বললো মম।
এবার একটু চোখ পিটপিট করে তাকাল ইকবাল, ‘হয়নি হবে। এখন ঘুমোও তো, সকালে অফিস আছে।’ তার গলায় বিরক্তি।
‘অফিস তো আমারও আছে। এই শোন না, আমার খুব টেনশন হচ্ছে।’ বললো মম।
‘এত টেনশনের কি আছে?’ উড়িয়ে দিতে চাইল ইকবাল।
তবুও মমর মন মানছিল না, ‘আছে। আমার তো কখনো এমন হয় না, তুমি জানো।’ একটু দম নিল মম, ‘তুমি কালই একটা স্ট্রিপ নিয়ে এসো। আমি প্রেগনেন্সি টেস্ট করব।’
‘তুমি অযথা-ই টেনশন করছো। তুমি খুব ভালো করেই জানো, আমরা শুধু সেফ দিনগুলোতে...।’
‘তারপরও। আমার সন্দেহ হচ্ছে।’ মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললো মম। ইকবাল পাশ ফিরে শুলো।
পরের দিন প্রেগনেন্সি টেস্টের স্ট্রিপ নিয়ে এলো ইকবাল অফিস থেকে বাসায় ফেরার সময়। রাতটা ভীষণ দুশ্চিন্তা-ই কাটল মমর। ওরকম-টা হওয়ার কোন কারণ নেই জানে। তবুও। যদি সন্তান চলে আসে! এ মুহূর্তে সন্তান আসার অর্থ মমকে চাকরি ছাড়তে হবে। প্রতি মাসে ইকবালের বাড়িতে টাকা পাঠাতে হয়। সেখানে ওর বাবা-মা রয়েছে। ছোট একটা ভাই, একটা বোন রয়েছে- দু’জনই পড়ছে এখনও। এদিকে নিজেদের সংসারে হাজারও খরচ। স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলে চাকরি করেই মাস চালানো ভার। তার উপর যদি মমকে চাকরি ছাড়তে হয় তাহলে তো না খেয়ে থাকতে হবে! মম ভাবতেই পারছিল না।
ভোররাত্রে যখন ইউরিনে স্ট্রিপ ডুবাল তখন তাতে ভেসে উঠল খুব উজ্জ্বল দু’টো দাগ। তা দেখেই কপালে ভাঁজ পড়ল মমর। দু’টো দাগের অর্থ সে জানে। সে প্রেগনেন্ট। কিন্তু? কোথা থেকে যে কি হলো! শোবার ঘরে ইকবাল তখনও ঘুমে অচেতন। একবার ভাবল তাকে ডেকে তুলে সংবাদটা দেয়। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত বদলাল। হাত লাগাল রান্নার কাজে।
কিছুক্ষণবাদে ইকবাল ঘুম থেকে উঠল। উঠেই সোজা কিচেনে। ‘কি খবর?’ জানতে চাইল মমর কাছে। মম বুঝল, আগের রাতে ‘এখন ঘুমোও তো, সকালে অফিস আছে’ বলে ইকবাল যতই ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দিক না কেন ভিতরে ভিতরে সেও যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিল এটা নিয়ে। অন্যদিন ঠেলেঠুলে ঘুম থেকে ওঠানো যায় না। আজ নিজে নিজেই সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে চলে এসেছে রান্নাঘরে।
মম চুপ করে রইল। তার মুখ ভার। সেটা দেখেই কিছুটা অনুমান করতে পারল ইকবাল। তারপরও মমর মুখ থেকে সে শুনতে চায়। মম কথাটা বলতেই নিজের মাথার চুল টানতে লাগল ইকবাল। বললো, ‘কিন্তু কিভাবে? আমরা তো শুধু সেফ দিনগুলোতেই...।’
‘সেফ দিনগুলো সব সময় সেফ নয়।’ মম বললো, ইকবালের দিকে না তাকিয়েই।
ইকবাল কোন কথা না বলে বাথরুমে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে এসে আবারও দাঁড়াল মমর পাশে, ‘এখন কি করবে ভাবছো?’
‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’ বললো মম ধরা গলায়।
‘একবার আল্ট্রাসনো করলে কেমন হয়? স্ট্রীপের রেজাল্ট তো ভুলও হতে পারে।’ বললো ইকবাল।
এ কথাটা যে মম ভাবেনি তা নয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম তো অবশ্যই করবে কিন্তু সেটা আরও কয়েকদিন পর। এখন করলে কিছুই বোঝা যাবে না। কাজেই এ মুহূর্তে ধৈর্য্য ধরা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
সেদিন অফিসে গিয়ে কাজে মন বসাতে পারল না মম। লাঞ্চের পরে প্রতিদিনের মতো একবার ফোন করল ইকবালকে। কিন্তু অন্যদিনের মতো কথোপকথন ঠিক জমল না। বারবারই সকালবেলার টেস্টের রেজাল্টটা মাথা গলিয়ে দিতে লাগল এ-কথা ও-কথার ফাঁকে।
অবশ্য সেদিন রাতে ইকবাল বাসায় ফিরল একটু হালকা মেজাজে। ফিরেই মমকে বললো, ‘শোন, অনেক ভেবে চিন্তে দেখলাম, অযথা টেনশন করার কিছু নেই। সন্তান আসলে আসুক। এমন তো না যে আমরা কখনোই সন্তান নেব না। কাজেই শুভস্য শীঘ্রম।’ বলে হাসল একটু।
ইকবালের কথায় একটু হালকা বোধ করল মম। কিন্তু পুরোপুরি ভারমুক্ত হতে পারল না। এই মুহূর্তে সন্তান এলে তার ক্যারিয়ারের কী হবে? সাড়ে-তিনবছর ধরে অক্লান্ত খেটে এই প্রতিষ্ঠানে নিজের একটা স্থান করে নিয়েছে সে। এ রকম একটা চাকরি এখন যদি হারাতে হয়! ইকবালকে বললো, ‘সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু সন্তান মানুষ করতে গিয়ে যদি আমাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয় তাহলে কি হবে? তুমি একা পারবে সংসার চালাতে?’
একটু দমে গেল ইকবাল, তারপরও ফুসফুস ভরল বাতাসে, ‘সে একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আর তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে কেন? তুমি ছুটি নেবে। এখন তো সব কোম্পানি মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়।’
‘তুমি আমার কোম্পানীর বিষয়ে জানো না। এখানে বেতন ভালো, সুযোগ-সুবিধাও খারাপ না। কিন্তু এই ব্যাপারটাতে! কোম্পানী আমাকে ঠিকই ছুটি দেবে কিন্তু তারপরে কোন না কোন একটা কারণ দেখিয়ে আমাকে বের করে দেবে।’ বললো মম।
‘তুমি এতটা শিওর হচ্ছো কিভাবে?’ ইকবালের মাথায় আসলেই ঢুকছিল না।
‘সুমাইয়া আপুর কথা তো তুমি কিছু জানো না। বাচ্চা হওয়ার পরে উনি আর অফিসে টিকতে পারেননি।’ বললো মম।
ইকবাল চুপ করে গেল। এঘর-ওঘর পাইচারি করল কিছুক্ষণ। তারপর রিমোট নিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসল সোফায়, টিভিতে খেলার চ্যানেল ছাড়ল। মম চলে গেল কিচেনের দিকে।
সপ্তাহ দু’য়েক পরে আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হলো। ঠিক তাই! জানা গেল মম মা হতে চলেছে। ঠিক এই সময়ে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দিল মমর শরীরে। সে ঠিকমতো খেতে পারে না, খেতে গেলেই বমি বমি লাগে। রাতে ঘুমোতেও পারে না ঠিকমতো। মমর মনে হচ্ছিল সময়ের সাথে সাথে এগুলো একসময় সয়ে যাবে। কিন্তু ব্লিডিং এর ব্যপারটা! প্রায়ই রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সেই সাথে দেখা দিল আরও কিছু মেয়েলী সমস্যা।
একদিন অফিস শেষে ইকবালকে নিয়ে মম ছুটল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার ম্যাম বললেন ‘কমপ্লিট রেস্ট নিতে হবে। অন্তত দু-তিনমাস।’ শুনে মমর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তাহলে অফিস?
কিছুদিনের ছুটির কথা বলতেই মমর অফিসের বস সোজা না করে দিলেন। তখন চোখে সরষে ফুল দেখতে লাগল মম। সব শুনে ইকবাল বললো, ‘চলো, তাহলে এবরশন করে ফেলি।’
ইকবাল এমন একটা কথা বলবে ভাবতে পারেনি মম। প্রথমটায় তাই নিজের কানকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। আঁতকে উঠে বললো, ‘মানে?’
ইকবাল একটু সময় নিল, ‘দেখো, এই অবস্থায় তোমার চাকরিটা আমাদের দু’জনের জন্য, আমাদের সংসারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই বলছিলাম।’
যে সন্তান তিলে তিলে বড় হচ্ছে তার গর্ভে তাকে নষ্ট করার কথা কিছুতেই ভাবতে পারে না মম। এত বড় পাপ সে করবে না মরে গেলেও। ‘আমি কিছুতেই পারব না। কিছুতেই না।’ বললো মম।
‘তাহলে করো তোমার যা ইচ্ছা।’ বললো ইকবাল। তারপর পাশ ফিরে শুলো।
সেরাতে ঘুম আসছিল না মমর। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কাটাল অনেক রাত পর্যন্ত। ওর পাশে ইকবালের ভারী নিঃশ্বাস। কিচেনে ঢুকে চা করল মম। তারপর দক্ষিণের বারান্দায় বসল। সামনের খালি জায়গাটাতে উঁচু করে বসানো বিলবোর্ডটার উপর চোখ পড়ল। ‘হ্যাপি নেস্ট।’ দারুণ তো নামটা! এখানে ওরা মাঝে মাঝেই বসে। আগে কখনো চোখে পড়েনি তো নামটা! ডেভেলপার বাড়ি বানিয়ে এপার্টমেন্ট বিক্রি করবে। এক-একটা এপার্টমেন্ট হয়ে উঠবে এক-একটা সুখী নীড়! মমর হঠাৎ কান্না পাচ্ছিল।
মায়ের সাথে কথা বললো মম একদিন। তারপর মনে জোর পেল অনেকটা। শারীরিক অসুস্থতা আর মানসিক চাপ নিয়েই মম অফিস করতে লাগল সকাল-সন্ধ্যা। দু’হাতে সামলাতে লাগল সংসার। শুরুতে যেসব শারীরিক সমস্যা হচ্ছিল তাও যেন একটু একটু করে কমতে লাগল।
‘আচ্ছা, বলো তো, আমাদের কি হবে? ছেলে নাকি মেয়ে?’ একদিন জানতে চাইল ইকবাল। অনেকদিন পর সেদিন তাকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছিল। রাতে খাবার পরে দু’জনে বসে ছিল ওরা ওদের দক্ষিণের বারান্দায়। এ-ক’দিনে এবরশনের চিন্তা থেকে তাহলে সরে এসেছে ইকবাল! ইকবালের প্রশ্ন শুনে মমর তাই মনে হলো।
‘আমাদের মেয়ে হবে।’ নির্দ্বিধায় বললো মম। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে।
‘তুমি কিভাবে জানো?’ জানতে চাইল ইকবাল।
‘আচ্ছা তার আগে বলো, তুমি কি চাও? কি হলে তোমার বেশী ভালো লাগবে?’ উল্টো প্রশ্ন করল মম।
‘দেখো, এখন যে অবস্থা দু’টো সন্তান মানুষ করা সো টাফ। কাজেই আমরা একটাই নেব। যদি প্রথম সন্তান ছেলে হয় তাহলে আর ট্রাই করব না। কিন্তু যদি মেয়ে হয়, তাহলে তো আবার ট্রাই করতে হবে। আর সেটা আমি চাই না। তাই আমার ইচ্ছে আমাদের ছেলে হোক।’ বললো ইকবাল।
মমর ধারণা ছিল ইকবাল হয়তো বলবে মেয়ের কথা। বলবে মেয়ে হলেই সে বেশি খুশি হবে। ছেলেরা তো অধিকাংশ সময় প্রথম সন্তান মেয়েই চায়! তাছাড়া ইকবাল শিক্ষিত, ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়েছে, ভালো পরিবেশে মানুষ হয়েছে। অথচ সেও এই রকম একটা ধারণার বৃত্তে বন্দী! অনেক কথাই বলতে ইচ্ছে করছিল ইকবালকে। কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল কষ্ট। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মম শব্দ করে।

‘তুমি কষ্ট পেলে? আচ্ছা, এখন জানা যায় না আমাদের কি বেবি আসছে?’ জানতে চাইল ইকবাল।
‘হুম।’ ছোট করে বললো মম।
‘তাহলে চলো, আল্ট্রাসনো করি।’
‘কোন দরকার নেই।’ বললো মম। ইকবালকে আর কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে চলে গেল ঘরে। বিছানা তৈরি করতে লাগল শুয়ে পড়বে বলে।
কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে হলো। ডাক্তারের পরামর্শেই করতে হলো। সেদিনও ইকবাল গিয়েছিল মমর সাথে। মমর সত্যিই কোন আগ্রহ ছিল না আগেভাগে তার অনাগত সন্তানের লিঙ্গ-পরিচয় জানার। কিন্তু ইকবালের জন্যই সে জানতে চাইল ডক্টর ম্যামের কাছে। মমর কথা শুনে আল্ট্রাসনোগ্রাম করতে করতেই তিনি উল্টো প্রশ্ন করলেন মমকে, ‘আপনি কি চান? ছেলে না মেয়ে?’
মম বললো, ‘মেয়ে।’ বললো সত্যি, কিন্তু প্রাণপণে চাচ্ছিল তার এই চাওয়াটা পূরণ না হোক। তার নিজের জন্য নয়, ইকবালের জন্য। হয়তো ইকবালের মা-বাবার জন্যও। কিন্তু মমকে বিষাদে ডুবিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন ম্যাম, ‘আপনার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে। আপনাদের মেয়ে হতে যাচ্ছে।’
খবরটা শুনে সেদিন ডাক্তারখানায় পুরোটা সময় মুখ কালো করে ছিল ইকবাল। বাসায় এসেই সে জানিয়ে দিল তার সিদ্ধান্ত, ‘তুমি এবরশন করে ফেল। শুধু শুধু ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই।’
‘তুমি এটাকে ঝামেলা বলছো?’ বললো মম।
‘ঝামেলা ছাড়া কি? ছেলে হলেও না হয় কথা ছিল!’ বললো ইকবাল। বাথরুমে ঢুকল। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে রেরিয়ে এলো। এসেই বললো, ‘বাচ্চার জন্য এত উতলা তো তুমি ছিলে না। তাহলে এখন এবরশন করতে এত বাধছে কেন?’
‘আমি সন্তানের জন্য উতলা ছিলাম না। কিন্তু তাই বলে! আর আমি চাইলেও এখন আর তা সম্ভব নয়।’
‘কেন সম্ভব নয়?’ ইকবাল যেন বেপরোয়া হয়ে উঠল।
‘বেবি বড় হয়ে গেছে। তাছাড়া এটা আমাদের প্রথম বেবি। এবরশন করতে গেলে অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। চিরজীবনের জন্য আমি মা হওয়ার ক্ষমতাও হারাতে পারি।’ বললো মম। শান্ত কণ্ঠে।
‘তুমি সব জেনে বসে আছো না?’ ইকবাল চোখ রাঙাল।
মম প্রত্যুত্তর করল না। ইকবালও চুপ করে গেল।
ইকবাল ওর বাড়িতে মমর মা হতে যাওয়ার খবরটা প্রথমটাতে বলেনি। সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানার পরে যখন সে সবকিছু বললো তখন মমর শ্বাশুড়ি মমকে ফোন করেছিলেন। সরাসরি কিছু বলেননি, কিন্তু আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছিলেন, পরামর্শ দিয়েছিলেন বাচ্চা নষ্ট করে ফেলতে। মম বুঝেও না বোঝার ভান করেছিল, হ্যাঁ-হুঁ করে ফোন রেখে দিয়েছিল। এরপরও মা-ছেলের মধ্যে এ নিয়ে কথা-বার্তা চলছিল এটা বুঝতে পেরেছিল মম, কিন্তু অতটা গা করেনি। মনে মনে সিদ্ধান্তটা সে নিয়েই ফেলেছিল। আর ধরে নিয়েছিল, এটা তার জন্য একটা যুদ্ধ। আর এটাও বুঝে গিয়েছিল এ যুদ্ধটা তার শুধুই একার। কষ্ট হতো। ভীষণ কষ্ট হতো মমর। যখন চোখের সামনে ইকবাল একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল। যখন বদলে বদলে যেতে যেতে একটু একটু করে অচেনা হয়ে উঠছিল ওর কাছে!
সূর্যের তেজ কমে এসেছে, দিনগুলো ছোট হয়ে এসেছে অনেকটা। পাঁচটা বাজতে না বাজতেই এখন আঁধার ঘনিয়ে আসে রাস্তায়। তাছাড়া মমও আগের মতো হাঁটাচলা করতে পারে না। সে কারণে অফিসে মাতৃত্বকালীন ছুটি চাইল মম। বস বললেন, ‘দেখছেন তো অফিসে কাজের কত চাপ। এর মধ্যে কিভাবে আমি আপনাকে লম্বা ছুটি দিই বলেন তো?’
‘কিন্তু স্যার!’ মম বোঝানোর চেষ্টা করল বসকে। কিন্তু বসের সেই একই কথা, ‘আরও কিছুদিন করার চেষ্টা করেন।’
যখন বুঝল সোজা আঙুলে কাজ হবে না তখন মম একটু আঙুল বাঁকা করার চেষ্টা করেছিল। বসও বাঁকা কথা বলে দিলেন মুখের উপর, ‘তাহলে আপনার জায়গায় আমাকে নতুন কাউকে নিয়ে নিতে হবে। আমার অফিসে তো আর বাড়তি লোক নেই।’
সেদিন বাসায় এসে ইকবালকে সব কথা বলতেই সে হুঙ্কার দিয়ে উঠল, ‘এখন আমাকে এসব বলে কি হবে? আমি তো আগেই বলেছি...।’
মম বসে রইল বারান্দার গ্রিল ধরে। বিষণ্ন। অবসন্ন। বাইরে শীতের তোড়জোড়। দূরের ল্যাম্পোস্টের বাতি ঘিরে কুয়াশার ঘোর। ঘোরের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে মমও। ওর কেবলই মনে হচ্ছিল ইকবালের কথা শোনাই বোধ হয় ঠিক ছিল। কি দরকার ছিল এসব ‘ঝামেলা’ পোহানোর! পরক্ষণেই ভিতর থেকে কেউ একজন বাধা দিয়ে উঠল মমকে। মমর ঘোর কাটল!
ছুটি পাশ হলো না। বাড়িতে বসে থাকা মানুষের বেতন দিতে চায় কোন্ অফিস! মম অফিস যাওয়া বন্ধ করে দিল। একদিন হিয়া ফোন করেছিল মমর কাছে, খোঁজ নেওয়ার জন্য। ওর কাছে শুনল মমর জায়গায় নতুন একটা মেয়েকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে অফিসে।
মম ভারী হয়ে পড়ল অনেক। এখন সংসারের কাজ-কর্মও করতে পারে না। দু’জনার সংসার হলেও কাজ নিতান্ত কম নয়। রান্না-বান্না, ঘর-দোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, জামা-কাপড় কাচা। একজন কাজের লোক রাখতে পারলে ভালো হতো। ইকবালকে বলতেই সে ফুঁসে উঠল, ‘একজনের আয় দিয়ে তো সংসারই চলবে না। তার উপর কাজের লোকের জন্য বাড়তি টাকা কি ভূতে যোগাবে?’
মমর চোখের কোণ ভিজে উঠল, ‘তুমি সব সময় আমার সাথে ওভাবে কথা বলো কেন? যে আসছে সে কি শুধু আমার একার সন্তান? তোমার নয়?’
‘আমি চেয়েছিলাম সন্তান তোমার কাছে?’ ইকবালের কণ্ঠে বিদ্রুপ। এই ইকবাল একদম অচেনা মমর। এই ইকবাল সেই ইকবাল নয় যে ছুটির দিনে মমকে রিকশা করে শহর দেখাতো, হাতিরঝিলে নীল-আকাশ মেঘের বিকেলে গা ঘেঁষে বসে বাদাম চিবাতো, রঙিন স্বপ্নের জাল বুনতো। এই ইকবাল সেই ইকবাল নয়, কখনোই।
কি বলবে আর মম! তারপরও আকুতি করে বললো, ‘তোমার মাকে একটু বলো না হয় এখানে এসে থাকতে ক’টা দিন।’
‘ছেলে হলেও কথা ছিল। হবে তো মেয়ে। তোমার মেয়ে ধরার জন্য আমার মা আসতে পারবে না।’ বলে অফিসের জন্য বের হয়ে গেল ইকবাল।
অনন্যোপায় হয়ে শেষমেষ নিজের মাকে এসে থাকতে বললো মম ওদের সাথে। ওর মা’ও ঝাড়া হাত-পা নয়। তাঁর নিজের সংসার রয়েছে, রয়েছে হাজারও ঘর-গৃহস্থালির কাজ। তাছাড়া মমর বাবার ডায়াবেটিস, তাঁর শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না ইদানীং। মা চলে এলে ওদিকে ভাবী একলা পড়ে যাবে, একা সব দিক কুলিয়ে উঠতে পারবে না। আবার এদিকে প্রথম সন্তানের মা হতে যাচ্ছে মেয়ে। খুব বেশি দিনও তো বাকি নেই! এমন সময় কাউকে না কাউকে অবশ্যই সার্বক্ষণিক তার পাশে থাকা উচিৎ। বলা যায় না কখন কি হয়ে যায়! সব ভেবেচিন্তে মমর মা ঢাকা চলে এলেন, এসে রইলেন মেয়ের সংসারে।
মমর মা এসে থাকাতে সংসারের কিছুটা শ্রী ফিরল। ইকবালও গলা উঁচু করে না যখন তখন। বরং যতক্ষণ বাসায় থাকে একটু বাড়তি রকমের গম্ভীর হয়ে থাকে সে। এভাবেই চলছিল দিন। এক সময় মম বুঝতে পারল দিন ঘনিয়ে এসেছে। আল্ট্রাসনোগ্রাম এর রিপোর্ট অনুযায়ী এখন আর দিন নয়, কয়েকঘণ্টার অপেক্ষা।
আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে মম ইকবালকে বলেছিল, ‘জানো, আমার খুব ভয় হচ্ছে। মনে হচ্ছে আজই কিছু একটা হয়ে যাবে।’
গলায় টাই বাঁধতে বাঁধতে ইকবাল নির্লিপ্ত গলায় বললো, ‘হলে হবে।’
‘আমাদের প্রথম বেবি আসছে। তুমি আমার সাথে থাকবে না? তুমি আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে না?’ মমর গলায় মিনতি।
‘অফিসে ভীষণ কাজের চাপ। আমি কোনভাবেই কামাই করতে পারব না। কি চাও তুমি? তোমার মতো আমিও চাকরিটা হারাই?’ ইকবালের গলায় শ্লেষ।
‘তাই বলে!’ মম কথা শেষ করতে পারল না।
‘তোমার মা তো রয়েছেনই। অবস্থা সে রকম দেখলে একটা সিএনজি ডেকে হাসপাতালে চলে যেও।’ বললো ইকবাল। তারপর বেরিয়ে গেল হনহন করে।
মম বুঝতে পারছিল দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ইকবালের সব কথা শুনেছেন মা। নিজেকে ভীষণ অপমানিত মনে হচ্ছিল তখন। মম যেখানে নিয়মিত দেখায় সে হাসপাতাল ওদের বাসা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। তাই বলে এই সময় এইভাবে কোন মানুষ বলতে পারে! ইকবাল চলে যাওয়ার পরে মা এসে বসলেন মমর পাশে। মম দেয়ালের দিকে মুখ ফিরে শুলো। এ মুখ সে নিজের মাকেও দেখাতে পারবে না।
সাড়ে ন’টার দিকে মমর প্রসব বেদনা শুরু হলো। মমর মা নিচে নামলেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সিএনজি ডাকলেন।

তিন
মম চোখ মেলে তাকাল। তিন-চারজন তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাদের সবার পরনে আকাশী রঙের এপ্রোন, মুখে হালকা সবুজ রঙের মাস্ক। ডাক্তার ম্যামকে চিনতে পারল মম। তারপাশে দাঁড়িয়ে আরও কয়েকজন। সবাই নার্স হবে বোধ হয়। ডাক্তার ম্যাম মমর কানের কাছে মুখ এনে জানতে চাইলেন, ‘ব্যথা হচ্ছে?’
মম ঘাড় নাড়ল। শরীরে ব্যথা-বেদনার কোন অনুভূতি এখন তার নেই। মমর মনে হচ্ছে, সে সাঁতার কাটছে। কখনো ডুব-সাঁতার, কখনো চিৎ-সাঁতার। এই একটু আগে সে তলিয়ে গিয়েছিল ঘোলা পানির নিচে, এইমাত্র সে ভেসে উঠেছে। আচমকা আবার তলিয়ে গেল পয়সা তলিয়ে যাওয়ার মতো। ফের ভেসে উঠল, যেভাবে ডোবার পানিতে হঠাৎ ভেসে ওঠে রূপালী পেটের মাছ। তারপর আবার নিকষ কালো অন্ধকার।
একটা বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনতে পেল মম। খুব কাছেই। তারপরই আবার সব কিছু নিস্তব্ধ। যেন কানে তালা লেগে যায়। একটুবাদে কয়েকজন মানুষের পায়ের আওয়াজ ভেসে এলো এদিকটায়। তারপর আবার নীরবতা।
বাচ্চাটা এখনও কাঁদছে। কেউ বাচ্চাটাকে থামাচ্ছে না কেন! মম অবাক হচ্ছিল। কেউ একজন মমকে হাত দিয়ে নাড়া দিল। ‘এই দেখেন, কী ফুটফুটে একটা মেয়ে হয়েছে আপনার! এই দেখেন।’ কেউ একজন বললো মমকে।
মম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল। ‘ও, মেয়ে!’ মম চোখ বুজল। মা’র মুখটা ভেসে উঠল একবার চোখের সামনে। কোথায় মা? অপারেশন থিয়েটারের বাইরে হবে হয়তো। মা যদি একবার হাতটা রাখতেন ওর মাথার উপরে, ছেলেবেলায় জ্বর হলে যেমন রাখতেন!
মম আবার তলিয়ে গেল। ঘোলা জলের নিচে।

চার
প্রায় পনের ঘণ্টা পরে মমর জ্ঞান ফিরল। প্রথমটায় বুঝতেই পারল না সে কোথায় আছে। দেয়ালে শূন্য পাওয়ারের একটা রঙিন বাতি জ্বলছে। হালকা গতিতে ফ্যান চলছে মাথার উপরে। মমর গলা পর্যন্ত ভারী কাপড়ে ঢাকা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মম। একটা আবছা মূর্তি বসে রয়েছে তার মাথার কাছে। মমকে নড়তে দেখে আবছা মূর্তিটিও নড়ে উঠল, মাথা নিচু করে এগিয়ে এলো মমর দিকে। ‘মম, মা আমার।’ ডাকলেন মা। মম হাত বাড়িয়ে দিতেই দু’হাতে হাতটা জড়িয়ে ধরলেন।
একটু বাদে বাতি জ্বালালেন মা। দেয়ালঘড়িতে রাত দু’টো। মমর পাশে নরম কাপড়ে মোড়া নবজাতক, মমর মেয়ে। মেয়েকে দেখামাত্রই বাস্তবে ফিরল মম। তলপেটের ব্যথাটাও যেন ফিরে এলো। সেই সাথে ফিরে এলো স্মৃতি। মনে পড়ল ইকবালের কথা। ‘মা, ইকবাল কোথায়?’
‘বাইরে। বসে আছে।’
‘এখনও বসে আছে! কাল তো ওর ওফিস আছে। ওকে বাসায় যেতে বলো। অফিস থেকে এসে কিছু খেয়েছে?’
‘ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না তোকে। আমরা একভাবে চালিয়ে নিয়েছি। মেয়েকে দেখবি? রাজকন্যার মতো মেয়ে হয়েছে তোর। দুধের মতো গায়ের রঙ।’ বললেন মা।
মম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করল। কাপড়-চোপড়ের কুণ্ডলীর মধ্যে একটু শব্দ করে কেঁদে উঠল যেন মেয়েটা।
‘ইকবাল কি করেছে জানিস?’ খুশি-খুশি গলায় বললেন মা।
মম তাকাল জিজ্ঞাসু চোখে।
‘অফিস থেকে ফেরার সময় রাজ্যের জিনিসপত্র কিনে এনেছে। ল্যাক্টোজেন, ডায়াপার, ওয়েল-ক্লথ। ছোট একটা মশারি কিনে এনেছে। বেবি লোশন, ক্রিম আরও কত কী! সবকিছুর আমি নামও জানি না। এত করে বললাম, বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসতে। কিছুতেই গেল না। বললো তোর সাথে দেখা করে তবে যাবে।’
‘তুমি ওকে একটু ডাকবে মা!’ বললো মম।
মা উঠে চলে গেলেন কেবিনের বাইরে। একটু বাদে ইকবাল ঢুকল। এসে বসল মমর মাথার কাছে। মম একটা হাত বাড়িয়ে দিতেই মাঝপথে হাতটা ধরল। তারপর মমর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে একটা চুমু খেল কপালে। মমর চোখ দিয়ে জল গড়াল।
অনেকক্ষণ বসে রইল ইকবাল। মমর হাত ধরে। এক সময় বললো, ‘আব্বা-মা আসছেন রাতের গাড়িতে। বলেছি সোজা হাসপাতালে আসতে। নাতির মুখ দেখে তারপর বাসায় যাবে। ভালো করেছি না?’
‘হুম।’ বললো মম। একটু হাসার চেষ্টা করল। জিব দিয়ে ঠোঁট চাটল। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।
‘মেয়ের নাম কি রাখবে ঠিক করেছো?’ জানতে চাইল ইকবাল।
জন্ম নিয়েই সব কিছু জয় করতে শুরু করেছে এই মেয়ে! এই মেয়ের নাম ‘জয়া’ই থাক। বললো মম মনে মনে। তারপর চোখ বুজল। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তার। এক সময় ইকবালের হাতটা হাতের মুঠিতে নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ল।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement