লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৭ আগস্ট ১৯৭৮
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৭৪

বিচারক স্কোরঃ ২.৬৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০৬ / ৩.০

বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

keyboard_arrow_leftকৈশোর (মার্চ ২০১৪)

বন্ধু
কৈশোর

সংখ্যা

মোট ভোট ২৪ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৭৪

জাতিস্মর

comment ২৯  favorite ২  import_contacts ২,৩১৩
এই গাঁয়ের এক রাখাল ছেলে,
লম্বা মাথার চুল,
কালো গায়েই কালো ভ্রমর,
কিসের রঙ্গিন ফুল...
উত্তরকুল আর দক্ষিণকুল। উত্তর কুলের বাসিন্দারা একটু বনেদি। পুরো কুল জুড়েই দুইটা বাড়ি। এক বাড়িতে আবার কেউ থাকেনা। সেই হিসেবে উত্তর কুলের বসবাসরত বাড়ি একটাই। বিশাল কাঠের দোতালা বাড়ি। উঠোন থেকে এক তলার বারান্দায় উঠতেই ভাঙ্গতে হয় ৭/৮ টি সিঁড়ী। লম্বা ঝুল বারান্দা। বারান্দার সামনেই বিশাল বড় এক উঠোন। ধান ভাঙ্গবার জন্য। শীতকালের শুরুতে যখন ধান কাটার মওসুম শুরু হয় তখন এই উঠোনের মধ্যে ধান, গাছ সহ স্তূপ করে রাখা হয় গরু দিয়ে মাড়ানোর জন্য। তখন হয় এক এলাহি কারবার। সারা রাত ধরে চলে ধান মাড়ানোর উৎসব। মহিলারা বাড়ির পেছনে রান্নাঘরে বানায় পিঠাপুলী আর কিছুখন পরপর ছোটোরা টিনের গামলা ভর্তি করে সেগুলো পৌঁছে দেয় বদলাদের (যারা ধান মাড়াই করেন) কাছে। আর বদলারা সেই ধান মাড়াই করে সুর করে ওজন দেয়। এই এক কুড়ি এক...এক কুড়ি এক...এক কুড়ি এক...এক কুড়ি দুই...এক কুড়ি দুই...এক কুড়ি দুই...এক কুড়ি তিন...। সেই উঠোন পাহারা দেয়ার জন্য আবার উঠোনের চার কোনায় চারটি ছোট্ট কুড়ে ঘর। এতটুকুন ছোট্ট। ঢুকতে গেলে মাথা নিচু করতে হয়। ভিতরে ঢুকলেও। ওই কুড়ে ঘর গুলো সেই সময় মাঝরাত পর্যন্ত থাকে ছোটদের দখলে। উঠোনের উত্তর পূর্ব পাস দিয়ে ছোট্ট একটা টিনের দরজা। দরজার ওপাশে রিহানের স্বর্গ। দরজা ছাড়িয়ে আর একটা ছোটমোটো উঠোন। বাম দিকে ঘরে ওঠার আর একপ্রস্থ সিঁড়ি আর ডানে একটা বড় মুরগির ঘর আর তারপর শুধু বাগান আর তিনটা বিশাল সাইজের মাছ ভর্তি পুকুর। মুরগীর ঘরটার দেয়ালগুলো মাটির, উপরে গোলপাতার ছাউনি। প্রত্যেক দিন রাতে মুরগি আর হাঁসগুলোকে খেদিয়ে ঢোকানো হয় সেই ঘরে আর সকাল বেলা খুলে দেয়া হয় সেই দরজা। রিহান প্রত্যেকদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে এসে দাড়ায় মুরগির ঘরের সামনে। ছোট্ট দরজাটা খোলা মাত্র ক...কক...কক... আর প্যাঁক...প্যাঁক... প্যাঁক ...প্যাঁক... করতে করতে প্রত্যেকর পায়ে পায়ে বাড়ি খেয়ে বের হয় সব মুরগি আর হাঁসগুলো। একছুটে সবগুলো দৌড় দেয় সামনের রান্নাঘরের পেছনে বিশাল পুকুর ঘাটের পাশে। ওখানেই ওদের প্রাতরাশের বাবস্থা। রিহান অপেক্ষা করে সবগুলো হাঁস, মুরগী বের হওয়া পর্যন্ত। তারপর হাঁটুমুড়ে বসে। তীব্র বিসটার গন্ধে নাক কুঁচকে ওঠে রিহানের। ভিতরে উঁকি দেয়। ভিতরের আন্ধকার সয়ে আসতে রেটিনা সময় নেয় কয়েক সেকেন্ড। তারপরই সে খুজতে শুরু করে সাদা গোল গোল কোন আবায়াব। দেখা মাত্রই উত্তেজিত রিহান একটা লম্বা লাঠি দিয়ে বের করে নিয়ে আসে। ডিম। ডিম হাতে নিয়েই রিহান এক দৌড়ে চলে যায় দক্ষিণ কুলে। রাজুর কাছে।
দক্ষিণ কুলের বাড়িগুলোও কাঠের দোতালা। তবে সাইজে একটুখানি ছোট। সামনে একটা বড় উঠোন রেখে, উত্তর দক্ষিণে ইংরেজি L –এর মতো চারটি বাড়ি। দুই কুলের মাঝে এক চিলতে মাটির রাস্তা। প্রথম বাড়িটা রোকছনাদের, পরেরটা রাজুদের, তারপরেরটা লিটনদের আর শেষ বাড়িটা কামরুলদের। উত্তর কুল আর দক্ষিণ কুলের সবাই আত্মীয়। তবে দক্ষিণ কুলের সবাই নিকটাত্মীয়। আর দক্ষিণ কুলের সবাই রিহানের পরম আত্মীয়। কারন ওই কুলেই যে রাজু থাকে............
ঠিক এরকম একটা স্বপ্নরাজ্যে কেটেছে আমার শৈশবের একটা বড় অংশ। গ্রাম বলতেই আমার কাছে তখন ছিল রুপকথার রাজ্য। যে রাজ্যে কোন শাসন নেই। শুধু খেলা আর খেলা। ঘুম থেকে সকাল বেলা উঠেই রিহানের মতো ডিম হাতে নিয়ে এক ছুটে চলে যেতাম দক্ষিণ কুলে, রাজুর কাছে। আমার সমবয়সী অনেক বাচ্চারা ছিল তখন দক্ষিণ কুলে। ছেলেদের মধ্যে রাজু, লিটন, কামরুল, শামিম, শাহিন, তারিকুল, সবুজ ছাড়াও ছিল গ্রামের অন্যান্য ঘরের ছেলেরা। আর মেয়েদের মধ্যে ছিল, রুবিনা, রুকসনা, লাইজু (রাজুর আত্মীয়), কাকলী, ছোট্ট লিয়া আর ওই যে, গ্রামের অন্যান্য ঘরের মেয়েরা। আমাদের গ্রামের নাম ছিল ভাটখালি, আর ইউনয়ন ছিল পুটীখালি, জেলা বাগেরহাট। সেই সময় মোটামুটি প্রত্যন্ত গ্রাম ছিল ভাটখালি।
আমরা থাকতাম খুলনা শহরে। এক্কেবারে ছেলেবেলায় খুলনা থেকে রওনা দিলে রূপসা নদী ফেরীতে করে পেরিয়ে সোজা চলে যেতাম রূপসা ট্রেন স্টেশনে। সেখান থেকে প্রায় তিন/চার ঘণ্টা ট্রেন ভ্রমন শেষে পৌঁছতাম বাগেরহাটে। সেটা ছিল লোকাল ট্রেন। সব ষ্টেশনই ছুঁয়ে যেত। আর আমি অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করতাম সেই ভ্রমন। সাঁই সাঁই করে মাঠের পর মাঠ ছুটে যেত। মনে হতো যেন সবুজ রংকে সাথে করে সোনালী রঙের দৌড়যুদ্ধ। ট্রেন যেদিকে যাবে রঙ যাবে তার বিপরীতে। সে যেন এক অবিরত প্রতিযোগিতা। কে কার আগে পৌঁছুবে গন্তব্বে। প্রায় প্রায় দেখা যেত ছোট ছোট রাখাল ছেলেরা কখনো একাকী আবার কখনো দল বেঁধে দাড়িয়ে হাত নাড়ছে ট্রেনের যাত্রীদের উদ্দেশে। পরনে লুঙ্গি, মাথায় গামছা আর শরীরটা খালি। খালি গায়ের সেই রাখাল ছেলেরা আমাকে নিশ্চয়তা দিত যে সত্যি সত্যিই আমি আমার গ্রামে যাচ্ছি। আমার রুপকথার রাজ্যে।
বাগেরহাট ট্রেন ষ্টেশন থেকে আমরা তখন ভ্যান বা রিকশা নিয়ে চলে যেতাম নদীর ঘাটে। নৌকায় করে নদী পার হলেই ছিল বাস স্ট্যান্ড। আদ্যিকালের বাস ছিল সেগুলো। বাসগুলোর সামনে ইঞ্জিনের ভেতর একটা রড ঢুকিয়ে ঘুরাতে হতো বেশ কিছুক্ষণ তারপর বাসের ইঞ্জিন চালু হতো। এক স্টার্টেই পুরো ভ্রমন। কোথাও সে ইঞ্জিন একবারের জন্যও থামতনা, শুধু গতিই কমাত। ওই বাসগুলোও ছিল লোকাল। মানে কিছুক্ষণ পর পরই বাস থামত এক এক স্ট্যান্ডে আর হুড়মুড় করে লোকজন নামত আর উঠত সেই বাসে। আমার আম্মাকে দেখতাম ওড়না দিয়ে নাক ঢেকে মহা বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে লোকজনের দিকে। মাঝে মাঝে আমার নাকেও কাপড় দেয়ার বৃথা চেষ্টা করতেন আম্মা। আমার যে কি ভালো লাগতো সেই সময়টুকু। বাসের বাইরে পুরো পুরি চিরায়ত গ্রামের দৃশ্য। একটার পর একটা অসম্ভব সুন্দর বাড়ি আমার পাশ দিয়ে উল্টো দিকে চলে যাচ্ছে। বেশির ভাগ বাড়িগুলোই লোকাল পর্দা দিয়ে ঢাকা। সুপারির পাতা। অনেকগুলো সুপারির পাতা পাশাপাশি রাখলেই তৈরি আমাদের লোকাল পর্দা। বাস ভর্তি মানুষ গ্রামের স্থানিয় ভাষায় কথা বলছে। কৃষকদের গায়ের ঘামের গন্ধ, পানের গন্ধ, কাঁচা সুপরির গন্ধ, মাথায় ব্যাবহার করা সরিষার তেলের গন্ধ, আরও কত কি... মিলেমিশে এক অদ্ভুত স্বতন্ত্র গন্ধের সৃষ্টি করত। সেই ছোট্ট আমি মাতাল হয়ে যেতাম।
এই মাতাল করা বাসে আমাদের গন্তব্য ছিল দৈবজ্ঞহাটি। দৈবজ্ঞহাটি থেকে আমাদের গ্রাম ভাটখালি ছিল পায়ে হাঁটা পথ। প্রায় সাত/আট কিলোমিটার। আর এই যাত্রাপথটুকুই ছিল আমার “Way to The Wizard of Ozz”। আমি হারিয়ে যেতাম আমার কল্পনার রাজ্যতে। কখনো ক্ষেতের আইলে, কখনো বা মেঠো পথে খালি পায়ের সেই ছোট্ট আমির আঁকাবাঁকা ছোটা। আহা! কি যে দুরন্ত আনন্দ!!! সারা গ্রাম জুড়ে যেন ছিল আমাদের আত্মীয়। কিছুক্ষণ পরপর তাই থামতাম এক এক বাড়িতে। কোথাও আপ্যায়িত হতাম মুড়ি আর গুড়ে। আর কোথাওবা রসের পিঠা। কি চমৎকার আন্তরিকতা আর অতিথিয়তা। মোটামুটি দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছে যেতাম আমার রাজপ্রাসাদে। উত্তর কুলে। আর উত্তরকুলে পৌঁছানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে দক্ষিণকুলে আমার চীৎকার শুনত সবাই। এ...এ...এ...রাজু...উ.উ.উ. রাউজ্জারে...এ.এ।
রাজু ছিল বেশ ভালই মূর্খ। কতদুর পরাশুনা করেছিল তা আমার মনে নেই। তবে ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত আমি কনফার্ম। কারন ওই ক্লাশ পর্যন্ত আমি নিজেও মাঝে মাঝে ওর সাথে ইস্কুলে গিয়েছি। ইস্কুলের বিষয়ে মূর্খ থাকলেও বাকি বিষয়গুলোতে রাজু ছিল অসম্ভব দারুন। যেমন ধরা যাক, ডাউক পাখি ধরা। এই পাখিটা বেশিক্ষণ উড়তে পারেনা। কিছুক্ষণ ওড়ে তারপর দৌড় দেয়। আবার ওড়ে আবার দৌড়। ওড়ার শক্তি কম কিন্তু প্রাণশক্তি মারাত্মক। ডাউক ধরা তাই বেশ কঠিন। সেই বার গ্রামে একটু তাড়াতাড়িই গিয়েছিলাম। উত্তর কুলের পাশেই মাইলের পর মাইল শুধু ধান ক্ষেত। বেশির ভাগই উত্তর কুলের। সেই ধান খেতের মধ্যে আমি আর শামিম ইঁদুরের গর্ত খুঁড়ছিলাম। মেঠো ইঁদুর। মাঠের ধান, গাছ সহ কেটে একটা বড় গর্তে লুকিয়ে রাখে। আর আমরা ছোট ইঁদুরের দল সেই গর্ত খুঁজে খুঁজে ইঁদুরের চুরি করা ধানগুলোকে দ্বিতীয়বার চুরি করি। এক সের ধান দিলে এক সের গোলগোল্লা পাওয়া যায়। মজার খাবার। খাবারের চেয়েও মজার সেই ইঁদুরের কাছ থেকে ধান চুরির মুহূর্তগুলো। সেরকমই এক দিনে শামিম এর সাথে আমার প্রথম ডাউক পাখি দেখা। শামিম কে জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে পাখির নাম বলে দিলো একটা বিশিষ্ট সহ। আর তা হল, পাখিটা বেশিক্ষণ উড়তে পারেনা। দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য জানার আগেই আমি ডাউকের পেছনে দে ছুট। ধান ক্ষেতের ভেতরে দিয়ে। ডাউক যেদিকে আমিও সেদিকে। আমি ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটছি। পাকা হলুদ রঙের ধানের শিস আমার দুই পাশ দিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে যাচ্ছে। ধানের শিসে আমার শরীরের খোলা জায়গাগুলোতে লেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। আমি তবুও ছুটছি। কিছু বুঝতে পারছিনা। বুঝলাম পরদিন গোসল করবার সময়। যেই খালে লাফ দিয়েছি অমনি নদীর নোনা পানিতে সারা শরীর জ্বলে উঠল। কিছুক্ষণের মধ্যে মুখ, হাত, পা সব ফুলে গেল বিশ্রীভাবে। রাজু এল রক্ষাকর্তা। আমাকে দেখে নিমেষে বুঝে গেল সব। জিজ্ঞেস করলো, এ ব্যাডা ডাউক্কা কি অমনে ধরন যায়? আয় আইজগো তরে ডাউক ধরন শিখামুয়ানে। ওই দিনই জীবনের প্রথম ডাউক ধরা। খুব আসলে কঠিন না। ডাউক সাধারনত সোজা দৌড়ায়। তাই ডাউককে তাড়া করেই একটু ডানে বা বাম দিক দিয়ে দ্রুত গিয়ে ডাউকের চলার রাস্তায় দাড়াতে হয়। তারপরের কাজ সোজা। আমি যখন জীবনের প্রথম ডাউক ধরার আনন্দে দিশেহারা তখন রাজু এসে বলল, সাধ মেটছে? এইবার ছাইরা দেও দেহি। আমিতো অবাক। কি বলে হাঁদারাম। কে না জানে ডাউক পাখির মাংশ কত স্বাদের? আমি তেজের সাথে জিজ্ঞেস করলাম, কেন ছেড়ে দেবো? রাজু খুব শান্ত কণ্ঠে আমাকে বিজ্ঞের মতো জবাব দিলো, তরে দৌড় পাইর্যাব যদি তর চাইতে একশো গুন বড়ো কোন পেরানি তর হাত, পা এক কইরা ঝুলাইয়া তরে মজা কইরা রান্দনের আর খাওনের আলাপ করত, হেইলে তর খুব আরাম লাগত? স্বীকার করতেই হবে যে, তা অবশ্যই খুব আরামের হতোনা। সুতরাং ডাউক ছেড়ে দিতে হল। এই হল রাজু। সে সব জানত। আমরা যা জানতাম তাও জানত, যা জানতাম না তাও। রাজু ছিল আমার প্রানের দোস্তো। আমার রক্ত বন্ধু, ভাই সবকিছু।
আমরা ধিরে ধিরে বড় হতে লাগলাম। শৈশবের দুরন্তপানা রুপ নিল কৈশোরের বাঁদরামিতে। প্রত্যেক বছর ফাইনাল পরীক্ষার পর লম্বা একটা সময় আমার বরাদ্দ ছিল গ্রামে। সেই সময় চলতো আমাদের সার্বিক বাঁদরামি। আমি যখন একটু বড়ো ক্লাশে তখন রাজুর পারিবারিক চাপে রাজু চাকরি নিল আমাদের ভাটখালি বাজারের একমাত্র পাইকারি দোকানে। সেই সময় আসলে ওই দোকানটাই ছিল পুরো ইউনিয়নের মধ্যে একমাত্র পাইকারি দোকান। লিটনের বাবার, রাঙ্গা ভাইয়ের। রাঙ্গা ভাই আবার ছিলেন রাজুর নানার আপন ভাই আর লিটন ছিল আমাদের বন্ধু। রাজুর বাবা জীবিত ছিলেননা। ওর বাবার মৃত্যুর পর রাজুর মাকে জোর করে অন্য জাইগায় বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল ওর নানাবাড়ির সবাই। সেই সময় এটা একেবারে সধারন ঘটনা। তাই রাজু ছোটবেলা থেকেই নানাবাড়িতে মানুষ। শহরে গিয়েছে খুব কম। দৌড় ওর গঞ্জ পর্যন্ত। মোড়লগঞ্জ।
চাকরি নেওয়ার পর রাজু খুব ব্যাস্ত হয়ে পড়ল। সকাল দশটার মধ্যে গিয়ে দোকান খুলতে হয়। দুপুরে তিন ঘণ্টার ছুটি। খাওয়া, গোসল, বিশ্রাম সব এই সময়ের মধ্যে। তারপর আবার রাত দশটা পর্যন্ত দোকানে। কঠিন কাজ। একেবারে ফুরসত পায়না আমাকে সময় দেবার। যা টুক টাক দেখা হয় সেই গোসল করার সময় আর না হয় অনেক রাতে। আগে কয়েক ঘণ্টা ধরে শুধুই গোসল করতাম। আমাদের অত্যাচারে পুকুর, খাল, বিল সব বিরক্ত হয়ে যেত তবু আমাদের গোসল শেষ হতনা। আর সেখানে এখন কোনমতে অল্প সময়ের মধ্যেই সব সারতে হয়। কথা যা হয় তা রাতে। সেই সময় আমি আবার নতুন নতুন সিগারেট খাওয়া শিখেছি। গোল্ডলিফ সিগারেট। এক পিস মাত্র দুই টাকা। সেই জোগাড় করতেই জান বের হয়ে যায়। সেই সময়টাতে আমাদের অভিভাবকরা কোন হাত খরচ দিতেননা। পকেট চালাতে হতো খুব সাবধানে। কখনও বাবা- মায়ের কাছ থেকে বিভন্ন অজুহাতে টাকা মারতাম। কখনওবা ইস্কুলে যাওয়ার রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে। তবে বেশির ভাগ সময় চেয়ে চিন্তে। গ্রামে যাওয়ার আগে হয়তো গোপনে এক প্যাকেট সিগারেট জোগাড় করতাম এবং তা কয়েকদিনের মধ্যেই ফিনিশ। তারপর চলতো বদলাদের “সোনালী বিড়ি”। এক প্যাকেট মাত্র দেড় টাকা। জিনিশ অনেক কড়া তবে কাজ যেহেতু ধোয়া খাওয়া তাই শুধুমাত্র কাজ চলে। ভাব চলেনা।
আমাদের গ্রামের হাটটাই ছিল পুরো ইউনিয়ন এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাট। হাট বসত সপ্তাহে দুই দিন। রবি আর বৃহস্পতিবার। হাটের আগের দিন রাতে রাজুর দোকানের সব মালপত্র আসত গঞ্জ থেকে। বড় বজরা নৌকায়। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত সেই নৌকা পাহারা দিতাম। হাটের দিন সকাল থেকেই নাম না জানা কত গ্রাম থেকে যে নৌকা এসে জমা হত হাটের ঘাটে, তার ইয়াত্তা নেই। হাজার রকম পশরা থাকতো সেই নৌকায়। পায়ে হেঁটে আশেপাশের দশ গ্রামের মনে হয় সবাই চলে আসত হাটে। হাট শুরু হত দুপুরের পরে। কিন্তু ব্যাবসায়িরা আসতে শুরু করতেন সকাল থেকেই। সেই সময় দেখতাম আমাদের জ্ঞাতি ভাই, কামরুলের আব্বা হাটের থেকে টাকা তুলতেন। প্রতি বছর সরকার থেকে ডাক হত। সর্বচ্চ দর দাতা পেতেন হাট। প্রতি হাটবারে তাই সে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে টোল নিতেন হাটে আসা সব ব্যাবসায়িদের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে আমিও মজা করার উদ্দেশে কামরুলের সাথে সাথে ঘুরে টোলের টাকা তুলতাম। চমৎকার সময় ছিল সেটা। এরকমই কোন এক হাটবারে অনেক ব্যাস্ততার মধ্যেও রাজু আমাকে ডেকে বলল আজকে রাতে যখন দোকান বন্ধ করবে তখন যেন আমি অবশ্যই থাকি। ওরা হাটের দিন সাধারনত দোকান বন্ধ করে রাত নয়টা দশটার দিকে। ওইদিন তাই আমি বন্ধ করার আগে আগেই পৌঁছে গেলাম বাজারে। হাট শেষ হয় সাধারনত সন্ধে সাতটা/ আটটার মধ্যেই। তারপর চলে রাঙ্গা ভাইএর হিসাব। কে কত টাকার বাকি নিল, কত টাকা শোধ করলো ইত্যাদি। হাট শুরুর আগেই সবাই রাঙ্গার দোকান থেকে বাকিতে জিনিশপত্র নিয়ে যেত আর হাট শেষ হলেই সেই টাকা শোধ করত। অনেকে আবার পরেরদিনের অন্য হাটে বিক্রির উদ্দেশেও জিনিশপত্র বাকিতে নিত। রাজু পরদিন সেইসব হাট ঘুরে ঘুরে সব টাকা কালেকশন করত। আমি রাতে দোকানে উপস্থিত হয়েই সবসময়ের মতো বসে বসে কাঁচা বাদাম খাওয়া শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি রাজু আমাকে ইশারায় ডাকছে। আমি দোকানের বাইরেই বেঞ্চিতে বসে ছিলাম। সেখান থেকে উঠে এবার নদির ঘাটে আসলাম। শীতের সময়। প্রচুর ঠাণ্ডা আর কুয়াশা। বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে রাজু হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করলো যে, “কাইল গজালিয়া হাডে বকেয়া তোলতে যাব। তুই যদি যাস তাইলে তরে একখান উপহার দেব’। আমার কোন কাজ ছিলনা। তাই রাজি হয়ে গেলাম। পরদিন সকাল দশটায় আমরা রওনা দেব।

নয়টার দিকে রাজু এসে আমাকে ডেকে তুলল। যাবিনা? শীতের সকাল কোনমতে আড়মোড়া ভেঙ্গে পাঁচ মিনিটে কাপড় বদলে সোয়েটার, জ্যাকেট পড়ে রওনা দিলাম রাজুর সাথে। যে হাটে রাজু যাবে সেই হাটটা আমাদের গ্রাম থেকে বেশ দূরে। দশ/বারো মাইলের কমনা। পুরো পথটা হেঁটেই যেতে হবে তাই এতো তাড়াতাড়ি প্রস্তুতি। গ্রামের শীতের সকাল কিন্তু শহরের মতো না। অসম্ভব সুন্দর। চারিদিকে শুধু কুয়াশা। পাঁচ হাত দুরের জিনিসও দেখা যায়না। মারাত্মক ঠাণ্ডা। আর চারিদিকে ঘাস, আড় গাছের পাতায় যেন ছোট্ট ছোট্ট মুক্তো বসানো। তিব্র শীতে কথা বলার সময়ও মুখ থেকে ধোঁওয়ার মতো বের হয়। শীতের দিনে এতো সকালে খুব কম মানুষই ঘুম থেকে ওঠে। এরকম একটা সকালে আমরা দুই বন্ধু চললাম অনেক দুরের পথে। ঘর থেকে নেমে ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার মতো অবস্থা। রাজু বলল,“এখন একটু শীত করছে, তবে হাঁটা শুরু করলে আর সমস্যা নেই। গা গরম হয়ে যাবে”। ভরশা এখন সেটাই। রাজু সব জানে। আমরা হাঁটা শুরু করলাম। আমাদের বাড়ি থেকে রাস্তায় যেতেই প্রায় পাঁচ মিনিটের পথ। পুরো পথটাই বাগানের ভেতর দিয়ে। বড় বড় সব গাছ। কুয়াশার কারনে কিছুটা দেখা যায় আর বাকিটা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। কেমন যেন অদ্ভুত এক পবিত্রতায় মাখা। বিশ্বচরাচর একদম নিশ্ছুপ। মাঝে মাঝে কোন এক নাম না জানা পাখি হয়তো মনের ভুলে ঘুমের ভেতর ডেকে উঠছে। সেই শব্দ প্রকৃতির এই নিস্তব্দতাকে ভাঙ্গতে পারছেনা। বরং যেন আরও বাড়িয়ে তুলছে। প্রকৃতির এই অসম্ভব সুন্দর রুপে কেন যেন নিজ থেকেই ভালবাসার সাথে সাথে একটা স্রধাও চলে আসে। এই মৌনতা যেন নিজেকে জানানোর জন্য সৃষ্টিকর্তার এক অভাবনীয় প্রচেষ্টা। সবাই ইচ্ছে করলেও পায়না। আমি পেয়েছি। আমি ধন্য।
বাড়ির সীমানা পেরিয়ে আমরা এখন খালপাড় ধরে হেঁটে চলছি। তখন ভাটির সময়। আমাদের সাথে সাথে শীতে ভেজা নদীও চলছে। সাথে নিয়ে কচুরিপানা আর ঘোলা জল। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশের কোন বাড়ির আঙিনায় খেজুর গাছের রস পাড়ছে কোন এক গাছি। সেই খেজুর গাছের উপর থেকেই ডেকে উঠছে, “ক্যাডা যায়রে?” এই ডাকটাও যেন আজ সকালের প্রকৃতির একটা অংশ। রাজুও জোর গলায় চেঁচিয়ে উত্তর দেয়, “আমরা গো চাচা। আমি রাউজ্জা, আর লগে আছে উত্তর কুলের মেহমান”। গাছ থেকে আবার প্রশ্ন, “ক্যাডা বাবুল্লার (বাবুল-আমার খালাতো ভাই) ভাই নাহি?”। হাঁটতে হাঁটতেই রাজু উত্তর দেয়, “হ..চাচা”। আবার প্রশ্ন, “তা তোমরা যাও কই?” এবার আমি চেঁচিয়ে বললাম, “দোকানের বকেয়া তুলতে যাচ্ছি”। আমার গলার আওয়াজ পেয়ে উনি আরও জোরে বলে উঠলেন, “দুজ্ঞা কিছু মুখে দিয়া যাও আমাগো বাড়ি থেইক্কা”। আমরা তখন সেই বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে এসেছি। রাজু অনেক জোরে চিৎকার করে বলল, “আমু আনে চাচা। হ্যারে লইয়া বৈকালে আমু আনে”। এই হোল আমার বাঙলার চিরাইত রুপ। আমি তখনও শীতে কাঁপছি। কাঁপতে কাঁপতেই চলে আসলাম ভাটখালি বাজারের ব্রিজের উপর। কাঠের ব্রিজ, সাথে লোহার রেলিং। ব্রিজের উপর এসে রাজুকে বললাম, “একটু থামরে, একটা বিড়ি খেয়ে নেই”। তখন বিড়িই সম্বল। সিগারেট শেষ আরও চার/পাঁচ দিন আগে। রাজু হেসে ফেলল।
]তর আর বিড়ি খাইতে হবেনা।
[ক্যান?
] এখন থেইক্কা তরে আর বিড়ি টানতে হইবনা। প্রত্যেক সপ্তাহে দুইডা প্যাকেট পাবি। তয় শর্ত একখান, আমার লগে সবসময় বকেয়া তোলতে যাইতে হবে।
রাজু ওর গায়ের চাদরের ভিতর থেকে বের করলো একদম ব্র্যান্ড নিউ টাটকা এক প্যাকেট গোল্ড লিফ সিগারেট। আমি তো অবাক। রাজুকে কোনোমতেই স্মকার বলা যাবে না। ও টুকটাক যা খায় তা আমাকে সঙ্গ দেবার জন্য। তারচেয়েও বড় কথা, এক প্যাকেট গোল্ড লিফ সিগারেটের দাম চল্লিশ টাকা। ওই সময় এটা ওর জন্য অনেক টাকা। এসব কিছু চিন্তা করতে করতেই রাজু বের করলো আর এক প্যাকেট। আমি তখন আর কিছু চিন্তা করতে পারছিলামনা। খুশিতে গদ গদ হয়ে আগে এক প্যাকেট ছিঁড়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ফেললাম। অনেকদিন পর ধোঁওয়ার সাথে কিছুটা ভাবও টানলাম।
সিগারেট টানতে টানতে তীব্র শীত উপেক্ষা করে, ঘন কুয়াশার মাঝে ঘাড়ে হাত দিয়ে নদীর পাড়ে পাড়ে হেঁটে চলছি দুই বন্ধু। নেই কোন চিন্তা, নেই কোন চাওয়া পাওয়া। নেই কোন গন্তব্বে যাওয়ার তাড়া। মাস শেষে নেই টাকার চিন্তা। সেই মুহূর্তে মাথায় নেই কোন প্রেমিকার কথা। এক অনাবিল প্রশান্তির মাঝে একবারের জন্য হলেও প্রকৃতি আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। না বুঝে হলেও অকণ্ঠে পান করেছি আমি সেই প্রশান্তি। আজ যেন তা এক স্বপ্ন, সেই কুয়াশা ছোঁয়ার, নদীর ঘোলা জল ছোঁওয়ার আর তোর হাত ছোঁওয়ার বন্ধু।
পরের গল্প বেশ ছোট। স্বপ্নের জগত ছেড়ে তখন বাস্তবতার আকাঙ্ক্ষা পুরনে ব্যাস্ত আমি হঠাৎ করে জানতে পারলাম রাজু ঢাকায়। আমি অবাক। রাজু ঢাকায় অথচ আমাকে জানায়নি। ভালো করে খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, বিয়ে করেছে রাজু। ছোট্ট একটা ছেলেও হয়েছে। সাংসারিক টানাপোড়নে রাজু এখন একজন ট্যাম্পু হেল্পার। থাকে খিলগাঁওয়ের আশেপাশে কোথাও। একদিন খুঁজতে খুঁজতে হাজির খিলগাঁও ট্যাম্পু স্ট্যান্ডে। একে ধরে ওকে জিজ্ঞেস করে শেষ পর্যন্ত খোঁজ পাওয়া গেল রাজুর। সে এখন ডিউটিতে। যে কোন সময় এসে পরবে। পাশের এক চায়ের দোকানে বসলাম আর স্ট্যান্ডের একজনকে অনুরোধ করে আসলাম যেন রাজু আসলে এই চায়ের দোকানে পাঠিয়ে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা মিলল রাজুর। একটু শুকিয়ে গেছে। কিন্তু চেহারা আর চোখের দুষ্টমি আছে এখনও। আমাকে রাজু কল্পনাও করেনি। অসম্ভব খুশি হয়েছিল ও সেদিন। অনেকক্ষণ গল্প করলাম আমরা। জিজ্ঞেস করলাম, “তুই যে ঢাকায় একবারও যোগাযোগ করলিনা কেন?” ওর সহজ সরল উত্তর, “তুই ব্যাডা বিয়া করছ সেইরহম বড়লোক। করো ব্যাডা ব্যাবসা। আমি ট্যাম্পুর হেল্পার ক্যামনে তোর কাছে যাই? তুই পরিচয় দিবি ক্যামনে? তর লজ্জা লাগবনা?” আমি তখনও পরিচয় দিয়েছি এখনও দেই। তুইতো আমার বন্ধুরে।
এরপর বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। আমি আবুধাবিতে। হঠাৎ দুঃসংবাদ আসলো আমার আর এক প্রানের বন্ধু আবদুল্লাহ হেল বাকি (সোহেল), পড়ত খুলনা ইউনিভার্সিটিতে, আর্কিটেক্টে। সে কটকা ট্র্যাজেডিতে মারা গেছে। বাকি ছিল আমার ইস্কুল বন্ধু। ক্লাশ থ্রী থেকে একসাথে পরাশুনা। আমরা তিন বন্ধু ছিলাম একসাথে। প্রানের দোস্তো। আমি, বাকি আর সঞ্জয় (মেজর আরিফ)। অনেক কষ্ট পেলাম। কিছুদিন পরে দেশে ফিরে ভাবলাম অনেকদিন গ্রামে যাইনা। আর সবার সাথেও দীর্ঘদিন যোগাযোগও নেই। সেই উদ্দেশেই গ্রামে যাত্রা। হাতে বেশ সময় নিয়েই গেলাম। অনেকদিন বিশ্রাম নেইনা। এইবার একটু লম্বা সময়ের জন্য বিশ্রাম নেব।
যথারীতি সেই ছেলেবেলার মতো উত্তরকুলে পৌঁছেই কোনমতে ব্যাগটা রেখে বড় খালাকে সালাম করেই রওনা হলাম দক্ষিণ কুলের উদ্দেশে। হঠাৎ খালা আমার হাত টেনে ধরলেন। খুব আবেগি কণ্ঠে বল্লেন, “কোথায় যাও?” বললাম, দক্ষিণ কুলে। খালা জিজ্ঞেস করলেন, রাজুর লগে দেখা করতে যাও? আমার উত্তর, হাঁ। খালা আমার হাত ধরে ওনার আরও কাছে নিয়ে গেলেন, আস্তে আস্তে বললেন, “রাজু আর নাই। রাজু মারা গেছে”। আমি ফিক করে হেসে ফেললাম। খুব শক্ত একজন মানুষের মতো জিজ্ঞেস করলাম, কিভাবে? খালা অনেক লম্বা চওড়া গল্পটা বললেন। কিছুই বুঝলাম না। আমি তখনও হাসছি। হঠাৎ দেখি দুই চোখ থেকে পানি পড়ছে। বড় খালা পুরনো মানুষ। আমার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “আহারে! তোর এতো কাছের বন্ধু ছিল। আর তিনটা দিন আগে আসলেই অন্তত বন্ধুর মুখটাতো শেষবারের মতো দেখতে পারতি”। আমার মাথায় তখন সেই কুয়াশার দৃশ্য। নদীর পাড়ে আমরা দুই বন্ধু তীব্র ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে একজন অন্যজনের ঘাড়ে হাত রেখে হাঁটছিতো হাঁটছিই। রাজু আটকে গেল আমার কুয়াশার ফ্রেমে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি একজন পাতলা করে মহিলা ছোট্ট একটা নাদুসনুদুস বাচ্চাকে সাথে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে দক্ষিণ কুল থেকে উত্তর কুলে আসছে। পেছনে দক্ষিণ কুলের আরও বেশ কিছু মহিলা এবং বাচ্চা। সবাই শোকগ্রস্ত। কেউ একজন দক্ষিণ কুলে খবর দিয়েছেযে আমি এসেছি। সেই খবর শুনে রাজুর বউ হয়তোবা সান্তনা খোঁজার জন্য তার স্বামী-এর সবচেয়ে কাছের বন্ধুর কাছে ছুটে এসেছে। কি সান্তনা দেবো আমি? আমি হাসিমুখে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলাম। এক্কেবারে রাজুর ডুপ্লিকেট। কেমন বড় বড় চোখ, গোলগাল চেহারা, হালকা কালচে গায়ের রঙ। বাপকা বেটা। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলাম, “বেটা, নাম কি তোর?” বাপের মতই সবজান্তা হাসি হেসে উত্তর দিলো, রমিজ। দক্ষিণ কুলের সবাই দেখি কাঁদছে। শোকতো তিন দিনে শেষ হওয়ার কথা। তারপরেও এরকম দলবেঁধে কাঁদা। এবার ওখানে আমার ছেলেবেলার এক বন্ধু রুবিনাকে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলাম, “কিরে এরকম দল বেঁধে কাঁদছিস কেন? কাঁদলে কি রাজু ফেরত আসবে?” রুবিনা কাঁদতে কাঁদতেই উত্তর দিলো, “ও চাচা, তুমি একটু কান্দ। তোমার দুখ দেইখা তো আমাগো আরও দুখ লাগতাছে”। আমি খুব দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে চলে আসলাম রাজু আর আমার ছেলেবেলার সবচেয়ে পছন্দের খেলার জায়গায়। বিলের ধারে পুকুর পাড়ে। ওদের মাঝে নিজেকে খুব অসিহয় মনে হচ্ছিলো। থাক, আমার দুঃখ আমারি থাক।
ওই দিন সন্ধায় চুলার পাড়ে বসে শুনলাম রাজুর চলে যাওয়ার গল্প। বান্ধু আমার প্রোমোশন পেয়ে ট্যাম্পুর হেল্পার থেকে হয়েছিল বাসের হেল্পার। কোন এক অশুভ দিনে রাজু হেল্পারি করছিল বাসের দরজায়। হঠাৎ করেই পরনের কাপড় খুলে যায় ওর। সেই কাপড় সামলাতে গিয়ে রাজু চলে যায় চলন্ত বাসের নিচে। ছিঁড়ে চ্যাপ্টা হয়ে যায় আমার বন্ধুর শরীর। রাজু ছিল খুব আবেগি। আচ্ছা, যখন রাজু বাসের নিচে চলে গিয়েছিল তখনকি মৃত্যু টের পেয়ে ওর একমাত্র আদরের ধন রমিজের কথা মনে হয়েছিল? রমিজের ছোট্ট মুখটা শেষবারের মতো ছোঁয়ার জন্য মৃত্যুর ঠিক আগে কি রাজুর রক্তাত্ত হাটটা একবার নড়ে উঠেছিল? উত্তরগুলো আর জানা হলনা।
রাজুর চলে যাওয়ার পরে একবার কি দুইবার আমি গ্রামে গেছি। তাও দুই একদিনের জন্য। রমিজের বয়স এখন সম্ভাবত বারো। রমিজের মা রাজু মারা যাওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আবার বিয়ে করে ফেলেছে। আগেই বলেছি, গ্রামে এটা খুব সাধারণ ঘটনা। রমিজ এখন থাকে রাজুর নানার কাছে। একা একা। মা নেই, বাবা নেই, ছোট্ট একটা হৃদয়ে কোন বড় আশাও নেই। আমাকে চেনেওনা। লোকমুখে শুনে শুধু হয়তো জানে আমার কথা। হয়তো রমিজ ওর বন্ধুদের কাছে গল্প করে যে, ওর বাবার এক বন্ধু আছে। যার গাড়ি আছে, সেই গাড়ি আবার সে নিজেই চালায়। থাকে ঢাকায়। মাঝে মাঝে বিভিন্ন দেশে যায়, ঘোরা আর ব্যাবসায়ের কাজে। অনেক ব্যাস্ততো তাই সময় করে আসতে পারেনা। একদিন হঠাৎ করে বড়ওও একটা গাড়ি নিয়ে এসে আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাবে। আমি ঢাকাতে পরাশুনা করবো। গাড়িতে করে ইস্কুলে যাব। আরও কত কি? রমিজ বেটা, তুমি অপেক্ষা করো, তোমার বাবার বন্ধু একদিন এসে ঠিকই তোমাকে নিয়ে যাবে।
রাজু আমি অপেক্ষায় আছি। সবাইকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ পেতে হবে। আমিও বাতিক্রম না। যেমন তুইও ছিলিনা। কিন্তু তোর বা বাকির কথা মনে পড়লে বুকের ভেতর মোচর দেয়রে বন্ধু। আগে চলে যাবি, যা। তাই বলে এতো কষ্ট নিয়ে? হিসেব এখানে দুইটা। এক হিসেবে আমি ভালো আছি। তোদের মতো এতো কষ্ট নিয়ে যেতে হয়নি আমাকে। আর এক হিসেবে তোরা ভালো আছিস। আমার মতো জীবন যুদ্ধের কষ্টের মাঝেও প্রিয় বন্ধু হারানোর শোক নিয়ে বেঁচে নেই তোরা। দুটোর জন্যই সৃষ্টিকর্তার কাছে ধন্যবাদ। তোকে উদ্দেশ্য করে আমার কয়েকটা শেষ কথা।
“সরি বন্ধু। আমাদের অনেক পরিকল্পনা ছিল এই জীবন নিয়ে সেই ছেলেবেলা থেকে। কিন্তু অর্থ নামক অনর্থের পেছনে দৌড়াতে গিয়ে সব পরিকল্পনা ভুলে গিয়েছিলাম। তুই চলে গেছিস চিরতরে কিন্তু আশা এখনও যায়নি। আমি তোর আর আমার পরিকল্পনাগুলো এবার হাতে নেব, ইনশাল্লাহ। তারপর কোন এক শীতের সকালে তীব্র ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে আমি আবার হাঁটবো তোর সাথে। অনেক কথা হবে তখন। খেজুর বাগানের ভেতর থেকে যখন কুয়াশা ফুড়ে সূর্যের প্রথম আলো এই ধরণীকে স্পর্শ করবে, তখন আমি ধরে নেব এই আলো তোকে ছুঁয়ে এসেছে।

advertisement

advertisement

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন

advertisement